‘ইন্ডিয়া’ জোটে থেকেও জোটের শরিকদের বিরুদ্ধেই কেন তোপ দাগছেন মমতা ব্যানার্জি?

ভারতে আসন্ন লোকসভা ভোটে বিজেপিকে হারাতে কংগ্রেস-সহ অনেকগুলি বিরোধী দল মিলে গঠন করেছে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টাল ইনক্লুসিভ অ্যালায়েন্স বা ‘ইন্ডিয়া' জোট। আর এখন সেই জোটের শরিকদের বিরুদ্ধেই একরাশ ক্ষোভ উগরে দিলেন জোটেরই গুরুত্বপূর্ণ শরিক তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী তথা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি।

ইন্ডিয়া জোটে তাকে ও তার দলকে যথেষ্ট ‘সম্মান’ দেওয়া হয় না। সেই জোটের নাম তিনিই দিয়েছিলেন, কিন্তু বৈঠক ‘নিয়ন্ত্রণ’ করে সিপিএম - এ কথা জানিয়ে সোমবার ‘ইন্ডিয়া জোটের’ শরিকদের বিরুদ্ধে তীব্র উষ্মা ব্যক্ত করেছেন তিনি।

রাম মন্দির উদ্বোধনের দিন (২২ শে জানুয়ারি) সর্বধর্ম সমন্বয়ের উপর জোর দিয়ে ‘সংহতি মিছিলের’ আয়োজন করেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। মিছিলের শেষে জনসভায় বিরোধী দল বিজেপিকে নিশানা দেগেছেন তিনি।

কিন্তু একই সঙ্গে বিজেপিকে ‘নির্মূল’ করতে তৈরি ‘ইন্ডিয়া জোটের’ অন্য শরিকদের বিরুদ্ধে সরাসরি ক্ষোভ প্রকাশ করতেও দ্বিধা করেননি তিনি।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বলেছেন, “বাংলাতে আমরা ইন্ডিয়া জোটের বৈঠক করি। জোটের নাম ইন্ডিয়া আমিই দিয়েছিলাম। এটা বলতে আমার খুব দুঃখ লাগে, বৈঠকে গিয়ে দেখি সেই বৈঠক নিয়ন্ত্রণ করছে সিপিএম। সেই সিপিএম - যার সঙ্গে আমার জীবনের ৩৪ বছর লড়াই করেছি, তাদের কোনও কথা আমরা মানব না।”

একই সঙ্গে আক্ষেপ জানিয়ে তিনি বলেছেন, “আমাদের খুব অসম্মান করা হয়।”

এই অভিযোগের উত্তরে দলীয় ‘সঙ্কীর্ণতা’ দূরে সরিয়ে রাখার আহ্বান জানিয়েছে কংগ্রেস। বরং যে লক্ষ্য নিয়ে ইন্ডিয়া জোট তৈরি, সে কথা তারা মনে করিয়ে দিয়েছে।

প্রবীণ কংগ্রেস নেতা প্রদীপ ভট্টাচার্য বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, “ইন্ডিয়া জোট তৈরি হয়েছে একটা রাজনৈতিক কারণে। সারা ভারতের মানুষের দিকে তাকিয়ে, বিশেষ করে দেশের ঐক্য এবং সংহতির দিকে তাকিয়ে।"

"দলীয় সংকীর্ণতাকেই যদি আমরা আদর্শ বলে মনে করি, তাহলে কিন্তু আগামী দিনে আমরা কোন পথে যাব কেউ বলতে পারব না। সুতরাং আমি আশা করব তৃণমূল তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে পুকুর থেকে সমুদ্রে নামবে”, বলেন মি ভট্টাচার্য।

আরও পড়তে পারেন:

‘জোটের’ বিরুদ্ধে ক্ষোভ

লোকসভা ভোটে আসন ভাগাভাগি থেকে শুরু করে ‘ইন্ডিয়া' জোটে কংগ্রেসের ভুমিকা-সহ একাধিক বিষয় নিয়ে একাধিকবার অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন মমতা ব্যানার্জি। সংহতি মিছিলের শেষে মঞ্চে দাঁড়িয়ে সে বিষয়েও সরব হয়েছেন তিনি।

সিপিএম এবং কংগ্রেস দুই দলকেই কটাক্ষ করেছেন।

দেখা যাচ্ছে, আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের আগে বিজেপি সরকার যখন অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণ, দুর্নীতি দমন-সহ একাধিক ইস্যুকে সামনে রেখে ভোট প্রচারে নেমে পড়েছে, বিরোধী ইন্ডিয়া জোট তখন নিজেদের মধ্যে আসন ভাগাভাগির সমীকরণ সমাধানে ব্যস্ত।

আসন্ন ভোটের লড়াইয়ে জোট কীভাবে লড়বে, সে বিষয়ে মতামত জানিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি। তার অভিযোগ, সে কথা মানা হয়নি।

কিন্তু ‘অসম্মান’ হওয়া সত্ত্বেও, তার দাবি বিজেপিকে হারাতে ‘ইন্ডিয়া জোটের’ প্রতি আস্থা রেখেছেন তিনি।

“আমাদের খুব অসম্মান করা হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও সমস্ত আঞ্চলিক দলের নেতৃত্বকে বলেছিলাম, যে রাজ্য যে দল শক্তিশালী, সেখানে সেই দলের হাতে ভোটের দায়িত্ব ছেড়ে দাও”, বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী।

অন্য দিকে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে আগামী লোকসভা ভোটে বিভিন্ন রাজ্যে শরিক দলগুলোর সঙ্গে আসন ভাগাভাগির জন্য পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গড়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জি-সহ ‘ইন্ডিয়া’র নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের দিনই এই পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গে।

কিন্তু তার মতামতকে ‘গুরুত্ব’ দেওয়া হয়না বলে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন তৃণমূলের সর্বোচ্চ নেত্রী।

তার কথায়, “আমি বলেছিলাম ৩০০ আসনে লড়াই হোক। তার পর বাকিদের সাহায্য করে দেব। তোমাদের কোনও সিটে আমরা লড়ব না। ওরা কি বলল? আমাদের যা মর্জি তাই করব। কিন্তু একটা কথা মনে রাখবেন, বিজেপিকে সাহায্য করবেন না। যদি বিজেপিকে সাহায্য করেন, তাহলে কেউ আপনাদের মাফ করবেন না। আর আমি তো করবই না।”

নাম না করে নিশানায় রাহুল গান্ধী

নাম না করেই রাহুল গান্ধীকে কটাক্ষও করেছেন তৃণমূল নেত্রী। এই মুহুর্তে ‘ভারত জোড়ো ন্যায় যাত্রা’তে ব্যস্ত রয়েছেন রাহুল গান্ধী।

সেই সফরের মাঝেই গতকাল (২২শে জানুয়ারি) অসমের নগাঁও জেলার শঙ্করদেব মন্দিরে যাওয়ার কথা ছিল তার। অভিযোগ, সে সময়ে পুলিশ বাধা দেয় তাকে।

সেই ঘটনারও পরোক্ষ উল্লেখ ছিল তৃণমূল নেত্রীর বক্তৃতায়।

নাম না করেই রাহুল গান্ধীকে কটাক্ষ করে মমতা ব্যানার্জি বলেন, “আমাদের লড়াই করার হিম্মত আছে কিন্তু এরা লড়াই করতে দেয় না। আমাদের হিম্মত রয়েছে বলে আমরা মিছিল বের করেছি।"

"কটা রাজনৈতিক দল মিছিল বের করার হিম্মত দেখিয়েছে? একটা মন্দির সফরে গিয়ে হয়ে গেল? আমরা তো মন্দির, মসজিদ, গুরুদ্বার, গির্জায় গিয়েছি। সব ধর্মকে নিয়েই তো চলেছি।”

প্রসঙ্গত, রাহুল গান্ধীর 'ভারত জোড়ো ন্যায় যাত্রা'র পশ্চিমবঙ্গের উপর দিয়ে যাওয়ার কথা আগামী বৃহস্পতিবার। এই সফরের বিষয়ে তৃণমূলের কাছ থেকে কোনও সমর্থন না পেয়ে, মহম্মদ সেলিমের নেতৃত্বে সিপিএমকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব।

কী বলছে কংগ্রেস

শরিক তৃণমূলের ‘অভিযোগ’ নস্যাৎ করেছেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর রঞ্জন চৌধুরী।

তার সঙ্গে মমতা ব্যানার্জির ‘বিভেদ’ অবশ্য নতুন নয়। প্রায়শই দুপক্ষ বাদানুবাদে জড়িয়েছেন।

সম্প্রতি অধীর রঞ্জন চৌধুরী বলেছিলেন, তৃণমূলের স্বার্থেই তাদের কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতার প্রয়োজন। তার মন্তব্য ছিল, ‘‘কংগ্রেসকে আপনার প্রয়োজন, মনে রাখবেন মমতা ব্যানার্জি। বাঁচতে গেলে আপনার প্রয়োজন হবে কংগ্রেসকে।’’

সে সময়ে পাল্টা জবাব নিয়েছিল তৃণমূলও।

গতকাল (২২ শে জানুয়ারি) অধীর রঞ্জন চৌধুরী সাংবাদিকদের আরও বলেন, “ইন্ডিয়া জোটে থাকলেও মোদী-শাহের সঙ্গে ওর (মমতা ব্যানার্জির) গোপন আঁতাত রয়েছে। সেই কারণেই উনি কখনও কংগ্রেসকে, কখনও রাহুলকে, কখনও বামেদের আক্রমণ করেছেন। এটা ওর পুরনো ছক।"

অন্য দিকে, সমস্ত ‘মনোমালিন্য’ ভুলে তৃণমূলকে প্রধান বিরোধী বিজেপির বিরুদ্ধে লড়ার বার্তা দিয়েছেন কংগ্রেসের প্রদীপ ভট্টাচার্য। একই সঙ্গে দু’টি রাজনৈতিক দলের দৃষ্টিভঙ্গি যে আলাদা হতে পারে সে কথা মেনে নিয়েও ‘এক লক্ষ্যের’ দিকে এগিয়ে যাওয়ার কথাও বলেছেন এই বর্ষীয়ান নেতা।

তার কথায়, “বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য, এই চিন্তাধারা নিয়েই তৈরি হয়েছিল এই জোট। সব রাজনৈতিক দলেরই একটা রাজনৈতিক ভাবভঙ্গি রয়েছে। দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা নিশ্চয়ই থাকতেই পারে। পতাকার রঙ যেমন আলাদা, দৃষ্টিভঙ্গিও আলাদা।”

বিজেপির ধর্মীয় মেরুকরণকে রুখতে, ‘ইন্ডিয়া জোটের’ সমস্ত শরিকদের একজোট হওয়ার উপর জোর দিয়েছেন তিনি।

তিনি বলেছেন, “কিন্তু একটা মৌলিক বিষয় যখন সামনে এসে দাঁড়ায়, যেটা জাতীয় সংহতিকে বিপন্ন করতে পারে, দেশের ঐক্য সংহতি কে বিপন্ন করতে পারে এবং দেশের অভ্যন্তরে বিভাজনের রাজনীতি তৈরি হতে পারে- তখন সেই বিভাজনকে প্রতিহত করার জন্য বাঁধ দেওয়া দরকার। আর সেটা তৈরি করতে গেলে সব দলগুলো যারা বিজেপির বিরুদ্ধে রয়েছে, তাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন।”

“সুতরাং, একটা ঐতিহাসিক প্রয়োজনে এই ইন্ডিয়া জোট তৈরি করা। সেই ইতিহাসের এই প্রয়োজনকে যদি আমরা অস্বীকার করি তাহলে আমরা ভুল করব”, বলেন প্রদীপ ভট্টাচার্য।

সিপিএমের বক্তব্য

অন্য দিকে, জোটের একাধিক বৈঠকে রাহুল গান্ধীর পাশে দেখা গিয়েছে সিপিএম পলিটব্যুরো সদস্য সীতারাম ইয়েচুরিকে। তাদের দল যে বিজেপি এবং আরএসএসের বিরুদ্ধে ‘ইন্ডিয়া জোটের’ অংশীদার হয়ে একত্রে লড়বে সে কথা সিপিএম স্পষ্ট করে দিয়েছে।

কিন্তু জোটে বামেদের ভুমিকা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন তৃণমূলের সর্বোচ্চ নেত্রী।

অভিযোগ করেছেন, বৈঠকে তাকে ‘অসম্মান’ করা হয়। এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, “উনি তো সিপিএমের থেকে সম্মান আশা করেন না!”

একই সঙ্গে তিনি যোগ করেছেন, “উনি তো বরং সিপিএমের বিরুদ্ধে আদাজল খেয়ে আরএসএসের সঙ্গে থেকেছেন। উনি সম্মান আশা করছেন কেন? আর উনি সম্মান চেয়েছেন সে কথাও তো কখনও বলেননি। তাই প্রশ্নই তো ওঠে না।”

বিজেপিকে ক্ষমতা থেকে সরানোর ক্ষেত্রে তৃণমূলের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মি চক্রবর্তী।

তার কথায়, “ওনার দুঃখের কারণ ইন্ডিয়া জোটে উনি গুরুত্ব পাচ্ছেন না। তার কারণ শুধু জোট নয়, পুরো দেশ বুঝে গেছে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তৃণমূলের কোনও বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। ওর স্পষ্ট করে দেওয়া উচিত বিশ্বাসযোগ্যতা আছে কিনা। আর যদি না থাকে তা হলে, সম্মান পাবেনই বা কেন!”

আরও পড়তে পারেন

কেন জোটের বিরুদ্ধে ক্ষোভ?

একাধিকবার তৃণমূল নেত্রীর গলায় ইন্ডিয়া জোটের শরিকদের বিরুদ্ধে নানান ‘অসন্তোষ’ প্রকাশ পেয়েছে। এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পুরো বিষয়টিকে ‘রাজনীতির খেলা’ ছাড়া আর কিছুই মনে করছেন না বিশ্লেষকেরা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং অধ্যাপক ড. বিশ্বনাথ চক্রবর্তী বলেন, “রাজনীতি এখন পোস্ট ট্রুথ-এর উপর চলে। যার মানে, সামান্য সত্যি থাকবে এবং বাকিটা মিথ্যে মিশিয়ে ন্যারেটিভ তৈরি করা। এটাই কিন্তু এখন রাজনীতি।”

'ইন্ডিয়া' জোটে তৃণমূলের অবস্থানের বিষয়ে তিনি বলেছেন, “তৃণমূল জাতীয় স্তরে বিজেপিকে কখনওই চ্যালেঞ্জ করবে না। বরং তারা এই জোটের মধ্যে একটা গণ্ডগোল তৈরি করতে চাইছে। যেটা তারা ইতিমধ্যে শুরু করে দিয়েছে।"

"কিন্তু তৃণমূলের একটা ভয় আছে, পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানরা কংগ্রেস এবং সিপিএমকে কিছুটা ভোট দিতে পারে। যাতে ওই দু’টি দলকে মুসলমানরা ভোট না দেয়, তাই তাদের কাছে সরাসরি এই বার্তা দিতে চাইছে, যে সিপিএম এবং কংগ্রেস বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বিষয়ে সিরিয়াস নয়। যদিও ব্যাপারটা ঠিক উল্টো”, বলেন বিশ্বনাথ চক্রবর্তী।