মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য ঘিরে ক্ষুব্ধ ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

    • Author, ইয়ান আইকম্যান এবং ক্যাথরিন আর্মস্ট্রং
  • পড়ার সময়: ৪ মিনিট

ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে দেশটিতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের একটি বক্তব্য নিয়ে সম্প্রতি বিতর্ক তৈরি হয়েছে। যা নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

নিজের বক্তব্যে 'ফ্রান্সে সহিংসতা 'বৃদ্ধি' পেয়েছে', বলে দাবি করেছিলেন ফ্রান্সে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত চার্লস কুশনার। যা ভালো ভাবে নেননি ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল ব্যারো।

এর জের ধরে সোমবার সন্ধ্যায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের বাবা এবং মার্কিন রাষ্ট্রদূত চার্লস কুশনারকে তলব করে ফরাসি কর্তৃপক্ষ।

কিন্তু সোমবার সেই তলবের জবাবে নিজের ব্যস্ততার কথা জানিয়ে ফরাসি কর্তৃপক্ষের সমনের উত্তর দেওয়ার জন্য নিজে না গিয়ে একজন ডেপুটিকে পাঠিয়েছিলেন কুশনার।

এর প্রতিক্রিয়ায় ফরাসি মন্ত্রীদের সাথে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের দেখা করার অনুমতি বন্ধ করে দেন ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যারো।

তবে এ নিয়ে বিতর্কের পর কিছুটা বরফ গলেছে বলে জানা যাচ্ছে। মঙ্গলবার দেশ দুটির প্রতিনিধিদের মধ্যে ফোনে কথা হয়েছে।

জানা গেছে, আগামী দিনে মুখোমুখি দেখা করতে সম্মত হয়েছেন এই দুইজন। এছাড়া ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আর হস্তক্ষেপ না করার কথাও জানিয়েছেন ফ্রান্সে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত চার্লস কুশনার।

তবে মঙ্গলবারের আলোচনা সম্পর্কে কেউই প্রকাশ্যে কিছু বলেননি।

মঙ্গলবারের আলোচনা নিয়ে ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দলের একজন সদস্য ফরাসি মিডিয়াকে জানিয়েছেন, "তাকে (ব্যারো) তলব করার কারণগুলো পুনরায় জানানো হয়েছে, ফ্রান্স তৃতীয় কোনও দেশের কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তার জাতীয় এবং জনসাধারণের বিষয়ে কোনও ধরনের হস্তক্ষেপ মেনে নিতে পারে না।"

"রাষ্ট্রদূত বিষয়টি লক্ষ্য করেছেন এবং আমাদের জাতীয় কোনো আলোচনায় হস্তক্ষেপ না করার জন্য তার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন," জানান ওই সদস্য।

গত সপ্তাহে এই কূটনৈতিক বিরোধ শুরু হয়, যখন ফ্রান্সে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেশটির উগ্র ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী কোয়েন্টিন ডেরাঙ্কের হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে পোস্ট করে, যেখানে সতর্ক করে দেওয়া হয় যে ফ্রান্সে "সহিংস বামপন্থী চরমপন্থা বৃদ্ধি পাচ্ছে।"

২৩ বছর বয়সি গণিতের শিক্ষার্থী ডেরাঙ্ক গত ১৪ই ফেব্রুয়ারি হাসপাতালে মারা যান। যার দুইদিন আগে লিওঁতে মুখোশধারী একটি দলের হামলার শিকার হয় সে।

এই হামলার জন্য ফ্রান্সের মধ্য-ডানপন্থি সরকারের মন্ত্রীরা "অতি-বাম" জঙ্গিদের দায়ী করেছেন।

এই ঘটনায় মার্কিন দূতাবাসের পোস্ট করা একটি মন্তব্য ফরাসি সরকারকে ক্ষুব্ধ করেছে। গত সপ্তাহের শেষের দিকে ব্যারো বলেছিলেন, " রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই ট্র্যাজেডির কোনো ধরনের ব্যবহার আমরা প্রত্যাখ্যান করি, যা একটি ফরাসি পরিবারকে শোকের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।"

"আন্তর্জাতিক বিভিন্ন আন্দোলনের অভিজ্ঞতা থেকে, বিশেষ করে সহিংসতার বিষয়ে, আমরা আসলে কোনও শিক্ষাই নেইনি," ওই পোস্টে আরও উল্লেখ করা হয়।

সোমবার ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তলব করার পরও কুশনারের না আসার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তোলে। এরপরই তার বিরুদ্ধে "রাষ্ট্রদূত মিশনের মৌলিক বিষয়গুলো উপলব্ধি করতে স্পষ্ট ব্যর্থতার" অভিযোগ আনা হয়।

যেখানে বলা হয়েছে যে, কুশনারকে যাতে "সরকারের মন্ত্রীদের সাথে সরাসরি যোগাযোগের অনুমতি না দেওয়া হয়" সে বিষয়েও ব্যারো অনুরোধ করেছিলেন।

মঙ্গলবার কুশনারের সাথে কথা বলার আগে, ব্যারো ফ্রান্সইনফোকে বলেছিলেন যে, তার তলবের উত্তর দিতে ব্যর্থ হওয়া "একটি আশ্চর্যজনক" ঘটনা।

"যখন আপনি ফ্রান্সে আপনার দেশ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করার সম্মান পান, তখন আপনি কূটনীতির সবচেয়ে মৌলিক রীতিনীতি মেনে চলবেন এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তলবে সাড়া দিবেন," ব্যারো বলেন।

তিনি বলেন, "আমরা এটা কখনই মেনে নিব না যে বিদেশি দেশগুলো এসে আমাদের জাতীয় রাজনৈতিক বিতর্কে হস্তক্ষেপ করবে, নিজেদেরকে এতে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে, পরিস্থিতি যাই হোক না কেন।"

প্যারিসে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস মঙ্গলবার ব্যারোর সাথে কুশনারের ফোনালাপকে "অকপট এবং বন্ধুত্বপূর্ণ" বলে বর্ণনা করেছে এবং বিবিসিকে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে তারা দুজনই "একসাথে কাজ করার জন্য তাদের যৌথ প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।"

ফরাসি সরকারের সাথে কুশনারের কূটনৈতিক টানাপোড়েনের ঘটনা এটিই প্রথম নয়। গত বছরও, ইহুদি-বিদ্বেষের উত্থান মোকাবেলায় ব্যর্থতার অভিযোগ তোলায়, ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাকে তলব করেছিল।

ডেরাঙ্কের মৃত্যুর ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ছয়জন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। অন্যদিকে উগ্র বামপন্থী ফ্রান্স আনবোউড (এলএফআই) দলের একজন ডেপুটির সংসদীয় সহকারীর বিরুদ্ধেও জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে।

তারা সকলেই লা জিউন গার্ড নামক একটি সংগঠনের সদস্য বা তার কাছাকাছি ছিল, যা গত বছর নিষিদ্ধ হওয়ার আগে এলএফআই-এর নিরাপত্তা প্রদান করত।

এলএফআই নেতা জঁ-লুক মেলানচন, যিনি আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী, দাবি করেছেন যে তার দলের "এই গল্পের সাথে কোনও সম্পর্ক নেই" এবং "সকল ধরণের সহিংসতার" নিন্দাও জানিয়েছেন তিনি।

"আমরা আমাদের শঙ্কা প্রকাশ করছি, কিন্তু তার (ডেরানকের) পরিবার এবং বন্ধুদের প্রতি আমাদের সহানুভূতি এবং সমবেদনাও প্রকাশ করছি," তিনি বলেন।

মঙ্গলবার ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এলিসি প্রাসাদে একটি বৈঠক করেছেন, যেখানে তিনি এর আগেও বলেছিলেন যে, "সক্রিয় এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সম্পর্কযুক্ত সব সহিংস গোষ্ঠীর বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

বৈঠকের পর সূত্রগুলো ফরাসি গণমাধ্যমকে জানিয়েছে যে সরকার লা জিউন গার্ডের যেসব শাখা নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও কার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা করছে বলে সন্দেহ করছে, সেগুলো বন্ধ করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।