নির্বাচনে সাংবাদিকদের জন্য নীতিমালা, পুরনো পথেই ইসি

    • Author, সজল দাস
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিদেশী পর্যবেক্ষক এবং দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের জন্য নীতিমালা জারি করেছে নির্বাচন কমিশন। বিদেশি পর্যবেক্ষকদের ভিসা দিতে কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানো হলেও গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে পুরনো নীতিমালার বেশিরভাগ বিষয়ই বহাল রাখার অভিযোগ তুলেছেন সাংবাদিক ও বিশ্লেষকরা।

নতুন নীতিমালা দেয়ার ক্ষেত্রে মূল অংশীজন অর্থাৎ গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা না করারও অভিযোগ উঠেছে।

নির্বাচনের সময় কেন্দ্রে তথ্য সংগ্রহ এবং ছবি ও ভিডিও ধারণের ক্ষেত্রে প্রিজাইডিং কর্মকর্তাকে অবহিত করা এবং ভোট কেন্দ্রে সাংবাদিকদের উপস্থিতির সময় নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন তারা।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের অনুমতি দেয়ার ক্ষেত্রে ইসির ক্ষমতা আগের তুলনায় বাড়ানো হয়েছে।

তবে গণমাধ্যমের কাজ করার ক্ষেত্রে নীতিমালায় কিছু বিষয়ে আরো স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন ছিল।

এছাড়া নতুন নীতিমালার কিছু ক্ষেত্রে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের দেয়া প্রস্তাবের প্রতিফলন থাকলেও অনেক প্রস্তাবই গ্রহণ করা হয়নি বলে জানান সংস্কার কমিশনের সদস্য আব্দুল আলীম।

অবশ্য জারি করা নীতিমালার কোনো বিষয় নিয়ে কারো আপত্তি থাকলে আলোচনার সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন ইসি সচিব আখতার আহমেদ।

পরিবর্তনের বিষয়ে ইসি সচিব বলছেন, "যেসব জায়গায় মনে হয়েছে আগেরটাতে অসুবিধা নাই, সবকিছু তো পরিবর্তন প্রাসঙ্গিক নয়।"

যদিও নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট সময় এখনো ঠিক হয়নি। তবে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন করার লক্ষ্য রেখে প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন।

নতুন নীতিমালায় যা বলা হয়েছে

আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের জন্য নির্বাচন কমিশনের জারি করা নতুন নীতিমালায় নানা নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের ভিসা দেয়ার ক্ষেত্রে এবার নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। অতীতে এই বিষয়ে সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ থাকলেও নতুন নীতিমালায় নির্বাচন কমিশনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য আব্দুল আলিম বিবিসি বাংলাকে বলেন, "এটা আগে সরকার যেটা করতো সেটাই হতো। এখন তাদেরকে ভিসা দেয়ার সিদ্ধান্তটি দেবে নির্বাচন কমিশন। কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকারকে জানাবে এবং ফরেন মিনিস্ট্রি ভিসা দেবে।"

তবে একজন পর্যবেক্ষক সারাদিন একটি কেন্দ্রে থাকবে, সংস্কার কমিশনের দেয়া এই প্রস্তাব গ্রহন করা হয়নি বলেও জানান তিনি।

আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের জন্য নীতিমালায় বলা হয়েছে, ভোটগ্রহণের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে ইসি সচিবের কাছে ইমেইল বা হার্ডকপির মাধ্যমে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।

এক্ষেত্রে ব্যক্তি বা সংগঠন হিসেবে পর্যবেক্ষক হতে হলে সুশাসন, নির্বাচন, গণতন্ত্র, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং মানবাধিকার নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।

প্রতিটি পর্যবেক্ষক সংস্থা ভোট গণনা বা ফলাফল একত্রিকরণের সময় কেবল একজনকে মনোনীত করতে পারবে।

স্থানীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের জন্য প্রযোজ্য নীতিমালা আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষক এবং পর্যবেক্ষক সংস্থার জন্যও প্রযোজ্য হবে।

নির্বাচন পরিচালনায় সহায়তা করতে সংবিধান, নির্বাচন-সম্পর্কিত আইন ও বিধিমালা মেনে চলবেন পর্যবেক্ষকরা। তারা নির্বাচন-সম্পর্কিত কর্মকর্তাদের কাজে কোনো রকম হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকবেন।

পর্যবেক্ষকরা এমন কোনো আচরণ করবেন না, যাতে তাদের আচরণকে কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীর সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত করে বা নিরপেক্ষ না হয়।

নির্বাচনের সময় ভোটকেন্দ্রে প্রবেশের সুযোগ পাবেন বিদেশী পর্যবেক্ষকরা। তবে এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রিসাইডিং অফিসার কর্তৃক আরোপিত যেকোনো বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে। তবে, তারা বেশিক্ষণ ভোটকেন্দ্রের ভেতরে থাকতে পারবেন না।

ভোটের আগে, ভোটগ্রহণের দিন এবং ভোট পরবর্তী পরিস্থিতির তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনগুলো তৈরি করতে হবে।

প্রত্যেক নির্বাচন পর্যবেক্ষক অথবা সংস্থা পর্যবেক্ষণের সময় নির্বাচনী অনিয়ম যদি থাকে, সে সম্পর্কিত সুপারিশসহ কমিশনের কাছে প্রতিবেদন জমা দিতে পারবে।

দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যম ও গণমাধ্যমকর্মীদের জন্যও নীতিমালা প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। নীতিমালা অনুযায়ী, বিদেশী গণমাধ্যমকেও অনুমতি নেয়ার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতো একই পন্থা অনুসরণ করতে হবে।

সংবাদ প্রকাশ বা প্রচারের জন্য দেশি গণমাধ্যম বা সংবাদকর্মীদের জন্য ধার্য নিয়মগুলো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম কর্মীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।

এছাড়া আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষক এবং বিদেশী সাংবাদিকদের অভ্যর্থনা এবং সহায়তার জন্য ভোটগ্রহণের তারিখের ১০ দিন আগে বিমানবন্দর ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি সহায়তা ডেস্ক স্থাপন করবে।

বিদেশী সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষক নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য কোনো জেলা বা নির্বাচনী এলাকায় যেতে চাইলে তাদেরকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ইসি সচিবালয় অনুরোধ জানাবে বলেও নীতিমালায় বলা হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদের সই করা দেশি সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে, নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে আবেদনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের সাংবাদিক পাস কার্ড, গাড়ি ও মোটরসাইকেলের স্টিকার দেবে ইসি সচিবালয় ও রিটার্নিং কর্মকর্তা।

নির্বাচনের সংবাদ সংগ্রহে অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড প্রাপ্তি এবং নির্বাচন ঘিরে গণমাধ্যমকর্মীরা কি করতে পারবেন কিংবা পারবেন না সে বিষয়গুলোও উল্লেখ করা হয়েছে।

নীতিমালায় বলা হয়েছে, ভোটের সময় বৈধ কার্ডধারী সাংবাদিকরা সরাসরি ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবেন। তবে তথ্য, ছবি ও ভিডিও নেয়ার ক্ষেত্রে প্রিসাইডিং অফিসারকে জানাতে হবে।

একসঙ্গে দুইয়ের অধীক মিডিয়ার সাংবাদিক একই ভোটকক্ষে প্রবেশ করতে পারবেন না। ১০ মিনিটের বেশি ভোটকক্ষে অবস্থান না করা এবং সেখানে কারো সাক্ষাৎকার না নেয়ার নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে।

জানানো হয়, ভোট গণনার সময় সাংবাদিকরা থাকতে পারবেন এবং ছবিও তোলা যাবে। কিন্তু সরাসরি সম্প্রচার করা যাবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সরাসরি সম্প্রচার করা যাবে না।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই নীতিমালা জারি করা হলেও স্থানীয় সরকারের জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও এই একই নীতিমালা প্রযোজ্য হবে বলে নীতিমালায় উল্লেখ আছে।

যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা

নির্বাচনের সংবাদ সংগ্রহে দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংবাদিক বা গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য নতুন নীতিমালায় আগের নীতিমালা থেকে খুব বেশি পরিবর্তন আনা হয়নি বলেই মনে করেন গণমাধ্যমকর্মীরা।

নির্বাচন কমিশন নিয়ে নিয়মিত কাজ করেন এমন সাংবাদিকরা বলছেন, মোটর সাইকেল ব্যবহারের সুযোগ রাখাসহ দুই একটি জায়গায় পরিবর্তন এনে আগের নীতিমালাই পুনরায় জারি করা হয়েছে।

নির্বাচন কমিশন নিয়ে কর্মরত সাংবাদিকদের সংগঠন 'রিপোর্টার্স ফোরাম ফর ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসি, আরএফইডি'র সভাপতি কাজী জেবেল বিবিসি বাংলাকে বলেন, "নতুন নীতিমালায় ইতিবাচক কিছু দিক রয়েছে। তবে অনেক বিষয়ে আমরা মনে করছি আমাদের পেশাগত কাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।"

প্রিজাইজিং কর্মকর্তাকে অবহিত করার বিষয়ে তিনি বলেন, "একটা ভোটকেন্দ্রের গেটে থাকে পুলিশ, প্রিজাইডিং কর্মকর্তা থাকেন অনেক দূরে, এখন একজন সাংবাদিক কিভাবে তাকে অবহিত করবেন, সে তো গেট থেকেই ঢুকতে পারবে না।"

এছাড়া নির্বাচন কমিশন থেকে যখন কার্ড দেয়া হচ্ছে "এটাই তো একটা অনুমতি," বলেন মি. জেবেল।

অতীত নির্বাচনে ভোট কারচুপিতে অনেক ক্ষেত্রে প্রিজাইডিং কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও উঠেছে। এক্ষেত্রে কোনো সাংবাদিক যদি তাকে অবহিত করে তাহলে কী হবে, এই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

মি. জেবেল বলেন, "বিগত নির্বাচনে আমাকেও অনেক কেন্দ্রে পুলিশ ঢুকতে দেয়নি। এমন পরিস্থিতিতে আমি কার কাছে প্রতিকার চাইবো, এখানে সেই প্রতিকারের বিষয়টি রাখা হয়নি। এছাড়া ভোটের দিন নির্বাচন কর্মকর্তাকে রিচ করাও তো কঠিন," বলেন তিনি।

ভোটকক্ষে প্রবেশ ও অবস্থানের সময় নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন গণমাধ্যম কর্মীরা। তারা বলছেন, "একজন সাংবাদিক দশ মিনিটের বেশি কক্ষে অবস্থান করতে পারবেন না। এই দশ মিনিট কেনো?

গণমাধ্যম কর্মীদের কেউ কেউ বলছেন, "ওইখানে যদি কারচুপি হয়, আমি দশ মিনিট থাকবো কারচুপি হবে না পরে আবার হবে, এটা কি সেই সুযোগ করে দেয়া?"

এই নীতিমালা করার আগে অংশীজন অর্থাৎ সাংবাদিকদের সঙ্গে এ নিয়ে নির্বাচন কমিশন কোনো আলোচনা করেনি বলেও দাবি করেন আরএফইডি সভাপতি কাজী জেবেল।

সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনা না করার বিষয়টি স্বীকার করেছে নির্বাচন কমিশনও। তারা বলছে, নীতিমালা নিয়ে কোনো প্রস্তাব বা পরামর্শ থাকলে কমিশনের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ রয়েছে।

নীতিমালায় পরিবর্তনের বিষয়ে ইসি সচিব আখতার আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, "যেসব জায়গায় মনে হয়েছে আগেরটাতে অসুবিধা নাই, সবকিছু তো পরিবর্তন প্রসঙ্গিক নয়। এটার একটা কাঠামো আছে একসেপ্টেবল রেঞ্জ (গ্রহণযোগ্য মাত্রা) এর মধ্যে থাকে তাহলে তো অসুবিধা নাই বলেই আমার ধারণা।"

"আলোচনা, সমালোচনা, পরিবর্তন, পরিবর্ধন এগুলো চলমান প্রক্রিয়া। কোনো জিনিসই তো স্থায়ী না। এটাতে পরিবর্তন হতেই পারে," বলেন মি. আহমেদ।

নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য আব্দুল আলীম বলছেন, নতুন নীতিমালায় স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের যোগ্যতা এবং বয়স কিছুটা বাড়ানো হয়েছে।

এছাড়া আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের ভিসা দেয়ার ক্ষেত্রে অতীতে সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ থাকলেও নতুন নীতিমালায় ইসির ওপরই সিদ্ধান্ত নেয়ার মূল দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

তবে গণমাধ্যমের কাজের ক্ষেত্রে কেন্দ্রে প্রবেশ, প্রিজাইডিং কর্মকর্তাকে অবহিত করার বিষয়সহ নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের দেয়া অনেক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়নি। "আমরা বলেছিলাম যদি অনিয়ম হতেই থাকে তাহলে তো অবহিত করার সুযোগ নেই, সাংবাদিকরাতো যাবেই," বলেন মি. আলীম।

গণমাধ্যম কর্মীদের কেন্দ্রে অবস্থানের বিষটিকে অপশনাল রাখার কথা বলছেন সাবেক নির্বাচন কর্মকর্তা ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন টুলি।

তিনি বলছেন, "যেখানে সমস্যা হবে সেখানে তো বেশি সময় থাকার প্রয়োজন হতেই পারে।"

তবে, প্রিজাইডিং কর্মকর্তাকে অবহিত করার বিষয়ে মিজ টুলি বলছেন, সাংবাদিক নাম নিয়ে কেউ নির্বাচন বিঘ্ন করতে পারেন আবার সংশ্লিষ্ট প্রিজাইডিং কর্মকর্তাও অনিয়ম করতে পারেন, 'বিষয়টি বেশ জটিল'।

অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের কথা বলছেন তিনি।