নিখোঁজ ডুবোযানের সন্ধান চলছে, এবং কীভাবে এটি পাওয়া যেতে পারে

নিখোঁজ ডুবোজাহাজ টাইটান
ছবির ক্যাপশান, নিখোঁজ ডুবোজাহাজ টাইটান
    • Author, ভিজুয়াল সাংবাদিকতা টিম
    • Role, বিবিসি নিউজ

টাইটানিক জাহাজের ধ্বংসাবশেষ দেখতে টাইটান নামে ডুবোযানটি রোববার আটলান্টিক সাগরের গভীরে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু এক ঘণ্টা ৪৫ মিনিট পরই পানির উপরে মাদার শিপ বা মূল জাহাজের সাথে ডুবোযানটির যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

ডুবোযানটির ভেতরে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ সময় বেলা ১১ টায় (১০ জিএমটি) শেষ হয়ে যাওয়ার কথা।

টাইটানিক জাহাজের ধ্বংসাবশেষ সাগরের নিচে যে জায়গায় তা ক্যানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ড দ্বীপের সেন্ট জনস এলাকা থেকে ৪৩৫ মাইল দক্ষিণে। এবং সে জায়গায় এখন ১২টির মত উদ্ধার জাহাজ হাজির হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র এবং ক্যানাডার নৌবাহিনীসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশেষায়িত সংস্থা উদ্ধারকাজে সম্পৃক্ত হয়েছে। একাজে তারা জাহাজ ছাড়াও সামরিক বিমান এবং ‘সোনোবয়া’ ব্যবহার করছে যা দিয়ে সাগরের অনেক নিচে বস্তুর অবস্থান নির্ণয় করা হয়।

টাইটানের মাদার শিপ পোলার প্রিন্সের সাথে যোগ দিয়েছে সাগরের নিচে কেবল বা তার বসানোর জাহাজ ডিপ এনার্জি এবং অন্য তিনটি জাহাজ। আরও জাহাজ সেখানে যাচ্ছে।

এসব জাহাজের কতগুলোতে এমন সব দূর নিয়ন্ত্রিত জলযান রয়েছে (আরওভি) যা সাগরের তলদেশে অনুসন্ধানে ব্যবহার করা হয়। তবে জানা গেছে একমাত্র ফরাসী গবেষণা জাহাজ এল অ্যাটালান্টাতেই এমন ডুবোযান রয়েছে যেটি টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ যে গভীরে সে দূরত্বে যেতে সক্ষম। বুধবার দিনের শেষ দিকে ফরাসী জাহাজটি ঐ জায়গায় পৌঁছুতে পারে বলে জানা গেছে।

আর্কটিক অঞ্চলে রসদ সরবরাহের কাজে ব্যবহার হয় এমনি জাহাজও গুরুত্বপূর্ণ কিছু যন্ত্রপাতি নিয়ে সেখানে যাচ্ছে।

মার্কিন নৌ বাহিনী এমন একটি জাহাজ পাঠাচ্ছে যেটি সাগরের গভীর তলদেশে থেকে ভারি জিনিস তুলে আনতে সক্ষম।

মার্কিন কোস্ট গার্ডের ক্যাপ্টেন জেমি ফ্রেড্রিক জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার ক্ররা “জটিল এই উদ্ধার অভিযানে দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছে।“

ইউনিভার্সিটি কলেজ অব লন্ডনের ডুবোজাহাজ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক অ্যালিস্টার গ্রেগ বলছেন একটা সমস্যা হচ্ছে উদ্ধারকারীরা ঠিক নিশ্চিত নয় ঠিক কোথায় তাদের খোঁজা উচিৎ - সাগরের তলদেশে না ওপরে। “সাগরের তলদেশ এবং ওপরের মাঝামাঝি কোথাও এই ডুবোযানটি রয়েছে – সে সম্ভাবনা খুবই কম, ফলে এই অনুসন্ধান খুবই বড় একটি চ্যালেঞ্জ,” তিনি বলেন।

নিখোঁজ টাইটানের সন্ধানে জোর তৎপরতা চলছে
ছবির ক্যাপশান, বিমান থেকে সোনোবয়া ফেলে নিখোঁজ টাইটানের সন্ধানে জোর তৎপরতা চলছে

পানির ওপরে অনুসন্ধান

মার্কিন কোস্ট গার্ড বলছে, তারা সাগরের ২০হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় অনুসন্ধান চালাচ্ছে। একাধিক জাহাজ এ কাজ করছে। পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার সি-১৩০ হারকিউলিস বিমান আকাশ থেকে ডুবোযানটি শনাক্ত করার চেষ্টা করছে।

“কিন্তু ডুবোযানটি যদি বিপদ সংকেত না পাঠাতে পারে তাহলে মাঝারি সাইজের একটি মালবাহী ভ্যানের আকৃতির সাদা রং করা এই যানটি আকাশ থেকে শনাক্ত করা খুবই শক্ত কাজ হবে,” বলেন অধ্যাপক গ্রেগ।

আবহাওয়ার যেভাবে রদবদল হচ্ছে তাতে দূর থেকে পরিষ্কারভাবে দেখার কাজটিও সহজ হচ্ছেনা।

দূর নিয়ন্ত্রিত জলযান (আরওভি) এখন উদ্ধারের বড় ভরসা
ছবির ক্যাপশান, দূর নিয়ন্ত্রিত জলযান (আরওভি) এখন উদ্ধারের বড় ভরসা

সাগরের গভীরে অনুসন্ধান

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

২২-ফুট লম্বা ডুবোযানটির সন্ধানে উদ্ধারকারীদের অনেক গভীরে এমনকি চার কি.মি. গভীরেও যেতে হতে পারে। কারণ পানির ভেতর দিয়ে রেডিও বা জিপিএস সংকেত যেতে পারেনা।

ক্যানাডার পি-থ্রি অরোরা বিমান আকাশ থেকে সোনোবয়া ফেলে ডুবোযানটির অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা করছে। শত্রুপক্ষের সাবমেরিন শনাক্ত করতে এই সোনোবয়া ব্যবহার করা হয়।

জাহাজের প্রপেলার বা যন্ত্রের শব্দ এসব সোনোবয়ায় ধরা পড়ে। এমনকি ক্ররা যদি জাহাজের খোলের ভেতর কোনো কিছু দিয়ে জোরে আঘাত করতে থাকে বা কোনো শব্দ সংকেত পাঠায় তাহলেও সেসব শব্দ এসব বয়ায় ধরা পড়তে পারে।

মার্কিন মিডিয়ায় খবর বেরিয়েছে যে উদ্ধারকাজে সমন্বয়কদের কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগের কাছে পাঠানো গোপন একটি বার্তায় বলা হয়েছে যে সাগরের নীচে আধ ঘণ্টা পরপর জাহাজের খোলের গায়ে আঘাত করার মত শব্দ শোনা গেছে।

ব্রিটেনের সাদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্র বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ সাইমন বোক্সাল বলছেন, সাগরের নিচের এই শব্দ উদ্ধারকারীদের উৎসাহিত করবে। “মহাসাগরের নিচে নানারকম শব্দ হয়, কিন্তু তারপরও ঐ শব্দ আশা যোগাবে।“

অস্ট্রেলিয়ার সাবমেরিন গবেষণা এবং উদ্ধার বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ফ্রাংক ওয়েন বলেন যদি সাগরের উপরিতলের খুব কাছ থেকে একটি বয়া এমন শব্দ পায় তাহলে বোঝা যায় যে নিখোঁজ ডুবোযানটি সাগর পৃষ্টের হয়তো কাছাকাছি রয়েছে বা এমনকি পানির ওপরও থাকতে পারে।

টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ সাগরের চার কিমি গভীরে

যদি ডুবোযানটি সাগরের তলদেশে থাকে?

যদি সাগরের তলদেশে উদ্ধারকাজ চালাতে হয় তাহলে সেখানে হয়ত মানুষ-বিহীন দূর নিয়ন্ত্রিত জলযান (আরওভি) পাঠাতে হবে।

ডিপ এনার্জি নামে যে জাহাজ সাগরের তলদেশে তার বসানোর কাজ করে সেটি থেকে মঙ্গলবার সেখানে অন্তত একটি আরওভি সাগরের গভীরে পাঠানো হয়েছে । তবে ৩৮০০ মিটার গভীরে টাইটানিক জাহাজের ধ্বংসাবশেষ যেখানে পড়ে রয়েছে সে পর্যন্ত ঐ রোবোটিক জলযানটি যেতে পারবে কিনা তা পরিষ্কার নয়।

তবে আরওভি নিয়ে আরও একাধিক জাহাজ ঐ এলাকায় যাচ্ছে। জানা গেছে ফরাসী গবেষণা জাহাজ এল অ্যাটালান্টায় অত গভীরে পৌঁছুতে সক্ষম দুটো আরওভি রয়েছে।

টাইটান যদি সাগরের তলদেশে পড়ে থাকে এবং নিজের শক্তিতে ওপরে না উঠতে পারে, তাহলে বিকল্প খুবই কম বলে মনে করেন অধ্যাপক গ্রেগ।

“ডুবোযানটির হয়তো অক্ষত রয়েছে কিন্তু এটি যদি ২০০ মিটারের নিচে থাকে তাহলে খুব কম জলযানই রয়েছে যেটি আরও গভীরে যেতে সক্ষম, এবং ডুবুরিরা যেতে পারবে সে সম্ভাবনা একেবারেই নেই। নৌ সাবমেরিন উদ্ধারের জন্য তৈরি এসব জলযানের পক্ষে টাইটানিক যেখানে পড়ে রয়েছে অত গভীরে যাওয়া সম্ভব নয়।“

কিন্তু সাগরে উদ্ধারকাজের বিশেষজ্ঞ ডেভিড মার্নস বলেন, কোনো আরওভি যদি টাইটানের অবস্থান শনাক্ত করতে পারে তাহলে সেটি ডুবোযানটি উদ্ধারও করতে পারবে।

“অত্যাধুনিক আরওভিগুলোতে দুটো লিভার থাকে যেগুলো দিয়ে টাইটানকে আঁকড়ে ধরে ওপরে তুলে আনতে তারা সক্ষম।“ তাছাড়া, তিনি বলেন, এসব আরওভি টাইটানের সাথে একটি দড়ি বেঁধে দিতে পারে যাতে ওপর থেকে আস্তে আস্তে ক্রেন দিয়ে সেটিকে টেনে তুলে আনা সম্ভব হয়।

যুক্তরাষ্ট্র এর আগে টাইটানিকের মত সাগরের গভীর তলদেশে উদ্ধারকাজ চালিয়েছে।

গত বছর তারা দক্ষিণ চীন সাগরে ৩৭৮০ মিটার গভীর থেকে আরওভি ব্যবহার করে একটি বিধ্বস্ত যুদ্ধবিমানের ধ্বংসাবশেষ তুলে আনে।

ঐ কাজে মার্কিন সেনাবাহিনী একটি আরওভি পাঠিয়ে বিমানটির চারদিকে শক্ত দড়ি পেঁচিয়ে উদ্ধারকারী একটি জাহাজের ক্রেন দিয়ে সেটিকে টেনে তুলেছিল।