প্রতি বছরই হচ্ছে বন্যা, কেন নিজেকে বাঁচাতে পারছে না পাকিস্তান?

আরিফ খান উদ্ধার কাজে সাহায্য করছিলেন আরও অনেকের সাথে
ছবির ক্যাপশান, আরিফ খান উদ্ধার কাজে সাহায্য করছিলেন আরও অনেকের সাথে

কাদামাটিতে ভেজা দুটি শিশুর মরদেহ উদ্ধার করে নিয়ে যাচ্ছিলেন গ্রামবাসী। চারপাশে ভিড় করে থাকা মানুষের মুখে কান্না ছিল না, দেখা যাচ্ছিল না কোনো আতঙ্কও। কিন্তু তাদের চোখ থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছিল রাগ।

খাইবার পাখতুনখোয়ার সোয়াবি জেলার একটি ছোট গ্রামে জড়ো হয়েছিলেন তারা।

হঠাৎ বন্যায় ভেসে যায় গ্রামটির বেশ কয়েকটি বাড়ি। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েন অনেকে।

ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা কেউ কেউ শিশুদের মরদেহ সরিয়ে নেওয়ার কাজ দেখছিলেন, আর অন্য কয়েকজন তখন উদ্ধারকর্মী ও সেনা সদস্যদের সঙ্গে মিলে যন্ত্রপাতিসহ বা খালি হাতেই খুঁজে যাচ্ছিলেন জীবিত কাউকে পাওয়া যায় কি না।

গ্রামবাসীদের অনেকেরই কথায় ক্ষোভ ফুটে উঠছিল–– বন্যার আগে কোনো সতর্কবার্তা পাওয়া যায়নি।

"সরকার আমাদের আগেভাগে সতর্ক করলো না কেন?"- এমন প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছিল সবার মনে।

এছাড়া স্থানীয় প্রশাসনের পর্যাপ্ত সহায়তা না পাওয়া নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেকে।

মৃতদেহ উদ্ধারে সহায়তা করছিলেন আরিফ খান। তিনি বলছিলেন, "আমাদের সঠিক সরঞ্জাম দরকার এই উদ্ধারকাজ চালিয়ে যেতে। এখানে প্রায় ১৫টা বাড়ি ছিল। আমাদের এক্সকাভেটর দরকার।"

যদিও জরুরি উদ্ধারকর্মী আর সেনারা সাহায্যের জন্য সেখানে ছিল, আরিফ যে সরঞ্জামের জন্য বারবার অনুরোধ করছিলেন তা ছিল মাত্র কয়েকশ' মিটার দূরে, তবুও জলমগ্ন রাস্তার কারণে তা গ্রামে পৌঁছাতে পারেনি।

"অ্যাম্বুলেন্স, ওষুধ আর এক্সকাভেটর সবই রওনা হয়েছে," জানালেন মারদান জেলার কমিশনার নিসার আহমদ, "কিন্তু বন্যার তীব্রতার কারণে সেগুলো এখনো গ্রামে পৌঁছাতে পারেনি।"

সারাদিন গ্রামবাসীরা নিজেরাই ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে যাচ্ছিলেন, মরদেহও উদ্ধার করছিলেন তারা।

এমন দৃশ্য পাকিস্তানে নতুন নয়।

শুধু জুন মাসেই মৌসুমি বৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যায় ভেসে বা ঘরবাড়ি ভেঙে দেশটিতে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ৮০০ জন।

২০২২ সালে মৌসুমি বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট দুর্যোগে প্রাণ হারিয়েছিলেন প্রায় এক হাজার ৭০০ জন।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে তখন ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল ১৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। আর পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনের প্রয়োজন ছিল আরও ১৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার।

প্রশ্ন উঠছে–– বারবার একই ঘটনা ঘটছে, তবুও পাকিস্তান কেন এখনো বন্যার আঘাত থেকে নিজেকে ভালোভাবে রক্ষা করতে পারছে না?

ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ সরানোর চেষ্টা করছে কয়েকজন উদ্ধারকর্মী ও তাদের চেয়ে বেশি সংখ্যক সাধারণ লোকজন
ছবির ক্যাপশান, খাইবার পাখতুনখোয়ায় উদ্ধারকর্মীরা খালি হাতে ধ্বংসস্তূপের মাটি খুঁড়ে জীবিতদের উদ্ধার করার চেষ্টা করছে

'আন্তর্জাতিক পাপের' বড় মূল্য

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

ভৌগোলিক কারণে পাকিস্তান জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর একটি। দেশটিকে শুধু ভারী মৌসুমি বৃষ্টিই মোকাবিলা করতে হচ্ছে না, সঙ্গে আছে চরম তাপমাত্রা ও খরা।

পাশাপাশি, হিমবাহ গলতে শুরু করায় নতুন নতুন হ্রদ তৈরি হচ্ছে, এই হিমবাহগুলো ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

পাকিস্তান আবহাওয়া বিভাগের প্রধান আবহাওয়াবিদ ড. সাইয়েদ ফয়সাল সাঈদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এসব প্রবণতা আরও খারাপ হচ্ছে।

তার মতে, "আগামী কয়েক দশকে মৌসুমি বৃষ্টিপাত বাড়বে। তাই এটি এক বছরের মধ্যে সমাধানযোগ্য কোনো সমস্যা নয়।"

তবে অনেক পাকিস্তানির কাছে এটি এক কঠিন বাস্তবতা, কারণ দেশটি বিশ্বের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের এক শতাংশেরও কম অবদান রাখে।

"আন্তর্জাতিক পাপের জন্য আমরা বড় মূল্য দিচ্ছি," বলেন ড. আমজাদ আলী খান, যিনি খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের জাতীয় পরিষদের সদস্য এবং প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীকে জলবায়ু ইস্যুতে পরামর্শ দেন। এ বছর মৌসুমি বৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে এই প্রদেশেই।

এই ক্ষোভ রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের সব দিকেই শোনা যাচ্ছে।

সাবেক ফেডারেল জলবায়ুমন্ত্রী সেনেটর শেরি রহমান সম্প্রতি বলেছেন, "গ্লোবাল সাউথে যখন প্রাণহানি ঘটে, নদীগুলো ভেঙে যায় আর জীবিকা বিলীন হয়ে যায়, তখন পাকিস্তানের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য আসলে কোনো অর্থ বরাদ্দ হয় না।"

তবে কেউ কেউ বলছেন, দেশটি নিজস্ব অর্থ কীভাবে ব্যয় করবে তা নিয়ে দ্বিধায় আছে।

বন্যার পানিতে কয়েক ইঞ্চি ডুবে যাওয়া রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন তিন জন নারী, তাদের একজনের কোলে একটি শিশু। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন ও কাজ করছেন কয়েকজন পুরুষ
ছবির ক্যাপশান, পাকিস্তানের গ্রামীণ ও পাহাড়ি অঞ্চলে গ্রীষ্মের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা আঘাত হেনেছে

জলবায়ু সহনশীলতায় বিনিয়োগের সঙ্গে প্রতিযোগিতা থাকে প্রতিরক্ষার মতো খাতের। এ বছরের পাকিস্তানের ফেডারেল বাজেটও তার প্রমাণ।

সামগ্রিক ব্যয় কমানোর অংশ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের বাজেট কমিয়ে আনা হয়েছে প্রায় ৯.৭ মিলিয়ন ডলারে। অন্যদিকে প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়িয়ে করা হয়েছে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার।

শেরি রহমান এই কাটছাঁটের সমালোচনা করে বলেন, এতে ভুল বার্তা দেওয়া হয়েছে।

বাজেট ঘোষণার সময় তিনি প্রশ্ন তোলেন, "যদি আমরা নিজেরাই নিজেদের রক্ষা করতে বিনিয়োগ না করি, তবে অন্যরা কেন আমাদের সহায়তা করবে?"

এদিকে পাকিস্তানের জলবায়ু তহবিলের আসল রূপ জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের বাজেটে প্রতিফলিত হয় না বলে মন্তব্য করেছেন জলবায়ু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ আলী তাওকির শেখ।

তিনি জানান, আইএমএফ-এর সঙ্গে চুক্তির অংশ হিসেবে ফেডারেল সরকার জলবায়ু-সম্পর্কিত খাতে অতিরিক্ত দুই বিলিয়ন ডলারের বেশি বরাদ্দ রেখেছে। তবে তার দাবি, এর মধ্যে বাঁধ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের মতো কিছু পুরনো প্রকল্পও অন্তর্ভুক্ত আছে।

তার কথায়, বাজেটের বাইরে বিভিন্ন খাতে এক হাজারেরও বেশি উন্নয়ন প্রকল্প এখনো অসম্পূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান না থাকায়, চরম ক্ষতিকর দুর্যোগের পূর্বাভাস দেওয়া বা সতর্ক করাটাই এখন পাকিস্তান আবহাওয়া অধিদপ্তরের মুখ্য কাজ।

বন্যার পানির তোড়ে ভেঙে যাওয়া একটি ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন লোক

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, হঠাৎ বন্যার তীব্রতা স্থানীয় অবকাঠামো ধ্বংস করে দিয়েছে, যেটি এলাকাবাসীর চলাচলে বড় ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে

তবে এখানেও 'যদি' ও 'কিন্তু' রয়েছে। যেমন ক্লাউডবার্স্ট বা মেঘ বিস্ফোরণের মতো চরম প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষেত্রে আগে থেকে ভবিষ্যদ্বাণী করা খুব কঠিন।

আর্দ্র ও স্যাঁতসেঁতে বাতাস হঠাৎ করে ওপরের দিকে উঠে গেলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যার ফলে স্থানীয়ভাবে প্রবল বৃষ্টিপাত ঘটে।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এ ধরনের বৃষ্টি একের পর এক গ্রাম ধ্বংস করেছে।

তবে ড. সাঈদ বলেছেন, যদিও কয়েক দিন আগে থেকে ক্লাউডবার্স্টের সঠিক সময় জানা যায় না। তবুও যে ধরনের আবহাওয়ায় এটি ঘটতে পারে তা শনাক্ত করা সম্ভব। মানে ঝুঁকিপূর্ণ জোন নির্ণয় করার কথা বলছেন তিনি।

"যখন আবহাওয়া অধিদপ্তর ভারী বৃষ্টিপাতের সতর্কবার্তা দেয়, তখনই সব জেলা প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করা উচিত," বলেন ড. সাঈদ।

তবে তিনি আবহাওয়া অধিদপ্তরের ত্রুটি স্বীকার করে বলেন, "আমি বলছি না যে এটি নিখুঁত।"

বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে যৌথ এক উদ্যোগের অংশ হিসেবে পিএমডি নতুন রাডার ও স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া স্টেশন কিনছে এবং স্বল্পমেয়াদী পূর্বাভাসের মডেলিং উন্নত করার কাজ করছে।

বন্যার পানির তোড়ে ভেঙে যাওয়া একটি বাড়ির সামনে মালপত্র সরানোর কাজ করছেন এক ব্যক্তি

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের বুনের জেলা ব্যাপক মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাম্প্রতিক বন্যায়

এখানে আরও বড় চ্যালেঞ্জ হলো জায়গামতো সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া।

এই গ্রীষ্মের সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলোর কিছু ঘটেছে গ্রামীণ ও পাহাড়ি এলাকায়, যেখানে নেটওয়ার্ক সংযোগ অত্যন্ত দুর্বল।

আবহাওয়া অ্যাপ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট সেসব সম্প্রদায়ের জন্য তেমন কাজে আসে না।

এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সহযোগিতায় নতুন পদ্ধতি পরীক্ষা করছে পাকিস্তান আবহাওয়া অধিদপ্তর।

ইসলামাবাদ থেকে পাকিস্তান আবহাওয়া অধিদপ্তর উত্তর পাকিস্তানের হিমবাহ উপত্যকায় স্থাপন করা সাইরেন সক্রিয় করতে পারে, যেসব এলাকা হিমবাহ হ্রদ ভেঙে প্রবল বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে।

তবে কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন, এটি কোনো চূড়ান্ত সমাধান নয়, এ বছরের ক্ষয়ক্ষতিই তার প্রমাণ।

শহরে, গ্রামে কোথাও আইন মানা হচ্ছে না

"রিভার প্রটেকশন অ্যাক্ট"সহ কয়েকটি আইন আছে, যা নদী বা তার উপনদীর ২০০ ফুট ব্যাসার্ধের মধ্যে নির্মাণ নিষিদ্ধ করে প্রণয়ন করা হয়েছে। কিন্তু মানুষ এই আইন না মেনে এসব এলাকায় নতুনভাবে বাড়ি নির্মাণও চালিয়ে গেছে।

"আপনি গ্রামগুলোকে মুছে ফেলতে চাইছেন," বলেন ড. খান। তিনি আরও যোগ করেন যে মানুষ এই নদীর ধারে দশকের পর দশক ধরে বসবাস করছে এবং আইন কার্যকর করা প্রায় অসম্ভব।

ড. খান বলেন, আইন প্রণেতারা এই সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি বিবেচনা করেননি।

তিনি বলেন, জনগণকে স্থানান্তরিত করার জন্য উপজাতীয় কাউন্সিলের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত ছিল। এই উপজাতীয় কাউন্সিল স্থানীয়ভাবে জিরগা নামে পরিচিত।

তিনি আরও বলেন, যদি বিকল্প আবাসন ও আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ ও অর্থায়ন না করা হয়, তাহলে এটি 'প্রায় অসম্ভব'।

শহুরে এলাকায়ও নির্মাণ সংক্রান্ত আইন লঙ্ঘিত হচ্ছে। পাকিস্তানের বাণিজ্যিক রাজধানী করাচিতে সাম্প্রতিক বন্যার সময় প্রশাসনকে সরকারি ছুটি ঘোষণা করতে হয়েছে।

এ পর্যন্ত, দেশের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (এনডিএমএ) জানিয়েছে, এই বছরের মৌসুমি বৃষ্টির ফলে ঘটে যাওয়া মৃত্যুর প্রায় ৩০ শতাংশই ঘটেছে ভেঙে পড়া বাড়ি থেকে।

কাপড়ে ঢাকা কয়েকটি মৃতদেহ নিয়ে যাচ্ছেন গ্রামের বাসিন্দারা

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, প্রাণহানির কেন্দ্র হলো খাইবার পাখতুনখোয়া, তবে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরেও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে অনেক

জলবায়ু সহনশীল স্থাপত্য বিশেষজ্ঞ ড. ইয়াসমিন লারী বলেন, "কেউই আইন মেনে চলে না। প্রতিটি রাস্তা এখন সরু হয়ে আসছে।"

করাচি শহরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বেশ করুণ।

শহরে শতাধিক ড্রেইন সিস্টেমের খাল থাকলেও, এসব হয় আরও সংকীর্ণ হয়েছে, অথবা এসব খালের ওপর অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে।

সিন্ধ প্রদেশের আবাসন মন্ত্রী সাইদ ঘানি বলেন, "নতুন পানি নিষ্কাশন খাল তৈরি করার জন্য স্থান খুঁজে পাওয়াই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যখন তারা দোকান বা অবৈধ স্থাপনা সরানোর চেষ্টা করেছেন, আদালতে তা আটকে দেওয়া হয়েছে।"

সিন্ধ প্রদেশের নতুন আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় আছে বলে জানান সাঈদ ঘানি।

এতে আইনের ফাঁকফোকর বন্ধ করা হবে এবং সিন্ধ ভবন নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের দায়ী করা হবে, যদি তারা নিয়ম লঙ্ঘন করে কোনো স্থাপনা নির্মাণ অনুমোদন দেন।

বন্যার পানির স্রোতের মধ্যেই ভেঙে যাওয়া রাস্তা দিয়ে চলাচল করছে মানুষজন ও যানবাহন

ছবির উৎস, Anadolu via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, প্রতিবছরই পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে পাহাড়ি এলাকায় বন্যা হচ্ছে, তবে ক্ষয়ক্ষতি ফেরানো যাচ্ছে না

রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ

পাকিস্তানের ভঙ্গুর শাসন ব্যবস্থার ব্যয়ের হিসাব দেখলে বোঝা যায়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে আরও সহায়তা পাওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে।

ধারাবাহিক পতন থেকে রক্ষা পেতে আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভর করেছে পাকিস্তানের দুর্বল অর্থনীতি।

একের পর এক সরকার তাদের জলবায়ু কর্মসূচির জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা চাওয়াকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। তারা বছরের পর বছর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের কাছ থেকেও অর্থায়ন নিশ্চিত করেছে।

কপ২৭ জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলনে পাকিস্তানের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ছিল, ২০২২ সালের বন্যার ক্ষয়ক্ষতি তখনও সকলের মনে তাজা ছিল, যা প্রায় ৩৩ মিলিয়ন মানুষকে প্রভাবিত করেছিল।

পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশ দাবি জানিয়েছিল লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড প্রতিষ্ঠার জন্য, যাতে জলবায়ু দুর্যোগে আক্রান্ত দেশগুলোকে সহায়তা করা যায়।

দেশের ভেতরেও প্রাকৃতিক বন্যা প্রতিরোধ করার জন্য বনায়ন কর্মসূচি চালু হয়েছে।

২০২৩ সালে সরকার ন্যাশনাল অ্যাডাপ্টেশন প্ল্যান শুরু করেছে, যার লক্ষ্য সারাদেশে একটি রোডম্যাপ তৈরি করা।

কিন্তু এত রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সরকার পরিবর্তনের মধ্যে এই কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়াটাই বেশ কঠিন একটা কাজ।

বন্যার পানির ওপর দিয়ে যাচ্ছে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা যার মধ্যে পাকিস্তানের একটি পতাকা উড়ছে, পেছনে দেখা যাচ্ছে কয়েকটি বাড়ি

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পাকিস্তানে এ বছরও ৮০০ জনের মতো মানুষ মারা গেছে বন্যায়

কর্মকর্তাদের সাথে হোক কিংবা জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে, অথবা এই চরম আবহাওয়ার শিকার প্রত্যক্ষ মানুষদের সঙ্গে হোক, মোটামোটি সব বৈঠকের শেষে এক ধরনের হতাশার ছায়া লক্ষ্য করা যায়।

"দারিদ্র্য সবচেয়ে বড় সমস্যা," বলেন ড. লারী।

যতটুকু সমাধান তারা বলেছেন, তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন যথেষ্ট অর্থ, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, ফেডারেল সরকার বা প্রাদেশিক বাজেটের মাধ্যমে। কিন্তু অর্থের অভাবে তা কার্যকর করা কঠিন।

একটি উন্নত পূর্বাভাস ব্যবস্থা, নিরাপদ স্থানে নতুন বাড়ি, জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো, সবকিছুই অর্থায়ন প্রয়োজন।

এ পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি এই বছরের শতাধিক প্রাণহানিকে থামাতে পারেনি।

"সব সিদ্ধান্ত একেবারে ওপর থেকে আসে," ব্যাখ্যা করেন ড. লারী।

তার মতে, সরকারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হয়েছে, কিন্তু যথাযথ ফলাফল মেলেনি।

যদি পাকিস্তানের পক্ষে এসব অর্থায়ন করা সম্ভব না হয়, সেক্ষেত্রে তাদের উচিত জনগণকে শিক্ষিত করার ওপর জোর দেওয়া এবং নিচ থেকে শুরু করে একটি 'দারিদ্র্য মুক্তির সিঁড়ি' তৈরি করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

ড. লারী নিজের কাজ দেখিয়ে বলেন, জার হাজার গ্রামে তিনি জলবায়ু সহনশীল বাড়ি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং বৃক্ষরোপণ সম্পর্কিত জ্ঞান ছড়িয়ে দিচ্ছেন।

এদিকে, এ বছরের মৌসুমি বৃষ্টি শেষ হয়নি, শোক ও ক্ষতির প্রভাবও কমেনি।

সোয়াবি জেলায় সেই গ্রামে, উদ্ধারকাজের মাত্র কয়েক মিটার দূরে একটি শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হচ্ছিল।

একসাথে প্রার্থনা করা হচ্ছিল, যখন দেশ আরও ভারী বৃষ্টি ও বিপদের সতর্কবার্তার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে তারা সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে।