ক্যান্সার সারাতে 'পানিপড়া', চিকিৎসা সংকট যেভাবে কবিরাজের কাছে যেতে বাধ্য করছে আফগানদের

ছবির উৎস, BBC via Getty
- Author, মামুন দুররানি
- Role, বিবিসি আফগান ফরেনসিক টিম
- পড়ার সময়: ৮ মিনিট
আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলে কান্দাহারের শহরতলীতে একটি সাধারণ বাড়ির সামনে জড়ো হয়েছেন কয়েক ডজন মানুষ। প্রাণঘাতী অসুখ থেকে মুক্তির আশায় এবং নিজেদের প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তারা এখানে এসেছেন।
উজ্জ্বল রঙে সাজানো বাড়িটির একটি কক্ষে অসুস্থ পুরুষ, নারী ও শিশুদের অনেককে বসে বা শুয়ে থাকতে দেখা যায়।
তবে এখানে উপস্থিত সবাই যে মৃত্যুপথযাত্রী বা মারাত্মক রোগে আক্রান্ত, তা নয়।

ঘরের এক কোণে বসে আছেন নেদা মোহাম্মদ কাদরি—যাকে দেখতেই সবাই এখানে এসেছেন।
সাদা পাগড়ি পরা, দীর্ঘ কালো দাড়িওয়ালা এই ব্যক্তি নিজেকে একজন 'পীর' বা কবিরাজ বলে পরিচয় দেন।
কাদরি একটি পানির বোতল থেকে চুমুক দেন, তারপর সেই পানি থুতুর সঙ্গে ছিটিয়ে দেন তার সামনে থাকা মানুষদের ওপর।
তিনি দাবি করেন, ঈশ্বরের কৃপায় এই সাধারণ কাজের মাধ্যমেই ক্যান্সার ও থ্যালাসেমিয়ায় ভোগা অনেক মানুষের উপশম হয়েছে। থ্যালাসেমিয়া এমন একটি রক্তজনিত রোগ, যা অঙ্গ বিকলতার কারণ হতে পারে।
কাদরির কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় শিক্ষা নেই, এমনকি চিকিৎসা-সংক্রান্ত কোনো প্রশিক্ষণও না।
কয়েক বছর আগে তিনি একজন রাঁধুনি হিসেবে কাজ করতেন। তবে তার ভাষ্য অনুযায়ী, তখনও মানুষ তার কাছে তাবিজ চাইতে আসত, যেগুলোকে কেউ কেউ অতিপ্রাকৃত শক্তিসম্পন্ন বলে মনে করে।
তিনি বলেন, যেহেতু লোকজনের অবস্থার উন্নতি হতে থাকে, তাই তার কাছে আসা মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়—বিশেষ করে ক্যান্সার রোগীদের।

ছবির উৎস, Habib Ullah
স্বাস্থ্য-ব্যবস্থার ওপর তীব্র চাপ
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, আফগানিস্তানে প্রতি বছর ২৪ হাজারের বেশি মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হন এবং প্রায় ১৭ হাজার মানুষ এই রোগে মারা যান।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কেননা এখানে হাসপাতাল ও ক্লিনিকের অভাব রয়েছে।
এছাড়া, সেখানে পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও নার্স না থাকায় অনেক রোগী জানতেই পারেন না তাদের কী রোগ আছে।
এরকম পরিস্থিতিতে আফগানিস্তানে আধ্যাত্মিক চিকিৎসক বা কবিরাজদের কাছে মানুষের ভিড় বেড়েই চলেছে। এর কারণ মূলত পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবার অভাব এবং চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে অতিরিক্ত খরচ।
চিকিৎসাকেন্দ্রের অভাবও একটি কারণ, যেমন- সম্প্রতি রাজধানী কাবুলে একটি বিশেষায়িত ক্যান্সার হাসপাতাল তৈরি করেছে তালেবান সরকার।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, লাইফস্টাইল বা জীবনযাপনের পদ্ধতি, যেমন- অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার খাওয়া, নাসওয়ার নামে পরিচিত ধোঁয়াবিহীন তামাকের ব্যবহার, উচ্চ মাত্রার দূষণের কারণে আফগানিস্তানে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার হার বেশি।
তালেবান ২০২১ সালে দেশটির ক্ষমতায় আসার পর আন্তর্জাতিক সহায়তার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। যেমন আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি কান্দাহারের মিরওয়াইস হাসপাতালের সহায়তা স্থগিত করে দেয় অর্থসংকটের কথা উল্লেখ করে। যেটি পরিচিত ছিল গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে।
এ সরকারের স্বল্পমেয়াদী এবং প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া অর্থায়নের কারণে হাসপাতালটি এখন প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদির অভাবে ভুগছে। ফলে রোগীদের নিজ নিজ প্রাথমিক ওষুধ ও সরঞ্জাম নিজেদেরই কিনতে হচ্ছে।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Bilal Guler/Anadolu Agency via Getty Images
এই তীব্র সংকটের প্রভাব দক্ষিণ আফগানিস্তানে কিছুটা হলেও কমানো যেত পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্তপথে যাতায়াতের মাধ্যমে। প্রায় ১৮ মাস আগ পর্যন্ত কান্দাহারের বাসিন্দারা ভিসা ছাড়াই সীমান্ত পাড়ি দিতে পারতেন এবং উন্নত সুবিধাসম্পন্ন হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিতে যেতে পারতেন।
কিন্তু সেই সুযোগও এখন বন্ধ হয়ে গেছে।
আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘর্ষের পর চামান–স্পিন বোলদাক সীমান্ত একাধিকবার বন্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে পাকিস্তান থেকে আমদানি করা ওষুধের ওপর, যার উপর এই অঞ্চলের মানুষ অনেকটাই নির্ভরশীল ছিল।
এসব কারণে আগে থেকেই থাকা আফগানিস্তানের নাজুক স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর আরও বড় চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
চিকিৎসার পথে বাধা
নাজির আহমদ মাইওয়ান্দওয়ালের স্ত্রী শুকরিয়া এক বছরেরও বেশি সময় আগে তীব্র মাথাব্যথায় ভুগতে শুরু করেন। তখন নাজির তার স্ত্রীকে নিয়ে পাকিস্তানে যান, যেখানে তার ব্রেন টিউমার ধরা পড়ে এবং অপারেশন করা হয়।
"অপারেশনের পর আমার স্ত্রীর অবস্থা কিছুটা ভালো হতে শুরু করে। তার ওজন কিছুটা বাড়ে এবং ছয় মাস সবকিছু ঠিকঠাক মনে হচ্ছিল। তবে ধীরে ধীরে তার শারীরিক অবস্থা আবার খারাপ হতে শুরু করে," জানান মাইওয়ান্দওয়াল।
চিকিৎসকরা শুকরিয়াকে আবার পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু তখন সীমান্ত দিয়ে ভিসাহীন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।
মাইওয়ান্দওয়াল বলেন, "আমি তিনবার পাকিস্তানের ভিসার জন্য আবেদন করেছি, কিন্তু প্রতিবারই তা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। আমি কাবুলেও গিয়েছিলাম, কিন্তু সেখানে ক্যান্সার চিকিৎসাকেন্দ্রে রেডিওথেরাপির ব্যবস্থা ছিল না। ফলে আমি হতাশ হয়ে ফিরে আসি।"
মার্চ মাসে তার স্ত্রী শুকরিয়া মারা যান। সেসময় তার বয়স ছিল মাত্র ২৪ বছর।
আবার কান্দাহারের সেই বাড়িতে ফিরে আসা যাক।
এখানে কাদরি বলেন, প্রতিনিয়ত তার কাছে মানুষ আসছে, যার মধ্যে অনেকেই আসছেন শেষ আশার খোঁজে।
তিনি বলেন, "আফগানিস্তানের সব প্রান্ত থেকে ক্যান্সার রোগীরা আমার কাছে আসে। প্রতিদিন ২৫০-৩০০ জন, এমনকি ৪০০ জন পর্যন্ত মানুষও আসে।"
হাবিবুল্লাহর ছেলে আসাদও ছিলেন তাদেরই একজন।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, AFP via Getty Images
হাবিবুল্লাহ তার ছেলে আসাদের চিকিৎসার জন্য পাকিস্তানে যেতে পেরেছিলেন। কিন্তু সেখানে তাকে জানানো হয়, আর কিছু করার নেই।
তাকে পরামর্শ দেওয়া হয় আসাদকে বাড়ি নিয়ে পরিবারের সঙ্গে বাকি সময়টা কাটাতে।
হাল না ছেড়ে এবং কিছুটা 'মানসিক শান্তি'র খোঁজে হাবিবুল্লাহ আফগানিস্তানে ফিরে আসেন।
অনেক ক্যান্সার রোগীকে কাদরি সুস্থ করেছেন- বন্ধুদের কাছে এমন কথা শুনে আসাদকে নিয়ে তার কাছে যান তিনি।
কিন্তু সেখানেও কোনো আশার আলো পাওয়া যায়নি।
হাবিবুল্লাহ বলেন, "ওরা আমার ছেলের একটি ছবি তুলে সেটি তার কাছেই রাখতে বলেছিল এবং বলেছিল দশ দিনের মধ্যে তার চেহারা বদলে যাবে যে সে নিজেকেই চিনতে পারবে না।"
কিন্তু তা না হয়ে আসাদের শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হতে থাকে এবং এক পর্যায়ে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই সে মারা যায়।
হাবিবুল্লাহ বলেন, "আমি আমার ছেলেকে হারিয়েছি। সে রেখে গেছে পাঁচটি সন্তান ও একজন স্ত্রী।"
তিনি আরও বলেন, "আমার ছেলেকে ভিত্তিহীন প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতারিত করা হয়েছে। সে কাদরিকে টাকা দিয়েছে, কিন্তু ক্যান্সার থেকে সুস্থ হতে পারেনি।"
হাবিবুল্লাহর দাবি, একটি ভেড়া নেওয়ার পরও কাদরি "নজরানা ও যাতায়াত খরচ" হিসেবে বড় অঙ্কের টাকা দাবি করতেন।
তার ভাষায়, কাদরি একজন "প্রতারক"।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কান্দাহারের আরেকজন বাসিন্দা বলেন, তিনি ত্বকের ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য কাদরিসহ অনেক মাজার ও কবিরাজের কাছে গিয়েছিলেন।
তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, "কাদরি আমাকে পাকিস্তান বা অন্য কোথাও যেতে মানা করেছিলেন এবং একটি ভেড়া নিয়ে আসতে বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, 'সৃষ্টিকর্তা চাইলে তুমি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাবে'।"
তিনি আরও জানান, সাত দিন ধরে তিনি কাদরির কাছে গিয়ে ঝাকফুঁক নিয়েছেন এবং তাকে সেফট্রিয়াক্সন ইনজেকশন ও কো-অ্যামক্সিক্ল্যাভ এবং অগমেন্টিন ট্যাবলেট দেওয়া হয়েছিল। এগুলো সাধারণত, ব্যাকটেরিয়াজনিত গুরুতর ইনফেকশন বা সংক্রমণ সারাতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
তিনি বলেন, "এসবের পরও আমার অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। আমি বুঝতে পারছিলাম সময় নষ্ট হচ্ছে, তাই বাধ্য হয়ে পাকিস্তানের লাহোরে অবস্থিত শওকত খানম হাসপাতাল-এ চিকিৎসা নিতে যাই।"
সেখানে চিকিৎসা নেওয়ার পর শেষ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে ওঠেন তিনি।
চিকিৎসার পদক্ষেপ
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, সেফট্রিয়াক্সন মানবদেহের শিরায় প্রয়োগ করতে হয় এবং এসব অ্যান্টিবায়োটিকের কোনোটিই ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয় না।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এগুলোর ব্যবহার বিপজ্জনক হতে পারে এবং এর ফলে ড্রাগ রেজিস্ট্যান্সসহ (এমন একটি অবস্থা যখন নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ আর কাজ করে না) অগণিত জটিলতা তৈরি হতে পারে।
বিবিসির প্রশ্নের জবাবে কাদরি দাবি করেন, তিনি তার সেবার জন্য কোনো টাকা চান না। তবে এটাও বলেন, তার কাজের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে অনেকেই তাকে অর্থ দেন।
"মানুষের কাছেই জিজ্ঞেস করুন," বলেন তিনি।
তিনি আরো জানান, "চিকিৎসকের পরামর্শে" তিনি রোগীদের ওষুধ দেন এবং কখনোই কাউকে আধুনিক চিকিৎসা নিতে বাধা দেননি।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Hamid Sabawoon/Anadolu via Getty Images
আফগানিস্তানে হতাশাগ্রস্ত মানুষের কাছে এ ধরনের সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে কাদরি একা নন।
নানগরহারের বাসিন্দা মোহাম্মদ আজিজ সাঈদি বলেন, তার যমজ মেয়েরা থ্যালাসেমিয়ায় ভুগছিল এবং বেঁচে থাকার জন্য তাদের শরীরে প্রতি মাসে রক্ত দিতে হতো।
তিনি জানান, কিছু আত্মীয়ের পরামর্শে তিনি তার মেয়েদের কবিরাজের কাছে নিয়ে যান, কিন্তু এতে তাদের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়।
"কেউ খাদ্যাভ্যাসে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল, কেউ আবার দিয়েছিল ফুঁ দেওয়া পানি। কিন্তু কোনো পরিবর্তন হয়নি। পরে আমরা চিকিৎসা শুরু করি এবং এখন তাদের অবস্থা খুব ভালো," বলেন তিনি।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, ঝাড়ফুঁক কিংবা আধ্যাত্মিক চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি ও প্রাণঘাতী রোগে ভোগা মানুষের জন্য মানসিক সমর্থন ও স্বস্তি হয়তো দিতে পারে, তবে তা কখনোই চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিকল্প হতে পারে না।
তবে কান্দাহারের সেই বাড়িটির বাইরে ধৈর্য ধরে অপেক্ষারত মানুষদের জন্য এই উপদেশটি হয়তো বেশ কঠিন, যারা সেখানে আশ্রয় নিয়েছে ক্ষীণ হয়ে আসা আশা ছাড়া আর প্রায় কিছুই না থাকার কারণে।







