চীনের ওপর শুল্ক কমানোর ঘোষণা ও বেইজিং সফরের আশ্বাস: ট্রাম্প-শি বৈঠকে যা যা হলো

হাত মেলানোর মধ্য দিয়ে বৈঠক শুরু ও শেষ করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিং

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, হাত মেলানোর মধ্য দিয়ে বৈঠক শুরু ও শেষ করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিং

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠককে 'অসাধারণ' বলে অভিহিত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এক প্রশ্নের জবাবে বৈঠকটিকে ১০ এ ১২ নম্বর দিয়েছেন তিনি।

দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানে চির প্রতিদ্বন্দ্বী এই দেশদুটির দুই প্রেসিডেন্টের বৈঠক হয় আজ। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে চলে এই বৈঠক।

গত এপ্রিল থেকে পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপ, বিরল খনিজ আহরণ নিয়ে প্রতিযোগিতা- এরকম নানা কারণে বিশ্বের বৃহত্তম দুই অর্থনীতির মধ্যে উত্তেজনা দানা বেঁধে ওঠায় এই আলোচনার দিকে বিশেষ নজর ছিল গণমাধ্যমের।

বৈঠকে শেষে বুসান ছাড়ার সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এসময় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে তিনি বলেন, "এটা ছিল অসাধারণ একটি বৈঠক। তিনি একজন মহান নেতা"।

"আমরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি এবং সেগুলো আপনাদের হাতে তুলে দেওয়া হবে কিছুক্ষণের মধ্যেই," তিনি যোগ করেন।

যুক্তরাষ্ট্র চীনের ওপর আমদানি শুল্ক কমাবে এবং চীনকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আধুনিক কম্পিউটার চিপ কেনার সুযোগ দেবে বলে তিনি জানিয়েছেন।

একইসঙ্গে চীন বিরল খনিজ রপ্তানির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের যে ঘোষণা দিয়েছিল, সেটি নিয়ে "কোনো বাধা থাকবে না" বলেও জানিয়েছেন ট্রাম্প। তবে চীনের কাছ থেকে এমন কোনো ঘোষণা এখনো আসেনি।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো অতটা উচ্ছ্বাস না দেখালেও চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে বৈঠকের বিষয়ে কথা বলেছেন শি জিনপিং।

বড় বাণিজ্য ইস্যুগুলোর সমাধানে দুই পক্ষই ঐকমত্যে পৌঁছেছে এবং চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের দলগুলো এমন ফলাফল নিয়ে কাজ করবে যা দুই দেশের অর্থনীতির জন্য 'একটি আশ্বাসজনক পথ' হিসেবে কাজ করবে, বলেন মি. শি।

বৈঠকে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা

ছবির উৎস, Reuters

শি'র সঙ্গে বৈঠক 'বড় সফলতা'

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

বৈঠক শেষে সমাপনী বক্তব্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি'র সঙ্গে বৈঠক ছিল "একটি বড় সফলতা" এবং "একটি বড় সম্মান"।

তিনি শি'র নেতৃত্বের প্রশংসা করেন।

প্রায় ১৫ মিনিট ধরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন ট্রাম্প, তবে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে সে বিষয়ে খুব কমই তথ্য দিয়েছেন তিনি।

ওয়াশিংটন ও বেইজিং "অনেক বিষয়ে একমত হয়েছে" বলেও তিনি জানান।

সংক্ষেপে তিনি যা বলেছেন:

  • ট্রাম্প বলেন, বিরল খনিজের বাণিজ্য সংক্রান্ত বিষয়টি 'সমাধান' হয়েছে, এবং "চীনের পক্ষ থেকে আর কোনো বাধা নেই" — যদিও তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি। উল্লেখ্য, চীন এসব খনিজের প্রক্রিয়াকরণে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ রাখে এবং সম্প্রতি এগুলোর রপ্তানিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ এনেছে।
  • যুক্তরাষ্ট্র চীনা পণ্যের ওপর আরোপিত সব শুল্ক কমাবে, যা আগে ফেন্টানাইলের (এক ধরনের মাদক) রাসায়নিক উপাদান প্রবাহের প্রতিক্রিয়ায় আরোপ করা হয়েছিল — সিদ্ধান্তটি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে।
  • বেইজিং এনভিডিয়ার (চিপ তৈরির ক্ষেত্রে বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান কোম্পানি, যার তৈরি চিপগুলো শিল্পজগতে স্বর্ণমান হিসেবে বিবেচিত) প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং-এর সঙ্গে কথা বলবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষকে 'এক ধরনের রেফারি' হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এই আলোচনায়।
  • ট্রাম্প বলেন, চীন পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী বিপুল পরিমাণ সয়াবিন কেনা শুরু করবে — "যার আমি প্রশংসা করি"।
  • ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন 'একসঙ্গে কাজ করবে', তবে ট্রাম্প বলেন, তাইওয়ান ইস্যু দুই নেতার আলোচনায় আসেনি।
  • ট্রাম্প জানান তিনি আগামী এপ্রিল মাসে চীন সফর করবেন, আর প্রেসিডেন্ট শি পরে যুক্তরাষ্ট্র সফর করবেন।

বৈঠককে ১০-এর মধ্যে ১২ দিলেন ট্রাম্প

বৈঠকটি ১ থেকে ১০-এর মধ্যে কত নম্বর দেবেন — এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, তিনি বৈঠককে "বড় সফলতা" হিসেবে দেখছেন।

"তারা আমাকে আমাদের অসাধারণ সফলতার জন্য অভিনন্দন জানিয়েছে," বলেন তিনি।

প্রসঙ্গত, গত জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পর আজই শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার প্রথম মুখোমুখি বৈঠক হলো।

এর আগে ২০১৭ সালের এপ্রিলে ফ্লোরিডায় অবস্থিত মার-আ-লাগোতে ট্রাম্প এবং শি প্রথমবারের মতো দেখা করেন। একই বছর জুলাইতে জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনের সময় হামবুর্গে দুই নেতার মধ্যে আবার দেখা হয়।

২০১৮ সালের ডিসেম্বরে জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনের সময় বুয়েনস আইরেসে এবং ২০১৯ সালের জুনে একই সম্মেলনের সময় ওসাকায় দেখা করেন দুই প্রেসিডেন্ট।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন:
ডোনাল্ড ট্রাম্প

ছবির উৎস, Getty Images

বাণিজ্য ইস্যুতে ঐকমত্যের কথা জানালেন শি

চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মন্তব্য প্রকাশ করেছে, যা তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে করেছিলেন।

চীনা নেতা বলেন, "বাণিজ্যের বড় ইস্যুগুলো" সমাধানে দুই পক্ষই ঐকমত্যে পৌঁছেছে।

চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের দলগুলো এমন ফলাফল নিয়ে কাজ করবে যা দুই দেশের অর্থনীতির জন্য "একটি আশ্বাসজনক পথ" হিসেবে কাজ করবে, বলেন শি।

তিনি আরও বলেন, অবৈধ অভিবাসন, সাইবার প্রতারণা, অর্থপাচার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো ক্ষেত্রে সহযোগিতার "উজ্জ্বল সম্ভাবনা" রয়েছে।

"চীন ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে বড় শক্তির দায়িত্বশীলতা প্রদর্শন করতে পারে এবং একসঙ্গে কাজ করে দুই দেশ ও বিশ্ববাসীর জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ, বাস্তবসম্মত ও উপকারী উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পারে," বলেন তিনি।

আজকের বৈঠকে শি জিনপিং ও ডোনাল্ড ট্রাম্প কী বিষয়ে একমত হয়েছেন সে সম্পর্কে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

তারা জানিয়েছে, চীন এক বছরের জন্য 'প্রাসঙ্গিক রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা' বাস্তবায়ন স্থগিত করবে। যার আওতায় এই মাসের শুরুতে উন্নত প্রযুক্তি উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিরল মৃত্তিকা এবং অন্যান্য বাণিজ্য উপকরণের ওপর নিয়ন্ত্রণ কঠোর করেছিল বেইজিং।

বিনিময়ে, ওয়াশিংটন বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে যে নিয়ম করেছিল তা এক বছরের জন্য স্থগিত করবে। মার্কিন 'নিষেধাজ্ঞার তালিকায়'- নাম আছে এমন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অন্তত ৫০ শতাংশ মালিকানা আছে, এমন কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর এই নতুন নিয়ম কার্যকর আছে।

চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আরও বলেছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফেন্টানাইলের জন্য রাসায়নিক উপাদান আসার প্রতিক্রিয়ায় যেসব চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক দিয়েছিল, সেগুলো কমাতে ওয়াশিংটন সম্মত হয়েছে। চীনা পণ্যের ওপর অন্যান্য পারস্পরিক শুল্ক এক বছরের জন্য স্থগিত থাকবে। ট্রাম্পও এর আগে একই রকম ঘোষণা করেছেন।

উল্লেখ্য, হেরোইনের চেয়ে ৫০ গুণ বেশি শক্তিশালী মাদক ফেন্টানাইল তৈরিতে দরকার হয় এমন রাসায়নিক যুক্তরাষ্ট্রে আসে মূলত চীন এবং ভারত থেকে।

বেইজিংয়ের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চীন আজকের সিদ্ধান্তগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কাজ করতে "অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে"।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন:
শি জিনপিং

ছবির উৎস, Getty Images

চীনা পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের টাইমলাইন

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এখন পর্যন্ত চীনা পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, তার একটি টাইমলাইন দেখা যেতে পারে––

ফেব্রুয়ারি: যুক্তরাষ্ট্রে ফেন্টানাইল নামক মাদকের প্রবাহের কারণে ট্রাম্প চীনা পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিলেন।

মার্চ: প্রেসিডেন্ট আরও ১০ শতাংশ শুল্ক যোগ করেন চীনা পণ্যের ওপর, চীনকে ফেন্টানাইল প্রবাহ রোধে যথেষ্ট পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগে।

এপ্রিল: ট্রাম্প 'লিবারেশন ডে' শুল্কের অংশ হিসেবে সব চীনা আমদানির ওপর ৩৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন। এতে চীনা পণ্যের ওপর মোট শুল্ক দাঁড়ায় ৫৪ শতাংশ।

মে: কয়েক সপ্তাহের পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপের পর যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বাণিজ্য উত্তেজনা প্রশমনে একটি চুক্তিতে পৌঁছায়।

দুই পক্ষই একমত হয়, তিন অঙ্কের শুল্ক বাতিল করা হবে — যা এক পর্যায়ে চীনা পণ্যের ক্ষেত্রে ১৪৫ শতাংশ এবং আমেরিকান পণ্যের ক্ষেত্রে ১২৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছিল।

উভয় দেশই শুল্ক ১০ শতাংশ হারে বজায় রাখায় সম্মত হয়। যুক্তরাষ্ট্র ফেন্টানাইল সংক্রান্ত কারণে অতিরিক্ত ২০ শতাংশ শুল্ক অব্যাহত রাখে।

৩০ অক্টোবর: দক্ষিণ কোরিয়ায় শি'র সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প সাংবাদিকদের জানান, তিনি ফেন্টানাইল শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

ট্রাম্পের মতে, এতে চীনা পণ্যের ওপর মোট শুল্ক হার "৪৭ শতাংশ" হবে।

তিনি কোন শুল্কের কথা বলছেন তা স্পষ্ট নয়, এবং হোয়াইট হাউস থেকে আরও স্পষ্টতা না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

স্টিল, কাঠ এবং অন্যান্য পণ্যের মতো নির্দিষ্ট খাতের ওপর ট্রাম্পের শুল্ক এখনো বহাল রয়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিং হ্যান্ডশেক করছেন

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, গত জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পর আজই শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার প্রথম মুখোমুখি বৈঠক হলো

কিম জং আনের সঙ্গে দেখা করতে 'ফিরে আসবেন' ট্রাম্প

ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং আনের সঙ্গে এই সফরে দেখা করার সময় তার ছিল না, তবে তিনি "ফিরে আসতে পারেন"।

"আমার কিম জং আনের সঙ্গে দারুণ সম্পর্ক ছিল। আমি নির্বাচিত না হলে... তিনি খুব বেশি মানুষকে পছন্দ করেন না, আমার ছাড়া, আমি মনে করি যুদ্ধ হয়ে যেত," এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের বলেন ট্রাম্প।

উল্লেখ্য, ট্রাম্প দক্ষিণ কোরিয়ায় পৌঁছানোর কয়েক ঘণ্টা আগে উত্তর কোরিয়া ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়েছে।

এ বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পারমাণবিক পরীক্ষা পুনরায় শুরু করার "উপযুক্ত সময়", কারণ অন্যান্য বড় দেশগুলো তা শুরু করেছে।

"এটা অন্যদের কারণে," বলেন তিনি।

উল্লেখ করে যে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্রের মজুদ সবচেয়ে বড়।