আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
'আনফিট' রোহিত শর্মাই যেভাবে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে ভারতের চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জয়ের নায়ক
নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে তৃতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়নস ট্রফির শিরোপা ঘরে তুলল ভারত। এর আগে ২০০২ সালে শ্রীলঙ্কার সাথে যৌথভাবে আর ২০১৩ সালে এই শিরোপা ঘরে নিয়েছিল দেশটি।
নিউজিল্যান্ডের করা ২৫১ রানের জবাবে ভারত চার উইকেট হাতে রেখে জয় তুলে নিয়েছে।
আরও একবার আইসিসি ইভেন্টের সীমিত ওভারের ফাইনালে হারের মুখ দেখলো নিউজিল্যান্ড।
২০১৫ ও ২০১৯ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের পর, ২০২১ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে হারের পর নিউজিল্যান্ডের তালিকায় এবারে যোগ হলো চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনালের হার।
ম্যাচ শেষে ভারতের ভিরাট কোহলি বলেন, "যখনই আমাদের কঠিন সময় এসেছে কেউ না কেউ রুখে দাঁড়িয়েছেন, এটাই শিরোপা জয়ের মূল চাবিকাঠি"।
ফাইনাল ম্যাচের সেরা ক্রিকেটারের পুরস্কার জিতেছেন রোহিত শর্মা, ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, "আমি কোচের সাথে কথা বলে আগ্রাসী ক্রিকেট খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যেটা দলকে সাহায্য করে। আমার মনে হয় প্রথম ৫-৬ ওভারেই উইকেটের আচরণ বোঝা যায়। আর যেহেতু আমাদের জাদেজা ৬ উইকেট গেলে ব্যাট করতে নামে তাই আমার জন্য ব্যাপারটা সহজ হয়"।
টুর্নামেন্টের সেরা ক্রিকেটারের পুরস্কার পেয়েছেন রাচিন রাভিন্দ্রা, ২৫ বছর বয়সী এই তারকা ক্রিকেটার এই টুর্নামেন্টে ২টি সেঞ্চুরি করেছেন।
পুরস্কার নেয়ার সময় সম্প্রচারকদের সাথে সাক্ষাৎকারে রাচিন বলেন, "দলে তরুণ বা অভিজ্ঞ বলে কিছু নেই, যখন মাঠে নামি সবাই একই লক্ষ্যে নামি।"
'মোটা' রোহিত শর্মার নেপথ্যে কী ছিল?
চ্যাম্পিয়নস ট্রফি ২০২৫ চলাকালীন ভারতের কংগ্রেসের এক রাজনীতিবিদ শামা মোহাম্মেদ একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পোষ্টে রোহিত শর্মাকে 'আনফিট ও মোটা' বলেন।
এনিয়ে তুমুল তর্ক বিতর্ক হয়েছে ভারতের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে। পরে ঐ নেত্রী নিজের পোষ্ট সরিয়ে নেন তবে আলোচনা থামেনি।
ভারতের ক্রিকেট বোর্ডও এই বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান।
যদিও রোহিত শর্মা বা দলের অন্য কেউ এবিষয়ে কোনও বক্তব্য দেননি।
ফাইনাল ম্যাচে তাই অনেকেই রোহিত শর্মার ইনিংসটিকে 'একরকম জবাব' হিসেবে দেখছেন।
২৫২ রানের টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে ভারতের অধিনায়ক রোহিত শর্মা ৪১ বলে ৫০ রান পূর্ণ করে ভারতের অন্য ব্যাটারদের ওপর থেকে চাপ নামিয়ে দেন।
বিরাট কোহলি মাত্র এক রান করে আউট হয়ে গেলেও এর প্রভাব পড়েনি দলের রানের চাকায়।
রোহিত শেষ পর্যন্ত ৮৩ বলে ৭৬ রান তোলেন।
এই ইনিংসে রোহিত ৭টি চার ও ৩টি ছক্কা মারেন।
বিবিসির টেস্ট ম্যাচ স্পেশালের জনপ্রিয় ক্রিকেট রিপোর্টার জনাথন এগনিউ বলেন, "রোহিতকে একেবারেই বিচলিত লাগছে না, বরং তিনি ঠাণ্ডা মাথায় দলকে জয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন"।
শ্রেয়াস আইয়ার আলোচিত নন, তবে পারফর্মার
ভারতের মিডল অর্ডারে ফাইনাল ম্যাচে দাঁড়িয়ে গিয়েছেন শ্রেয়াস আইয়ার, ভিরাটের জলদি আউট হওয়াটা একেবারে বুঝতেই দেননি আইয়ার।
মসৃণভাবে ব্যাট করা ভারতীয় টপ অর্ডারে ফাটল ধরে যখন ১০৬ রানে ভিরাট ও ১২২ রানের মাথায় রোহিত শর্মা আউট হয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরে যান, সেখান থেকে ইনিংস মেরামতের কাজে হাত দেন শ্রেয়াস আইয়ার।
আকসার প্যাটেলকে সাথে নিয়ে ৭৫ বলে ৬১ রানের একটি জুটি গড়েন শ্রেয়াস, এখানেই নিউজিল্যান্ডের হাত থেকে ম্যাচটা বেরিয়ে যায়।
শ্রেয়াসের ৪৮ রানের ইনিংসটা ভারতের এই শিরোপা জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।
২ চার ও ২ ছয়ে ৬২ বলে ৪৮ রান করেন তিনি।
এই টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রানের মালিক আইয়ার, ২৪৩ রান তুলেছেন তিনি পাঁচ ইনিংসে। শীর্ষে আছেন ২৬৩ রান তোলা রাচিন রাভিন্দ্রা।
ম্যাচ শেষে শ্রেয়াস বলেন, "এটাই আমার প্রথম আইসিসি শিরোপা, আমি ভালো শুরু করছিলাম তবে বড় রান পাইনি, তবে আমি খুশি কারণ আমরা শিরোপা জিতেছি"।
ম্যাচের শুরুতে নিউজিল্যান্ডের আগ্রাসন ছাপিয়ে ভারতের স্পিনারদের দাপট
দুবাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে টস জিতে নিউজিল্যান্ড ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেয়ার পর ক্রিকেট দর্শক ও বিশ্লেষকদের মধ্যে কেউ কেউ অবাক হয়েছিলেন। ভারতের রান তাড়া করার রেকর্ড বিবেচনা করেই তারা এই বিস্ময় প্রকাশ করেন।
তবে টসের পর ভারতের অধিনায়ক রোহিত শর্মা মনে করিয়ে দেন, দুবাই-এর এই মাঠে আগে ও পরে ব্যাট করে ভারত ম্যাচ জিতেছে, তাই টসে যাই হোক তার প্রভাব খেলায় পড়বেনা।
নিউজিল্যান্ড মাঠে নামার পর থেকেই ব্যাটে বল দারুণভাবে আসছিল, নিউজিল্যান্ডের ব্যাটাররা একটা ভালো শুরু এনে দেন, তবে রোহিত শর্মা স্পিনারদের হাতে বল তুলে দেয়ার সাথে সাথে খেলা ঘুরে যায়।
৬ ওভারে ৪৬ তোলা নিউজিল্যান্ডের প্রথম উইকেট নেন ভারুণ চক্রবর্তী ৫৭ রানের মাথায়।
টুর্নামেন্ট জুড়েই ভারতের এই ৩৩ বছর বয়সী লেগ স্পিনাররা আলোচনায় ছিলেন, তার বলে এলবিডব্লিউ হয়ে প্যাভিলিয়নে ফেরেন উইল ইয়াং।
তবে এই সময় ক্রিজে আক্রমণাত্মক রূপে ছিলেন রাচিন রাভিন্দ্রা, ২৯ বলে ৩৭ রান তুলে তিনি কুলদীপ ইয়াদাভের করা প্রথম বলেই বোল্ড হয়ে যান।
চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে চার ম্যাচে দুই সেঞ্চুরি করা রাচিন রাভিন্দ্রার উইকেট পাওয়ার পরে ভারতের দলে স্বস্তি নেমে আসে।
ফাইনালেও মনে হচ্ছিল রাচিন কিছু একটা করে ফেলবে, ৪টি চার ও ১টি ছক্কা হাঁকান তিনি।
বিবিসির হয়ে ধারাভাষ্য দেয়া পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক রামিজ রাজা বলেন, "রাচিন দারুণ ব্যাট করছিলেন, এই উইকেটটা নিউজিল্যান্ডের খেলা বদলে দেবে"।
কুলদীপ তার পরের ওভারে বল হাতে নিয়ে কেইন উইলিয়ামসনের উইকেট নিয়ে নেন।
শুরুর তিন উইকেট হারিয়েই নিউজিল্যান্ড কার্যত একটা খোলসে ঢুকে যায়, ১০ ওভারেই ৬৯ করা দলটির ১০০ করতে লেগেছে ১৯ ওভার ২ বল।
ভারতের স্পিনাররা কেমন করলো
এবারের চ্যাম্পিয়নস ট্রফির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আলোচনার বিষয় ছিল দুবাইয়ের মাটিতে সব ম্যাচ খেলা ভারতের স্পিন সুবিধা নেয়া, কেউ কেউ এই সুবিধাকে 'অন্যায্য'ও বলেছেন।
ভারত দুবাই-এ সব ম্যাচ খেলবে এটা আগে থেকেই নির্ধারিত থাকায় স্কোয়াডে পাঁচ জন স্পিনার নিয়ে তারা সফর করেছে।
যার মধ্যে আকসার প্যাটেল, কুলদীপ ইয়াদাভ, রাভিন্দ্রা জাদেজা ও ভারুণ চক্রবর্তী নিয়মিত ম্যাচ খেলেছেন।
এই স্পিনাররা জসপ্রিত বুমরাহ'র অনুপস্থিতি বুঝতেই দেননি অধিনায়ক ও কোচকে।
ফাইনালেও ভারতের নেয়া ৭ উইকেটের মধ্যে ৫ টিই নিয়েছেন স্পিনাররা।
রানও দিয়েছেন নিয়ন্ত্রিত, আকসার প্যাটেল ৮ ওভারে ২৯, রাভিন্দ্রা জাদেজা ১০ ওভারে ৩০ রান দিয়ে ১ উইকেট নিয়েছেন।
ফাস্ট বোলাররা ফাইনাল ম্যাচে তেমন সুবিধা করতে পারেননি, হার্দিক পান্ডিয়া এদিন মাত্র ৩ ওভার বল হাতে পেয়েছেন, দিয়েছেন ৩০ রান।
নিউজিল্যান্ড চেষ্টা করেছে, কিন্তু যথেষ্ট হয়নি
পুরো টুর্নামেন্ট জুড়েই বারবার ফিল্ডিং ও দুর্দান্ত সব ক্যাচের জন্য আলোচনায় এসেছেন নিউজিল্যান্ডের গ্লেন ফিলিপস। দলটা শেষ পর্যন্ত আরও একটা শিরোপা হাতছাড়া করলেও ক্রিকেট দর্শকদের আনন্দ দিয়েছন ফিলিপ্স, রাচিন রাভিন্দ্রার মতো পারফর্মাররা।
নিউজিল্যান্ডের ব্রেসওয়েল দারুণ বল করেছেন ফাইনাল ম্যাচে, ১০ ওভারে মাত্র ২৮ রান দিয়ে ২টি উইকেট নিয়েছেন তিনি।
নিউজিল্যান্ডের স্পিনাররাও ভারতের মতো পাঁচ উইকেট নিয়েছেন।
রাচিন রাভিন্দ্রা সিরিজের সেরা ব্যাটার ছিলেন, চোট থেকে ফিরে বাংলাদেশের বিপক্ষে ১১২ ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ১০৮ রান তুলেছেন তিনি, ১০৬ স্ট্রাইক রেট ও ৬৫ গড়ে মোট রান করেছেন ২৬৩।
সেরা উইকেট শিকারিও নিউজিল্যান্ডের ম্যাট হেনরি, চার ম্যাচে ১০ উইকেট নেয়া এই ফাস্ট বোলার কাঁধে চোট পেয়ে ফাইনাল ম্যাচটা মিস করেছেন।
নিউজিল্যান্ডও মিস করেছে আরও একটি আইসিসি শিরোপা।