বাংলাদেশে রোজা কবে থেকে শুরু?

    • Author, জান্নাতুল তানভী
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

ইসলামিক ক্যালেন্ডার বা হিজরী ক্যালেন্ডারের নবম মাস রমজান। সারা বিশ্বের ইসলাম ধর্মাবলম্বী বা মুসলিমদের কাছে এই মাসটির গুরুত্ব অপরিসীম, পুরো মাসজুড়ে রোজা রাখেন তারা।

বাংলাদেশে রোজা কবে থেকে, বুধবার নাকি বৃহস্পতিবার, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই এমন আলোচনা করছেন।

কেননা সরকার বা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে রোজা নিয়ে এখনো কোনো ঘোষণা আসেনি।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বেশ কিছু দেশে নিজস্ব চাঁদ দেখা কমিটির মাধ্যমে রমজান মাস ও কবে থেকে রোজা রাখা হবে সেটি নির্ধারণ করা হয়।

ইসলামী বিধান অনুযায়ী, মুসলিমরা চন্দ্রবর্ষ অনুসরণ করে থাকে। চন্দ্রবর্ষে বারো মাস, প্রতিটি মাস ২৯ বা ৩০ দিনের হয়ে থাকে।

চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে রমজান মাসও ২৯ বা ৩০ দিনের হয়।

বাংলাদেশে চাঁদ দেখা কমিটির বৈঠক বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বায়তুল মোকাররমে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে বলে জানিয়েছে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের একজন কর্মকর্তা।

এদিকে, সরকারি এই সংস্থাটি এরই মধ্যে 'ঢাকা জেলার সাহরি ও ইফতারের সময়সূচি' সংক্রান্ত সম্ভাব্য একটি ক্যালেন্ডার প্রকাশ করেছে।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, ১৯শে ফেব্রুয়ারি শুরু হতে যাচ্ছে রমজান মাস। ওইদিনই পহেলা রমজান অর্থাৎ প্রথম রোজা।

তবে, এই ক্যালেন্ডারে পহেলা রমজানকে স্টার চিহ্নিত করে এটিও উল্লেখ করা হয়েছে যে, পহেলা রমজান চাঁদ দেখার উপর নির্ভরশীল।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের দ্বীনি দাওয়াত ও সংস্কৃতি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ হারুনূর রশীদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমাদের এখানে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি আছে, এই কমিটির সভা আগামীকাল সন্ধ্যায় বসবে। যদি আগামীকাল সন্ধ্যায় বাংলাদেশের আকাশে চাঁদ দেখা যায় তাহলে কালকে থেকেই তারাবি শুরু হবে ও কাল ভোররাতে সেহেরি খাবে"।

তবে সম্পূর্ণ বিষয়টিই চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে বলে জানান তিনি।

এরই মধ্যে, রোজা উপলক্ষে সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, পুঁজিবাজার এবং সুপ্রিমকোর্টসহ বিচারিক আদালতের সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে।

ক্যালেন্ডার অনুযায়ী রোজা কবে থেকে শুরু ও কবে শেষ?

ইসলাম ধর্ম অনুসারে, রমজান মাসেই পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআন নাজিল হয়েছিল। কোরআনে মুসলমানদের জন্য রমজান মাসে রোজা রাখা ফরজ করা হয়েছে।

পূণ্য অর্জন ও আত্মশুদ্ধির আশায় সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত মুসলিমরা পানাহার থেকে বিরত থাকেন। মাগরিবের আজান শুনে মুখে খাবার তুলে রোজা ভাঙেন।

তবে বিশেষ কিছু পরিস্থিতি বা অসুস্থতা থাকলে রোজা বাধ্যতামূলক নয়।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের দ্বীনি দাওয়াত ও সংস্কৃতি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ হারুনূর রশীদ জানান, বুধবার সন্ধ্যায় অর্থাৎ বাদ মাগরিব রাজধানীর বায়তুল মোকাররমে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হবে।

ধর্মমন্ত্রী, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবের নেতৃত্বে এই জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটিই কবে রোজা হবে বুধবার সন্ধ্যায় সেই সিদ্ধান্ত নেবেন।

মি. রশীদ বলেন, "যদি আগামীকাল চাঁদ দেখা না যায় তাহলে একদিন পরে কনফার্ম (বৃহস্পতিবার)। আমরা আশা করতেছি, কালকে চাঁদ দেখা যাবে, যতটুকু আমাদের কাছে ইনফরমেশন আছে"।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন যে ক্যালেন্ডার ছাপিয়েছে তাতে রহমতের দশ দিন উল্লেখ করে, বৃহস্পতিবার, ১৯ শে ফেব্রুয়ারি, প্রথম রোজার দিন ঢাকায় ইফতারের সময় বিকেল পাঁচটা ৫৮ মিনিটে। আর সেহরির শেষ সময় ভোর পাঁচটা ১২ মিনিটে।

মি. রশীদ এই বিষয়ে ব্যাখ্যা করে জানান, কাল চাঁদ না দেখা গেলে পরদিন বৃহস্পতিবার সেহরি খেয়ে শুক্রবার প্রথম রোজা হবে।

এই ক্যালেন্ডারটিতে দেখা যায়, ২০শে মার্চ শুক্রবার ৩০তম ও শেষ রোজা।

সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের সময়সূচি

রমজান মাস উপলক্ষে দেশের সব সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত এবং আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন অফিস সময়সূচি নির্ধারণ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।

গত আটই ফেব্রুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।

এতে বলা হয়েছে, হিজরি ১৪৪৭ (২০২৬ খ্রিস্টাব্দ) সনের পবিত্র রমজান মাসে সেহরি ও ইফতারের সময় বিবেচনায় দেশের সব সরকারি ও আধা-সরকারি এবং স্বায়ত্তশাসিত ও আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন অফিস সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে।

রমজানে রবি ও বৃহস্পতিবার সকাল নয়টা থেকে বিকেল সাড়ে তিনটা পর্যন্ত অফিস চলবে।

সুপ্রিম কোর্ট ও বিচারিক আদালতের সময়সূচি

রমজান উপলক্ষে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন এরই মধ্যে আপিল বিভাগ, হাইকোর্ট বিভাগ, অধস্তন আদালতের অফিস ও আদালতের নতুন সময়সূচি নির্ধারণ করেছে।

রমজান মাসে রোববার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সকাল নয়টা থেকে বেলা তিনটা পর্যন্ত আপিল বিভাগের অফিস খোলা থাকবে।

এই সময়ের মধ্যে দুপুর একটা থেকে দেড়টা পর্যন্ত জোহরের নামাজের জন্য বিরতি রয়েছে।

এছাড়া আপিল বিভাগের কোর্টের সময়সূচি সকাল নয়টা থেকে বেলা দেড়টা পর্যন্ত আগের সময়ই থাকবে বলে জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন।

রমজান মাসে রোববার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত হাইকোর্ট বিভাগের আদালতের কার্যক্রম চলবে সকাল দশটা থেকে বিকাল সোয়া তিনটা পর্যন্ত।

রোজা ছাড়া সাধারণত সাড়ে দশটা থেকে বিকাল চারটা পর্যন্ত চলে আদালতের কার্যক্রম।

দুপুরে সোয়া একটা থেকে দুইটা পর্যন্ত যোহরের নামাজের বিরতিও রাখা হয়েছে।

এছাড়া হাইকোর্ট বিভাগের অফিস রোজায় সকাল সোয়া নয়টা থেকে বিকাল সাড়ে তিনটা পর্যন্ত চলবে। দুপুরে নামাজের বিরতিও রাখা হয়েছে।

রমজান মাসে সারা দেশের বিচারিক বা অধস্তন আদালত ও ট্রাইব্যুনালগুলোতে সকাল সাড়ে নয়টা থেকে দুপুর তিনটা পর্যন্ত আদালতের কার্যক্রম চলবে।

দুপুর সোয়া একটা থেকে পনেরো মিনিটের নামাজের বিরতিও রয়েছে।

এছাড়া বিচারিক এই আদালতগুলোর অফিস শুরু হবে সকাল নয়টা থেকে সাড়ে তিনটা পর্যন্ত।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সময়সূচি, লেনদেনের সময় কমেছে পুঁজিবাজারে

আসন্ন রমজান মাসে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অফিস সময়সূচিতে পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগ (ডিএফআইএম) থেকে ইস্যু করা চিঠিতে বলা হয়েছে, রমজান মাসে রোববার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দেশের সব আর্থিক প্রতিষ্ঠান অফিস চলবে।

নতুন সময় অনুযায়ী, অফিস সকাল সাড়ে নয়টা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত চলবে।

আর শুক্রবার ও শনিবার থাকবে সাপ্তাহিক ছুটি।

এর মধ্যে দুপুর একটা ১৫ মিনিট থেকে একটা ৩০ মিনিট পর্যন্ত জোহরের নামাজের বিরতি থাকবে।

ব্যাংকগুলোয় রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত লেনদেন হবে সকাল সাড়ে নয়টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত।

এদিকে রমজান মাসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) পিএলসিতে লেনদেন হবে নতুন সময়সূচিতে।

সোমবার প্রতিষ্ঠানটির এ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, রমজান মাসে ডিএসইর লেনদেন সকাল ১০ টায় শুরু হয়ে দুপুর একটা ৪০ মিনিট পর্যন্ত চলবে।

পোস্ট ক্লোজিং সেশন থাকবে একটা ৪০ মিনিট থেকে একটা ৫০ মিনিট পর্যন্ত।

তবে অফিসিয়াল কার্যক্রম সকাল নয়টা থেকে বিকেল সাড়ে তিনটা পর্যন্ত চলবে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

রমজান মাস শেষ হওয়ার পরে আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অফিস সময়সূচি, ব্যাংকের আর্থিক লেনদেন এবং ডিএসই এর লেনদেন আগের অবস্থায় ফিরে আসবে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।

রোজায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটি

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটি নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে নানা আলোচনা চলছে। স্কুলের ছুটি নিয়ে হাইকোর্টের একটি রিটে করা আদেশের প্রেক্ষিতেই মূলত আলোচনার জন্ম।

এই সপ্তাহের রোববার হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ রমজান মাসের শুরু থেকেই মাধ্যমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক স্কুল বন্ধ রাখতে আদেশ দিয়েছিল।

কিন্তু পরদিন সোমবার হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন করলে ওই আদেশ স্থগিত করে দেয় আপিল বিভাগের চেম্বার জজ আদালত।

এর ফলে মাধ্যমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক স্কুল ছুটির যে পূর্বসিদ্ধান্ত ছিল সেটিই বহাল থাকছে।

চলতি শিক্ষাবর্ষে রমজান উপলক্ষে মাদ্রাসাগুলোয় ১৫ই ফেব্রুয়ারি থেকে, অর্থাৎ রমজান শুরুর আগে থেকে ছুটি শুরু হলেও মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুলগুলোতে এবার ১৫ই রমজান অর্থাৎ, আগামী সাতই মার্চ পর্যন্ত নিয়মিত ক্লাস চালু রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

সোমবার চেম্বার জজ আদালত হাইকোর্টের আদেশটি স্থগিত করে দেওয়ায় মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুলগুলোতে সাতই মার্চ পর্যন্ত ক্লাস চালু থাকবে।

আটই মার্চ থেকে রোজার ছুটি শুরু হবে।

এছাড়া বাৎসরিক ছুটির ক্যালেন্ডারে প্রাথমিক স্কুলের রমজানের ছুটির বিষয়টি পাওয়া যায়।

ছুটির তালিকা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আটই মার্চ থেকে ২৬শে মার্চ পর্যন্ত রোজা, ঈদসহ কয়েকটি ছুটির কথা বলা হয়েছে।

এছাড়া ঢাকার কয়েকটি ইংলিশ মিডিয়ামের ছুটির ক্যালেন্ডার থেকে জানা যাচ্ছে, বেশিরভাগ স্কুলে রমজানের মাঝামাঝি পর্যন্ত ক্লাস চালু রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

এছাড়া কলেজগুলোতে রোজার ছুটির জন্য গত বছরের ডিসেম্বরে একটি প্রজ্ঞাপন হয়।

সেই প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, দেশের সকল সরকারি বেসরকারি কলেজ ২০২৬ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি থেকে ২৫ শে মার্চ পর্যন্ত বন্ধ থাকার কথা জানিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর।

তবে, যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব আইনে চলে তাই তাদের ছুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কমিটি নির্ধারণ করে থাকে।

এই ছুটি একেক বিশ্ববিদ্যালয়ে একেক ধরনের হয়ে থাকে।