ভোটের মুখে পশ্চিমবঙ্গে কি কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার ‘অপব্যবহার’ হচ্ছে?

ছবির উৎস, Getty Images
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ভূপতিনগর নামে একটি জায়গায় দেশে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে তদন্তে সর্বোচ্চ সংস্থা এনআইএ-র টিমের ওপর স্থানীয় বাসিন্দাদের হামলার অভিযোগ এবং ওই সংস্থার কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেই শ্লীলতাহানি ও হেনস্থার পাল্টা অভিযোগকে ঘিরে ওই রাজ্যের রাজনীতি আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলিকে ‘অপব্যবহারের’ অভিযোগ তুলে আবারও সরব হয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী এবং তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বোচ্চ নেত্রী মমতা ব্যানার্জী।
সোমবার এই ইস্যুতে নির্বাচন কমিশনেরও দ্বারস্থ হয়েছে তৃণমূল।
এরই মাঝে পুরুলিয়ায় তৃণমূল প্রার্থী শান্তিরাম মাহাতোর হয়ে প্রচারসভা থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি তোপ দাগেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী।
তিনি সেখানে বলেন, ‘‘এনআইএ, সিবিআই, বিজেপির ভাই-ভাই। ইডি আর ইনকাম ট্যাক্স বিজেপির টাকা তোলার বাক্স।”
মমতা ব্যানার্জীর দাবি, ভোট সামনে এলেই কেন্দ্রীয় সরকারের এনফোর্সমেন্ট ডায়রেক্টোরেট (ইডি), সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই), ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ)-র মতো কেন্দ্রীয় সংস্থাকে ‘ব্যবহার’ করে থাকে ক্ষমতাসীন দল বিজেপি।
পূর্ব মেদিনীপুরের নাড়ুয়াবিলা গ্রামে এনআইএ-র কর্মকর্তাদেরপাঠানোর পদক্ষেপ তারই ‘প্রতিফলন’ বলে অভিযোগ করেছেন মমতা ব্যানার্জী।।
কেন্দ্রীয় সংস্থার এই কথিত ‘অতি সক্রিয়তার’ জবাবে তিনি সোমবার বাঁকুড়ার সভা থেকে প্রধানমন্ত্রীকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে বলেছেন, “গোটা দেশে জেল বানান। এজেন্সি দিয়ে গোটা দেশকে জেল বানিয়ে রেখেছেন।আমরা ভয় পাই না।”
অন্য দিকে জাতীয় অনুসন্ধানকারী সংস্থা বা এনআইএ-র কর্মকর্তাদেরওপর আক্রমণের ঘটনার উল্লেখ শোনা গিয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মুখেও।
এই ঘটনায় তৃণমূলকে নিশানায় রেখে তিনি অভিযোগ করেছেন, "পশ্চিমবঙ্গে তোলাবাজ, দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের রক্ষা করতে তৃণমূল কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলির উপর হামলা চালাচ্ছে।"
প্রসঙ্গত, ২০২২ সালে ভূপতিনগরে একটি বিস্ফোরণ মামলার তদন্ত করছে এনআইএ। এই ঘটনায় অভিযুক্ত স্থানীয় দুই তৃণমূল নেতার খোঁজে শনিবার ওই এলাকায় যান এনআইএ-র কর্তারা।
এনআইএ-র অভিযোগ, ধৃতদের গাড়িতে তোলার পরেই তাদের গাড়িতে হামলা চালানো হয়। সেদিনই ভূপতিনগর থানায় হামলার লিখিত অভিযোগ দায়ের করে এনআইএ।
পরে শনিবার রাতে ভূপতিনগর থানায় এনআইএ-এর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ দায়ের করেছে ধৃত একজন তৃণমূল নেতার পরিবার।
অন্য দিকে, গত জানুয়ারি মাসে তৃণমূল নেতা শাহজাহান শেখের বাড়িতে গিয়ে প্রায় একই ভাবে হামলার মুখে পড়তে হয়েছিল তদন্তকারী এনফোর্সমেন্ট ডায়রেক্টোরেট কর্মকর্তাদের।

ছবির উৎস, Getty Images
মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
ভূপতিনগরে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের উপর হামলার ঘটনায় এনআইএ-কেই কাঠগড়ায় তোলেন মমতা ব্যানার্জী। একই সঙ্গে তোপ দাগেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উপরেও।
ঘটনার দিনই তিনি বলেন, “আমি যখন হেমতাবাদ থেকে বেরোচ্ছিলাম সাংবাদিকরা আমাকে প্রশ্ন করছে, ভূপতিনগরে হামলা হয়েছে। হামলাটা কে করেছে? হামলাটা মেয়েরা করেনি, হামলা করেছে এনআইএ।”
২০২২ সালে ভূপতিনগরের নাড়ুয়াবিলা গ্রামে বিস্ফোরণের ঘটনাকে বিশেষ আমল দিতে নারাজ মুখ্যমন্ত্রী।
বরং তার দাবি, এনআইএ-র ‘অতিসক্রিয়তার’ আসল কারণ হল 'ভোটের ফলফল আঁচ করতে পেরেছে বিজেপি'।
একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন তদন্তের অভিযানের জন্য কেন কাকভোরে যেতে হয়েছিল এনআইএ টিমকে!
ভূপতিনগরের প্রসঙ্গ টেনে রবিবার পুরুলিয়ার হুড়াতেএকটি সভা থেকে তিনি বলেন, “গদ্দার জানে হারবে, তাই লোকের বাড়ি গিয়ে গিয়ে... কোথায় একটা চকোলেট বোম ফেটেছিল ২০২২ সালে… আর মধ্যরাতে গিয়ে যদি মহিলার বাড়িতে অত্যাচার করে, গ্রামে ঢুকে অত্যাচার করে, মহিলারা কী করবে? শাঁখা-পলা পরে বসে থাকবে? না মাথায় ওড়না দিয়ে বসে থাকবে? তারা তাদের ইজ্জত-সম্মান রক্ষা করবে না?”
‘গদ্দার’ বা বেইমান বলতে তিনি বুঝিয়েছেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা, বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীকে – যিনি বছরতিনেক আগে পশ্চিমবঙ্গে ভোটের আগে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন।
মুখ্যমন্ত্রী আরও অভিযোগ করেছেন পুরুলিয়ার হোটেলে গিয়ে এনআইএ-র কর্মকর্তারা না কি খোঁজ নিচ্ছেন কোন তৃণমূল নেতা কোথায় থাকছেন।
মমতা ব্যানার্জী বলেন, ‘‘আবার রামনবমী আসছে। চকোলেট বোম ফেললেও এনআইএ-কে ঢুকিয়ে দেবে। পুরুলিয়ায় সব হোটেলে গিয়ে এনআইএ খোঁজ নিচ্ছে, কে থাকছে। তোমার কী? তোমার কী কাজ?"
"কোন হোটেলে কোন পার্টির লোক থাকবে? নির্বাচনের সময় আমরা সরকারি জায়গায় থাকি না। যে হেলিকপ্টার নিয়ে কর্মসূচিতে যাই, সেটাও দলের টাকায় ভাড়া করি।’’

ছবির উৎস, Getty Images
‘গোটা দেশকে জেল বানান’
দিনকয়েক আগে উত্তরবঙ্গে একটি জনসভায় দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে এমন নেতাদের নিশানায় রেখে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, তৃণমূল, বাম ও কংগ্রেস একে অপরকে বাঁচাতে ইন্ডিয়া জোট তৈরি করেছে। ৪ঠা জুন ভোটের ফল প্রকাশের পর বিজেপি আরও কড়া হাতে দুর্নীতি দমন করবে।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী এর জবাব দিয়েছেন সোমবার। বাঁকুড়ার জনসভায় তার বক্তব্যে আবারও শোনা গিয়েছে বিজেপি কেন্দ্রীয় সংস্থাকে ‘ব্যবহার’ করছে সেই অভিযোগ।
দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং ঝাড়খণ্ডের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনকে গ্রেফতারের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেছেন, “(প্রধানমন্ত্রী) বলছে চৌঠা জুনের পর সবাইকে জেলে ভরব। এই কথা কি প্রধানমন্ত্রীর মুখে শোভা পায়? গোটা দেশে জেল বানান।"
"এজেন্সি দিয়ে গোটা দেশকে জেল বানিয়ে রেখেছেন। আমরা আপনাকে ভয় পাই না। আপনাদের যদি সাহস থাকে, জনসাধারণের ভোট নিয়ে লড়াই করুন।”
“আপনারা আমাদের কর্মীদের কেন গ্রেফতার করছেন? আপনারা কেন হেমন্ত সোরেনকে গ্রেফতার করেছেন? হেমন্তর স্ত্রী সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। দেশের একমাত্র আদিবাসী সম্প্রদায়ের মুখ্যমন্ত্রী। আপনি কী না করছেন!”

ছবির উৎস, Getty Images
‘তৃণমূল দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের বাঁচাতে চায়’
নরেন্দ্র মোদীও অবশ্য এর পাল্টা জবাব দিয়েছেন।
রবিবার জলপাইগুড়ি জেলার ধূপগুড়ির জনসভা থেকে তৃণমূলকে তোপ দেগে নরেন্দ্র মোদী বলেছেন “তৃণমূল দেশের আইন এবং সংবিধান লঙ্ঘনকারী দল।”
তিনি বলেন, ‘‘তৃণমূল চায় ওদের গুন্ডাদের সন্ত্রাস করার লাইসেন্স মিলুক। তদন্তকারীরা তদন্ত করতে গেলে ওদের উপর হামলা করে। অন্যদের দিয়ে হামলা করায়”, বলেছেন প্রধানমন্ত্রী।
সন্দেশখালির প্রসঙ্গও টেনে এনেছেন তিনি। নরেন্দ্র মোদী বলেছেন, “সন্দেশখালিতে আপনারা দেখেছেন, কী হয়েছে। এখানে প্রত্যেক ঘটনায় আদালতকে হস্তক্ষেপ করতে হয়।’’
ভূপতিনগরের ঘটনা পরম্পরা
২০২২ সালে অর্জুনপুর পঞ্চায়েতের ভগবানপুর-২ ব্লকের তৃণমূলের বুথ সভাপতি রাজকুমার মান্নার বাড়িতে বিস্ফোরণ হয়। এই ঘটনায় রাজকুমার মান্না, তাঁর ভাই দেবকুমার মান্না ও বিশ্বজিৎ গায়েন গুরুতর আহত হন। পরে তিনজনেরই মৃত্যু হয়।
পুলিশের তরফে স্বতঃপ্রণোদিত মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু হয়। এই ঘটনায় উপযুক্ত ধারা প্রয়োগ এবং এনআইএ-র হাতে তদন্তভার তুলে দেওয়ার আর্জি জানিয়ে কলকাতা হাই কোর্টে হলফনামা দায়ের করা হয়।
পরে এই ঘটনার তদন্তের ভার এনআইএ-র হাতে তুলে দেওয়া হয়।
তদন্তে উঠে আসে তৃণমূলের বুথ সভাপতি মনোব্রত জানা ও বলাইচরণ মাইতির নাম।
প্রসঙ্গত, বিস্ফোরণে রাজকুমার মান্নার মৃত্যুর পর নাড়ুয়াবিলার তৃণমূলের বুথ সভাপতি হন মনোব্রত মান্না। আর অর্জুননগরের অঞ্চল সভাপতি হলেন বলাইচরণ মাইতি।
তাদের খোঁজ চালাতেই শনিবার এনআইএ-র দুটি দল ভূপতিনগরে পৌঁছয়। সঙ্গে ছিল আধা সামরিক বাহিনীও।
শনিবার একটি দল যায় নাড়ুয়াবিলা গ্রামে মনোব্রত জানার খোঁজ করতে, অন্যটি যায় নিচ নাড়ুয়া গ্রামে বলাইচরণ মাইতির খোঁজে। বিস্ফোরণের ঘটনায় যুক্ত থাকার অভিযোগে তাদের আটক করা হয়।
তাদের ভূপতিনগর থানায় নিয়ে গিয়ে গ্রেফতার করা হবে এমনটাই স্থির করা হয়েছিল।
কিন্তু এনআইএ-র অভিযানের খবর গ্রামে ছড়িয়ে পড়লে কর্মকর্তাদের উপর চড়াও হন কিছু মানুষ। তাদের উপর আক্রমণ চালানো হয়, গাড়ি ভাঙচুর করা হয় বলেও অভিযোগ।
এই ঘটনায় এনআইএ-র একজন কর্মকর্তা আহত হন বলেও জানানো হয়েছে এবং পুলিশের কাছে এই মর্মে লিখিত অভিযোগও দায়ের করা হয়।
পরে দুই ধৃত তৃণমূল নেতাকে কলকাতা নিয়ে আসা হয় এবং বিশেষ আদালতে পেশ করা হয়। আগামী বুধবার (১০ এপ্রিল) পর্যন্ত তাদের এনআইএ হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেয় আদালত।
অন্যদিকে, ভূপতিনগরে তদন্তে আসা আধিকারিকদের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ করেন গ্রামবাসীরা।
তারা গভীর রাতে দরজা ভেঙে বাড়িতে ঢুকে মহিলাদের শ্লীলতাহানি করেছে, বাড়ি তছনছ করেছে এবং ধৃতর পরিবারের উপর অত্যাচার করা হয়েছে বলে পুলিশে অভিযোগ জানানো হয়েছে। শ্লীলতাহানির ধারাও দেওয়া হয়েছে এনআইএ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে, যা জামিন অযোগ্য।
এনআইএ-এর তরফে অবশ্য সব অভিযোগই অস্বীকার করা হয়েছে।

ছবির উৎস, NIA/X
এনআইএ-র বিবৃতি
শ্লীলতাহানি-সহ সব অভিযোগই এনআইএ-র তরফ থেকে অস্বীকার করা হয়েছে।
তারা এক বিবৃতিতে বলেছে, ভূপতিনগরে তল্লাসি নিয়ম মেনেই চালানো হয়েছিল। তাদের সঙ্গে ছিলেন সিআরপিএফ জওয়ান ও নারী কনস্টেবলরাও। এই ঘটনাকে নিয়ে ‘বিতর্ক’কে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলেও মন্তব্য করা হয়েছে।
রবিবার এই জাতীয় অনুসন্ধানকারী সংস্থার তরফে বিবৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, “মহামান্য কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশে ২০২৩ সালের ৬ জুন একটি বিস্ফোরণ সংক্রান্ত মামলার তদন্তভার হাতে নিই আমরা। সেই মতোই শনিবার নড়ুয়াবিলা গ্রামে তল্লাসি অভিযান চালানো হয়েছিল।”
বিস্ফোরণ কাণ্ডে ধৃত দু’জনকে স্থানীয় থানায় নিয়ে যাওয়ার সময় উত্তেজিত জনতা ‘বিনা প্ররোচনায়’ তদন্তকারীদের উপরে হামলা চালায় বলে তারা জানিয়েছে। তাতে একজন কর্মকর্তা আহত হন এবং তাদের গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলেও জানানো হয়।
ধৃতদের নিয়ম মেনেই গ্রেফতার করা হয়েছে এবং এই পুরো অভিযান একেবারেই ‘অনৈতিক’ নয় বলেও দাবি করা হয়েছে ওই বিবৃতিতে।








