আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে যেসব মামলা বিচারাধীন রয়েছে
- Author, জান্নাতুল তানভী
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
গত পাঁচই অগাস্ট শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে থাকা বেশ কিছু মামলা একে একে খারিজ হয়েছে। এরই মধ্যে নাশকতা ও মানহানির ২৩টি মামলা খারিজ হয়েছে।
মূলত খালেদা জিয়ার যে দুইটি মামলা নিয়ে বেশি আলোচনা সে দুটি হলো জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা।
কারণ এই দুই মামলাতেই কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়েছে মিজ জিয়াকে।
সোমবার জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় হাইকোর্টের দেয়া ১০ বছরের কারাদণ্ড স্থগিত করেছে আপিল বিভাগ।
এর আগে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পরদিনই দুর্নীতির এ দুইটি মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা মওকুফ করেছিলেন রাষ্ট্রপতি।
খালেদা জিয়াকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে অন্য আরেকটি দুর্নীতি মামলা থেকে। বিচারিক আদালতে কার্যক্রম চলছে আরও দুইটি দুর্নীতির মামলার।
খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা জানান তার বিরুদ্ধে মোট ৩৭টি মামলা ছিল। এর মধ্যে বেশিরভাগই নাশকতা ও মানহানির মামলা।
আর বেশিরভাগ মামলাই হয়েছে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। শুধুমাত্র দুইটি মামলায়ই খালেদা জিয়ার সাজা হয়েছিল।
মিজ জিয়ার আইনজীবী কায়সার কামাল বিবিসি বাংলাকে বলেন, “রাষ্ট্রপতি পাঁচই অগাস্টের পর সব রাজনৈতিক দলের, সুশীল সমাজ ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র নেতৃবৃন্দের অনুরোধের প্রেক্ষিতে যে দুইটি মামলায় অন্যায়ভাবে সাজা দেয়া হয়েছিল সেগুলো মওকুফ করে দিয়েছেন।”
রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন পাঁচই অগাস্টের পর খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে থাকা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুইটি দুর্নীতি মামলার সাজা মওকুফ করলেও আদালতের মাধ্যমে এসব মামলা নিষ্পত্তি করা হবে বলে জানিয়েছেন মি. কামাল।
এই মুহূর্তে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে যেসব মামলা রয়েছে ও এগুলোর বর্তমান বিচারিক অবস্থা সম্পর্কে তুলে ধরা হয়েছে এ প্রতিবেদনে।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা
সোমবার জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় হাইকোর্টের দেয়া ১০ বছরের কারাদণ্ড আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত করেছে আপিল বিভাগ।
একইসঙ্গে খালেদা জিয়ার করা দুইটি লিভ টু আপিল গ্রহণ করে তাকে আপিল দায়েরের অনুমতি দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত। দুই সপ্তাহের মধ্যে আপিলের সার সংক্ষেপ জমা দেয়ার নির্দেশও দেয়া হয়েছে।
খালেদা জিয়ার আইনজীবী মি. কামাল বিবিসি বাংলাকে বলেন, “ এই প্রক্রিয়ার অংশীজন প্রত্যেকের প্রতি কৃতজ্ঞতা কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং আদালতের প্রতি আস্থাশীল। তিনি আদালতের মাধ্যমে আইনগত প্রক্রিয়ায় ওনার মামলা নিষ্পত্তি করতে চান”।
“এরই অংশ হিসেবে হাইকোর্ট ডিভিশন ও এপিলেট ডিভিশনে গিয়েছি। আমরা আইনজীবীরা মামলা মোকাবেলা করছি” বলেন মি. কামাল।
২০০৮ সালে তৎকালীন সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে এই মামলাটি করে দুর্নীতি দমন কমিশন।
এই মামলাতেই সাজা পেয়ে দুর্নীতির দায়ে প্রথমবারের মতো কারাগারে যেতে হয় খালেদা জিয়াকে।
এর আগে তাকে অন্তরীণ হতে হয়েছিল রাজনৈতিক কারণে।
২০১৮ সালের আটই ফেব্রুয়ারি পুরনো ঢাকার বিশেষ আদালতের বিচারক খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন। ওইদিনই কারাগারে যান তিনি।
সেই থেকে প্রায় ছয় বছরের বেশি সময় কারাবন্দী ছিলেন মিসেস জিয়া।
এ মামলার অভিযোগ ছিল, এতিমদের জন্য বিদেশ থেকে পাওয়া দুই কোটি ১০ লাখের বেশি টাকা প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের দেয়া হলেও, তা এতিম বা ট্রাস্টের কাজে ব্যয় করা হয় নি। বরং সেই টাকা নিজেদের হিসাবে জমা রাখার মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে।
রায়ে খালেদা জিয়ার একমাত্র জীবিত সন্তান তারেক রহমান, যিনি এখন ব্রিটেনে বসবাস করছেন এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত প্রধানের দায়িত্বও পালন করছেন, তাকেও দশ বছর কারাদণ্ড দেয়া হয়।
মামলাটির তদন্ত শেষ হয়ে অভিযোগপত্র দেয়া হয়েছিলো ২০০৯ সালে, কিন্তু আদালতে অভিযোগ গঠন হয় ২০১৪ সালের মার্চ মাসে।
বকশীবাজারের বিশেষ জজ আদালতে এই মামলার বিচার কার্যক্রম চলে। এর মধ্যে ৩২ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন এবং ১৬ দিন ধরে যুক্তিতর্ক চলেছে।
আদালতে হাজির না হওয়ায় কয়েকবার খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করা হয়েছিল।
বিচারিক আদালতের সাজার বিরুদ্ধে খালেদা জিয়ার আপিল খারিজ হয়ে যায় হাইকোর্টে। আর সাজা বৃদ্ধি চেয়ে দুদকের করা আবেদন মঞ্জুর করে হাইকোর্ট।
মিসেস জিয়ার সাজা পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে দশ বছর করে হাইকোর্ট। পরে এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যান তিনি।
জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা
২০১১ সালের অগাস্টে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে এ মামলাটি করে দুদক।
এ মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় তিনি তার ক্ষমতা অপব্যবহার করে এই ট্রাস্টের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছেন।
ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে তিন কোটি ১৫ লাখ টাকা লেনদেন করা হয়েছে বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ টাকার কোন উৎস তারা দেখাতে পারেন নি বলে অভিযোগ করা হয়।
২০১৪ সালের মার্চ মাসে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এ মামলার বিচার কাজ শুরু হয়।
২০১৮ সালের ২৯শে অক্টোবর এই মামলাটির রায় ঘোষণা করে বিশেষ আদালত। খালেদা জিয়াকে সাত বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয় এ মামলায়।
বিচারিক আদালতের এ রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল শুনানির জন্য হাইকোর্টে বিচারাধীন রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি এ মামলার সাজা মওকুফ করলেও আইনীভাবেই মোকাবেলা করা হবে বলে জানান খালেদা জিয়ার আইনজীবী মি. কামাল।
“আপিল শুনানির জন্য এ মামলার পেপারবুক প্রস্তুত। আশা করছি শিগগিরই শুনানি হতে পারে” বলেন মি. কামাল।
নাইকো দুর্নীতি মামলা
কানাডার জ্বালানী কোম্পানি নাইকোর সঙ্গে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের চুক্তি করে রাষ্ট্রের প্রায় ১০,০০০ কোটি টাকা ক্ষতি করার অভিযোগে এই মামলাটিও হয় ২০০৮ সালে সেনা-সমর্থিত সরকারের সময়।
মামলায় শেখ হাসিনাকেও আসামী করা হয়েছিল, কারণ এই চুক্তিটি প্রথম করা হয়েছিল ১৯৯৬ সালে যখন তিনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
পরে ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর আদালত শেখ হাসিনাকে এই মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়।
তবে মামলাটি রয়ে যায় এবং আসামী হিসাবে থেকে যান খালেদা জিয়া।
মিসেস জিয়ার আইনজীবী কায়সার কামাল জানান এ মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে।
গ্যাটকো দুর্নীতি মামলা
ঢাকার কমলাপুরে কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের কাজ যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে গ্যাটকো নামে একটি কোম্পানিকে দেওয়ার অভিযোগে এই মামলাটিও হয় ২০০৭ পরবর্তী সেনা-সমর্থিত সরকারের সময়।
মিজ জিয়ার আইনজীবী মেজবাহ উদ্দীন জানান সম্প্রতি অভিযোগ গঠনের শুনানির সময় এই মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন খালেদা জিয়া।
বড় পুকুরিয়া কয়লা খনি দুর্নীতি মামলা
খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ২০০৮ সালে এই মামলাটি করা হয়েছিল।
এই মামলার অভিযোগ ছিল - চুক্তিবদ্ধ কোম্পানি শর্ত ভেঙে সরকারের চোখের সামনে অতিরিক্ত এলাকায় কয়লা খনন করে রাষ্ট্রের ক্ষতি করেছে, এবং খালেদা জিয়া রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন।
এ মামলায় আগামী ২০শে নভেম্বর অভিযোগ শুনানি হবে বলে জানান মি. উদ্দীন।
মানহানি ও নাশকতার মামলা
দুর্নীতির পাঁচটি মামলা ছাড়াও খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আরও ৩২টি মামলা রয়েছে।
এর মধ্যে নাশকতা ও মানহানির মোট ২৩ টি মামলা এরই মধ্যে খারিজ হয়ে গেছে বলে জানান মিজ জিয়ার আইনজীবী মি. কামাল।
মি. কামাল জানান, “এসব মামলা খারিজ হয়েছে কারণ যিনি বাদী মামলা দায়ের করার পর আর কোন দিন আদালতে যান নি তারা। আবার অনেক বাদী মারাও গেছেন। মানহানি হয়েছে এটা বাদীকে আদালতে গিয়ে বলতে হয়”।
“কিন্তু মামলা করার পর বাদী আর আদালতেই যায় নি। আর এবি সিদ্দিক নামে আরেক বাদী মারা গেছেন। ফলে বিচারিক আদালত এসব মামলা খারিজ করে দিয়েছেন” বলেন মি. কামাল।
এছাড়া মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির অভিযোগে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলাও ছিল মিসেস জিয়ার বিরুদ্ধে।
তার আরেকজন আইনজীবী মেজবাহ উদ্দীন বিবিসি বাংলাকে বলেন, “ রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় বিচারিক আদালতে অভিযোগ আমলে নেয়ার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আবেদন করা হয়েছিল। হাইকোর্ট খালেদা জিয়াকে মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়েছে। উচ্চ আদালতে একটি হত্যা মামলা থেকেও অব্যাহতি পেয়েছেন তিনি”।
মিজ জিয়ার আইনজীবীরা জানান দুর্নীতির একটি মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়ায় তার বিরুদ্ধে এখন শুধু দুর্নীতির চারটি মামলা রয়েছে।