রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানে ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে নানা আলােচনা

    • Author, জেরোস্লাভ লিউকিভ এবং জেমস চ্যাটার

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কাে রুবিও বলেছেন, ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনা মূলত যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাব করেছে। যদিও, একে পুরােপুরি রাশিয়ার স্বার্থের অনুকূলে তৈরি করা হয়েছে বলে ভাবা হচ্ছে।

একদল মার্কিন সিনেটর জানিয়েছেন, মি. রুবিওর কাছ থেকে তারা জেনেছিলেন ওই প্রস্তাবে, যাকে কেউ কেউ রাশিয়ার চাহিদা মফিক তৈরি বলে বর্ণনা করছেন, তাতে ওয়াশিংটনের অবস্থানের প্রতিফলন ঘটেনি।

তবে, পরে যারা বলেছিলেন যে এ শান্তি পরিকল্পনা 'যুক্তরাষ্ট্র লিখেছে' এবং 'রাশিয়া ও ইউক্রেনের কাছ থেকে পাওয়া শর্তাদির' ভিত্তিতে তৈরি করা - মি. রুবিও তাদের সাথে দূরত্ব তৈরি করেন।

মি. রুবিও সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ইউক্রেন এবং ইউরােপের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সাথে শান্তি আলােচনার বিষয়ে আলাপের জন্য রওয়ানা হওয়ার পর বিষয়টি সামনে এসেছে।

তবে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে বলেছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের জন্য প্রস্তাবিত পরিকল্পনা কিয়েভের জন্য 'চূড়ান্ত প্রস্তাব' নয়।

ইউক্রেনের মিত্ররা এই প্রস্তাবের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করার পর এ কথা বলেছেন ট্রাম্প।

শনিবার ইউরোপ, কানাডা এবং জাপানের নেতারা বলেছিলেন, এই পরিকল্পনায় 'ন্যায়সঙ্গত এবং স্থায়ী শান্তির জন্য অপরিহার্য' উপাদান রয়েছে, কিন্তু এতে 'অতিরিক্ত কাজের প্রয়োজন' হবে বলে তারা উল্লেখ করেন।

সীমান্ত পরিবর্তন এবং ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর আকার ছোট করার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

রোববার ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউক্রেনের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় বৈঠক করার কথা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কারণে মস্কোর পক্ষে অনুকূল বলে বিবেচিত এ পরিকল্পনা গ্রহণের ফলে ইউক্রেন তাদের 'ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তগুলোর মধ্যে একটির মুখোমুখি হতে যাচ্ছে' বলে আগেই সতর্ক করেছিলেন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।

২৮ দফা পরিকল্পনা গ্রহণের জন্য ইউক্রেনকে ২৭শে নভেম্বর পর্যন্ত সময় দিয়েছেন ট্রাম্প।

অন্যদিকে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, এটা সমাধানের একটি 'ভিত্তি' হতে পারে।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর

শনিবার হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকরা যখন ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করেন, ইউক্রেনের জন্য বর্তমান পরিকল্পনাই চূড়ান্ত কী- না?

তখন মি. ট্রাম্প বলেছিলেন, "না, এটা আমার চূড়ান্ত প্রস্তাব নয়।"

তবে, পরে রিপাবলিকান সিনেটর মাইক রাউন্ডস বলেছেন, মি. রুবিও একদল আইনপ্রনেতাকে বলেছেন এই শান্তি আলােচনা যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব নয়।

পর দেশটির স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র টমি পিগট জানিয়েছেন, মি. রুবিওর সাথে কথাপেকথনের ব্যপারে মাইক রাউন্ডস যা বলেছেন তা 'পরিষ্কার মিথ্যা'।

পরে মি. রুবিও সামাজিক মাধ্যম এক্স এ দেয়া পােষ্টে লিখেছেন, "শান্তি প্রস্তাবটি যুক্তরাষ্ট্র প্রণয়ন করেছে।এতে রাশিয়ার তরফ থেকে পাওয়া শর্তাদি যুক্ত করা হয়েছে, একইসাথে ইউক্রেনের কাছ থেকে পাওয়া শর্তও যুক্ত করা হয়েছে।"

এদিকে, রোববার জেনেভায় যারা আলোচনায় অংশ নেবেন তাদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফও থাকবেন।

যুক্তরাজ্যের পক্ষে উপস্থিত থাকবেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জোনাথন পাওয়েল।

দক্ষিণ আফ্রিকায় জি২০ শীর্ষ সম্মেলনে শনিবারের যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন কানাডা, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, জাপান, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, যুক্তরাজ্য, জার্মানি এবং নরওয়ের নেতারা।

স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে ইইউর দুই জন শীর্ষ কর্মকর্তাও ছিলেন।

এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "আমরা বিশ্বাস করি, খসড়াটি একটি ভিত্তি কেবলমাত্র, এতে আরো কাজ করার প্রয়োজন আছে। ভবিষ্যতের জন্য টেকসই শান্তি নিশ্চিত করতে আমরা এর সাথে জড়িত হতে প্রস্তুত। বল প্রয়োগের মাধ্যমে সীমান্তে পরিবর্তন করা যাবে না এ বিষয়ে আমরা নীতিগতভাবে পরিষ্কার।"

এতে আরো বলা হয়েছে, " ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন এবং ন্যাটোর সাথে সম্পর্কিত উপাদানগুলো বাস্তবায়নের জন্য পর্যায়ক্রমে ইইউ এবং ন্যাটো সদস্যদের সম্মতির প্রয়োজন হবে।"

জোহানেসবার্গে জি২০ শীর্ষ সম্মেলনে উপস্থিত যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার শনিবার জেলেনস্কির সাথে ফোনে কথা বলেছেন। পরে ট্রাম্পের সঙ্গেও কথা বলেছেন।

ব্যাপকভাবে ফাঁস হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি পরিকল্পনায় বর্তমানে ইউক্রেনীয়ান বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা পূর্বাঞ্চলীয় দোনেৎস্ক অঞ্চল থেকে তাদের সেনা প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।

দোনেৎস্কের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী লুহানস্ক অঞ্চল এবং ২০১৪ সালের রাশিয়ার দখল করা দক্ষিণের ক্রাইমিয়া উপদ্বীপে কার্যত নিয়ন্ত্রণ থাকবে রাশিয়ার।

ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় এলাকা খেরসন এবং ঝাপোরিজঝিয়ার সীমান্ত বর্তমান যুদ্ধরেখা বরাবর স্থির করে দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে এই পরিকল্পনায়।

আংশিকভাবে উভয় অঞ্চলই রাশিয়ার দখলে।

ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ সংখ্যা ছয় লাখে সীমাবদ্ধ রাখা এবং প্রতিবেশী পোল্যান্ডে ইউরোপীয়ান যুদ্ধবিমানগুলো মোতায়েন রাখার কথাও বলা হয়েছে মার্কিন এই পরিকল্পনায়।

এই পরিকল্পনায় কিয়েভ "নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পাবে" বলা হলেও বিস্তারিত কিছু উল্লেখ করা হয়নি।

নথিতে বলা হয়েছে, এটা 'আশা করা হচ্ছে' রাশিয়া তার প্রতিবেশীদের ওপর হামলা করবে না এবং ন্যাটো তার সীমা আর সম্প্রসারণ করবে না।

রাশিয়ার ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে এবং বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলোর জোট জি-সেভেন এ পুনরায় যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে দেশটিকে " বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পুনরায় অন্তর্ভূক্ত করা হবে।"

অর্থাৎ এটিকে আবার জি-এইট করার প্রস্তাবও রয়েছে মার্কিন পরিকল্পনায়।

শুক্রবার ট্রাম্প বলেছিলেন জেলেনস্কিকে এই মার্কিন প্রস্তাবগুলো 'পছন্দ করতেই হবে', অন্যথায় ইউক্রেন এবং রাশিয়া যুদ্ধ চালিয়ে যাবে।

ওইদিনের সকালেই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া বার্তায় বলেন, তার দেশকে "একটি খুব কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে পারে, হয় মর্যাদা হারানো অথবা একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হারানোর ঝুঁকি - আসতে পারে।"

জেলেনস্কি বলেন, তার কার্যালয়ের প্রধান অ্যান্দ্রে ইয়েরমাক ভবিষ্যতের শান্তি চুক্তির জন্য ইউক্রেনের আলোচক দলের নেতৃত্ব দেবেন। এর মধ্যে রাশিয়া জড়িত এমন যে কোনো চুক্তিও অন্তর্ভূক্ত।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করা এক ভিডিও বিবৃতিতে তিনি বলেন, "আমাদের প্রতিনিধিরা জানেন কীভাবে ইউক্রেনের জাতীয় স্বার্থকে রক্ষা করতে হয় এবং রাশিয়া যাতে তৃতীয়বার এবং ইউক্রেনের বিরুদ্ধে আরেকটি হামলা চালানো থেকে বিরত রাখতে ঠিক কী করতে হবে।"

যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি উন্নত অস্ত্র সরবরাহ, যেমন বিধ্বংসী রাশিয়ান বিমান হামলা প্রতিহত করার মতো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সেইসাথে ওয়াশিংটনের সরবরাহ করা গোয়েন্দা তথ্যের ওপর কিয়েভ নির্ভরশীল।

মস্কোর যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা পাওয়ার কথা শুক্রবার পুতিন নিশ্চিত করেছেন। কিন্তু ক্রেমলিনের সাথে বিস্তারিত আলোচনা করে করা হয়নি বলে জানিয়েছেন।

মস্কো 'নমনীয়তা দেখাতে' ইচ্ছুক, কিন্তু যুদ্ধ চালিয়ে যেতে প্রস্তুত রয়েছে বলেও পুতিন জানান।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুতিন ইউক্রেনে একটি পূর্ণ মাত্রার হামলা শুরু করেন।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুদ্ধে ব্যাপক হতাহতের খবর পাওয়া যাচ্ছে, তবে রাশিয়ান সেনারা ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছে।