পশ্চিমবঙ্গে সালিশে ডেকে মারধরের অভিযোগ, নারীর আত্মহত্যা

ছবির উৎস, Getty Images
পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলায় গ্রামীণ সালিশি সভায় ডেকে মারধর করার জেরে আত্মঘাতী হয়েছেন এক নারী। ওই নারীর স্বামী অভিযোগ দায়ের করেছেন পুলিশের কাছে। দুদিন আগে একই রাজ্যের উত্তর দিনাজপুর জেলায় এরকমই এক সালিশি সভায় এক যুবক-যুবতীকে লাঠি দিয়ে ব্যাপক মারধরের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ওই ঘটনায় স্থানীয় এক তৃণমূল কংগ্রেস সদস্য গ্রেফতার হয়েছেন।
উত্তর দিনাজপুরের ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক বিবৃতি-পাল্টা বিবৃতির মধ্যেই সামনে এসেছে জলপাইগুড়ির ঘটনা। সেখানেও স্থানীয় তৃণমূল কংগ্রেস সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ জানিয়েছে এই ঘটনায় চার জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। স্থানীয় সূত্রগুলি বলছে আটককৃতদের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের এক নেত্রীও আছেন।
তৃণমূল কংগ্রেস বলছে তাদের স্থানীয় সদস্য বা নেতা নেত্রীরা ঘটনাগুলোতে জড়িত থাকলেও তাদের নেতৃত্ব বা প্রশাসনিক শীর্ষ কর্মকর্তারা কখনই এসব ঘটনাকে সমর্থন করে না।
অন্যদিকে বিজেপি বলছে এক ‘মধ্যযুগীয় বর্বরতা’র দিকে এগোচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ।

ছবির উৎস, ANI
বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক
সালিশি সভা বসিয়ে মারধর করার দুটি সাম্প্রতিক ঘটনাতেই ‘বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে’র বিষয় জড়িয়ে আছে বলে জানা যাচ্ছে।
ভারতে সালিশি সভা বসিয়ে তাৎক্ষণিক বিচার এবং শাস্তি নির্ধারণের কোনও আইনি স্বীকৃতি নেই, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গসহ বহু রাজ্যেই স্থানীয় স্তরে সালিশি সভা বসানো হয় নিয়মিত।
বিশ্লেষকরা বলছেন পশ্চিমবঙ্গে এ ধরনের সালিশি সভায় স্থানীয় রাজনীতি জড়িয়ে থাকে বহু কাল ধরেই, তবে অন্যান্য রাজ্যগুলোতে সালিশি সভায় জাতপাত, খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদি বিষয়গুলোই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিচার্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
শিলিগুড়ি শহরের কাছে জলপাইগুড়ির ফুলবাড়ি এলাকার ঘটনাটি গত শুক্রবারের। পুলিশের কাছে দায়ের করা অভিযোগে আত্মঘাতী নারীর স্বামী জানিয়েছেন যে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের কারণে তার স্ত্রী বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, “আমার স্ত্রী এক যুবকের সঙ্গে চলে গিয়েছিল। আট দিন পরে স্ত্রী আমাকে ফোন করে। আমাকে জানায়, বাড়ি ফিরে আসতে চায়। এরপর আমি নিয়ে আসি। এলাকায় একটি সালিশি সভা বসেছিল। কয়েকজন মহিলা ছিলেন সেখানে।’’
তার অভিযোগ, ‘‘সেখানেই আমার স্ত্রীকে এবং মারধর করা হয়। এর পরেই অপমানে আত্মঘাতী হয় স্ত্রী।’’
পুলিশ বলছে এই অভিযোগ আসার পরে তারা এক নারীসহ মোট চারজনকে গ্রেফতার করেছে।

ছবির উৎস, Screebgrab/X-Md. Selim
ভাইরাল ভিডিও
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
জলপাইগুড়ি জেলার ঘটনাটি শুক্রবারের হলেও মঙ্গলবার বিষয়টি জানা যায় এমন একটা সময়ে, যখন গত রবিবার উত্তর দিনাজপুরের চোপড়া এলাকায় মারধরের ভিডিওটি ভাইরাল হয়ে গেছে।
ওই ভিডিওটিতে দেখা গেছে এক যুবক ও যুবতীকে রাস্তায় ফেলে লাঠি দিয়ে ব্যাপক মারছেন এক ব্যক্তি। তাদের দুজনেই মারের চোটে ব্যথায় কাতরাচ্ছিলেন, রেহাই দেওয়ার আর্জি জানাচ্ছিলেন, তবুও মার থামেনি।
এদের দুজনকে যখন রাস্তায় ফেলে লাঠি দিয়ে মারা হচ্ছে, তখন তাদের ঘিরে অনেক মানুষকে দাঁড়িয়েও থাকতে দেখা গেছে।
পরে জানা যায় যিনি মারধর করছিলেন, তার নাম তাজিমুল ইসলাম। বড়সড় চেহারার জন্য মাটি কাটার যন্ত্রের জন্য পরিচিত সংস্থা ‘জেসিবি’ বলে স্থানীয়ভাবে ডাকা হয় তাকে। পুলিশ জানিয়েছে এর আগেও একাধিক মামলা রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
পালা করে ওই যুবক এবং যুবতীকে লাঠি দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ মারার পরে ভিড়ের মধ্যে থেকে কয়েকজন নারী-পুরুষ এগিয়ে এসে মি. ইসলামের হাত থেকে লাঠিটা সরিয়ে নেন। তখন তিনি ওই যুবতীর চুলের মুঠি ধরে তুলে লাথি মারতে থাকেন।
ইসলামপুরের পুলিশ সুপার জবি থমাস সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে জানিয়েছেন যে সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি দেখেই তারা মামলা রুজু করেন রবিবার। সেদিনই গ্রেফতার করা হয় অভিযুক্ত মি. ইসলামকে।
তিনি আবার চোপড়ার তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক হামিদুর রহমানের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। মি. রহমান বলেছেন যে ওই যুবক-যুবতী দুজনেই বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিলেন।
ওই সম্পর্ক স্থানীয় মানুষ মেনে নিতে পারেনি বলেই নাকি সালিশি সভা ডাকা হয়েছিল, এমনটাও সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন মি. রহমান।

ছবির উৎস, Getty Images
রাজনৈতিক দোষারোপ
দুই জেলার দুটি সালিশি সভার সঙ্গে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের যোগ সামনে আসায় বিরোধী দলগুলি নিশানা করেছে তৃণমূল কংগ্রেসকে।
বিজেপি বলছে পশ্চিমবঙ্গ এক মধ্যযুগীয় ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। দলটির নেতা অধ্যাপক বিমল শঙ্কর নন্দের কথায়, “সব ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেসের স্থানীয় নেতৃত্ব জড়িয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতাসীনরা নিজেদের হাতে ক্ষমতা তুলে নিচ্ছে। তাদের হাতে ক্ষমতা আছে বলে তারা পার পেয়ে যাচ্ছে।”
“গুজব ছড়িয়ে দিয়ে গণপ্রহারের মতো ঘটনা পুলিশ একটু সতর্ক হলেই আটকাতে পারে। কিন্তু যেখানে সালিশি সভা ডেকে এ ধরনের ঘটনা ঘটানো হচ্ছে, তা কী করে আটকাবে তারা? পুলিশ প্রশাসন থেকে শুরু করে সব কিছুই তো এরাজ্যে ক্ষমতাসীন দলের নিয়ন্ত্রণে,” বলছিলেন অধ্যাপক নন্দ।
যাদের বিরুদ্ধে সালিশি সভা বসিয়ে মারধরের ঘটনা সামনে এসেছে, তারা তৃণমূল কংগ্রেসের স্থানীয় নেতা-কর্মী হলেও দল তাদের সমর্থনে পাশে দাঁড়ায়নি।
দলটির মুখপাত্র অরূপ চক্রবর্তী বলছিলেন, “প্রথম থেকেই আমরা এই ঘটনাগুলোর তীব্র নিন্দা করেছি। ঘটনাচক্রে রাজ্যের বেশিরভাগ জায়গাতেই যেহেতু আমাদের দলই স্থানীয় স্তরের ক্ষমতায় আছে, তাই অভিযোগও আমাদের দলের স্থানীয় কিছু নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে উঠছে। এটা একটা সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে।”
“দল আর প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তর থেকে বলা হয়েছে কোনও রাজনৈতিক রং না দেখে অপরাধীদের বিচার করা হবে। আশা করি কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে,” বলছিলেন মি. চক্রবর্তী।
এই ঘটনার বিস্তারিত রিপোর্ট চেয়ে পাঠিয়েছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। মঙ্গলবার চোপড়ায় গেছেন রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোস।

ছবির উৎস, Getty Images
সালিশি সভার প্রথা চলছেই
পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই সালিশি সভা বসিয়ে স্থানীয় স্তরের বিবাদ মেটানো হয়ে থাকে, যদিও এর কোনও আইনি বৈধতা নেই।
বামফ্রন্টের আমলের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত দেখা যেত যে সিপিআইএমের লোকাল কমিটিগুলোর দফতর বা নানা শাখা সংগঠনের অফিসে সালিশি সভার মতোই সংবিধান বহির্ভূতভাবে সমস্যা নিরসনের প্রচেষ্টা হতো।
সেইসব সালিশে বাড়িওয়ালা-ভাড়াটিয়া ঝামেলা, স্বামী-স্ত্রীর সমস্যা বা একেবারেই পারিবারিক বিবাদও মীমাংসা করা হতো, বলা ভালো দল যেভাবে মীমাংসা করতে চাইত, সেটাই চাপিয়ে দেওয়া হতো।
কলকাতার সিনিয়র সাংবাদিক ও অনলাইন সংবাদ পোর্টাল দ্য ওয়ালের কার্যনির্বাহী সম্পাদক অমল সরকার বলছিলেন, “প্রায় নব্বই দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত সিপিআইএমের দফতরগুলো সমান্তরাল প্রশাসন হয়ে উঠেছিল। সেখানে সব ধরনের সমস্যার সমাধান করে দেওয়া হতো। এখনও সেই ট্র্যাডিশন চলছে, আরও যোগ হয়েছে অর্থের বিনিময়ে তথাকথিত মীমাংসা করে দেওয়া।”
অনেক ক্ষেত্রেই জানা যায়, যে ব্যক্তি বেশি অর্থ দিতে সক্ষম, সালিশি সভার রায় তার পক্ষে যায়।
প্রতীচী ট্রাস্টের সমাজ গবেষক সাবির আহমেদ বলছিলেন, “সালিশি সভার কোনও সাংবিধানিক বৈধতা না থাকলেও এগুলো পশ্চিমবঙ্গসহ অনেক রাজ্যেই চলে আসছে। বিশেষত দেখা যায় যে স্থানীয় স্তরে যারা ক্ষমতাবান এবং অর্থবান তাদেরই পক্ষে রায় যায় আর যারা নিরীহ মানুষের ওপরে অত্যাচার বেড়ে যায়।”
তিনি আরও বলছিলেন যে আদালতের দীর্ঘসূত্রতা এবং বিচারব্যবস্থা প্রচুর খরচ সাপেক্ষ হওয়ার কারণে অনেক সময়েই আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষ এ ধরনের সালিশি সভায় যোগ দেন।
আর এই সুযোগটা নিয়েই তৃণমূল কংগ্রেসের স্থানীয় স্তরের নেতা-কর্মীরা নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শন করেন বলে মনে করেন সিনিয়র সাংবাদিক অমল সরকার।








