'ফ্লাইট এক্সপার্ট' বন্ধ: বিমানের লাখ লাখ টাকার টিকিট কিনে 'বিপাকে' ক্রেতারা

ছবির উৎস, BSS
- Author, মরিয়ম সুলতানা
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
যেসব গ্রাহক নিজেরাই 'ফ্লাইট এক্সপার্ট' থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে বিমানের টিকিট কেটেছেন তারা এখন দুশ্চিন্তায়। এছাড়া এই প্ল্যাটফর্ম থেকে অগ্রিম টিকিট কিনে রেখেছিলেন যে ট্রাভেল এজেন্টটা তারা বলছেন, তাদের সেসব টিকিটের ভবিষ্যৎও এখন অজানা।
২০১৭ সালের মার্চে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করা বিমানের টিকেট বুকিংয়ের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম 'ফ্লাইট এক্সপার্ট' বন্ধ হয়ে গেছে সম্প্রতি।
বিভিন্ন এয়ারলাইনসের টিকিট বুকিং, হোটেল রিজার্ভেশন, ট্যুর প্যাকেজের মতো নানা সেবা দিত ফ্লাইট এক্সপার্ট।
বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ফ্লাইট এক্সপার্ট লিমিটেডের মালিক মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এর সুবিধাভোগী, মালিক ও ব্যবস্থাপনায় যুক্তদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা চেয়ে রিট করা হয়েছে।
এই ঘটনার পরই হতাশার কথা জানিয়েছেন গ্রাহকরা, যাদের মধ্যে আছে টিকিট বিক্রেতা এজেন্সিগুলোও।
সম্প্রতি এই অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি বা ওটিএ থেকে ২২ লাখ টাকার টিকেট কাটার তথ্য জানিয়েছে ট্রাভেল এজেন্ট ট্রিপ্লয়।
ট্রিপ্লয়কে 'খুবই ছোট এজেন্ট' হিসেবে পরিচয় দিয়ে এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তৌফিক মাহবুব বর্ষণ বিবিসিকে বলেছেন, "কাস্টমারকে আমি কী বোঝাবো? কাস্টমার তো বলবে যে আমি ফ্লাইট এক্সপার্ট চিনি না; আমি চিনি আপনাকে; আমি আপনার থেকে টিকেট নিছি।"
তিনি জানান, ট্রিপ্লয়-এর মতো এমন আরও অনেক ট্রাভেল এজেন্ট বর্তমানে একই রকম অনিশ্চয়তার মাঝে রয়েছে। কারণ এদের কোনো কোনোটি কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে 'ফ্লাইট এক্সপার্ট' থেকে অগ্রিম টিকেট কিনে রেখেছিল এবং সেই টিকেটের ভবিষ্যৎ এখন তাদের কাছে অজানা।
এজেন্সিগুলো বলছে, যেসব গ্রাহক এজেন্টের কাছ থেকে টিকেট কেটেছে, দিনশেষে তারা তাদের টিকেট ঠিকই পাবে। কিন্তু এজেন্টরা ওই টিকেট পাবে কিনা, তা অনিশ্চিত।

ছবির উৎস, BIMAN BANGLADESH AIRLINES
হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ করে মালিক পলাতক
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
অনলাইন ট্রাভেল এজেন্ট (ওটিএ) 'ফ্লাইট এক্সপার্ট' নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত গত শনিবার।
ওইদিন দুপুরে হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায় 'ফ্লাইট এক্সপার্ট'-এর ওয়েবসাইট। তার আগে ফ্লাইট এক্সপার্টের অভ্যন্তরীণ হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সালমান বিন রশিদ মেসেজ দিয়ে জানান, নিজেকে রক্ষা করতে তিনি প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দিচ্ছেন এবং দেশ ছাড়ছেন।
মেসেজ দিয়ে মালিকের পালিয়ে যাওয়ার কথা ফ্লাইট এক্সপার্টের কর্মীরাই গণমাধ্যমে জানান।
সালমান বিন রশিদের ওই মেসেজে দাবি করেছেন, ফ্লাইট এক্সপার্টের দুই কর্মকর্তা তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এবং তাকে বিপদে ফেলেছে।
এদিকে এই ঘটনার বিষয়ে জানতে ফ্লাইট এক্সপার্টের সাথে বিবিসি সরাসরি যোগাযোগের চেষ্টা করলেও মুঠোফোন বন্ধ থাকায় শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি।
এদিকে, এই ঘটনায় শনিবার রাতেই মতিঝিল থানায় একটি মামলা হয়। সরকার ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের মালিক বিপুল সরকারের করা ওই মামলায় তিনজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
মামলার অগ্রগতি জানতে মঙ্গলবার মতিঝিল থানায় যোগাযোগ করা হলে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মেজবাহ উদ্দিন বিবিসিকে বলেন, ওই তিনজনের জামিন বাতিল হয়েছে এবং তারা এখন কারাগারে আছেন। আর এই মামলার মূল অভিযুক্তরা পলাতক।
এদিকে, 'ফ্লাইট এক্সপার্ট লিমিটেড' – এর পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডারদের সব আর্থিক হিসাব জব্দের নির্দেশনা চেয়ে রিট হয়েছে। আদালতের অনুমতি ছাড়া ফ্লাইট এক্সপার্ট লিমিটেডের সব পরিচালক, সুবিধাভোগী মালিক ও ব্যবস্থাপনায় যুক্তদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞাও চাওয়া হয়েছে রিটে।
গত সোমবার রিটটি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী পাভেল মিয়া।
এদিকে, ফ্লাইট এক্সপার্টের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিবিসিকে বলেন, ঘটনার দিনও তারা অফিসে ছিলেন। ওইদিন দুপুরে এমডি হোয়াটসঅ্যাপে ওই মেসেজ দেওয়ার পর তারা ঘটনা জানতে পারেন বলেও তিনি দাবি করেন।
"আমরা কোনোকিছু আলাপ পাই নাই। সবকিছু স্মুদলি ছিল। ঘটনার দিনও এজেন্সিরা টাকা ডিপোজিট করছে। সেদিনও টিকেট ইস্যু হয়েছে। অকারেন্স হওয়ার আগে বিভিন্ন আলামত পাওয়া যায়। আমরা সেরকম কিছু পাই নাই," বলেন তিনি।
এরপর তিনি আরও বলেন যে এই পরিস্থিতিতে গ্রাহক কিংবা এজেন্টদের মতো তারা নিজেরাও দুশ্চিন্তায় আছেন।
"আমরা বেতনভুক্ত কর্মচারী। আমার ছোট ছয় বছরের মেয়ে। আমার মা ঘরে অসুস্থ। আমার বাবা নাই। এই বেতনে আমার সংসার চলতো। সমস্ত কিছু নিয়ে উনারা চলে গেছে, আমরা আমাদের পেমেন্টও পাই নাই। আমাদের ক্যারিয়ারটা পুরা ধ্বংস করে দিছে। আমরা এখন কোথাও চাকরিও পাবো না।"

ছবির উৎস, Getty Images
কত টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ?
দেশি-বিদেশি বিভিন্ন এয়ারলাইনসের টিকিট বুকিং, হোটেল রিজার্ভেশন, ট্যুর প্যাকেজ ও ভিসা প্রক্রিয়াকরণের মতো বিভিন্ন সেবা দিত ফ্লাইট এক্সপার্ট।
তবে অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের জনপ্রিয়তার প্রধান কারণ ছিল কম খরচে বিমান টিকিট বুকিংয়ের সুবিধা।
গত শনিবার রাতে ১৭টি ট্রাভেল এজেন্টের পক্ষ থেকে পাঁচ জনকে আসামি করে মতিঝিল থানায় যে মামলাটি করা হয়, তার এজাহারে বলা হয়েছে যে 'ফ্লাইট এক্সপার্ট'-এর এমডি সালমান বিন রশিদ শাহ সায়েম ও তার বাবা মক্কা গ্রুপের চেয়ারম্যান এম এ রশিদ শাহ সম্রাট "পাঁচ থেকে ছয় হাজার কোটি টাকা প্রতারণামূলকভাবে আত্মসাৎ করে বিদেশ পালিয়েছে।"
তবে এজাহারে বলা হয়েছে, শুধু ওই ১৭টি কোম্পানির চার কোটি ৭৯ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছে ফ্লাইট এক্সপার্ট, যার মাঝে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলো ইউনিয়ন ট্রাভেলস।
মামলার বাদী বিপুল সরকার যদিও বিবিসিকে বলেছেন, সেদিন রাতে যারা উপস্থিত ছিলেন, তাদেরকে নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে হিসাব দিয়ে ওই মামলাটি করা হয়েছিলো।
"বাস্তবে ওরা কয়েক হাজার কোটি টাকা নিয়ে পালিয়েছে," বলছিলেন তিনি।
এদিকে, এজাহারে আরও বলা হয়, 'ফ্লাইট এক্সপার্ট' নিজেদের আয়াটা (ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন - আইএটিএ) অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের পাশাপাশি অন্যদের আয়াটা অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেও টিকিট বিক্রি করতো।
উদাহরণ হিসাবে 'হাজী ইয়ার ট্রাভেলস লিমিটেড, সোমা ইন্টারন্যাশনাল সার্ভিস, প্রোমা' – এই তিন মধ্যস্থতাকারী এজেন্সির কথা উল্লেখ করা হয় সেখানে।
অর্থাৎ, ফ্লাইট এক্সপার্ট নিজেরা সরাসরি উড়োজাহাজ পরিচালনাকারী সংস্থাগুলোর কাছ থেকে টিকিট না নিয়ে ওই মধ্যস্থতাকারী এজেন্সিগুলোর মাধ্যমেও টিকিট সংগ্রহ করতো।
একাধিক ট্রাভেল এজেন্ট বিবিসিকে সরাসরি বলেছে, মধ্যস্থতাকারী এজেন্সিগুলো এখন এজেন্টদের কেনা টিকিটগুলো রিফান্ড (ফেরত) করে অর্থ তুলে নিচ্ছে।

ছবির উৎস, BBC BANGLA
দিশেহারা শত শত এজেন্ট, গ্রাহক
মধ্যস্থতাকারী এজেন্সিগুলো টিকেট রিফান্ড করায় এখন বিপাকে শত শত এজেন্ট।
এদিকে, 'ফ্লাইট এক্সপার্ট' যেমন এজেন্সির (বিটুবি) কাছে টিকেট বিক্রি করতো, তারা একইভাবে সরাসরি গ্রাহকের (বিটুসি) কাছেও টিকেট বিক্রি করতো।
এজেন্সিগুলো বলছে, যেসব গ্রাহক এজেন্টের কাছ থেকে টিকেট কেটেছে তারা টিকিট পেলেও এজেন্টরা পাবে কি না তা অনিশ্চিত।
ট্রিপ্লয়-এর সিইও তৌফিক মাহবুব বর্ষণ বলছিলেন, এই ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেন এজেন্টগুলো। কারণ যেসব গ্রাহক অগ্রিম টিকেট কিনেছেন, তারা এজেন্টদের চেনেন।
তার মতে, যা ঘটেছে এটি একটি জাতীয় ইস্যু হলেও দিনশেষে গ্রাহকরা তা বুঝবে না।
নিজেদের অন্যদের তুলনায় খুবই ছোট এজেন্ট উল্লেখ করে তিনি বলেন যে তাদের টিকেট সংখ্যা ছিল ১৪টি। কিন্তু বড় রুটের হওয়ায় একেকটি টিকেটের দাম অনেক বেশি ছিল।
ফ্লাইট এক্সপার্ট থেকে কেনা ওই টিকেটগুলোর দাম পড়েছিলো ২২ লাখ টাকা এবং এর মধ্য থেকে "ছয় লক্ষ টাকার টিকেট ইতোমধ্যে শো করছে না, দেখাচ্ছে যে এগুলো রিফান্ড হয়ে গেছে"।
মঙ্গলবার দুপুরে এই উদ্যোক্তা বিবিসি বাংলাকে বলেন, "বাকি যে টিকিটগুলো আছে, সেগুলো কিন্তু কতক্ষণ শো করবে, তা এখন চিন্তার বিষয়।"
তিনি আশাহত কণ্ঠে আরও বলেন, "আমার নিজের স্ত্রী, ছেলের মাদ্রিদের টিকেট করা ছিল। সেটিও ইতোমধ্যে উইথড্র করে ফেলছে ওরা। এখন পর্যন্ত ছয় লক্ষ টাকা ড্যামেজ হয়ে গেছে। রিফান্ড করে ফেলেছে...আল্টিমেটলি এই টাকাটা চলেই যাবে। বাসা থেকে টাকা দিয়ে পোষাতে হবে। কাস্টমাররা এই ক্ষতি বহন না করলে আমরা তো তাদেরকে জোর করতে পারবো না।"
এই ঘটনা সামনে আসার পর থেকে গত শনিবার সন্ধ্যায়ই অনেক এজেন্ট মতিঝিলে ফ্লাইট এক্সপার্টের কার্যালয়ে গিয়ে জড়ো হন এবং হতাশা-ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
সেদিন মতিঝিল থানায় দায়ের করা মামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে দেখানো হয় ইউনিয়ন ট্রাভেলসকে। প্রাথমিকভাবে ২৫ লক্ষ টাকা ক্ষতির শিকার ইউনিয়ন ট্রাভেলসের মালিক মি. মোহাম্মদ তখন গণমাধ্যমে বলেন, এই ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে জমি-ফ্ল্যাট বিক্রি করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
এদিকে, এ বিষয়ে ট্রাভেল ব্যবসায়ী বিপুল সরকারও বিবিসিকে বলছিলেন, "যারা এক মাস বা তিন মাস পর যাবে, তাদের টিকেট ট্রাভেল এক্সপার্ট থেকে কিনে রেখেছিলো অনেক এজেন্ট।"
"কিছু টাকা পোর্টালে আপলোড করা ছিল। কিন্তু এখন আর সেটি কাজ করছে না, তাই টাকাটা তোলার সুযোগ নাই। ওই টাকা পুরোটাই লস হলো, কিছু টিকেট রিফান্ড হচ্ছে।"
"রিফান্ড হলে আমার পেসেঞ্জার এয়ারপোর্টে গিয়ে টিকেট পাবে না এবং তখন সে আমায় চাপ দিবে। তখন আমাদের ক্লায়েন্টদেরকে নতুন টিকেট দিতে হবে," বলছিলেন তিনি।
তবে বিটুবি'র সংখ্যা নিয়ে একটি প্রাথমিক ধারণা পাওয়া গেলেও বিটুসি'র সংখ্যা কত, তা জানতে পারেনি বিবিসি বাংলা এবং তাদের সাথে আলাদাভাবে কথাও বলতে পারেনি বিবিসি বাংলা। কিন্তু তাদের অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।
যেমন, রাফসান খান নামক একজন তার বন্ধুর প্রতারিত হওয়ার কথা জানিয়ে লেখেন, তার বন্ধু ফ্লাইট এক্সপার্ট থেকে টিকিট কেটেছিলো। কিন্তু "এখন আর এয়ারলাইন্সে শো করছে না।"
এ বিষয়ে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বিবিসিকে বলেন, "এজেন্টরা যেমন জানতেন না যে টিকেট সরাসরি ফ্লাইট এক্সপার্ট কিনছে নাকি থার্ড পার্টি থেকে সাব-এজেন্ট হিসেবে টিকিট নিচ্ছে... একইভাবে, সাধারণ গ্রাহকরাও জানতেন না যে ফ্লাইট এক্সপার্ট তাকে কার কাছ থেকে টিকেট নিয়ে দিচ্ছে।"
অর্থাৎ, গ্রাহক ও এজেন্ট, দু'পক্ষই এখন একই বিপদে। কারণ "এজেন্ট ও গ্রাহকরা দেখছে, তারা ফ্লাইট এক্সপার্ট থেকে কিনছে। কিন্তু আসল সোর্স হয়তো অন্য কোনো এজেন্সি" বলছিলেন তিনি।

ছবির উৎস, bss
ফ্লাইট এক্সপার্ট থেকে টিকেট কেনার কারণ
ট্রাভেল এজেন্টদের দাবি, তারা একপ্রকার বাধ্য হয়ে ফ্লাইট এক্সপার্ট থেকে টিকেট কিনতো।
তাদের বক্তব্য, ফ্লাইট এক্সপার্ট তিন হাজার হাজার টাকা কমে টিকেট বিক্রি করতো। গ্রাহকরা স্ক্রিনশট দিয়ে বলতো যে ফ্লাইট এক্সপার্ট কম দামে টিকেট দিচ্ছে। পরিস্থিতির চাপে পড়ে মার্কেটে টিকে থাকার জন্য তারা তখন বাধ্য হয়ে ফ্লাইট এক্সপার্টের থেকে টিকেট কিনতো।
ট্রিপ্লয়-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তৌফিক মাহবুব বর্ষণ বলছিলেন, "একটা টিকেটে মূলত সাত শতাংশের মতো মার্জিন থাকে। সাপোজ, একটি টিকেটের গ্রস ফেয়ার দেখাচ্ছে এক লাখ টাকা। কিন্তু পেমেন্ট হয়তোবা ৯৩ হাজার টাকা। কাস্টমারকে হয়তো এক-দুই হাজার টাকা লাভে সেটা ছেড়ে দিতে পারি, বা ৯৮ হাজার টাকায় দিতে পারি।"
"কিন্তু কাস্টমার আমাদেরকে তখন বিভিন্ন পোর্টালের উদাহরণ দেয়, বলে যে ফ্লাইট এক্সপার্টে টিকেট দেখাচ্ছে ৯০ হাজার টাকা। ওইসময় আমাদেরকেও ফ্লাইট এক্সপার্টের থেকে নিয়ে ৯০ হাজার টাকা দিয়ে টিকেট বিক্রি করতে হতো," যোগ করেন তিনি।
তবে বিপুল সরকার বলেন, এখানে টিকেটে ছাড়ের বিষয়টি মূখ্য ছিল না শুধু।
"ওরা যে পোর্টাল ইউজ করতো, তা ছিল সবচেয়ে সহজ। বিশ্বস্ততার ব্যাপার থাকে একটা। তাদের মার্কেটিং, সার্ভিসও ভালো ছিল। ট্রাভেল এজেন্সি যেসব সুবিধা চায়, তার সবই ওদের ছিল।"
এদিকে, ফ্লাইট এক্সপার্টের উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনায় শেয়ারট্রিপ কিংবা গো জায়ানের মতো ওটিএ-গুলোর ওপর ভরসা রাখা যায় কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে।
তবে শেয়ার ট্রিপের সহ-প্রতিষ্ঠাতা কাশেফ রহমান এই প্রসঙ্গে বিবিসিকে বলেন, "অনলাইন বলেন, অফলাইন বলেন, প্রত্যেকটা ইন্ডাস্ট্রিতেই এরকম স্ক্যাম হয়। আমাদের সাথে তাদের (শেয়ার ট্রিপের) সরাসরি কোনো যোগসূত্র নাই। শেয়ারট্রিপ সরকার ও প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নে পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠান। ফলে আমাদের যে ব্র্যান্ড ভ্যালু ও গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে, আমি নিশ্চিত যে সেখানে কোনও প্রভাব পড়বে না।''
পর্যটকদের অনলাইনভিত্তিক নানা রকম সেবাদানকারী আরেক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম গো জায়ান এর পাবলিক রিলেশনস বিভাগের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ জারিন সাদাফ বর্ণ বলেন, "যা ঘটেছে, তা আসলে অপ্রত্যাশিত। এই ঘটনায় অনেক কাস্টমার, ভেন্ডর, এমপ্লয়ি অ্যাফেক্টেড হয়েছে। আর এই পরিস্থিতিতে কাস্টমারদের মনে হওয়াটা স্বাভাবিক যে ফ্লাইট এক্সপার্টের মতো বাকিরাও হয়তো একই কাজ করছে।"
"কিন্তু আমরা একই খাতে কাজ করলেও ফ্লাইট এক্সপার্ট ও আমাদের মডালিটিটা একেবারেই আলাদা। গো জায়ান সম্পূর্ণভাবে বিটুসি কাজ করে। অর্থাৎ, আমরা থার্ড পার্টির সাথে কাজ করি না। আমরা এজেন্টদের সাথে কাজ করি না। আমরা ডিরেক্ট কাস্টমারদের সাথে কাজ করি।"
এদিকে, এই ঘটনায় গত রোববার সন্ধ্যায় ফ্লাইট এক্সপার্টের সদস্যপদ বাতিল করেছে অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (আটাব)।
তবে অতিরিক্ত ছাড়ে টিকিট বিক্রি ও গ্রাহকের অর্থ আত্মসাৎ করে পালিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা এর আগে হালট্রিপ, ২৪টিকিট ডটকম ও লেট'স ফ্লাইসহ অন্যান্য ওটিএ'র ক্ষেত্রে হয়েছে। কিন্তু তবুও সরকার থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানান কাজী ওয়াহিদুল আলম।
এই ধরনের ঘটনাগুলো ঘটার ক্ষেত্রে তিনি ব্যাংকগুলোকেও একইভাবে দায়ী করেন।
"এই ওটিএ-গুলোকে প্রমোট করছে ব্যাংকগুলো। এরা ফ্লাইট এক্সপার্টের মতো কোম্পানির সাথে যোগসাজশ করছে, বলছে যে কার্ডে টিকেট কিনলে ২০ শতাংশ ছাড় পাবে। এই ২০ শতাংশ ছাড় কীভাবে পাবে, তা ব্যাংক যাচাই করছে না," যোগ করেন তিনি।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালে ফ্লাইট এক্সপার্টকে অধিগ্রহণ করেছিলো ই-কমার্স খাতের প্রতিষ্ঠান ই–ভ্যালি। সেই থেকে এটি ই–ভ্যালির একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবসা পরিচালনা করছে।
ই–ভ্যালি নিজেও নানা প্রকার মূল্যছাড়ের মাধ্যমে গ্রাহকের কাছ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা তুলে নেয়, কিন্তু সময়মতো পণ্য সরবরাহ করে না বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একেবারেই কোনো পণ্য না দিয়ে প্রতারণায় জড়িয়ে পড়ে তারা যা পরে তা আর্থিক কেলেঙ্কারিতে রূপ নেয়।








