বাংলাদেশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হবে কীভাবে?

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, তারেকুজ্জামান শিমুল
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশে গণআন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটার পর থেকেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন নিয়ে জোর আলোচনা চলছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর দাবির মুখে ইতোমধ্যেই সংসদ ভেঙে দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন।
শিগগিরই একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নাম প্রস্তাব করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা।
কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিষয়ে কিছু বলা নেই। আবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যে বিধান ছিল, সেটিও ২০১১ সালে বাতিল করা হয়েছে।
তাহলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হবে কীভাবে? নতুন এই সরকার গঠিত হলে তার আইনি প্রক্রিয়াই-বা কী হবে?

ছবির উৎস, Getty Images
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কেন?
গণরোষের মুখে সোমবার ক্ষমতা ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন টানা চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হওয়া আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।
তিনি পদত্যাগ করায় মন্ত্রিসভাও ভেঙে গেছে।
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
অন্যদিকে, মঙ্গলবার সংসদ ভেঙে দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি। ফলে দেশ পরিচালনার জন্য যে ধরনের সাংবিধানিক সরকার কাঠামো দরকার হয়, সেটি এখন নেই।
এমন পরিস্থিতিতে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট, হত্যাসহ নানান ঘটনা ঘটতে দেখা যাচ্ছে।
সে কারণে সংসদ ভেঙে দিয়ে দ্রুত অন্তর্বর্তীকালীন একটি সরকার গঠনের তাগিদ দিচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো।
মঙ্গলবার সকালে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “রাষ্ট্রপতির কাছে আহ্বান জানাচ্ছি, কাল বিলম্ব না করে আজকের মধ্যেই পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন করুন।”
“অন্যথায় দেশে আবার রাজনৈতিক শূন্যতা দেখা দিতে পারে,” বলেন মি. আলমগীর।
অন্যদিকে, শেখ হাসিনার পতনের পর গঠিত হতে যাওয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান কে হবেন তা নিয়ে নানা আলোচনা চলছে।
এরই মধ্যে মঙ্গলবার ভোরে ফেসবুকে প্রকাশ করা এক ভিডিও বার্তায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নাম প্রস্তাব করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম।

ছবির উৎস, Getty Images
ভিডিও বার্তায় মি. ইসলাম বলেন, “আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে সর্বজন গ্রহণযোগ্য আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিসম্পন্ন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হবে।”
দ্রুত সময়ের মধ্যে এ সরকার গঠনের জন্য রাষ্ট্রপতির প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হওয়ার বিষয়ে ইতোমধ্যেই তারা অধ্যাপক ইউনূসের সঙ্গে কথা বলেছেন বলেও জানিয়েছেন এই সমন্বয়ক।
“ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গেও আমাদের কথা হয়েছে। তিনি ছাত্র-জনতার আহ্বানে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে এই গুরু দায়িত্ব নিতে সম্মত হয়েছেন,” বলেন মি. ইসলাম।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এই নেতা এটাও স্পষ্ট করেছেন যে, ছাত্র-নাগরিকের সমর্থিত সরকার ছাড়া সামরিক কিংবা অন্য কোনো ধরনের সরকারকে সমর্থন দেবেন না তারা।
“আমরা রক্ত দিয়েছি, শহীদ হয়েছি। আমাদের যে প্রতিশ্রুতি একটি নতুন বাংলাদেশ গঠন করার জন্য, সেটিকে আমাদের অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে এবং অবশ্যই ছাত্র জনতার প্রস্তাবিত সরকার বাদে কোনো ধরনের সরকার কিন্তু মেনে নেওয়া হবে না,” বলেন তিনি।

ছবির উৎস, Getty Images
সংবিধানে কী আছে?
বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানে ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার’ নামে কোন ব্যবস্থার উল্লেখ নেই।
তবে কাছাকাছি ধরনের একটি ব্যবস্থার কথা আগে বলা ছিল, যেটি ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থা নামে পরিচিত।
সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান ও ক্ষমতা হস্তান্তরের লক্ষ্যে ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশের সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
পরবর্তীতে এই পদ্ধতি অনুসরণ করেই তিনটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
কিন্তু ২০১১ সালে এই ব্যবস্থা বাতিল করে সংবিধান সংশোধন করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার।
বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী, নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ক্ষমতায় থাকা সরকারের অধীনেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
এরপর ওই সরকারই বিজয়ী রাজনৈতিক দল বা জোটের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন।
কিন্তু নির্বাচন ছাড়াই হুট করে সরকারের পতন ঘটায় বর্তমানে দেশে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সেটি বিবেচনায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের দাবি উঠেছে।
“অথচ এ ব্যাপারে সংবিধানে কিছুই বলা নেই,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক।
মূলতঃ সে কারণেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ঘিরে আইনগত এক ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে।

কোন উপায় আছে?
সংবিধানকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি বলা হয়ে থাকে। ফলে এটি না থাকলে দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে নানান সমস্যা ও সংকট তৈরি হবে।
এখন সংবিধানে উল্লেখ না থাকলেও প্রয়োজনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা যেতে পারে কি? কোন উপায় কি আছে?
সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক বলেন, "উপায় অবশ্যই আছে, তবে সেটি করতে হলে বর্তমান সংসদ বহাল রেখেই সরকার গঠনের চেষ্টা করতে হবে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন আইনজীবী মি. মালিক।
এক্ষেত্রে বর্তমান সংসদ সদস্যদের মধ্যে যতজনকে পাওয়া যায়, তাদেরকে নিয়েই নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করতে হবে।
“সংবিধান রক্ষার স্বার্থে এটি নামমাত্র মন্ত্রিসভা হবে। তাদেরকে দিক নির্দেশনা দেওয়ার জন্য উপদেষ্টামণ্ডলী রাখা হবে এবং তারাই রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দায়িত্ব পালন করবেন,” বলছিলেন মি. মালিক।
কিন্তু বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ইতোমধ্যেই সংসদ ভেঙে দিয়েছেন। যদিও সংবিধান অনুযায়ী সে এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির আছে কী-না, সেটি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
“বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, এককভাবে সংসদ বিলুপ্ত করার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির নাই,” বলেন আইনজীবী শাহদীন মালিক।

তিনি আরও বলেন, “সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে যে, প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সংসদের অধিবেশন আহ্বান, সমাপ্তি এবং সংসদ বিলুপ্তি করবেন।”
সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদের এক নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, “সরকারী বিজ্ঞপ্তি দ্বারা রাষ্ট্রপতি সংসদ আহ্বান, স্থগিত ও ভঙ্গ করিবেন....তবে আরও শর্ত থাকে যে, এই দফার অধীন তাহার দায়িত্ব পালনে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক লিখিতভাবে প্রদত্ত পরামর্শ অনুযায়ী কার্য করিবেন।”
কিন্তু নির্বাহী আদেশে ইতোমধ্যেই সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রে এখন কী করার আছে?
“পোস্ট ভ্যালিডিটি দিয়ে ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার’ গঠন করা যাবে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল।
উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনায় বিশেষ ক্ষমতাবলে কোন পদক্ষেপ নেওয়ার পর সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে পরবর্তীতে সেটির বৈধতা দেওয়াকে আইনের ভাষায় 'পোস্ট ভ্যালিডিটি' বা দায়মুক্তি বলা হয়ে থাকে।
১৯৭৫ সালের ১৫ই অগাস্টের পর গৃহিত সামরিক শাসনের সব কর্মকাণ্ডকে ১৯৭৯ সালে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে বৈধতা দেয়া হয়েছিল।
একইভাবে, ১৯৮৮ সালে সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে বৈধতা দেওয়া হয়েছিলে আরেক সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের যাবতীয় কর্মকাণ্ডকে। যদিও সামরিক শাসনের বৈধতা দেয়ার পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনীকে ২০১০ সালে অবৈধ ঘোষণা করে উচ্চ আদালত।
গণঅভ্যূত্থানে ১৯৯০ সালের ৬ই ডিসেম্বর জেনারেল এরশাদ সরকারের পতনের পর পঞ্চম সংসদের নির্বাচন পরিচালনার জন্য তিন মাসের অন্তর্বর্তীকালীন বা অস্থায়ী একটি সরকার গঠন করা হয়েছিল।
সে সময় আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিসহ আন্দোলনকারী সব দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে সেই অস্থায়ী সরকার গঠন করা হয়েছিল।
সেজন্য বিচারপতি আহমদকে প্রথমে উপরাষ্ট্রপতি হিসাবে দায়িত্ব দেয়া হয় এবং এরপর তিনি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
এছাড়া তিনি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসাবে দায়িত্ব পালনের পর নির্বাচন শেষে প্রধান বিচারপতির পদে ফিরে গিয়েছিলেন।
এই দু'টি বিষয়ে বৈধতা দেয়া হয়েছিল সংবিধানের একাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে।
উনিশ'শ একানব্বই সালে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত পঞ্চম সংসদে এই সংশোধনী পাস করা হয়।








