বিএনপির মামলার পর সাবেক সিইসি নুরুল হুদাকে ধরে পুলিশে দিল কথিত জনতা

ছবির উৎস, HIRON KHAN
সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদাকে তার উত্তরার বাসা থেকে ধরে নিয়ে গলায় জুতার মালা পড়িয়ে ভিডিও করার পর পুলিশে দেয়া হয়েছে। পরে সেখান থেকে সাবেক এই প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে গ্রেফতার দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ডিবি হেফাজতে।
রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে উত্তরা পশ্চিম থানারা পাঁচ নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে তাকে আটক করার কথা জানিয়েছিল উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ।
ডিবির যুগ্ম কমিশনার নাসিরুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, রোববার দুপুরে ঢাকার শেরে বাংলা নগর থানায় দায়ের করা একটি মামলায় সাবেক সিইসি মি. হুদাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।
এদিন দুপুরে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় সাবেক তিনজন সিইসিসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে বিএনপি। সেই তালিকায় ২০১৮ সালের নির্বাচনে তৎকালীন সিইসি নুরুল হুদার নামও ছিল। বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মো. সালাহ উদ্দিন খানের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদল রোববার সকালে থানায় ওই মামলার অভিযোগপত্র দেন।
এরপরই সন্ধ্যার দিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। তাতে সাবেক সিইসি নুরুল হুদাকে 'জুতার মালা পড়িয়ে ও ডিম ছুড়ে মারতে দেখা যায় একদল ব্যক্তিকে।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাবেক আমলা নূরুল হুদা ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন।
তার দায়িত্ব পালনকালে ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনসহ অসংখ্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে ছিল নানা প্রশ্ন। যে কারণে নানা সমালোচিতও ছিলেন তিনি।
সিইসি কেএম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত ওই ভোটে আগের রাতে ভোট দেয়ার অভিযোগ ছিল। যে কারণে সিইসি মি. হুদাকে অনেকেই রাতের ভোটের সিইসি হিসেবেও আখ্যা দিয়ে থাকেন।
কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন ইসির মেয়াদ শেষ হয় ২০২২ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি।

হেনেস্তার পর গ্রেফতার দেখায় পুলিশ
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
সিইসি হিসেবে দায়িত্ব থেকে অবসর নেয়ার পর ঢাকার উত্তরার পাঁচ নম্বর সেক্টরের একটি বাসায় থাকতেন সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নুরুল হুদা।
রোববার দুপুরে নুরুল হুদাসহ সাবেক তিনজন সিইসি ও ২৪ জনের নাম উল্লেখ করে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির একজন সদস্য মামলা দায়ের করেন।
ওই মামলার পর এদিন সন্ধ্যায় তার উত্তরার বাসায় স্থানীয় জনগণ যায় বলে জানায় পুলিশ।
তখনকার বেশ কিছু ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে দেখা যায় সাবেক সিইসি মি. হুদাকে বাসা থেকে বের করে তার গলায় 'জুতার মালা' ঝুলিয়ে দেয়া হয়।
সেখানে থাকা অনেকে সাবেক এই সিইসির বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের শ্লোগানও দিতে দেখা যায়।
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায় মি. হুদার গায়ে ডিম ছুড়ে মারা হচ্ছে ও তাকে হেনস্তা করা হচ্ছে।
পরে খবর পেয়ে সেখানে যায় উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ বা ডিএমপির মিডিয়া বিভাগের ডিসি তালেবুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, "স্থানীয় জনতা তাকে বাসা থেকে ধরে। পরে পুলিশে খবর দেয়া হলে প্রথমে উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ তাকে হেফাজতে নেয়। সেখান থেকে আনা হয় ডিবি পুলিশ হেফাজতে"।
পুলিশ জানিয়েছে, বিতর্কিত নির্বাচন নিয়ে রোববার ঢাকার শেরে বাংলা নগর থানায় যে মামলাটি দায়ের করা হয়েছে, সেই মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে সাবেক সিইসি মি. হুদাকে।
বর্তমানে ডিবি হেফাজতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে বলে জানিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ।
ডিবি পুলিশের যুগ্ম কমিশনার নাসিরুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, "তার নামে অন্যকোন মামলা আছে কী-না এখনো সেটি জানা নেই। তাকে ২২শে জুনের (রোববার) শেরে বাংলা নগর থানার মামলায়ই গ্রেফতার দেখানো হয়েছে"।
তিনি জানান, সোমবার সকালে তাকে আরো জিজ্ঞাসাবাদের জন্য শেরে বাংলা থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

সাবেক তিন সিইসি ও ইসিদের বিরুদ্ধে মামলা
এর আগে দুপুরে প্রহসনের নির্বাচন করার অভিযোগে সাবেক তিন প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ ২৪ জনের নাম উল্লেখ করে মামলার আবেদন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি।
শেরেবাংলা নগর থানায় এই মামলার আবেদন জমা দেন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মো. সালাহ উদ্দিন খানের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদল।
ওই মামলায় যে ২৪ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক সিইসি কাজী রকিব উদ্দিন আহমেদ, নির্বাচন কমিশনার মো. আবদুল মোবারক, আবু হাফিজ, জাবেদ আলী, শাহ নেওয়াজ ও তৎকালীন নির্বাচন সচিবসহ ইসির কয়েকজন কর্মকর্তা।
অভিযোগে আরও আসামি করা হয় ২০১৮ সালের নির্বাচনে তৎকালীন সিইসি এ কে এম নুরুল হুদা, নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম, কবিতা খানম ও ব্রিগেডিয়ার শাহাদাত হোসেন চৌধুরীকে।
সর্বশেষ ২০২৪ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল, নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আহসান হাবীব, মো. আলমগীর, আনিছুর রহমানসহ তৎকালীন নির্বাচন সচিবেরও নাম আছে ওই আবেদনে।
রোববার বিএনপির দায়ের করা মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, সাবেক কয়েকজন আইজিপি কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তাকেও আসামী করা হয়েছে।
এর আগে রোববার সকালে বর্তমান সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দীনের কাছে আরেকটি আবেদন জমা দেয় বিএনপির প্রতিনিধিদলটি।
আবেদনে ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের নেতা–কর্মীদের গ্রেপ্তার, গুরুতর জখম ও হত্যার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়। পাশাপাশি তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিএনপিসহ ঐক্যফ্রন্টের নেতা–কর্মীদের ওপর হওয়া হামলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে নির্বাচন বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়।

যে কারণে নানা বির্তক ছিল একাদশ নির্বাচন ঘিরে
বাংলাদেশে ২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে অন্যতম একটি বিতর্কিত নির্বাচন ছিল এটি। এর আগে ২০১৪ সালের এবং ২০২৪ সালের নির্বাচন নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
২০১৮ সালের নির্বাচনে জয়লাভের মধ্য দিয়ে টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ।
তৎকালীন সিইসি কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন ওই নির্বাচন কমিশন ভোটের দিন সারাদেশে সব ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
কিন্তু ভোটের আগের রাত থেকেই বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে অনিয়ম ও ভোট কারচুপির অভিযোগ এসেছিল বিভিন্ন গণমাধ্যমে।
ওই নির্বাচনে বিএনপি এবং তাদের জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বেশ কিছু প্রার্থী ভোটের আগের রাতেই ভোটকেন্দ্র নিয়ে সংবাদমাধ্যমের কাছে নানা অভিযোগ তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন।
তাদের অভিযোগ ছিল, রাতেই বিভিন্ন কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং তাদের জোটের প্রার্থীর সমর্থকেরা ব্যালট পেপারে সিল মেরেছে।
ভোট শুরুর আগের মুহূর্তে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের একটি কেন্দ্রে বিবিসি বাংলার সাংবাদিকের ক্যামেরায় ধরা পড়ে ব্যালট ভর্তি বাক্স।
ঢাকার কেন্দ্রগুলোতে বাইরে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল সকাল থেকেই। অনেক কেন্দ্রের বাইরের পরিবেশ দেখে ভিতরের অবস্থা বোঝার উপায় ছিল না।
ভোট শুরুর ঘণ্টাখানেক পর থেকেই অনেক কেন্দ্রের ভিতরে আওয়ামী লীগ বা তাদের জোটের প্রার্থীর সমর্থকদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে দেখা যায়।
আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জোটসঙ্গীরা ২৮৮টি আসন পায়। আর বিএনপি এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট পায় মাত্র সাতটি। বাকি তিনটি আসন পায় অন্যান্যরা।
ভোট শেষে কিছু ফলাফল আসার পর দেখা যায় যে ক্ষমতাসীনরা বিপুল ভোটে এগিয়ে যাচ্ছেন। এই ধারার প্রেক্ষাপটে ৩০শে ডিসেম্বরই সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলন করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন এবং ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে।








