ফুটপাতের দোকানে অ্যাপ পেমেন্ট, 'ক্যাশলেস বাংলাদেশ' করার চেষ্টা

বুধবার প্রথম দিনে নগদ-বিহীন লেনদেন করছেন একজন ক্রেতা
ছবির ক্যাপশান, বুধবার প্রথম দিনে মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে পণ্য কিনছেন একজন ক্রেতা
    • Author, সায়েদুল ইসলাম
    • Role, বিবিসি বাংলা নিউজ

মতিঝিলের শাপলা চত্বরের কাছে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ট্রাউজার দেখছিলেন ফিরোজ হোসেন। দরাদরির করে দাম ঠিক করার পর দেখা গেল, তার কাছে দুইশ টাকা কম আছে।

একটু পরে তিনি সদ্য চালু হওয়া ক্যাশলেস লেনদেনের কিউআর কোড ব্যবহার করে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের অ্যাপ দিয়ে দাম শোধ করলেন।

‘’আগেও বিকাশ বা রকেট দিয়ে কেনাকাটার বিল দিয়েছি। কিন্তু এরকম ফুটপাতের দোকানে অবশ্য দেয়া হয়নি। আজকে জাস্ট (কিউআর) কোডের ওপর ক্যামেরা ধরেই বিল দেয়া হয়ে গেল। কাজটা সহজ হয়েছে,’’ বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন ফিরোজ হোসেন।

নগদ টাকায় লেনদেন কমিয়ে ডিজিটাল পদ্ধতিতে আর্থিক লেনদেনে উৎসাহিত করার জন্য একটি উদ্যোগ শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর নাম দেয়া হয়েছে ক্যাশলেস লেনদেনের প্রচারণা।

বাংলাদেশে বহুদিন ধরেই বড় দোকানগুলোয় মোবাইল অ্যাপ, মোবাইলে আর্থিক সেবা বা ক্রেডিট কার্ড দিয়ে লেনদেন করা যায়। কিন্তু ফুটপাতের এসব দোকানগুলোয় এই সুবিধা ছিল না।

এসব ব্যবসায়ীকে ডিজিটাল লেনদেনে উৎসাহিত করার জন্য বুধবার মতিঝিল থেকে এই উদ্যোগ শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

মতিঝিল ও দিলকুশার ফুটপাতের অনেক দোকানে এভাবে নগদবিহীন লেনদেনের সুবিধা রয়েছে
ছবির ক্যাপশান, মতিঝিল ও দিলকুশার ফুটপাতের অনেক দোকানে এভাবে নগদবিহীন লেনদেনের সুবিধা রয়েছে

প্রথম দিনে যা দেখা গেল

মতিঝিল ও দিলকুশা ঘুরে দেখা গেল, বুধবার শাপলা চত্বরের আশেপাশে মতিঝিল ও দিলকুশার শতাধিক দোকানে ক্যাশলেস বা নগদবিহীন লেনদেনের ব্যাপার, ছাতা ও কিউআর কোড সম্বলিত স্টিকার ঝুলছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগে যেসব ব্যাংক বা আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে, তাদের পক্ষ থেকেই এগুলো দেয়া হয়েছে।

জামাকাপড় বিক্রেতা আবদুল মান্নান মিয়া বলছিলেন, ‘’ব্যাংকের লোকজন এসে এগুলো দিয়ে গেছে। আর একটা কার্ড দিছে। বলছে, তাদের যেকোনো এটিএম বুথে ঢুকে এটা দিয়ে টাকা বের করতে পারবো। ‘’

বেসরকারি একটি ব্যাংকের ভিসা কার্ড দেয়া হয়েছে মান্নান মিয়াকে। এজন্য তাকে কোন টাকাপয়সা দিতে হয়নি। তবে ব্যাংকের বাৎসরিক নানা চার্জ দিতে হবে।

‘’তয় মানুষ বেশি নগদ টাকা দিয়ে কিনতেছে। কেউ কেউ অবশ্য জিজ্ঞেস করে, এটা কি? হয়তো আস্তে আস্তে মানুষ আগ্রহী হবে। ‘’ তিনি বলছেন।

তার একটু দূরেই জুতা-স্যান্ডেল ও বেল্ট বিক্রি করেন আনোয়ার হোসেন। একটু আগেই একজন এই কিউআর কোড দিয়ে তাকে একটা পেমেন্ট দিয়েছে।

‘’অনেক সময় মানুষ নানা জিনিস কিনতে এসে দেখে পকেটে ততো টাকা নাই। আমার অনেক কাস্টমার একশো-দুইশ টাকার জন্য ফেরত গেছে। এখন এইটা থাকলে তারা নগদ টাকা না থাকলেও মোবাইল দিয়ে জিনিসপত্র কিনতে পারবো। আমার তো কোন ক্ষতি নাই, খরচ নাই। আর নগদ টাকাও টাকা, আর এইটাও তো আমার হিসাবেই থাকতেছে,’’ - বলছিলেন আনোয়ার হোসেন।

ক্যাশলেস লেনদেনে সুবিধা থাকলেও নগদ টাকায় বেচা-বিক্রি করতেও তাদের কোন বাধা নেই।

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

একটি কাপড়ের দোকানে বাচ্চাদের জন্য কাপড় দেখছিলেন মোঃ মঞ্জু। তিনি বললেন, ‘’আমার কাছে তো নগদ টাকা আছে। অ্যাপ আমার লাগবে না। তবে কোন সময় টাকার শর্ট পড়লে হয়তো এটা ব্যবহারও করতে পারি।‘’

ক্ষুদ্র দোকানগুলোর বিক্রেতাদের সাথে কথা বলে জানা গেল, বিভিন্ন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে যোগাযোগ করে তাদের নামে একাউন্ট খোলা হয়েছে। এরপর সেখান থেকেই কাউকে এটিএম কার্ড, কারও বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের একাউন্ট খুলে দেয়া হয়েছে।

মোবাইলের যেকোনো আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানের অ্যাপ খুলে এই কিউআর কোড স্ক্যান করলেই বিক্রেতার নাম, ছবি, একাউন্ট নাম্বারসহ বিস্তারিত আসে। এরপর সেখানে টাকার অংক বসিয়ে সেন্ড করে দিলেই বিক্রেতার হিসাবে টাকা চলে যাবে।

এসব দোকানের মধ্যে রয়েছে জামা-কাপড়, জুতা, গৃহস্থালি সরঞ্জাম, শুটকির দোকান, আনারস বিক্রেতা, চায়ের দোকান রয়েছে।

বুধবার উদ্বোধন হলেও বিক্রেতাদের অনেকের এখনো পুরো বিষয়টি নিয়ে ভালো ধারণা নেই।

আনারস বিক্রেতা মফিজুল ইসলামকে কিউআর কোড, ব্যানার দিয়ে যাওয়া হলেও কীভাবে এটি কাজ করে, কীভাবে তিনি ক্রেতাদের কাছ থেকে টাকা পাবেন, সেই টাকা কীভাবে নগদে রূপান্তর করবেন, তা নিয়ে তার কোন ধারণাই নেই। তাকে কেউ এ বিষয়ে কোন প্রশিক্ষণও দেয়নি।

একটি ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলছেন, অনেকটা তাড়াহুড়া করে তাদের এই কাজটি শুরু করতে হয়েছে। ফলে যথেষ্ট প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ ও বিক্রেতাদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

অনেক গ্রাহক অবশ্য নগদ অর্থেই লেনদেন করতে পছন্দ করছেন।
ছবির ক্যাপশান, অনেক গ্রাহক অবশ্য নগদ অর্থেই লেনদেন করতে পছন্দ করছেন।

ক্যাশলেস বাংলাদেশ প্রকল্প

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য নগদবিহীন লেনদেন চালু করতে বাংলাদেশ ব্যাংক যে উদ্যোগ নিয়েছে, তাতে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসগুলোর পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রধান সারির একাধিক ব্যাংকও অংশ নিয়েছে।

তাদের মোবাইল সেবার অ্যাপ ব্যবহার করে এই উদ্যোগের অংশ হওয়া যাবে। সেই সাথে রয়েছে ভিসা ও মাস্টার কার্ডের মতো সেবা প্রতিষ্ঠান।

অন্য মোবাইল সেবার সঙ্গে এর পার্থক্য হলো, এতদিন কোন একটি ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক সেবার অ্যাপ দিয়ে শুধুমাত্র সেই প্রতিষ্ঠানের কিউআর কোডে গ্রাহক পেমেন্ট করতে পারতেন।

কিন্তু এই উদ্যোগে বিক্রেতার কাছে থাকা কিউআর কোডে যেকোনো ব্যাংক বা মোবাইল সেবার অ্যাপ দিয়েই পেমেন্ট করা যাবে। আপাতত এখানে ১০টি ব্যাংক ও কয়েকটি এমএফএস প্রতিষ্ঠান যুক্ত রয়েছে।

বাংলাদেশে এখন ১৭কোটির বেশি মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের হিসাব রয়েছে। তবে সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা এর প্রায় অর্ধেক বলে ধারণা করা হয়। কারণ অনেকের একই নম্বরে একাধিক হিসাব রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, ছোট ছোট এসব দোকানকে নগদ অর্থে লেনদেনে উৎসাহিত করার মাধ্যমে আসলে ক্রেতা-বিক্রেতা এ ধরনের ব্যবস্থার প্রতি আগ্রহী করে তোলা হচ্ছে। এর মাধ্যমে এই ক্ষুদ্র বিক্রেতাদের বিল গ্রহণ পদ্ধতিকে ডিজিটাল এবং প্রাতিষ্ঠানিক করে তোলা হবে।

আপাতত অল্প কিছু দোকানকে এর আওতায় আনা সম্ভব হলেও পরবর্তীতে তা আরও বাড়ানো হবে।

ভিডিওর ক্যাপশান, কথা দিয়ে হিসাব রাখার প্রযুক্তি বাংলাদেশে

এসব সেবায় কী লাভ হবে

যেসব ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, এর ফলে তাদের সেবার আওতার পাশাপাশি তাদেরও ব্যবসা বাড়বে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মেজবাউল হক বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ‘’প্রান্তিক যে ব্যবসায়ীরা আছেন,তাদের প্রযুক্তিনির্ভর লেনদেনে মধ্যে আনা সম্ভব হচ্ছিল না। এই উদ্যোগের মাধ্যমে লো-কস্ত একটি পদ্ধতি ব্যবহার করে আমরা তাদের প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল লেনদেনের আওতায় নিয়ে আসতে চাইছি। ফলে এই প্রান্তিক ব্যবসায়ীরা ব্যাংকিং সিস্টেমের সঙ্গেও অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারবেন। এর মাধ্যমে ক্যাশলেস বাংলাদেশ গড়ার যে লক্ষ্য আছে আমাদের, সেটাও অর্জিত হবে।‘’

তবে একাধিক দোকান ঘুরে দেখা গেছে, বিকাশের মতো কোন কোন অ্যাপ অন্য ব্যাংকের কিউআর কোডে কাজ করছে না।

তবে কর্মকর্তারা বলছেন, প্রযুক্তিগত কিছু কারণে এই সমস্যা হচ্ছে, সেটা কিছুদিনের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে।

কিন্তু এই উদ্যোগে এখনো বাংলাদেশের সব ব্যাংকের অ্যাপ বা মোবাইলে আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি। নগদের মতো বড় আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানও রয়ে গেছে এখনো এই উদ্যোগের বাইরে।

জনতা ব্যাংকের সামনের এই গলির মতো এখনো অসংখ্য দোকান রয়েছে এই সেবার বাইরে।
ছবির ক্যাপশান, জনতা ব্যাংকের সামনের এই গলির মতো এখনো অসংখ্য দোকান রয়েছে এই সেবার বাইরে।

এখনো অনেক দোকান রয়েছে সেবার বাইরে

বুধবার মতিঝিল ও দিলকুশা এলাকার শতাধিক দোকানে নগদবিহীন লেনদেনের সেবা চালু হলেও এখনো অসংখ্য দোকান রয়েছে এই সেবার বাইরে।

মতিঝিলের জনতা ব্যাংকের পাশের গলির একটি দোকানের বিক্রেতা সাজাহান বলছিলেন, ‘’আমরা তো এই রকম কিছুর কথা শুনি নাই। আমাদের সঙ্গে কেউ তো যোগাযোগও করে নাই।‘’

আবার জুতা বিক্রেতা মোঃ মঞ্জু এতে অংশ নিতে চাইলেও তাকে এখনো কোন কোড বা একাউন্টের তথ্য দেয়া হয়নি।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলেছেন, আপাতত প্রচারণামূলকভাবে এই উদ্যোগ শুরু হয়েছে।

তাদের কথায়, পরীক্ষামূলকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের আশেপাশের এলাকা দিয়ে এটা শুরু করা হয়েছে। আস্তে আস্তে তা ঢাকার বিভিন্ন এলাকা এবং সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়া হবে।