এ আর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করবে কাজী নজরুলের পরিবার

- Author, অমিতাভ ভট্টশালী
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা
বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত গান ‘কারার ওই লৌহ কপাট’ গানটির সুর-বদল করার জন্য অস্কারজয়ী সঙ্গীত পরিচালক এআর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কবির পরিবার।
এই প্রসঙ্গে কবির পরিবারের মধ্যেই বড়সড় ফাটল সামনে এসেছে।
অভিযোগ করা হচ্ছে কাজী নজরুলের অন্যতম নাতি কাজী অনির্বাণই এমন চুক্তি করেছিলেন, যার ফলে ওই সুর বদল করা সম্ভব হয়েছে। কাজী অনির্বাণও তার বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগগুলির জবাব দিয়েছেন বিবিসি বাংলার কাছে।
যে ‘পিপ্পা’ সিনেমায় সুর বদল করা গানটি ব্যবহার করা হয়েছিল, তার নির্মাতাদের সঙ্গে ২০২১ সালে হওয়া একটি চুক্তিপত্রও পরিবারের সদস্যরা সামনে এনে অভিযোগ করছেন যে ওই চুক্তিতে একাধিক অসঙ্গতি তারা খুঁজে পেয়েছেন।
তবে আগেই বিষয়টি নিয়ে "ভাবাবেগে আঘাত" লেগে থাকলে তারা ক্ষমাপ্রার্থী বলে বিবৃতি দিয়েছিলে 'পিপ্পা' সিনেমাটির নির্মাতা সংস্থা।

ছবির উৎস, Getty Images
‘এ আর রহমানকে ক্ষমা চাইতে হবে’
কলকাতায় এক সংবাদ সম্মেলন করে ভারত আর বাংলাদেশে – উভয় দেশে বসবাসকারী কাজী নজরুল ইসলামের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন যে মামলা যেমন ভারতে হবে, তেমনই বাংলাদেশেও জনস্বার্থ মামলার প্রস্তুতি চলছে।
বাংলাদেশে বসবাসকারী কাজী নজরুলের নাতনি খিলখিল কাজী এবং ভারতে বসবাসকারী কবির নাতি কাজী অরিন্দম বলেন এআর রহমান এবং ‘পিপ্পা’ সিনেমাটির নির্মাতা সংস্থাকে ক্ষমা চাইতে হবে কাজী নজরুলের গানটিকে ‘বিকৃত’ করার ‘গর্হিত অপরাধে’।
খিলখিল কাজীর কথায়, “কাজী নজরুল ইসলামের এই কালজয়ী গানটি যেভাবে বিকৃত করা হয়েছে, তার জন্য এআর রহমানকে ক্ষমা চাইতে হবে এবং তা পৃথিবীর সব মানুষের সামনে চাইতে হবে। কাজী নজরুল ইসলামের গানকে তো এভাবে আমরা ছাড় দিতে পারি না।"
"যে গান আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে মেতে উঠেছিলেন সবাই, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সবাইকে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করেছে, বা আজও করে। গানটিকে ওই সিনেমা থেকে বাদ দিতে হবে। কোনও প্রজন্মের কাছে যেন ওই গানটি না যায়", বলেন তিনি।

কাজী নজরুলের নাতি কাজী অরিন্দম আবার বলছিলেন, “এটা তো শুধু একটা গান নয়, এটা একটা আন্দোলন, একটা ইতিহাস। বহু স্বাধীনতা সংগ্রামীর ইতিহাস এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ‘পিপ্পা’ ছবির নির্মাতাদের গানটির ইতিহাস অধ্যয়ন করা উচিত ছিল। আমরা চাইব গানটি সিনেমা থেকে প্রত্যাহার করে মূল সুরটি ফিরিয়ে আনা হোক।”
সিনেমার নির্মাতাদের তরফে একটি বিবৃতি দেওয়া হয়েছে মঙ্গলবার রাতে।
সেখানে তারা লিখেছেন যে তারা গানটিকে যেভাবে ব্যাখ্যা করেছে, “তা যদি ভাবাবেগে আঘাত দিয়ে থাকে অথবা অনিচ্ছাকৃত পীড়া দিয়ে থাকে, তাহলে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাইছি।“
ক্ষমা চাওয়ার কথা বলেও তারা কিন্তু এটা উল্লেখ করছে যে পরিবারের কাছ থেকে যথাযথ অনুমতি নিয়ে, লিখিত চুক্তি করেই তারা গানটি ব্যবহার করেছিল।

ছবির উৎস, Kazi Anirban
চুক্তিপত্র প্রকাশ করল পরিবার
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
এদিন একটি চুক্তিপত্র প্রকাশ করে কাজী নজরুল পরিবার। ওই চুক্তিটি হয়েছিল ‘পিপ্পা’ সিনেমার নির্মাতাদের সঙ্গে কাজী নজরুলের পুত্রবধূ কল্যাণী কাজীর মধ্যে। সেখানে সাক্ষী হিসাবে ছিলেন কল্যাণী কাজীর বড় ছেলে কাজী অনির্বাণ।
কাজী নজরুল ইসলামের ছোট ছেলে কাজী অনিরুদ্ধর পুত্র কাজী অনির্বাণ। তিনি ভারতে থাকেন। তার মা কল্যাণী কাজী প্রয়াত হয়েছেন এ বছরের মে মাসে।
ওই চুক্তিপত্রে অনেক অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে বলে দাবি করছে কবির পরিবার।
‘কারার ওই লৌহ কপাট’ গানটি নিয়ে বিতর্ক শুরু হওয়ার পরে কাজী অনির্বাণ বিবিসিকে জানিয়েছিলেন যে ছবিটির নির্মাতাদের সঙ্গে তার মা, কল্যাণী কাজীর মধ্যে ২০২১ সালে একটা চুক্তি হয়েছিল ওই গানটি সিনেমায় ব্যবহার করার বিষয়ে।
“ওই চুক্তিতে সাক্ষী হিসাবে আমি ছিলাম, কিন্তু সেখানে কোনভাবেই সুর বা কথা বদলানোর অনুমতি আমার মা দেননি,” বিবিসি বাংলাকে আগে বলেছিলেন নজরুলের পৌত্র কাজী অনির্বাণ।
ওই গান ব্যবহারের জন্য দু লক্ষ টাকা রয়্যালটিও পেয়েছিলেন কল্যাণী কাজী, সেটাও জানিয়েছিলেন তার বড় ছেলে।
তিনি আগে এটাও বলেছিলেন, “মা ভেবেছিলেন এআর রহমানের মতো বিখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক গানটা ব্যবহার করলে তা বিশ্বব্যাপী একটা প্রচার পাবে। সেজন্যই বিশ্বাস করে দাদুর গানটা ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছিলেন তিনি।"
"এমন কি এটাও বলেছিলেন মা যে গানটা তৈরি হওয়ার পরে যেন আমাদের শোনানো হয়। এটা স্পষ্টতই চুক্তি ভঙ্গ।“
তবে সিনেমাটির নির্মাতা সংস্থা বিবৃতি দিয়ে দাবি করেছে তারা চুক্তি অনুযায়ীই গানটির সুর বদল করে ব্যবহার করেছে।
অন্যদিকে বৃহস্পতিবার খিলখিল কাজী ও কাজী অনির্বাণেরই ভাই কাজী অরিন্দম বলছেন, তারা এই চুক্তির কথা জানতে পেরেছেন বিতর্ক তৈরি হওয়ার পরে, এবছর নভেম্বরের নয় তারিখে।
কাজী নজরুল ইসলামের নাতনি অনিন্দিতা কাজীও বিবিসি বাংলাকে আগে বলেছেন যে তিনিও এরকম কোনও চুক্তির কথা আগে জানতে পারেন নি।

ছবির উৎস, NAZRUL ACADEMY

ছবির উৎস, NAZRUL ACADEMY
সুর বদলের শর্ত ছিল চুক্তিতেই
কাজী অরিন্দম বলছেন যে বিতর্ক শুরু হওয়ার পরে তার বড় ভাই কাজী অনির্বাণ তাকে হোয়াটসঅ্যাপে একটি নথি পাঠান, যেটা নাকি ওই চুক্তি।
সেই নথিটিই সংবাদমাধ্যমের সামনে এনেছে কবি নজরুল ইসলামের পরিবার। আলাদা করে একই চুক্তি বিবিসি বাংলাকে হোয়াটসঅ্যাপ করেছেন কাজী অনির্বাণও।
সংবাদমাধ্যমকে যে কথিত চুক্তির কপি দেওয়া হয়েছে, সেখানে যেসব শর্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তার মধ্যে প্রথমটিই হচ্ছে নির্মাতা সংস্থা গানটি “রিক্রিয়েট”, “এডিট” এবং “রিফর্ম্যাট” করতে পারবে।
এই শর্তগুলি ছিল বলেই এআর রহমান এবং নির্মাতা সংস্থা সুর বদলিয়ে দিতে পেরেছেন, এমনটাই মনে করা হচ্ছে।
তবে আরও বেশ কিছু অসঙ্গতির কথা সামনে এনেছেন কাজী নজরুলের পরিবার।
তারা বলছেন, প্রথমত নথিটি কোনও স্ট্যাম্প পেপারে ছাপা নয়, যদিও ওপরে লেখা আছে “[অন স্ট্যাম্প পেপার]” শব্দগুলি।
সিনেমা নির্মাতাদের সঙ্গে চুক্তি বলে যেটি দাবী করা হচ্ছে, সেটা শুরুই হয়েছে কল্যাণী কাজীকে সম্বোধন করে, চিঠির আকারে।
তারই নীচে ‘কারার ওই লৌহ কপাট’ গানটি ব্যবহারের কিছু শর্তাবলী দেওয়া হয়েছে, কত টাকা রয়্যালটি দেওয়া হবে কল্যাণী কাজীর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে, আর এ নিয়ে মামলার নিষ্পত্তি কীভাবে হবে, সেটাও উল্লেখ করা হয়েছে।
কাজী নজরুল ইসলামের পরিবারের চতুর্থ প্রজন্মের সদস্য অভীপ্সা কাজী বলেন, “কল্যাণী কাজী যেখানে সই করেছেন, তাতে কোনও তারিখ উল্লেখ করা নেই, অথচ ওই চিঠিটির তারিখ রয়েছে আটই সেপ্টেম্বর।"
"আবার আশ্চর্যজনকভাবে সাক্ষী হিসাবে কাজী অনির্বাণ যেখানে সই করেছেন, সেখানে তারিখ লেখা চৌঠা সেপ্টেম্বর । তার মানে কি চুক্তি লেখার আগেই সাক্ষী সই করে দিয়েছিলেন?”
সিনেমা নির্মাতাদের তরফে কোনও সই নেই।
কল্যাণী কাজীকে সম্বোধন করে লেখা ওই চিঠি / চুক্তিকে একবার লেখা হয়েছে, "আপনার দাদু প্রয়াত শ্রী কাজী নজরুল ইসলাম", অথচ কল্যাণী কাজী তো আসলে কাজী নজরুল ইসলামের পুত্রবধূ।
অভীপ্সা কাজী প্রশ্ন তুলছেন, “তার মানে কী আসলে আলোচনা এবং চুক্তিটা কাজী অনির্বাণের সঙ্গেই হয়েছিল? কল্যাণী কাজীকে দিয়ে শুধু সই করিয়ে নেওয়া হয়েছিল?”

ছবির উৎস, Arka Deb
কাজী অনির্বাণের পাল্টা জবাব
খিলখিল কাজী ও কাজী অরিন্দমের সংবাদ সম্মেলনের পরে বিবিসি যোগাযোগ করেছিল কাজী অনির্বাণের সঙ্গে।
তার বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগগুলির এক এক করে জবাব দিয়েছেন তিনি।
তার কথায়, “পরিবারের অন্য সদস্যদের আমি কেন জানাইনি এই চুক্তির কথা, সেকথা তোলা হচ্ছে। তাদের জানানোর দায় কি আমার ছিল নাকি? মা তো আগেও বহু মানুষকে, রেকর্ডিং সংস্থাকে দাদুর গান ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন, সেগুলো কি সবাই জানত?"
"আবার বাংলাদেশে দাদুর গানের অনেক রকম বিকৃতি হয়, সেগুলো অনুমোদন পায় কী করে? কেউ তো আপত্তি তোলেনি? আমরা কি সেসব আগে থেকে জানতে পারি?”
চুক্তিপত্রে অসঙ্গতিগুলির প্রসঙ্গে কাজী অনির্বাণ বলছেন, “কোথায় তারিখ নেই, বা তারিখে অসঙ্গতি, মা কে কাজী নজরুল ইসলামের নাতনি বলে কেন সম্বোধন করা হল, এইসব আইনি খুঁটিনাটি আমি খতিয়ে দেখিনি। বিশ্বাস করে অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। আর সব কিছুর জন্য আমাকে কেন দায়ী করা হচ্ছে?”
কথিত চুক্তিটিতে যে শর্তের ফলে ‘কারার ওই লৌহ কপাট’ গানটির সুর বদল করা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে, সেই “রিক্রিয়েট”, “এডিট” এবং “রিফর্ম্যাট” শব্দগুলি সম্বন্ধে কাজী অনির্বাণ বলেন, “এই শব্দগুলো যে রয়েছে, সেটা মা নিশ্চিতভাবেই খেয়াল করেছিলেন।"
"তিনি আমাকে বলেছিলেন যে এ আর রহমান তো মিউজিক নিয়ে অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করেন, সেরকমই কিছু হয়তো করবে। মা ভাবতেই পারে নি যে ওই শর্তের সুযোগে সুর বদল করে দেওয়া হবে। জেনে শুনে এধরনের অনুমতি মা কখনই দিত না।"
"আগেও আপনাকে বলেছি যে সুরটা শুনে আমিও তো হতবাক হয়ে গেছি। এতটাই অবাক, এতটাই খারাপ লেগেছে সুরটা যে শুধু প্রথমটুকুই শুনেছি এখনও পর্যন্ত।“
কাজী নজরুলের পরিবারের একটা অংশ, যেখানে খিলখিল কাজী আর কাজী অরিন্দম আছেন, তারা যেমন আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলছেন, কাজী অনির্বাণও বলছেন তিনিও আইনি পথেই হাঁটবেন।
“আইনি ব্যবস্থা তো অবশ্যই নেব। তবে তারও আগে আমি প্রধানমন্ত্রী, সংস্কৃতি মন্ত্রী আর কেন্দ্রীয় ফিল্ম সেন্সর বোর্ডকে চিঠি লিখব। সিনেমায় আমাকে যে কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে, সেটা তুলে নিতে অনুরোধ করব আর গানটা পুরোপুরি বাদ দিতে হবে সিনেমা থেকে, এই অনুরোধও করব,” জানিয়েছেন কাজী অনির্বাণ।
একই সঙ্গে তার আক্ষেপ, “পরিবারের ভেতরে যেসব বিষয়গুলো থাকার কথা, সেসব সংবাদ সম্মেলন করে বলা হল!”








