মালয়েশিয়া: অবশেষে প্রধানমন্ত্রী হলেন আলোচিত রাজনীতিক আনোয়ার ইব্রাহিম

আনোয়ার ইব্রাহীম

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, রাজনৈতিক জীবনের ২৫ বছরের মাথায় তার স্বপ্ন পূরণ হলো।

আনোয়ার ইব্রাহিম মালয়েশিয়ার নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন।

এর ফলে শনিবারের জাতীয় নির্বাচনের পর দেশটিতে যে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল তার অবসান ঘটেছে।

মালয়েশিয়ার রাজা সুলতান আব্দুল্লাহ জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের জন্য কয়েকদিনের আলোচনা শেষে দেশটির বিরোধী নেতা আনোয়ার ইব্রাহিমকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করেন।

মি. আনোয়ার প্রায় সিকি-শতাব্দী ধরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য রাজনীতি করে আসছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত তার সেই স্বপ্ন সফল হয়েছে।

তার এই রাজনৈতিক জীবনে তাকে দু’বার কারাবরণ করতে হয়েছে।

সমকামিতার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়ে তিনি মোট ন’বছর কারাগারে কাটিয়েছেন।

এই অভিযোগ তিনি সবসময় অস্বীকার করে বলেছেন, এসবই ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য-প্রণোদিত।

আরো পড়ুন:

রাজার হস্তক্ষেপ কেন

 শনিবারের জাতীয় নির্বাচনে কোনো দল বা জোট সরকার গঠনের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। ফলে দেশটিতে নজিরবিহীন ঝুলন্ত পার্লামেন্ট তৈরি হয়।

সরকার গঠনের জন্য মি. আনোয়ার অথবা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মুহিইদ্দিন ইয়াসিন তাদের কেউই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেন নি।

রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতে সরকার গঠনের জন্য সমঝোতায় পৌঁছাতেও ব্যর্থ হয়।

পরে রাজার পক্ষ থেকে বলা হয় যে তিনি নিজেই দেশটির পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী নির্ধারণ করবেন এবং সবাই যাতে তাকে মেনে নেন।

বার্তা সংস্থা এএফপি বলছে রাজপ্রাসাদ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “মালয়েশিয়ার সুলতানদের সাথে পরামর্শ শেষে রাজা সুলতান আব্দুল্লাহ আনোয়ার ইব্রাহিমকে দেশটির ১০ম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ব্যাপারে তার সম্মতি দিয়েছেন।”

মি. আনোয়ারের পাকাতান হারাপান পার্টি পার্লামেন্ট নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসনে জয়ী হলেও সরকার গঠনের জন্য যথেষ্ট ছিল না।

এখন তিনি কোন কোন দলকে নিয়ে জোট সরকার গঠন করবেন সেটা এখনও পরিষ্কার নয়।

আনোয়ার ইবাহিম

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, রাজনৈতিক জীবনে তিনি দু'বার কারাবরণ করেছেন।

এর আগে সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পাঁচদিন ধরে ব্যাপক আলাপ আলোচনা হয়। এতে সরকার গঠনের ব্যাপারে বিভিন্ন ধরনের সমীকরণ নিয়ে আলোচনা হয়। তবে সেগুলো সবই প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।

রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ব্যক্তিগত ও আদর্শগত বিরোধের কারণে কোনো ধরনের সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

একারণে বিষয়টি শেষ পর্যন্ত মালয়েশিয়ার সাংবিধানিক প্রধান রাজা সুলতান আব্দুল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়।

রাজা সুলতান আবদুল্লাহ রাজনৈতিক নেতাদের প্রাসাদে ডেকে এনে তাদের সংগে এই অচলাবস্থা নিরসনের জন্য আলোচনা করেন।

এটা এখনও পরিষ্কার নয় যে নতুন সরকারের গঠন কী হবে, বিভিন্ন দলকে নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো জোট সরকার গঠিত হবে, অন্যান্য দলের সমর্থন নিয়ে সংখ্যালঘু সরকার হবে, নাকি প্রধান প্রধান দলগুলোকে নিয়ে একটি জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠিত হবে।

রাজনৈতিক জীবন

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মধ্য দিয়ে মালয়েশিয়ার বাগ্মী রাজনীতিক আনোয়ার ইব্রাহিমের রাজনৈতিক জীবনের একটি বড় লক্ষ্য অর্জিত হলো।

খুব দ্রুতই তিনি দেশটিতে রাজনৈতিক তারকায় পরিণত হন। অনেকেই আশা করেছিলেন যে তিনি হয়তো তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের স্থলাভিষিক্ত হবেন।

কিন্তু সেরকম ঘটেনি। অর্থনৈতিক সঙ্কটকে ঘিরে মি. ইব্রাহিম ও মি. মাহাথিরের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। দুর্নীতি ও সমকামিতার অভিযোগে মি. ইব্রাহিমকে কারাদণ্ডও দেওয়া হয়।

তার সেই সাজা ২০০৪ সালে বাতিল করে দেওয়া হলে তিনি পুনরায় রাজনীতিতে ফিরে আসেন।

তিনি সংস্কারবাদী পাকাতান হারাপান পার্টির নেতৃত্ব দেন। ২০১৩ সালের নির্বাচনে তার দল ইউএমএনও পার্টিকে প্রায় পরাজিত হওয়ার মুখে ঠেলে দিয়েছিল। কিন্তু তখন তার বিরুদ্ধে আবারও সমকামিতার অভিযোগ আনা হয় এবং ২০১৫ সালে তাকে পুনরায় কারাগারে প্রেরণ করা হয়।

বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর:
আনোয়ার ইবাহিম

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আনোয়ার ইব্রাহিমের সামনে এখন কঠিন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।

কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের বিরুদ্ধে বিরোধিতা তীব্র হলে মাহাথির মোহাম্মদ তার অবসর জীবন থেকে রাজনীতিতে ফিরে আসেন এবং আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে সমঝোতা করেন।

তারা দুজনে একত্রিত হয়ে ২০১৮ সালের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলকে নির্বাচনে পরাজিত করেন।

তার জের ধরে রাজা তাকে ক্ষমা করে দেন।

তাদের দুজনের মধ্যে সমঝোতার অংশ হিসেবে বলা হয় যে মি. মাহাথির মি. আনোয়ারের কাছে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দেবেন। কিন্তু ২০২০ সালেও প্রধানমন্ত্রীর পদ তার হাতছাড়া হয়ে যায়।

এখন তিনি তার গন্তব্যে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছেন। তবে তার সামনে এখন অর্থনৈতিক সঙ্কট ও কোভিড মহামারির মতো অনেক কঠিন চ্যালেঞ্জ।

রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাথে নিয়ে তাকে এখন এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে।