চীনের সহায়তা ও বিরামহীন বিমান হামলায় অনেক অঞ্চল পুনরুদ্ধার করছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী

ছবির উৎস, AFP via Getty Images
- Author, জোনাথন হেড
- Role, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া সংবাদদাতা
কয়েক মাসের তীব্র লড়াইয়ের পর বিদ্রোহীরা গত বছর কায়াকমে শহরের নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয়—যা চীনা সীমান্ত থেকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে যাওয়া প্রধান বাণিজ্য পথের অংশ।
কায়াকমে শহরটি এশিয়ান হাইওয়ে ১৪-এর ওপর অবস্থিত, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বার্মা রোড নামে পরিচিত ছিল।
শহরটি তা'আং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মির (টিএনএলএ) দখলে যাওয়াকে অনেকেই বিরোধী পক্ষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিজয় হিসেবে দেখেন। এতে ধারণা করা হচ্ছিল, ২০২১ সালে ক্ষমতা দখলকারী সামরিক জান্তার মনোবল ভেঙে যেতে পারে।
তবে এ মাসে মাত্র তিন সপ্তাহেই সেনাবাহিনী শহরটি পুনরুদ্ধার করে।
এই ছোট পাহাড়ি শহরটির ভাগ্যের মোড় বদলের সঙ্গে মিয়ানমারে সামরিক ভারসাম্যের নাটকীয় পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট বড় মিল আছে, শহরটির মতো ভারসাম্যও এখন জান্তার হাতে চলে এসেছে।
কায়াকমে শহরকে এর জন্য চরম মূল্য দিতে হয়েছে। টিএনএলএ বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে থাকার সময় প্রতিদিন সামরিক বাহিনীর বিমান হামলায় শহরের বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। বিমান বাহিনীর জেট বিমানে করে ৫০০ পাউন্ডের বোমা ফেলা হয়েছে বারবার, আর শহরের বাইরে বিদ্রোহীদের অবস্থানে কামান ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে।
শহরের অধিকাংশ বাসিন্দা পালিয়ে গিয়েছিলেন, যদিও সেনাবাহিনী পুনরায় নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর তারা ফিরতে শুরু করেছে।
"প্রতিদিন কায়াকমে ও সিপাও-তে তীব্র লড়াই চলছে," এই মাসের শুরুতে টিএনএলএ-র মুখপাত্র তার পার্ন লা বিবিসিকে একথা বলেন, "এই বছর সেনাবাহিনীর হাতে আরও বেশি সৈন্য, ভারী অস্ত্র এবং বিমান শক্তি রয়েছে। আমরা সিপাও রক্ষা করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।"
বিবিসির সঙ্গে তার কথোপকথনের পর, জান্তার বাহিনী সিপাও শহরও পুনরুদ্ধার করেছে—যেটি ছিল টিএনএলএ-র দখলে থাকা শেষ শহর। এর মাধ্যমে চীনা সীমান্তে যাওয়া সড়কে সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

ছবির উৎস, AFP via Getty Images
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আগামী ডিসেম্বরে নির্বাচনের পরিকল্পনা ঘোষণার পর চীন মিয়ানমারের সামরিক শাসকদের পক্ষ নেওয়ায় এই শহরগুলো মূলত বিদ্রোহীদের হাত থেকে ছুটে যায়।
তবে জান্তা সরকারের নির্বাচনের এই পরিকল্পনার ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে, কারণ এতে অং সান সু চি'র ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসিকে বাদ দেওয়া হয়েছে—যারা সর্বশেষ নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিল, কিন্তু তাদের সরকারকে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া মিয়ানমারের বড় অংশই এখন গৃহযুদ্ধের মধ্যে রয়েছে।
এই কারণেই সেনাবাহিনী এখন যতটা সম্ভব হারানো এলাকা পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করছে, যাতে এসব অঞ্চলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা যায়। আর তারা এ বছর তুলনামূলকভাবে বেশি সফল হচ্ছে, কারণ তারা আগের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়েছে এবং নতুন ও প্রাণঘাতী প্রযুক্তি অর্জন করেছে।
বিশেষ করে আগে সস্তা ড্রোন ব্যবহার করে বিরোধীরা যেরকম সুবিধা পেয়েছিল, এর জবাবে সেনাবাহিনী চীন থেকে হাজার হাজার ড্রোন কিনেছে এবং তাদের অগ্রবর্তী ইউনিটগুলোকে এসব ড্রোন ব্যবহার করার প্রশিক্ষণ দিয়েছে—যার ফলাফল হয়েছে প্রাণঘাতী।
ধীরে চলে ও সহজে উড়তে পারে এমন মোটরচালিত প্যারাগ্লাইডারও ব্যবহার করছে সেনারা, যা কম প্রতিরক্ষিত এলাকায় ঘোরাফেরা করে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বোমা ফেলতে পারে।
পাশাপাশি, চীন ও রাশিয়া থেকে পাওয়া বিমান দিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে বোমা হামলা চালানো হচ্ছে, যার ফলে এ বছর বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা অনেক বেশি। ধারণা করা হচ্ছে, এ বছর অন্তত এক হাজার মানুষ নিহত হয়েছে, তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
অন্যদিকে, বিভক্ত জান্তা বিরোধী আন্দোলন নিজেদের ভেতরের দুর্বলতার কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এই আন্দোলনে রয়েছে খুব দুর্ব অস্ত্রে সজ্জিত শত শত 'পিপলস ডিফেন্স ফোর্স' বা পিডিএফ—যেগুলো স্থানীয় গ্রামবাসী বা শহর থেকে পালিয়ে আসা তরুণ কর্মীদের দ্বারা গঠিত। তবে এগুলোতে জাতিগত বিদ্রোহী গোষ্ঠীর অভিজ্ঞ যোদ্ধারাও রয়েছে যারা কয়েক দশক ধরে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আসছে।
এই বাহিনীগুলোর নিজস্ব এজেন্ডা রয়েছে এবং তারা জাতিগত বার্মিজ সংখ্যাগরিষ্ঠদের প্রতি গভীর অবিশ্বাস পোষণ করে। তারা ২০২১ সালের অভ্যুত্থানে উৎখাত হওয়া প্রশাসন থেকে গঠিত ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্টের কর্তৃত্বও স্বীকার করে না। ফলে এই আন্দোলনের কোনো কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নেই।
এখন, চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা গৃহযুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ নিহত এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার পর, পরিস্থিতি আবারও পাল্টে যাচ্ছে।

ছবির উৎস, Getty Images
কীভাবে হারানো এলাকা পুনরুদ্ধার করল জান্তা
২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে শান রাজ্যে তিনটি জাতিগত সশস্ত্র বাহিনীর জোট মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে—যার নাম দেওয়া হয় 'অপারেশন ১০২৭'।
এই অভিযান শুরুর আগে থেকেই মিয়ানমারের অধিকাংশ এলাকায় সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ চলছিল এবং দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চললেও তাতে খুব একটা অগ্রগতি হচ্ছিল না।
'অপারেশন ১০২৭'-এর মাধ্যমে সেই চিত্র বদলে যায়। তিনটি গোষ্ঠী—তা'আং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি, মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মি এবং আরাকান আর্মি—নিজেদের 'ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স' নামে পরিচিত করে এবং কয়েক মাস ধরে পরিকল্পনা করে বড় আকারে ড্রোন ও ভারী অস্ত্র মোতায়েন করে।
তারা অপ্রস্তুত অবস্থায় থাকা সেনা ঘাঁটিগুলোতে আক্রমণ চালায় এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই প্রায় ১৮০টি ঘাঁটি দখল করে নেয়। শান রাজ্যের উত্তরাঞ্চলের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় বিদ্রোহীরা এবং হাজার হাজার সৈন্যকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করে।
এই চমকপ্রদ বিজয়গুলো জান্তাবিরোধী বৃহত্তর আন্দোলনের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করে, এবং পিডিএফ গোষ্ঠীগুলো সেনাবাহিনীর মনোবল দুর্বল হয়ে আসার সুযোগ নিয়ে নিজেদের এলাকায় হামলা শুরু করে।
যখন ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স এশিয়ান হাইওয়ে ১৪ ধরে মিয়ানমারের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয়ের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে, তখন সন্দেহ করা হচ্ছিলো যে সামরিক সরকার হয়তো পতনের মুখে।
কিন্তু তা ঘটেনি।

ছবির উৎস, Getty Images
"এই সংঘাতের শুরুতে দুটি বিষয় অতিরঞ্জিতভাবে তুলে ধরা হয়েছিল," বলেন ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ-এর গবেষক মরগান মাইকেলস।
"শান অঞ্চলের এই তিনটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘদিনের সহযোগিতার ইতিহাস রয়েছে। ২০২৩ সালে তাদের সাফল্য দেখে অন্যান্য গোষ্ঠীগুলো নিজেদের হামলা সমন্বিত করে। কিন্তু এটিকে একটি ঐক্যবদ্ধ, জাতীয় পর্যায়ের বিরোধী আন্দোলন যা বিজয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছিল–– সেই চিন্তাটি ভুল ছিল। দ্বিতীয় ভুলটি ছিল সেনাবাহিনীর মনোবল নিয়ে। তাদের মনোবল দুর্বল ছিল ঠিকই, কিন্তু এতটা নয় যে নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়ছিল।"
২০২৩ সালের শেষ দিকে জান্তা তাদের ক্ষতির জবাবে জোরপূর্বক নিয়োগ অভিযান শুরু করে।
হাজার হাজার তরুণ বার্মিজ পুরুষ পালিয়ে যায়—গোপনে আত্মগোপন করে, বিদেশে নির্বাসনে যায়, অথবা প্রতিরোধে যোগ দেয়। তবুও, ৬০ হাজারের বেশি তরুণ সেনাবাহিনীতে যোগ দেয় এবং ঝিমিয়ে পড়া বাহিনীকে পুনরায় শক্তিশালী করে। যদিও তারা অনভিজ্ঞ, তবুও তারা পার্থক্য গড়ে তোলে।
বিদ্রোহী সূত্রগুলো বিবিসিকে নিশ্চিত করেছে যে নতুন নিয়োগপ্রাপ্তরা, ড্রোন ও বিমান হামলার সঙ্গে মিলিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিস্থিতি পাল্টে দেওয়ার অন্যতম কারণ।
ড্রোন সেনাবাহিনীকে একটি নির্ধারক সুবিধা দিয়েছে, যা তাদের আকাশপথে আধিপত্যকে আরও শক্তিশালী করেছে—বলছেন সু মন, আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা প্রজেক্ট (অ্যাকলেড)-এর একজন জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক, যারা সশস্ত্র সংঘাত নিয়ে তথ্য সংগ্রহে বিশেষজ্ঞ। তিনি সেনাবাহিনীর ড্রোন ব্যবহারের ওপর নজর রাখছেন।
"প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো আমাদের বলছে, প্রায় অবিরাম ড্রোন হামলায় তাদের বহু যোদ্ধা নিহত হয়েছে এবং তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। আমাদের তথ্যও দেখাচ্ছে, সেনাবাহিনীর বিমান হামলা আরও নিখুঁত হয়েছে—সম্ভবত ড্রোনের মাধ্যমে নির্দেশনা পাওয়ার কারণে।"
সীমান্তে কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং চীনের দুই বার ব্যবহারযোগ্য পণ্যের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর জন্য ড্রোন বা ড্রোন তৈরির উপকরণ সংগ্রহ করা কঠিন করে তুলেছে। মূল্য ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে।
এদিকে সেনাবাহিনীর এখন আরও উন্নত জ্যামিং প্রযুক্তি রয়েছে, ফলে তাদের অনেক ড্রোন মাঝপথেই আটকানো হচ্ছে।

ছবির উৎস, AFP via Getty Images
অনেক রণক্ষেত্রে একটিই যুদ্ধ
টিএনএলএ একমাত্র জাতিগত বাহিনী নয় যারা পিছু হটছে।
গত এপ্রিল মাসে চীনের তীব্র চাপের মুখে ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের আরেক সদস্য এমএনডিএএ সদস্যরা লাশিও শহর ছেড়ে দেয়—যেটি আগে শান রাজ্যে সেনাবাহিনীর সদর দপ্তর ছিল এবং বিদ্রোহীদের শহরটি দখলের ঘটনা ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল।
এমএনডিএএ এখন জান্তার সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে সম্মত হয়েছে।
আর শান বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ও সর্বাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত বাহিনী ইউডব্লিউএসএ-ও চীনের দাবির কাছে নতি স্বীকার করেছে এবং মিয়ানমারের অন্যান্য বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর কাছে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ বন্ধে সম্মত হয়েছে।
এই গোষ্ঠীগুলো সীমান্তবর্তী এলাকায় সক্রিয় এবং তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নিয়মিতভাবে চীনে প্রবেশের প্রয়োজন হয়। চীন শুধু সীমান্ত গেট বন্ধ করে এবং কয়েকজন নেতাকে আটক করেই তাদের দাবিতে সম্মতি আদায় করেছে।
আরও দক্ষিণে, কারেন রাজ্যে, থাইল্যান্ড সীমান্তের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ক্রসিংয়ের পথেও নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করেছে জান্তা বাহিনী।
বিদ্রোহী কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়ন (কেএনইউ), যারা দেড় বছর আগে এই সড়কের পাশে সেনা ঘাঁটি দখল করেছিল, তাদের পরাজয়ের জন্য নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত সৈন্য, নতুন ড্রোন এবং অন্যান্য কারেন মিলিশিয়া গোষ্ঠীর বিশ্বাসঘাতকতাকে দায়ী করছে। এমনকি তারা লে কাই কাও শহরটিও হারিয়েছে—যেটি ২০১৫ সালে জাপানি অর্থায়নে কেএনইউ-র জন্য নির্মিত হয়েছিল, যখন তারা কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে একটি অস্ত্রবিরতির অংশ ছিল।
পাশের কায়াহ রাজ্যে, যেখানে একটি প্রতিরোধকারী গোষ্ঠীগুলো দুই বছর ধরে রাজ্যের বেশিরভাগ অংশ নিয়ন্ত্রণ করে আসছিল, সেখানে ডেমোসো শহর এবং শান রাজ্যের সীমানার ভেতরে মোবিয়ে শহর পুনরুদ্ধার করেছে সেনাবাহিনী।
সেনারা উত্তরের কাচিন রাজ্য এবং সাগাইং ও মান্দালয়ের বিতর্কিত এলাকাগুলোতেও অগ্রসর হচ্ছে।
তবে মিয়ানমারের অনেক অংশে জান্তা তেমন সফল নয়। সশস্ত্র প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো রাখাইন ও চিন রাজ্যের বেশিরভাগ অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে এবং সেনাবাহিনীকে প্রতিহত করছে, এমনকি কিছু এলাকায় পিছু হটতে বাধ্য করছে।
গবেষক মরগান মাইকেলসের মতে সাম্প্রতিক বিজয়গুলোর একটি কারণ, সেনাবাহিনী এখন কেবল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতেই তাদের বাহিনী কেন্দ্রীভূত করছে—যেমন প্রধান বাণিজ্য পথ এবং যেসব শহরে তারা নির্বাচন করতে চায়।
উল্লেখযোগ্যভাবে, কায়াকমে ও সিপাও—এই দুই শহরই নির্বাচনের জন্য নির্ধারিত স্থান হিসেবে চিহ্নিত। সরকার স্বীকার করেছে, মিয়ানমারের ৩৩০টি টাউনশিপের মধ্যে ৫৬টিতে ভোটগ্রহণ সম্ভব হবে না; তবে বিরোধীরা মনে করে, এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি হবে।

ছবির উৎস, Getty Images
'চীন বিশৃঙ্খলার বিরোধী'
সীমান্তবর্তী জাতিগত বাহিনীগুলোর ওপর চীনের প্রভাব '১০২৭ অভিযান' শুরু হওয়ার আগেই তা থামিয়ে দিতে পারত। কিন্তু চীন তা করেনি।
এটি প্রায় নিশ্চিত যে তখন জান্তা-ঘনিষ্ঠ গোত্রগুলোর নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ছড়িয়ে পড়া প্রতারণামূলক কেন্দ্রগুলো নিয়ে চীনের হতাশাই এর কারণ। ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স এই প্রতারণা কেন্দ্রগুলো বন্ধ করাকে তাদের লক্ষ্য তালিকার শীর্ষে রেখেছিল। অনলাইন জালিয়াতি, অর্থ পাচার এবং মানব পাচারের মতো কাজ নিয়ন্ত্রণ করা হয় এসব কেন্দ্র থেকে।
তবে বর্তমানে চীন পুরোপুরি জান্তার পাশে দাঁড়িয়েছে। তারা নির্বাচনের জন্য প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং দৃশ্যমান কূটনৈতিক সমর্থনও দিয়েছে—এ বছর জান্তা নেতা মিন অং হ্লাইং ও শি জিনপিং-এর মধ্যে দুটি বৈঠকের আয়োজন করেছে। যদিও ২০২১ সালের অভ্যুত্থান ও তার ধ্বংসাত্মক পরিণতি নিয়ে চীনের উদ্বেগ ছিল।
"চীন মিয়ানমারে বিশৃঙ্খলা ও যুদ্ধের বিরোধিতা করে," অগাস্ট মাসে একথা বলেছিলেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই —যেটাকে চীনের উদ্বেগের সারসংক্ষেপ বলা যায়।
"বেইজিং-এর নীতিই হলো—রাষ্ট্র পতন নয়," বলেন মরগান মাইকেলস।
"তাদের সামরিক সরকারের প্রতি বিশেষ কোনো অনুরাগ নেই। কিন্তু যখন মনে হলো এই সরকার টালমাটাল অবস্থায় পড়ে যেতে পারে, তখন তারা সেটিকে রাষ্ট্র পতনের সমান মনে করে এবং হস্তক্ষেপ করে"।
মিয়ানমারে চীনের স্বার্থ সুপরিচিত। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। মিয়ানমারকে চীন ভারত মহাসাগরে প্রবেশের পথ হিসেবে দেখে এবং দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের জন্য তেল ও গ্যাস সরবরাহের উৎস হিসেবেও বিবেচনা করে। অনেক চীনা কোম্পানি সেখানে বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছে।
আর কূটনৈতিকভাবে অন্য কোনো উদ্যোগ কার্যকর না হওয়ায়, চীনের এই সিদ্ধান্ত—নির্বাচনের মাধ্যমে সামরিক সরকারকে শক্তিশালী করা—সম্ভবত অঞ্চলটির অন্যান্য দেশগুলোর কাছ থেকেও সমর্থন পাবে।
তবে যুদ্ধ থামানো চীনের জন্যও কঠিন হবে। সামরিক বাহিনীর হাতে মিয়ানমারের জনগণের ওপর যে ধ্বংসযজ্ঞ ও মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে, তা সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এমন এক ক্ষোভের ভিত্তি তৈরি করেছে—যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে থাকতে পারে।
"শুধু শুষ্ক অঞ্চলে সেনাবাহিনী এক লাখ ১০ হাজার থেকে এক লাখ ২০ হাজার ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে," বলেন মাইকেলস।
"সহিংসতা ছিল ব্যাপক এবং খুব কম মানুষ আছে যারা এর প্রভাব থেকে মুক্ত। এ কারণেই এখনই কোনো রাজনৈতিক প্রক্রিয়া কল্পনা করা কঠিন।"
"যদ্ধক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারছেন না এমন পরিস্থিতির মধ্যে যদি আপনি যুদ্ধবিরতির দিকে যেতে বাধ্য হন—তা এক বিষয়। কিন্তু রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে শান্তির আলোচনা এখনো অনেক দূরের বিষয় বলে মনে হয়।"








