ইসরায়েল-ইরানের এবারের সংঘাত কীভাবে শুরু হলো?

ইরানের রাজধানী তেহরানে ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবন, নিচে দাঁড়িয়ে আছেন জরুরি সেবাদানকারী কর্মীরা

ছবির উৎস, Anadolu via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ইরানের রাজধানী তেহরানে ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবন, নিচে দাঁড়িয়ে আছেন জরুরি সেবাদানকারী কর্মীরা
    • Author, লানা লাম, সোফিয়া ফেরেইরা সান্তোষ, জারোস্লাভ লুকিভ ও নাথান উইলিয়ামস
    • Role, বিবিসি নিউজ

গত শুক্রবার শুরু হওয়া সবশেষ সংঘাতে এখনো একে অন্যের ওপর হামলা চলমান রেখেছে ইসরায়েল ও ইরান। উভয় পক্ষ থেকেই ক্ষুব্ধ বক্তব্য আসছে। এদিকে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ইসরায়েলের হামলায় যোগ দেয়ার কথা ভাবছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনায় ইসরায়েলের হামলা, আর তার জবাবে ইসরায়েলে ইরানের পাল্টা বিমান হামলার মধ্য দিয়ে এবারের সংঘাতের শুরু হয়।

ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের হামলায় এখন পর্যন্ত ২২০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।

অন্যদিকে ইসরায়েল বলছে, ইরানের হামলায় দেশটির ২৪ জন নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন।

আরও পড়তে পারেন:

ইসরায়েলের 'অপারেশন রাইজিং লায়ন' অভিযান ও ইরানের পাল্টা জবাব

গত বৃহস্পতিবার (১২ই জুন) ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) তেহরানের ১৮ নম্বর জেলার বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। অঞ্চলটিতে সামরিক ভবন ও আবাসিক এলাকা রয়েছে।

এর কয়েক ঘণ্টা পর শুক্রবার স্থানীয় সময় ভোর সাড়ে তিনটার দিকে তেহরানে প্রথম দফায় হামলার খবর পাওয়া যায়। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম জানায়, রাজধানীর আবাসিক এলাকাগুলো হামলার শিকার হয়েছে।

ইরানে বিদেশি সাংবাদিকদের কাজ করার ক্ষেত্রে সরকারের কড়াকড়ি থাকায়, বিবিসির সাংবাদিকরা ইরানের ভেতর থেকে রিপোর্ট করতে পারছেন না। ফলে ইসরায়েলের এই হামলায় তেহরানে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা যাচাই করা কঠিন।

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) দাবি, তারা তেহরান থেকে প্রায় ২২৫ কিলোমিটার (১৪০ মাইল) দক্ষিণে অবস্থিত নাতাঞ্জের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়ে বড় ধরনের ক্ষতি করেছে।

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, 'অপারেশন রাইজিং লায়ন' নামের এই হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির "মূলে" আঘাত।

নেতানিয়াহুর দাবি, "ইরানকে যদি থামানো না যায়, তাহলে তারা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে।"

তবে ইরান জোর দিয়ে বলছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলী খামেনি ইসরায়েলকে "ভয়াবহ শাস্তির জন্য প্রস্তুত থাকতে" বলেছেন। আর দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই হামলাকে "যুদ্ধের ঘোষণা" বলে অভিহিত করেছেন।

কয়েক ঘণ্টা পরই ইরান পাল্টা হামলা শুরু করে। 'ট্রু প্রমিস ৩' নামের একটি অভিযানে ইসরায়েলের "ডজনখানেক লক্ষ্যবস্তু, সামরিক কেন্দ্র ও বিমান ঘাঁটি"-তে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় দেশটি।

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, ইসরায়েলের দিকে প্রায় ১০০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া হয়েছিল, যার বেশিরভাগই তাদের আয়রন ডোম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্বারা প্রতিহত করা হয়েছে।

এই পাল্টাপাল্টি হামলা কয়েকদিন ধরে চলমান রয়েছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের হামলার মাত্রা হ্রাস পেয়েছে, যা সম্ভবত ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সামরিক সক্ষমতার ওপর পড়া প্রভাবের ফল বলেই মনে করছেন বিবিসির হুগো বাচেগা।

ইসরায়েল ও ইরানে হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলো দেখানো হয়েছে মানচিত্রে
ছবির ক্যাপশান, ইসরায়েল ও ইরানে হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলো দেখানো হয়েছে মানচিত্রে

ইসরায়েলের হামলায় ইরানের বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছেন ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) কমান্ডার হোসেইন সালামি এবং পারমাণু বিজ্ঞানী ফেরেইদুন আব্বাসি, যিনি ইরানের পারমাণবিক শক্তি সংস্থার সাবেক প্রধান।

ইরান জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে বেসামরিক নাগরিক, এমনকি শিশুরাও রয়েছে।

আইডিএফ জানিয়েছে, তারা ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ স্থাপনাগুলোর ওপর একাধিক দফায় হামলা চালিয়েছে এবং তেল আভিভ ও উত্তর ইসরায়েলের দিকে ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে।

ইরানি বাহিনী বলছে, তারা মূলত ইসরায়েলের নিরাপত্তা স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে এবং দেশটির প্রধান শহরগুলোর বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

তেহরানে অবস্থিত ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারের সময় সেই ভবনে হামলা চালানো হয়। ইরানি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ওই ঘটনায় তিনজন কর্মী নিহত হয়েছে।

মঙ্গলবার ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ঘোষণা করেছে, তারা তেহরানের ওপর "পূর্ণ আকাশ নিয়ন্ত্রণ" প্রতিষ্ঠা করেছে এবং ইরানের এক-তৃতীয়াংশ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ধ্বংস করেছে।

এর আগে ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের চারটি স্থানে আঘাত হানে, যাতে অন্তত আটজন বেসামরিক লোক নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী।

ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত অন্তত ২২৪ জন নিহত হয়েছেন।

ইসরায়েল বলেছে, একই সময়ে তাদের ২৪ জন নাগরিক নিহত হয়েছেন। তারা তেল আভিভ, হাইফা, তামরা, রিশন লে সিওন ও বাট ইয়ামের বাসিন্দা ছিলেন।

ইরানের হামলায় ইসরায়েলের বাত ইয়ামের একটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, ইরানের হামলায় ইসরায়েলের বাত ইয়ামের একটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে

পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র

ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালানোর বিষয়টি বিবেচনায় রেখেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প—সূত্রের বরাত দিয়ে এমনটাই জানিয়েছে বিবিসির মার্কিন অংশীদার সিবিএস নিউজ।

মঙ্গলবার, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের এক বৈঠকের পর ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু টেলিফোনে কথা বলেন।

এর আগেই ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে ইরানকে "নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের" আহ্বান জানিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র জানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলী খামেনি কোথায় অবস্থান করছেন, তবে "এই মুহূর্তে" তাকে হত্যা করা হবে না।

এটি এমন এক সময়ে সামনে এলো যখন রোববার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল যে, ট্রাম্প ইরানের নেতাকে হত্যা করার ইসরায়েলের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী এই সংঘাতে হস্তক্ষেপ করলে "অপূরণীয় ক্ষতির" মুখে পড়বে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন খামেনি।

সোমবার, জি৭ সম্মেলন থেকে আগেভাগেই বেরিয়ে এসে এয়ার ফোর্স ওয়ানে উঠার সময় ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, কোনো যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতা করতে তিনি ওয়াশিংটনে ফিরছেন না—তিনি "যুদ্ধবিরতির চেয়েও ভালো কিছু" চান।

"একটি বাস্তব পরিণতি," তিনি বলেন, যা হতে পারে "সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ।"

এর আগেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি নতুন চুক্তির আলোচনায় পুরোপুরিভাবে না আসার কারণে ট্রাম্প ইরানকে দোষারোপ করেছেন। ওই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে চায়।

রোববার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি নতুন বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল, তবে শুক্রবার ইসরায়েলের হামলার পর তা বাতিল হয়ে যায়।

সম্পর্কিত আরও খবর:
ডোনাল্ড ট্রাম্প

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, কানাডায় জি৭ শীর্ষ সম্মেলন থেকে দ্রুত রওনা হওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন

পরিস্থিতি এখানে কীভাবে পৌঁছালো?

শুক্রবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, এই হামলা ছিল "ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে ওঠা ইরানকে প্রতিহত করতে সুনির্দিষ্ট সামরিক অভিযান"।

তিনি জানান, এই অভিযান "যতদিন প্রয়োজন ততদিন চলবে, যতক্ষণ না এই হুমকি দূর হয়।"

একজন ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তা বিবিসিকে জানিয়েছেন, ইরানের কাছে এত পরিমাণ পারমাণবিক উপাদান রয়েছে যে তারা "কয়েক দিনের মধ্যেই পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে সক্ষম"।

তবে ইরান বারবার বলেছে, তারা কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায়নি এবং তাদের পারমাণবিক কার্যক্রম সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত।

এই হামলা শুরু হয় এমন সময়, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে এপ্রিলে শুরু হওয়া আলোচনা স্থবির হয়ে পড়ে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চেয়েছিলেন তেহরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখতে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে, কিন্তু সম্প্রতি সংঘাত বেড়ে যাওয়ায় সর্বশেষ আলোচনাপর্ব বাতিল করা হয়।

গত বছর, এপ্রিল ও অক্টোবরে ইরান ও ইসরায়েল পরস্পরের বিরুদ্ধে একাধিক বিমান হামলা চালিয়েছিল—যদিও তখন ইসরায়েলের হামলা এখনকার অভিযানের মতো ব্যাপক ছিল না বলে ধারণা করা হয়।

ইরানের মূল পারমাণবিক স্থাপনাগুলো যেসব অঞ্চলে রয়েছে
ছবির ক্যাপশান, ইরানের মূল পারমাণবিক স্থাপনাগুলো যেসব অঞ্চলে রয়েছে

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি কী?

ইরান বহুদিন ধরেই দাবি করে আসছে যে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। দেশটিতে বেশ কয়েকটি পারমাণবিক স্থাপনা রয়েছে, যেগুলোর কয়েকটি ইসরায়েলি হামলার শিকার হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে অনেক দেশ এবং বিশ্ব পরমাণু পর্যবেক্ষক সংস্থা আইএইএ ইরানের এই দাবিকে পুরোপুরি বিশ্বাস করছে না। তাদের সন্দেহ, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি শুধু বেসামরিক নয়, বরং এর সামরিক দিকও রয়েছে।

চলতি জুনের শুরুতে আইএইএ-এর গভর্নর বোর্ড ২০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে যে ইরান তার পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করেছে।

তারা উল্লেখ করেছে, ইরান "অঘোষিত পারমাণবিক পদার্থ ও কার্যক্রম সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দিতে বারবার ব্যর্থ হয়েছে" এবং তাদের কাছে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বড় মজুত রয়েছে।

আইএইএ-এর একটি আগের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান ৬০ শতাংশ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ হয়েছে—যা অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় স্তরের কাছাকাছি—এতে করে তারা সম্ভবত ৯টি পারমাণবিক বোমা তৈরির উপকরণ সংগ্রহ করতে সক্ষম।