বয়সের আগেই মাসিক হওয়ার কারণ কী?এটা স্বাভাবিক নাকি সতর্ক সংকেত?

    • Author, সানজানা চৌধুরী
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা

পিরিয়ড, মেন্সট্রুয়েশন, মাসিক বা ঋতুস্রাব যেটিই বলুন না কেন প্রতিটি মেয়ের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধির যাত্রায় এটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের মেয়েদের সাধারণত ১১ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে মাসিক শুরু হয়।

তবে ইদানীং অনেক অভিভাবকরাই জানিয়েছেন যে তাদের মেয়েদের মাসিক তার কয়েক বছর আগেই শুরু হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় রোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার মতে, ১২ বছর বয়সের আগে কারও প্রথম মাসিক হলে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় প্রিকশাস পিউবার্টি।

যার বাংলা অর্থ সময়ের আগেই বয়ঃসন্ধি।

গবেষণায় এখন পর্যন্ত এর নির্দিষ্ট কারণ জানা যায়নি। তবে এ ব্যাপারে চারটি 'সম্ভাব্য' কারণ ব্যাখ্যা করেছেন গবেষকরা।

আরো পড়তে পারেন:

টিউমার বা রোগব্যাধি

ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের তথ্যমতে, আমাদের মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস গ্রন্থি থেকে এক ধরণের হরমোন নিঃসরিত হয়, এর প্রভাবে মস্তিষ্কের পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে দুই ধরনের হরমোন নিঃসরিত হয় এবং এর প্রভাবে মেয়েদের ওভারি থেকে এস্ট্রোজেন নামের হরমোন নিঃসরিত হয়।

এগুলো সবই গ্রোথ হরমোন যা মাসিক চক্র নিয়ন্ত্রণের জন্য দায়ী।

যখন এসব হরমোন নিঃসরণ স্বাভাবিক থাকে তখন কোনও সমস্যা হয় না। কিন্তু হাইপোথ্যালামাস, পিটুইটারি বা ওভারির কোথাও যদি টিউমার হয়, তাহলে হরমোন নিঃসরণের ভারসাম্য হারিয়ে যায়।

কেননা টিউমার হয় যখন কোষ অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়ে। এতে ওই দুই গ্রন্থিসহ ওভারি থেকেও গ্রোথ হরমোনের নিঃসরণও বেড়ে যায়। যার ফলে অল্প বয়সে মাসিক শুরু হয়।

এছাড়া শিশুর মস্তিষ্কের কোনও টিস্যুতে ইনফেকশন থাকলে বা এনসোফেলাইটিস হলে, মাথায় বা মেরুদণ্ডে বড় ধরনের আঘাতের ট্রমা থাকলে বা টিউমার হলে,মস্তিষ্কে রেডিয়েশন পাওয়া গেলে, হাইপোথাইরয়েডিজম হলে, ওভারিতে টিউমার বা সিস্ট থাকলে, কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যা হলে বা জন্মের সময় শিশুর মাথায় পানি জমলে বা খিঁচুনি থাকলে অর্থাৎ হাইড্রোসেফালাস থাকলে পরবর্তী জীবনে সময়ের আগেই তাদের মাসিক হতে পারে।

তবে অল্প বয়সে মাসিক হওয়া মানেই যে শিশুর টিউমার আছে বা রোগব্যাধি হয়েছে সেটা বলা যাবে না। এটি কেবল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করবেন।

সময়ের আগে মাসিক হওয়ার পেছনে আরও কিছু কারণ থাকতে পারে। যার একটি হলো শিশুটির জীবনযাপন।

খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন

সাধারণত অনেক বেশি ক্যালোরিযুক্ত খাদ্যাভ্যাসের সাথে মাসিক কখন শুরু হবে তার একটি যোগ আছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এপিডেমিওলজি ও বায়োস্ট্যাটিস্টিকস বিভাগের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব মেয়েদের ওজন বেশি বা যারা স্থূল তাদের সঠিক ওজনের মেয়েদের তুলনায় আগে মাসিক হয়।

কেননা শরীরে ফ্যাট বা অ্যাডিপোজ টিস্যুর পরিমাণ বেশি থাকলে পিটুইটারি গ্রন্থি সময়ের আগেই সক্রিয় হয়ে ওঠে। যার কারণে ওভারি থেকে এস্ট্রোজেনের উৎপাদন বেড়ে যায়।

আরেকটি গবেষণা বলছে, ফ্যাটের কারণে শরীরে ‘লেপটিন’ নামক হরমোনটির পরিমাণ বেড়ে যায়। এই লেপটিন হরমোন এস্ট্রোজেন হরমোন নিঃসরণে ইন্ধন জোগায়।

শরীরের মেটাবোলিজম বা হজম প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের কারণেও এস্ট্রোজেন হরমোনে প্রভাব পড়ে। এছাড়া অতিরিক্ত মানসিক চাপ থেকেও এস্ট্রোজেন নিঃসরণ বাড়তে পারে।

এস্ট্রোজেন বাড়লে সময়ের আগে শিশুর বয়ঃসন্ধির বিভিন্ন লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে। যেমন স্তন বাড়তে থাকা, যোনিপথ বগলসহ বিভিন্ন স্থানে লোম গজানো, তাপমাত্রা বাড়া, কণ্ঠ বদলে যাওয়া, মুখে ব্রন ওঠা, খিটখিটে মেজাজ, ইত্যাদি।

এখনকার শিশুদের এই ওজন বেড়ে যাওয়ার একটি বড় কারণ হিসেবে চিকিৎসকরা বলছেন, শিশুরা আর আগের মতো ছোটাছুটি করে না বা তার সুযোগ পায় না।

বেশিরভাগই এখন মোবাইল বা কম্পিউটার নিয়ে পড়ে থাকে এবং প্রচুর হারে ট্রান্সফ্যাটযুক্ত খাবার যেমন চিপস, বিস্কিট, কেক সেইসাথে জাঙ্কফুড যেমন পিৎজা, বার্গার, কোমল পানীয়, ইত্যাদি খায়।

এভাবে শারীরিক কার্যকলাপ কমে যাওয়া এবং এমন ফ্যাটযুক্ত খাবার খাওয়া শিশুদের ওজন বাড়ার বড় কারণ বলে মনে করেন চিকিৎসকরা।

কোভিড মহামারিও বয়ঃসন্ধির উপর প্রভাব ফেলেছে বলে নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে।

ওইসময় ঘরে বসে থেকে অনেক শিশুর ওজন বেড়েছে যার ফলে সময়ের আগেই মাসিক হয়েছে অনেকের।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

ইডিসি

মাসিক আগে হওয়ার আরেকটি কারণ হিসেবে গবেষকরা বলেছেন পরিবেশে আগের চাইতে এন্ডোক্রাইন ডিসরাপ্টিং কেমিকেলস-ইডিসি বেড়ে যাওয়া।

এন্ডোক্রাইন সিস্টেম হলো মানবদেহের গ্রন্থি এবং অঙ্গগুলোর একটি জটিল নেটওয়ার্ক। এটি শরীরের হজম শক্তি, শারীরিক শক্তি, প্রজনন, বৃদ্ধি এবং বেড়ে ওঠা, ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করে।

আজকাল অনেক ভোক্তা পণ্য বিশেষ করে প্লাস্টিকের পাত্র, ভিনাইলের তৈরি মেঝে, বালিশ/কুশন, ইত্যাদিতে এই শ্রেণির রাসায়নিক, বিশেষ করে পেথালেটস, বিসফেনল-এ জাতীয় রাসায়নিক ব্যবহার হচ্ছে।

এগুলোকে বলা হয় এন্ডোক্রাইন ডিসরাপ্টিং কেমিকেলস, যা এন্ডোক্রাইন সিস্টেমের স্বাভাবিক কার্যকলাপে বাধা দেয়।

এতে শিশুর শরীরে এস্ট্রোজেন অর্থাৎ মাসিক হওয়ার হরমোন নিঃসরণের মাত্রা বেড়ে যায়। ফলাফল মাসিক শুরু হয় সময়ের আগেই।

আবার এস্ট্রোজেন যুক্ত ক্রিম, লোশন, মে-কাপ পণ্য, মলম, ইত্যাদি ব্যবহারের প্রভাবের কথাও উঠে এসেছে গবেষণায়।

জাতি, জেনেটিক্স ও শ্রেণি

জাতিগত বৈশিষ্ট্য মাসিক কখন শুরু হবে তার উপর বড় প্রভাব রাখে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে আফ্রিকান, আমেরিকান ও হিস্পানিক বংশোদ্ভূত মেয়েদের তুলনামূলক আগে মাসিক হয়।

এরপরই রয়েছে এশীয় অঞ্চলের মেয়েদের অর্থাৎ বাদামী বর্ণের মেয়েদের অবস্থান। ককেশীয়রা অর্থাৎ যারা শ্বেতাঙ্গ তাদের মাসিক তুলনামূলক দেরিতে শুরু হয়।

আবার বিরল জেনেটিক রোগ ম্যাককিউন-অ্যালব্রাইট সিনড্রোম বা অ্যাড্রিনাল হাইপারপ্লাসিয়া নামে জেনেটিক সমস্যা থাকলে হরমোনে ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়, এতে মাসিক আগে শুরু হয়ে যায়।

আবার যেসব পরিবারের মেয়েদের বিশেষ করে মায়ের যদি বয়সের আগেই মাসিক শুরুর ইতিহাস থাকে, তাদের পরবর্তী প্রজন্মের মেয়েদের ক্ষেত্রেও এমনটা হতে পারে।

আর্থ-সামাজিক অবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি আর জীবনযাত্রাও এক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রভাবক।

দেখা গিয়েছে স্বল্প আয়ের এবং সমাজের অপেক্ষাকৃত অবহেলিত স্তরে থাকা মেয়েরা দরিদ্রতা, অপুষ্টি, পারিপার্শ্বিক চাপ এবং পরিবেশগত নানা শিল্প রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসে, যা তার মাসিকের উপর প্রভাব ফেলে।

অন্যদিকে, সচ্ছল পরিবারের মেয়েদের ইডিসির সংস্পর্শে আসার আশঙ্কা বেশি যা আজকাল বহু গৃহস্থালির পণ্য ও প্রসাধনীতে পাওয়া যায়।

সময়ের আগে মাসিক শুরু হলে কী হয়?

যেসব মেয়েদের বয়সের আগেই বয়ঃসন্ধিকাল শুরু হয় তাদের পরবর্তী জীবনে প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়ার বড় ঝুঁকি থাকে বলে গবেষকরা জানিয়েছেন।

সেইসাথে পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম-পিসিওএস, এন্ডোমেট্রিওসিস, টাইপ টু ডায়বেটিস, হৃদরোগ, অস্টিওস্পোরোসিস বা হাড়ক্ষয় রোগ, ইউটেরাসে টিউমার এমনকি স্তন ও জরায়ু ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

সম্প্রতি এক গবেষণায় জানা গেছে, যেসব মেয়েদের ১০ বছর বয়সের আগে মাসিক শুরু হয় তাদের পরবর্তীতে টাইপ টু ডায়াবেটিসের ঝুঁকি ৩০ শতাংশ পর্যন্ত এবং ৬৫ বছর বয়সের আগে স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকাংশে বেড়ে যায়।

মাসিক সময়ের আগে হলে একটি মেয়ের সারা জীবনে ডিম্বস্ফোটন চক্র বা ওভুলেটরি সাইকেলের সংখ্যা বেড়ে যায়।

এতে লম্বা সময় ধরে তার শরীরে এস্ট্রোজেন নিঃসরণ হতে থাকে, যার কারণে আরও নানা ধরনের ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে বলে গবেষণায় দেখা গিয়েছে।

মাসিক যদি সময় মতো হয়, অর্থাৎ সময়ের আগে না হয়, তাহলে মেনোপজের আগে ও পরে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি চার থেকে আট শতাংশ কমে যায়।

ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্যমতে, বয়ঃসন্ধির পর শিশুর বৃদ্ধি ধীর হয়ে যায়, এতে অনেকে আর লম্বা হয় না। তবে চিকিৎসা নিলে তা স্বাভাবিক হয়ে আসতে পারে।

আবার সময়ের আগে মাসিক হওয়ায় অনেক শিশু মানসিক চাপ, বিষণ্নতা, উদ্বেগে ভোগে বলে জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মার্সিয়া হারম্যান-গিডেন্স।

কারণ তাদের প্রজননতন্ত্রের হয়তো বিকাশ হয়েছে কিন্তু তাদের জ্ঞানবুদ্ধি থাকে একটা শিশুর মতোই।

এজন্য তারা কীভাবে এই শারীরিক পরিবর্তন সামলে উঠবে তা বুঝে উঠতে পারে না। তারা মাসিক নিয়ে অনেক বিব্রত থাকে। অনেকে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

এতে তাদের রেজাল্ট খারাপ হতে থাকে, স্বাভাবিক কাজকর্মে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

আবার আমাদের সমাজে অনেকেই একটি মেয়ের মাসিক হলে তাকে পরিণত বলে ধরে নেয়। তখন তার সাথে সামাজিক আচরণে যে পরিবর্তন আসে, সেটিও শিশুটির মন মানসিকতায় বড় প্রভাব ফেলে।

বয়সের আগেই শারীরিক পরিবর্তন হওয়ায় এই মেয়েদের যৌন সহিংসতার মুখে পড়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে অভিভাবকদের সতর্ক হওয়া ভীষণ জরুরি।

করণীয়

সর্বপ্রথম যেটা জরুরি, ছোট থেকেই খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন ঠিক রাখা। শিশুকে ঘরে তৈরি সুষম পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানোর অভ্যাস করুন।

বাইরে খেলাধুলা করা বা শারীরিক শ্রম হয় এমন কাজে আগ্রহী করে তুলুন এতে তার ওজন, শরীর, মন সবকিছুতে ভারসাম্য থাকবে। এক কথায় শুয়ে বসে থাকা বা জাঙ্কফুড খাওয়ার অভ্যাস করা যাবে না।

আরেকটি বিষয়, শিশুকে এমন কোনও প্রসাধনী, ওষুধ বা মলম দেবেন না যাতে এস্ট্রোজেন রয়েছে।

বয়সের আগে মাসিক যদি হয়েই যায় তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন। চিকিৎসক এর সম্ভাব্য কারণ জানতে বিশেষত হরমোনের পরিস্থিতি জানতে রক্ত পরীক্ষা, টিউমার বা ইনফেকশন শনাক্তে তলপেটের আল্ট্রাসাউন্ড ও মস্তিষ্কের এমআরআই পরীক্ষা করাতে পারেন।

এছাড়া হাড়ের বৃদ্ধি শনাক্তে এক্স রে করানো হতে পারে। পরীক্ষায় পাওয়া ফলাফল অনুযায়ী চিকিৎসকরা পরবর্তী ব্যবস্থা নেবেন। শিশুর মেডিকেল ইতিহাস বা শিশুর পারিবারিক ইতিহাসও এখানে জরুরি বিষয়।

তবে সবচেয়ে জরুরি হলো শিশুদের আগে থেকেই মাসিক এবং বয়ঃসন্ধিকালীন পরিবর্তনের বিষয়ে ধারণা দেয়া। এক্ষেত্রে স্কুলকেও এগিয়ে আসার পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকরা।

তবে একটি বিষয়- শিশুদের সঠিক তথ্যগুলো বোঝাতে হবে শিশুদের মতো করেই। এতে তারা এই পরিবর্তনকে স্বাভাবিকভাবে নেবে, আতঙ্কিত হবে না, ভুল তথ্যে বিভ্রান্ত হবে না।

নিজের শরীরের যত্ন নিতে শিখবে, শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনগুলো মোকাবেলা করতে পারবে, এবং আরও জরুরি বিষয় - তারা যৌন সহিংসতা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে শিখবে।