ট্রেনের টিকেট কাটার নতুন নিয়ম সহজ নাকি জটিল

বাংলাদেশ রেলওয়ে

ছবির উৎস, Bangladesh Railway

ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশ রেলওয়ে অনলাইন, অফলাইনে আন্তঃনগর ট্রেনের টিকিট কাটার নতুন ব্যবস্থা প্রণয়ন করেছে।
    • Author, সানজানা চৌধুরী
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা

বাংলাদেশ রেলওয়ে অনলাইনে এবং অফলাইনে আন্তঃনগর ট্রেনের টিকিট কাটার জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) দিয়ে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করেছে।

টিকিট কালোবাজারি প্রতিরোধ, বিনা টিকিটে ভ্রমণে জরিমানা করা এবং ভাড়া আদায় সহজ করার লক্ষ্যে এমন ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ।

টিকিট ব্যবস্থাকে আপগ্রেড করতে নতুন এই নিয়ম আগামী পয়লা মার্চ থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।

বাংলাদেশের রেলওয়েতে এখনও মান্ধাতার আমলের কাউন্টার-ভিত্তিক টিকেট কাটার ব্যবস্থা প্রচলিত।

সেখানে নতুন এই ব্যবস্থাকে বেশিরভাগ রেল ভ্রমণকারী স্বাগত জানালেও অনেক যাত্রীর কাছে নিয়মগুলো বেশ জটিল ঠেকছে, আবার কেউ কেউ এখনও বুঝতে পারছেন না নতুন সিস্টেম কীভাবে কাজ করবে।

সাম্প্রতিক সময়ে ‘জো বাইডেন’ ও ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’সহ সুপরিচিত ব্যক্তিদের নামে নিবন্ধন করে ভুয়া টিকিট কাটার অভিযোগ উঠেছিল।

টিকেট কাটার ক্ষেত্রে এখন থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়া বাধ্যতামূলক করা হলে এসব অনিয়মিত রোধ করা যাবে বলে প্রত্যাশা রেল কর্তৃপক্ষের।

ট্রেনে যাত্রীর চাপ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশে রেলের যাত্রীসেবা নিয়ে অনেক অভিযোগ

পক্ষে বিপক্ষে মত

দেশটির একটি বড় জনগোষ্ঠী যেখানে প্রযুক্তির সুবিধার বাইরে, আবার অনেকের অনলাইনে বা অফলাইনে নিবন্ধন বা লগ ইন করার পারদর্শিতা নেই, তারা কীভাবে নিবন্ধন করবেন সেটা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

ঢাকায় গৃহকর্মী হিসেবে কর্মরত তাহেদা বেগম নতুন নিয়মের বিষয়ে কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না। তিনি বছরে একাধিকবার ঢাকা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ট্রেনে ভ্রমণ করে থাকেন।

আগে কাউন্টারে গিয়েই টিকেট কিনতেন তিনি। এখন এনআইডি কার্ডে নিবন্ধনের প্রসঙ্গ আসতেই তিনি যেন ঘাবড়ে যাচ্ছেন।

“টিকেট বলে মুবাইলে করা লাগতো। আইডি তো আছে, কিন্তু আমার তো টাচ মুবাইল নাই, ইতা তো আমরা বুঝি না। স্টেশনে টাকা দিয়া টিকেট কিনলেই হয়। এতো ঝামেলার কি দরকার।” বলেন তিনি।

নতুন নিয়মের কারণে তার মতো অনেক যাত্রীর জন্য ট্রেনে ভ্রমণ করা জটিল হয়ে উঠতে পারে, সেক্ষেত্রে তাদের লাভের পরিবর্তে হয়রানি ও ভোগান্তি বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এ নিয়ে তাহেদা বেগম বলেন, “যারা ব্ল্যাক (কালোবাজারি) করতেসে তাদেরে জেলে দিক। এই সিস্টেমে তো আমাদের সমস্যা। লেখাপড়া জানিনা। দুইটাই রাখুক, যারা বুঝে তারা মুবাইলে কাটবো, যারা না বুঝে তারা স্টেশনে যাবো।”

তবে কালোবাজারির দৌরাত্মে অতিষ্ঠ জোবায়েদ সানি এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ইতিবাচক পরিবর্তন আশা করছেন। তিনি ঢাকা থেকে ভৈরব যাওয়া আসা করতে ট্রেন ব্যবহার করেন।

“নিয়ম তো ভালো, কিন্তু কতদিন ভালো থাকে, ওইটাই দেখার বিষয়। আমাদের তো ডিজিটাল সিস্টেম করে। পরে দেখা যায় সফটওয়্যার হ্যাং করে, এজন্য লাইনে দাঁড়াতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। অনলাইনে টাকা দিলাম, টাকা কাটল মেসেজ আসলো না, এজন্য দৌড়াও। তারপরও ডিজিটাল সিস্টেম ভালো, কিন্তু যদি এরকম ঘটনা ঘটে, সার্ভার স্লো হয়, কম্পিউটার কাজ না করে, তাহলে কিন্তু লাভ নাই। আবার ট্রেনের ভেতরের ম্যানেজমেন্টও থাকতে হবে।”

ট্রেন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ট্রেনে যাত্রীদের যত্রতত্র উঠে পড়া ঠেকাতে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি উঠেছে।

একই রুটে যাতায়াত করেন আয়শা আক্তার, তার চাওয়া একটাই যেন স্ট্যান্ডিং টিকেট এবং টিকেট ছাড়া যাত্রী ওঠানো বন্ধ করা হয়।

“আমি সবসময় টিকেট করি, কিন্তু কোনদিন বসতে পারি না। যারা টিকেট করে না তারা বসে থাকে। আমি একা কতো ঝগড়া করবো? ট্রেনের লোকরা এলে তাদের সিট থেকে উঠায় দেয়, অতোটুকুই। ট্রেনে ফেরিওয়ালা ওঠে, ফকির ওঠে, মালপত্র নিয়ে ওঠে। আবার নামার সময় ছাদ থেকে লোকজন মাথার ওপরে লাফ দেয়। এক কথায় মেয়েদের জন্য ট্রাভেল করা অসহ্যকর। সবার যদি টিকেট করা কনফার্ম করা যায় তাহলে এই ঝামেলাগুলো থাকবে না।” তিনি বলেন।

স্ট্যান্ডিং টিকেট প্রসঙ্গে বিভ্রান্তি না ছড়ানোর আহ্বান জানিয়ে আসছেন সাবেক রেল কর্মকর্তা মাহবুব কবীর মিলন।

নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে এই নতুন নিয়মের পক্ষে বেশ প্রচার প্রচারণা চালিয়ে আসছেন তিনি।

ট্রেনের স্ট্যান্ডিং টিকেট প্রসঙ্গে তিনি তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন, “রেল আইন অনুযায়ী আন্তঃনগর বা নন-স্টপ ট্রেনে স্ট্যান্ডিং টিকিট দেয়া সম্পূর্ণ অবৈধ। শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ১৮৯০ সালের আইন অনুযায়ী যিনি স্ট্যান্ডিং টিকিট ইস্যু করবেন, তাঁকে জরিমানা গুনতে হবে। কাজেই সম্পূর্ণ অবৈধ একটি কাজের কোন অনলাইন ব্যবস্থা হয় না, বা হবে না। অবৈধ কাজের ভাড়া কমাবার কোন সুযোগ নেই।”

এরপরও এই অবৈধ কাজ একটি সরকারি সংস্থা কিভাবে করে আসছে, এমন প্রশ্ন রেখেছেন তিনি।

তার মতে, সম্ভবত বিনা টিকিটের যাত্রী বা অবৈধ যাত্রী নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রেলের নেই বিধায় এদের স্ট্যান্ডিং টিকিট ইস্যু করে রেলের রাজস্ব বাড়াবার একটি অঘোষিত উপায় বা পন্থা এটি।

তবে যাত্রীর চাপ যেহেতু বেশি, সেজন্য তিনি প্রতিটি আন্তঃনগর ট্রেনে দুটি করে স্ট্যান্ডিং কোচ সংযুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন।

তিনি জানান “যেহেতু আমাদের নতুন নতুন কোচ সংগ্রহ করা হচ্ছে, কাজেই বিদেশ থেকে স্ট্যান্ডিং কোচ আনা যায়, অথবা আমাদের এখানেই তা' কনভার্ট করার ক্ষমতা রয়েছে।”

নতুন ব্যবস্থায় টিকেটেও পরিবর্তন আসবে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, নতুন ব্যবস্থায় টিকেটেও পরিবর্তন আসবে।

টিকেট কাটায় কী পরিবর্তন আসবে

মার্চ থেকে বাংলাদেশ রেলওয়ে টিকেটিং ব্যবস্থায় নতুন তিনটি সেবা অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।

সেগুলো হল, জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে রেলওয়ের আন্তঃনগর ট্রেনের টিকেটিং ব্যবস্থা, টিকিট চেকিং ব্যবস্থায় পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) মেশিন বসানো এবং অনলাইনের মাধ্যমে কেনা টিকিটের মূল্য অনলাইনে রিফান্ডের ব্যবস্থা করা। অর্থাৎ টিকিট ফেরত দিলে অনলাইনেই টাকা ফেরত পাওয়া যাবে।

রেল টিকেটের বিশৃঙ্খলা দূর করতে আগে থেকেই এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল।

শুরুতে এনআইডি দেখিয়ে আন্তঃনগর ট্রেনে প্রথম শ্রেণির টিকিট কেনা বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল।

কিন্তু ওই সময় সার্ভার জটিলতাসহ বেশি সময় লাগায় স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারি তৈরি হয়ে যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

চলতি বছরের শুরুতে পাইলট প্রকল্পের অংশ হিসেবে সোনার বাংলা ট্রেনের ১৫% টিকিটে এই পদ্ধতি চালু করা হয়। তবে মার্চ থেকে শতভাগ টিকেট করার ক্ষেত্রেই নতুন নিয়ম প্রযোজ্য হবে।

সেইসাথে ট্রেনে থাকা অবস্থায় যাত্রীদের টিকেট পিওএস মেশিনে চেক করার সিস্টেমও থাকবে। টিকিট জাল কী না তাও ধরা পড়বে পিওএস মেশিনে। প্রাথমিকভাবে ১০০টি পিওএস মেশিন দিয়ে কার্যক্রম শুরু করার কথা বলা হচ্ছে।

পরিচয় যাচাইয়ে যাত্রীদের এনআইডি, জন্ম-সনদের ফটোকপি বা ছবিযুক্ত আইডি কার্ড সাথে রাখতে বলা হয়েছে।

টিকেট চেক করার সময় যাত্রীর পরিচয়পত্রের সঙ্গে তার টিকিটে মুদ্রিত তথ্যের মিল না থাকলে বিনা টিকেটে ভ্রমণের দায়ে আইন অনুযায়ী জরিমানা করার কথাও বলা হয়েছে।

নতুন নিয়মে ট্রেনের টিকিটের রং পরিবর্তনসহ সেখানে যাত্রীর নাম, এনআইডি ও বয়সের তথ্য থাকবে। ফলে ওই ট্রেনে কারা যাতায়াত করেছেন তার পুরো ডাটাবেস রাখাও সম্ভব হবে।

পাশের দেশ ভারতেও যিনি ভ্রমণ করবেন তার নামেই টিকিট সংগ্রহ করতে হয়। অন্য নামের টিকিট নিয়ে কেউ ভ্রমণ করতে গিয়ে ধরা পড়লে ওই যাত্রীকে আটক করা হয়।

মূলত যারা বিনা টিকেটে ভ্রমণ করছেন, সেটি রোধ করার জন্য এমন উদ্যোগ।

কাউন্টারে টিকেট কাটা নিয়ে যাত্রীদের ভিড়।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, কাউন্টারে টিকেট কাটা নিয়ে যাত্রীদের ভিড়।

এরপরও সংশয়..

একটি মোবাইলে একটি এনআইডি নিবন্ধন এবং শতভাগ অনলাইন সেবা দেয়ার জন্য রেল কর্তৃপক্ষ আদৌ প্রস্তুত কিনা সেটা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

আবার বাংলাদেশে এখনও নিবন্ধন কাজ, ফর্ম ফিল-আপ বা পাসপোর্ট, ভিসার কাজে এক শ্রেণীর মানুষ টাকার বিনিমেয়ে পাড়ার দোকানের সাহায্য নিয়ে থাকেন।

সেখানে এখন ট্রেনের টিকেট কাটতে দোকানের সাহায্য নিতে হয় কিনা সেটা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

এ নিয়ে রেল মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেছেন, তারা মার্চের আগ পর্যন্ত সুবিধা অসুবিধা সব বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

তিনি জানান, “এখনই এতো নেগেটিভলি দেখার কিছু নাই। আমরা মাত্র শুরু করতে যাচ্ছি। ভুল ত্রুটি হতেই পারে। সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা সিস্টেমটা ডেভেলপ করবো। সমস্যা যে নেই বলবো না। কিন্তু সেটা তো রাতারাতি ঠিক হবে না। সময় লাগবে। মূল বিষয় হল আজ হোক কাল হোক ধীরে ধীরে আমাদের এনালগ সিস্টেম থেকে বের হয়ে আসতেই হবে।”

এরিমধ্যে ডিজিটাল সিস্টেমটি নিয়েও অভিযোগ আসতে শুরু করেছে। রেলওয়ের ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনে রেজিস্ট্রেশন করতে গিয়ে তথ্যের ইনপুট নিচ্ছে না বলে কয়েকজন গ্রাহক অভিযোগ করেছেন ।

তারা বলছেন, ডিজিটাল সিস্টেম প্রণয়নের আগে এই সিস্টেম আদৌ কাজ করে কিনা সেদিকে সরকারের মনোযোগ দিতে হবে।

রেল কর্মী

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, রেলকে যথাযথ ব্যবস্থাপনায় ফেরাতে টিম-ওয়ার্ক শক্তিশালী করার ওপর জোর দেয়ার কথা জানান রেলমন্ত্রী।

লোকসান তুলে আনার প্রত্যাশা

বাংলাদেশের ৪৪টি জেলায় যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম এই রেলপথ। প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী এই পথে চলাচল করলেও এখন পর্যন্ত রেল-খাত ১০০ কোটি টাকা ঘাটতিতে আছে।

যেখানে যাত্রী সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে সেখানে লাভ করার কথা থাকলেও প্রতিনিয়ত লোকসানের পাল্লা ভারি হচ্ছে জন-গুরুত্বপূর্ণ এই পরিবহন খাতটির।

রেলমন্ত্রী এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন টিকেট কালোবাজারিকে।

তিনি জানান, “গত এক দশকে বাংলাদেশ রেলওয়ে নতুন নতুন রেললাইন সংযুক্ত করা হয়েছে, কোচগুলোয় সেবার মান বাড়ানো হয়েছে কিন্তু তারপরও মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস নষ্ট হচ্ছে টিকেট কালোবাজারির জন্য। এটি রেলের সব অর্জন নষ্ট করে দিচ্ছে, ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছে।”

“এজন্যই এই নতুন নিয়ম। এখন থেকে একজন যাত্রীও টিকেট ছাড়া ভ্রমণ করতে পারবেন না। এতে রাজস্ব বাড়বে। এখানে সুবিধা ছাড়া আমি কোন অসুবিধা দেখি না।”

তার প্রত্যাশা শতভাগ টিকিট নিশ্চিত করা গেলে এক বছরের মধ্যে লোকসানের টাকা তুলে আনা সম্ভব হবে। আমরা চাই রেল খাতকে একটি লাভজনক খাত হিসেবে গড়ে তুলতে।

রেলওয়ের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে রেল পুলিশ সার্বক্ষণিক নিয়োজিত থাকেন। বছরের বিশেষ দিনগুলোয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়।

আবার ভ্রাম্যমাণ আদালতও অভিযান চালিয়ে থাকে। এরপরও কালোবাজারির দৌরাত্ম্য থামানো যায়নি।

রেলের অর্ধেক টিকিট কাউন্টারে বাকি অর্ধেক অনলাইন ও অ্যাপে বিক্রি করেও কালোবাজারি ঠেকানো যায়নি। বরং অনলাইনে টিকেট কেটে টিকেট ডুপ্লিকেট হওয়ার অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা।

এ ধরণের ভোগান্তি ও টিকেট কালোবাজারির সাথে রেলের কিছু অসাধু কর্মকর্তার জড়িত থাকার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

এতে ওই কর্মকর্তারা লাভ করলেও বছরের পর বছরের লোকসান ও অব্যবস্থাপনার ঘানি টানতে হচ্ছে রেল খাতকে। নতুন এই পদ্ধতি কালোবাজারি বন্ধ করবে কি না, সেটা সময়ই বলে দেবে।

এ নিয়ে ১৫ই ফেব্রুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে রেলমন্ত্রী বলেছেন, “রেলের কর্মচারী বা বাইরের মানুষ যারাই কালোবাজারিতে জড়িত থাকুক না কেন সেটা বিচার করার থেকে যদি সিস্টেমটা বন্ধ করা যায়, সেই উদ্যোগ আমরা গ্রহণ করছি।”

“এই কাজগুলো যারা করবেন তাদের টিম-ওয়ার্ক শক্তিশালী করার ওপর আমরা জোর দেবো। প্রথম দুই সপ্তাহ তাদের কাজ কঠোর মনিটরিং করা হবে। তথ্য প্রযুক্তির মাধৗমে ব্যবস্থাপনা এতোটা জোরদার করা হবে যেন কেউ টিকেট ছাড়া প্রবেশ করতে না পারে।” তিনি বলেন।

মূলত ‘টিকিট যার, ভ্রমণ তার’ নিশ্চিত করার জন্য এবং বাংলাদেশ সরকারের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গঠনের অংশ হিসেবে টিকিট বিক্রির ব্যবস্থায় এই পরিবর্তন আনার কথা তিনি বলছেন।

নতুন এই নিয়মটি রেল কর্মকর্তা ও যাত্রী উভয়ের সময় ও ভোগান্তি কমাতে ফলপ্রসূ হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

ট্রেন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ট্রেন

নিবন্ধনের নিয়ম ও শর্ত

রেলের টিকের কাটতে ১২ বছর বা তার বেশি বয়সী সবাইকে নিবন্ধন করতে হবে। কাউন্টার, অনলাইন ও মোবাইল অ্যাপ এর মাধ্যমে টিকেট ক্রয়কারী যাত্রীরা অনলাইন অথবা মোবাইল এসএমএস-এর মাধ্যমে যে কোনও সময় বাংলাদেশ রেলওয়ের টিকেটিং সিস্টেমে খুব সহজে নিবন্ধন সম্পন্ন করতে পারবেন।

টিকিট কেনার আগে প্রত্যেক যাত্রীকে জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, জন্ম-নিবন্ধন সনদ বা পাসপোর্ট যাচাই করে রেজিস্ট্রেশন বা নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

অনলাইনে টিকিট কেনার সময় যে যাত্রী ভ্রমণ করবেন তার এনআইডি লাগবে। যাত্রীর এনআইডি যাচাই করা হবে।

অন্যদিকে কাউন্টার থেকে টিকিট কিনতে আগাম নিবন্ধন করতে হবে। তবে ওই নিবন্ধনের জন্য ইন্টারনেটের প্রয়োজন হবে না। মোবাইল ফোন থেকে এসএমএসের মাধ্যমে নিবন্ধন করা যাবে। তারপর এনআইডি দেখিয়ে স্টেশন থেকে টিকিট পাওয়া যাবে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে https://eticket.railway.gov.bd রেজিস্টার অপশনে গিয়ে নিজের মোবাইল নম্বর, এনআইডি নম্বর ও জন্ম তারিখ দিয়ে নিবন্ধন করতে হবে।

আপনার নম্বর নিবন্ধিত থাকলে লগ ইন করলেই হবে।

তারপর কোথা থেকে ট্রেনে উঠবেন, গন্তব্য, ভ্রমণের তারিখ, কোন শ্রেণীতে ভ্রমণ করবেন সেগুলো সিলেক্ট করে দিলেই পছন্দের সিট বেছে নেয়ার অপশন আসবে।

এরপর অনলাইনে পেমেন্ট সম্পন্ন করলেই টিকেট আপনার নামে বুক হয়ে যাবে।

এছাড়া rail sheba app এ গিয়ে সাইন আপ করেও টিকেট কাটা যাবে এজন্য একই ধরণের তথ্য দিয়ে নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে।

আবার কাউন্টারে টিকেট করার ক্ষেত্রে মোবাইল থেকে মেসেজ অপশনে গিয়ে টাইপ করতে হবে BR<space>NID নম্বর <space> জন্ম তারিখ (সাল/মাস/দিন)

এসএমএস পাঠাতে হবে ২৬৯৬৯ নম্বরে।

ফিরতি এসএমএস-এর মাধ্যমে নিবন্ধন সফল বা ব্যর্থ হয়েছে কিনা, তা জানিয়ে দেওয়া হবে। এরপর কাউন্টারে জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, জন্ম-নিবন্ধন সনদ বা পাসপোর্ট দেখালেই টিকেট পেয়ে যাবেন।

ট্রেন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ট্রেন।

যাদের জাতীয় পরিচয়পত্র নেই বা যাদের বয়স ১২ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে, তারা বাবা বা মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে নিবন্ধন করা অ্যাকাউন্ট অথবা নিজেদের জন্ম নিবন্ধন নম্বর দিয়ে কিংবা জন্ম নিবন্ধন সনদ আপলোড করে নিবন্ধনকৃত অ্যাকাউন্ট দিয়ে টিকেট কিনতে পারবেন। এরূপ ক্ষেত্রে টিকিটের ওপরে মুদ্রিত নামের সঙ্গে যাত্রীর সম্পর্ক যাচাইয়ের জন্য ভ্রমণের সময় বাধ্যতামূলকভাবে জন্ম-নিবন্ধন সনদের ফটোকপি সঙ্গে রাখতে হবে।

বিদেশি নাগরিকরা পাসপোর্ট নম্বর দিয়ে ও পাসপোর্টের ছবি আপলোড করে নিবন্ধন সম্পন্ন করবেন।

সফলভাবে এনআইডি/পাসপোর্ট/জন্ম-নিবন্ধন যাচাই করে নিবন্ধন ছাড়া কোনও যাত্রী আন্তঃনগর ট্রেনের টিকেট কিনতে পারবেন না।

ভ্রমণকালে যাত্রীকে অবশ্যই নিজস্ব এনআইডি বা জন্ম নিবন্ধন সনদের ফটোকপি অথবা পাসপোর্ট/ছবি সম্বলিত আইডি কার্ড সঙ্গে রাখতে হবে।

পরিচয়পত্রের সঙ্গে টিকিটের ওপরে মুদ্রিত যাত্রীর তথ্য না মিললে যাত্রীকে বিনা টিকেট ভ্রমণের দায়ে অভিযুক্ত করা হবে এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

যাত্রীরা ১৬ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র/জন্ম নিবন্ধন/পাসপোর্ট-এর মাধ্যমে বাংলাদেশ রেলওয়ের সিস্টেমে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবে।

দেশের বিভাগীয় শহরের রেল স্টেশন ও আন্তঃনগর ট্রেনের প্রারম্ভিক স্টেশনসমূহে সর্বসাধারণের নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করার জন্য একটি করে হেল্প ডেস্ক স্থাপন করা হবে।