যে তিন ফ্যাক্টরে পাকিস্তানকে 'প্রায় বাদ' করে সহজ জয় তুলে নিলো কোহলির ভারত

চ্যাম্পিয়নস ট্রফি ২০২৫-এর বড় ম্যাচে কোনও রকমের নাটকীয়তা ছাড়াই পাকিস্তানকে হারিয়ে দিলো ভারত। দুবাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ৬ উইকেটে হেরেছে টুর্নামেন্টের স্বাগতিক পাকিস্তান।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই-এ পাকিস্তান টসে জিতে ব্যাটিং করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ৪৯.৪ ওভারে ২৪১ রান করে অলআউট হয়ে যায়। জবাবে ভারত সাত ওভার তিন বল হাতে রেখে জয় তুলে নিয়েছে।

এই ম্যাচ জয় ভারতের জন্য এতোটাই সহজ ছিল যে ম্যাচের শেষ পর্যায়ে দর্শকদের আগ্রহের বিষয় ছিল ভিরাট কোহলির শতক হবে কি না।

শেষ পর্যন্ত কোহলির ৯৬ রান থাকা অবস্থায় ভারতের যখন চার রান দরকার, তখন কোহলি চার মেরে খেলা শেষ করেন এবং শতক পূর্ণ করেন।

এটি ভিরাট কোহলির ৫১তম ওয়ানডে শতক, ম্যাচসেরার পুরস্কারও পেয়েছেন তিনি।

ম্যাচ শেষে কোহলি ফর্মে ফেরা নিয়ে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন, "সেমিতে ওঠায় অবদান রাখতে পেরে ভালো লাগছে, এই মাঠে কীভাবে খেলতে হবে আমি নিশ্চিত ছিলাম, তেমন ঝুঁকি নেইনি স্পিনারদের বিপক্ষে।"

ভারতের এই জয়ে চিরপ্রতিদ্বন্দ্রী পাকিস্তানের বাদ পড়াটা প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেছে। সোমবার নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশ হেরে গেলে ভারত ও নিউজিল্যান্ড গ্রুপ-এ থেকে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করবে।

তবে নিউজিল্যান্ড যদি ভারত ও বাংলাদেশের বিপক্ষে হেরে যায় এবং পাকিস্তান বাংলাদেশের বিপক্ষে জয় পায় তবে পাকিস্তান সেমিফাইনালে উঠতে পারে, সেটা যদিও বেশ দূরের সম্ভাবনা বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

আরও পড়তে পারেন

বাবর ও ইমামের উইকেট

টস জিতে ব্যাট করতে নেমে পাকিস্তান ভালোই করছিল। পাঁচটি চার মেরে বাবরকে যখন দারুণ ছন্দে মনে হচ্ছিল ঠিক তখন হার্দিক পান্ডিয়ার তুলনামূলক নিরীহ একটি বল ব্যাটের কানায় লেগে উইকেটকিপার কেএল রাহুলের হাতে ক্যাচ তুলে দেন বাবর আজম।

বিবিসি সাউন্ডসে ভারতের কিংবদন্তী সাবেক অধিনায়ক সুনীল গাভাস্কার বলছিলেন, "দারুণ দুটি শট মারার পর বাবর আউট হলেন, যেন ভারত বাউন্ডারি হজম করার দুশ্চিন্তা কাটিয়ে উঠতেই উইকেট পেয়ে গেলো"।

এর ঠিক এক ওভারের মাথায় ইমাম উল হক কঠিন একটি সিঙ্গেল নিতে গিয়ে আকসার প্যাটেলের ডিরেক্ট থ্রোয়ের ফাঁদে পড়েন। সুনীল গাভাস্কারের মতে, "এটা কখনোই রান নেয়ার মতো ছিল না"।

বিবিসি সাউন্ডসে নিজের বিশ্লেষণে ভারতের হয়ে বিশ্বকাপজয়ী এই ক্রিকেটার বলেন, "এই রানটা আসলে ডট বলের প্রেশারে নিতে গিয়েছেন ইমাম উল হক, এটা খুবই বাজে সিদ্ধান্ত ছিল"।

ইমাম আউট হন ২৬ বলে মাত্র ১০ রান করে।

রিজওয়ানের ধীর ব্যাটিং

প্রথম দুই উইকেটের পতনের পর পাকিস্তান বেশ পিছিয়ে পড়ে। ১০ ওভারের মাথায় স্কোরকার্ডে ৫০ এর বেশি রান থাকলেও দুই ওপেনারকে হারিয়ে পাকিস্তানের মোহাম্মদ রিজওয়ান ও সউদ শাকিল ধীরে খেলার সিদ্ধান্ত নেন। পরের ছয় ওভার তারা কোনও বাউন্ডারি মারতে পারেননি।

রিজওয়ান ৫৯ স্ট্রাইক রেটের একটি ইনিংস খেলেন যা আধুনিক ক্রিকেটে খুবই অনুপযোগী।তিনি রান রেট বাড়ানোর চাপে পড়ে বাজে একটি শট খেলে আউট হন।

বিবিসি রেডিওতে নিজের বিশ্লেষণে ইংল্যান্ডের নারী দলের সাবেক ক্রিকেটার অ্যালেক্স হার্টলে বলেন, "রিজওয়ান কুৎসিত শট খেলে আউট হয়েছেন"।

৭৭ বলে ৪৬ করা রিজওয়ান আউট হওয়ার দুই ওভার পরেই সউদ শাকিলও প্যাভিলিয়নে ফেরেন।

তাদের এই জুটি থেকে ১৪৪ বলে ১০৮ রান এসেছে।

এরপর পাকিস্তানের নিয়মিত বিরতিতে উইকেট গেলেও খুশদিল শাহ'র ৩৮ রানে শেষ পর্যন্ত ২৪১ রান করতে পারে পাকিস্তান।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

ভারতের বুদ্ধিদীপ্ত আগ্রাসন ও নিয়ন্ত্রিত ব্যাটিং

ভারতের ব্যাটিং-এর শুরুটা ছিল আগ্রাসী। রোহিত শর্মা শাহীন শাহ আফ্রিদির দারুণ এক বলে বোল্ড হওয়ার আগেই ২০ রান তোলেন ১৩৩ স্ট্রাইক রেটে।

অনেকটা খেলার ছন্দ ঠিক করে দেন তিনি। পরের ১০ ওভারে ভারতের ৬৪ রান চলে এসেছে ১ উইকেট হারিয়ে।

তবে এই উইকেট ছিল ধীরগতির বোলারদের, পাকিস্তানের তরুণ স্পিনার আবরার আহমেদ বল হাতে নিয়ে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলে দেন।

দুই একবার বোলিং প্রান্ত থেকে কোহলিকে বল পাল্টা থ্রো করে মানসিক খেলাও খেলেন আবরার।

শুভমন গিলকে দারুণ এক বলে তিনি আউট করেন।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় বলটিকে, 'বল অফ দ্য টুর্নামেন্ট' খেতাব দেয়া হয়।

তবে এরপর ভিরাট কোহলি ও শ্রেয়াস আইয়ার নিয়ন্ত্রিত ভঙ্গিতে ব্যাট করতে থাকেন।

ব্যক্তিগতভাবে কোহলির জন্য সময়টা ছিল বেশ কঠিন, শেষ ছয় ম্যাচের পাঁচ ম্যাচে কোহলি লেগ স্পিনারদের হাতে আউট হয়েছেন, তখন আবরার ছিলেন আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে।

তবে কোহলি দেখেশুনে খেলেছেন পুরোটা সময়।

১২৮ বলে ১১৪ রানের জুটি গড়েন এ দুজন, এই জুটিতেই ম্যাচ থেকে ছিটকে যায় পাকিস্তান।

ভিরাট কোহলি অনেক দিন ধরে ফর্মে ছিলেন না, এই ম্যাচ দিয়ে যেন ফর্মে ফিরলেন ঠিক ২০২৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপের মতো করে।

এই ম্যাচে কোহলি ওয়ানডে ক্রিকেটের অভিজাত ১৪,০০০ রানের ক্লাবে ঢুকে পড়লেন। ওয়ানডে ক্রিকেট ইতিহাসের তৃতীয় ক্রিকেটার হিসেবে ভিরাট কোহলি পূর্ণ করেন এই মাইলফলক।

কোহলির আগে ভারতের শচীন টেন্ডুলকার ও শ্রীলঙ্কার কুমার সাঙ্গাকারা ১৪,০০০ রান করেছিলেন ওয়ানডে ফরম্যাটে।

তবে কোহলি-ই এই রেকর্ড স্পর্শ করেন দ্রুততম সময়ে।

২৮৭তম ইনিংসে কোহলির ১৪ হাজার রান পূর্ণ হলো শচীন করেছিলেন ৩৫০ ইনিংসে, সাঙ্গাকারা করেছিলেন ৩৭৮ ইনিংসে।