গরমের কারণে রেল লাইনের পাত কি বেঁকে যেতে পারে?

বাঁকা হয়ে যাওয়া রেল লাইনে পানি দিচ্ছেন শ্রমিকরা

ছবির উৎস, Masuk Hridoy

ছবির ক্যাপশান, বাঁকা হয়ে যাওয়া রেল লাইনে পানি দিচ্ছেন শ্রমিকরা

বাংলাদেশে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল লাইনে পরপর দুইদিন পাত বেঁকে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এর ফলে শনিবার ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যে রেল যোগাযোগ কয়েকঘন্টার জন্য বন্ধ ছিল।

রেলওয়ের কর্মকর্তারা দাবি করছেন, প্রচণ্ড গরমের কারণে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রেল লাইনের পাত বেঁকে গেছে। এর ফলে ট্রেন দূর্ঘটনার আশংকা তৈরি হয়। কিন্তু ট্রেন চলাচল বন্ধ রেখে দ্রুত সেটি মেরামতের কাজ করে রেল বিভাগ। এর আগে বৃহস্পতিবার এই এলাকায় একটি মালবাহি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়েছিল।

এখন নানাভাবে রেল লাইন ঠাণ্ডা করে সোজা করার চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, গরমের কারণে কি রেল লাইন বেঁকে যেতে পারে? বিশেষজ্ঞরা বলছে, কেন এই লাইন বেঁকে গেল সেটি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা উচিত।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংবাদিক মাসুক হৃদয় বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরতলীর দাড়িয়াপুরে রেল লাইন বাঁকা হয়ে যাওয়ার বিষয়টি ধরা পড়ে।

রেল লাইন বাঁকা অবস্থায় দেখে স্থানীয় বাসিন্দারা বিষয়টি রেল কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে। এর আগে বৃহস্পতির একই জায়গায় একটি মালবাহি ট্রেনের সাতটি বগি লাইনচ্যুত হয়।

চব্বিশ ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই শনিবার আবারও সেখানকার রেললাইন বেঁকে যায়।

গরমের কারণে রেল লাইন বেঁকে যাওয়ায় বৃহস্পতিবার মালবাহি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়েছিল বলে রেলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এরপর শুক্রবারই রেল লাইন পুনরায় মেরামত করার পর রেল যোগাযোগ শুরু হয়।

প্রচণ্ড গরম দায়ী?

রেলের একাধিক কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, প্রচণ্ড গরমের কারণে রেলের পাত বেঁকে গেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে শনিবার দিনের তাপমাত্রা ৩৪ ডিগ্রি হলেও রেলের পাতে তাপমাত্রা অনেক বেশি পাওয়া যাচ্ছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভাগীয় প্রকৌশলী সিরাজ জান্নাত বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ‘’ যেখানে রেল লাইন বাঁকা হয়ে গেছে, সেখানে গাছপালা তেমন নেই। খোলা জায়গায় রোদের তাপ বেশি হওয়ায় প্রচণ্ড গরমের কারণে রেলে পাত বাঁকা হয়ে গেছে। শহরে যে তাপমাত্রা আছে, রেলে পাতের তাপ আমরা বেশি পাচ্ছি।‘’

কর্মকর্তারা বলছেন, কিছুদিন আগে এই এলাকায় রেলে স্লিপার পরিবর্তন করা হয়েছিল। সেই কারণে এভাবে রেলের পাত বাঁকা হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে কিনা, সেটি পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।

ঘটনাস্থল ঘুরে এসে সাংবাদিক মাসুক হৃদয় বলছেন, রেল লাইনের ওপর কচুরিপানা ও পানি দিয়ে পাত ঠাণ্ডা করার চেষ্টা করছেন রেলের প্রকৌশলীরা। এরপর পাতটি সোজা করার চেষ্টা করা হবে। খোলা মাঠের মতো জায়গায় রেলের ওই অংশটি রয়েছে।

প্রকৌশলী সিরাজ জান্নাত জানিয়েছেন, রাতের মধ্যেই রেলের কাঠের স্লিপার বদলে কংক্রিটের স্লিপার বসানো হবে। এতে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে বলে তারা আশা করছেন।

কর্মকর্তারা বলছেন, এই রেললাইনটি আবার চালু করতে দুই-একদিন লাগতে পারে। তবে পাশে আরেকটি রেললাইন থাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে রেল যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বেঁকে যাওয়া রেল লাইন

ছবির উৎস, Masuk Hridoy

ছবির ক্যাপশান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বেঁকে যাওয়া রেল লাইন
বেঁকে যাওয়া রেল লাইন ঠিক করার চেষ্টা করছেন রেল কর্মীরা

ছবির উৎস, Masuk Hridoy

ছবির ক্যাপশান, বেঁকে যাওয়া রেল লাইন ঠিক করার চেষ্টা করছেন রেল কর্মীরা

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপমাত্রা বেশি হলে রেলের পাত বেঁকে যাবার ঝুঁকি থাকে। এ ধরণের নজির অনেক জায়গায় রয়েছে। গত বছর ব্রিটেনে গরমের কারণে রেল চলাচল বিঘ্নিত হয়েছিল।

তাপমাত্রা যদি ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে তাহলে রেল লাইনের ওপরে সূর্যের তাপ ৫০ডিগ্রি পর্যন্ত হতে পারে। যেহেতু রেলের পাত লোহা দিয়ে তৈরি এবং সূর্যের তাপে লোহা অতিরিক্ত গরম হয়।

গ্লোবাল রোড সেফটি প্রোগ্রামের ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেটর মাহিয়াত হাসনা স্বর্না বিবিসি বাংলাকে বলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রেল লাইনকে সাদা রঙ করে দেয়া হচ্ছে, যাতে সেটি কম তাপ শোষণ করে। যুক্তরাজ্য, ইতালিসহ অনেক দেশে এটা করা হচ্ছে। রেল লাইনে সাদা রং করা হলে সেটির তাপমাত্রা পাঁচ থেকে দশ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমতে পারে।

গরম ছাড়াও রেলের পাত এভাবে বেঁকে যাওয়ার ঘটনার পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

‘’এটা যদি খুব পুরাতন রেল লাইন হয়ে থাকে, তাহলে হয়তো সেটার টেম্পার চলে গিয়ে থাকতে পারে। যখন এই রেললাইন বসানো হয়েছে, সেই সময়ের তাপমাত্রার তুলনায় এখনকার তাপমাত্রার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। সেই অনুযায়ী হয়তো রেললাইন পরিবর্তন করা হয়নি,‘’ বলেন মিজ স্বর্ণা

‘’এছাড়া রেল লাইনের রক্ষণাবেক্ষণ কীভাবে করা হচ্ছে, ঠিক মতো হচ্ছে কিনা, সেটাও কারণ হতে পারে। এই কারণে দেশের অন্যত্র না ঘটলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে হয়তো ওই নির্দিষ্ট স্থানে এই প্রবণতা বেশি দেখা দিচ্ছে,’’ তিনি বলছেন।

দুর্ঘটনা এড়াতে প্রচণ্ড গরম বা তাপদাহ চলার সময় দেশের অন্যসব রেললাইন পরীক্ষা করে দেখার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।