'হ্যাঁ' জয়ী হলে কি জুলাই সনদ পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হবে, গণভোটে 'না' জয়ী হলে কী হবে?

    • Author, তানহা তাসনিম
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা

আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের সাথেই অনুষ্ঠিত হবে গণভোট, অর্থাৎ এবার বাংলাদেশের ভোটারদের দিতে হবে দুইটি ভোট। কিন্তু অনেকের কাছেই এখন পর্যন্ত গণভোটের বিষয়বস্তু স্পষ্ট নয়।

বিশেষ করে গণভোটে 'হ্যাঁ' এবং 'না'-এর জয় পরাজয়ের সাথে জুলাই সনদের সম্পর্ক কতটুকু কিংবা 'হ্যাঁ' জয়যুক্ত হলেই বা সনদের কতখানি বাস্তবায়ন হবে, তা নিয়েও ভোটারদের মনে আছে সংশয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রীয়াজের ভাষ্যে এবারের গণভোটটি হবে মূলত সাংবিধানিক গণভোট। অর্থাৎ জুলাই সনদে অনেকগুলো সংস্কার প্রস্তাব থাকলেও, গণভোট হবে কেবল সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত ৩০টি প্রস্তাব নিয়ে।

যদিও গণভোটের ব্যালটের চারটি প্রস্তাবের শেষটিতে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাকি সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।

আইনজ্ঞদের অনেকে বলছেন, পুরো বিষয়টি নিয়ে এক ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।

সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরশেদ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথা বলা হচ্ছে এবং একইসাথে গণভোটের ব্যালটে চারটি বিষয় রাখা হবে।

সেখানে চার বিষয়ের বাইরে অন্যগুলো ব্যালটে থাকছে না। সেকারণেই বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করেন মি. মোরশেদ।

এদিকে গণভোটে 'হ্যাঁ'-এর পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। এতে জয়ের বিষয়ে দলটি আশাবাদী। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাংবিধানিক সংস্কার না হলে বাকি প্রস্তাব বাস্তবায়ন হওয়া বা না হওয়ায় খুব বেশি গুণগত পরিবর্তন আসবে না।

অন্যদিকে বিএনপি বলছে, গণভোটটি হচ্ছে আইনের ভিত্তিতে। যেহেতু জুলাই সনদের অঙ্গীকারনামায় তারা স্বাক্ষর করেছে, তাই তা বাস্তবায়নে দলটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এক্ষেত্রে আইনি বাধ্যবাধকতার চেয়ে নৈতিক বাধ্যবাধকতার বিষয়কে সামনে আনছে তারা।

রাজনৈতিক দলগুলো 'নৈতিকভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধ'

বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে সংস্কার আনতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মোট ১১টি কমিশন গঠন করা হয়। সেই কমিশনের সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে বৈঠকে বসে ঐকমত্য কমিশন। সেখানে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব গৃহীত হয়।

এরমধ্যে কিছু প্রস্তাবে সব দল একমত হয়, কিছু বিষয়ে ভিন্নমতের কারণে 'নোট অব ডিসেন্ট' দেয়া হয়। এই প্রস্তাবগুলোকে আবার দুইটি ভাগে ভাগ করে কমিশন।

প্রথম অর্থাৎ 'ক' অংশে রাখা হয়, সংবিধান সংস্কার সাপেক্ষে ৪৭টি প্রস্তাব আর 'খ' অংশে রাখা হয় আইন বা অধ্যাদেশ, বিধি ও নির্বাহী আদেশের ৩৭টি প্রস্তাব।

আলী রিয়াজ বলছেন, এরমধ্যে কেবল সংবিধান সংস্কার বিষয়ক ৩০টি প্রশ্ন নিয়ে হবে এবারের গণভোট।

"গণভোটে জুলাই সনদের ৪৮টি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যেগুলো সংবিধান সংশ্লিষ্ট", বলছিলেন অধ্যাপক রীয়াজ। তিনি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।

এর আগে, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫-এর ১৩ ধারায় এটি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার কথা উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, "জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকারনামা অনুসারে সংবিধানে জুলাই জাতীয় সনদ অন্তর্ভুক্ত হইবে"।

আর অঙ্গীকারনামায় "নতুন রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে জুলাই জাতীয় সনদের পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন এবং পূর্ণাঙ্গভাবে সংবিধানে তফসিল হিসেবে বা যথোপযুক্তভাবে সংযুক্ত" করার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল, যেখানে স্বাক্ষর করে রাজনৈতিক দলগুলোও।

এছাড়া গণভোটের ব্যালটে উল্লিখিত চারটি বিষয়ের শেষটিতে "জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে" বলে লেখা থাকবে।

ফলে প্রশ্ন উঠছে, গণভোটের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ জুলাই সনদ নাকি সনদের কেবল একটি অংশ বাস্তবায়ন হবে?

এনিয়ে আলী রীয়াজ বিবিসি বাংলাকে বলেন, জুলাই সনদের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনা হয়েছে এবং তারা এটি বাস্তবায়ন করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে।

তবে দেশের সব মানুষ রাজনৈতিক দলের সাথে সংশ্লিষ্ট নন। এমন প্রেক্ষাপটে জনসাধারণের মতামত নিয়ে জুলাই সনদকে আরও শক্তিশালী ভিত্তি দেয়ার লক্ষ্যেই গণভোটের আয়োজন করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

এক্ষেত্রে সংবিধান বিষয়ক সংস্কারকে 'মৌলিক' হিসেবে ব্যাখ্যা করে আলী রীয়াজ বলেন রাজনৈতিক দলগুলো ইতোমধ্যে "নৈতিকভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধ"।

বাড়তি হিসেবে সংবিধানের অনুচ্ছেদ এবং উপ-অনুচ্ছেদ পরিবর্তন বিষয়ক প্রস্তাবগুলো জনগণের সামনে উপস্থাপন করে তাদের মতামত চাওয়া হচ্ছে।

"গণভোটে যদি সংবিধান সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর সম্মতি না পাওয়া যায় তাহলে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সম্মতির প্রশ্নটা থেকে যাবে। মূল বিষয়গুলোতো সংবিধান সংশ্লিষ্ট। ফলে সেগুলো বাস্তবায়ন না করে বাকিগুলো কি বাস্তবায়ন করা যাবে? এক অর্থে করা যায়। করার ক্ষেত্রে বাধা থাকছে না কোনো অবস্থাতেই", বলছিলেন তিনি।

"গণভোটের মধ্য দিয়ে জনগণের সম্মতি পেলে রাজনৈতিক দলগুলো নিঃসন্দেহে এগুলো বাস্তবায়ন করবে, এমন অঙ্গীকার তাদের আছে"।

তবে গণভোটে যদি সম্মতি না পাওয়া যায়, আলী রীয়াজের মতে সবচেয়ে বড় যে সমস্যা হবে সেটা হচ্ছে সংবিধান সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো তখন সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে বিজয়ী হওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। "যদিও তারা অঙ্গীকারাবদ্ধ এটা বাস্তবায়ন করতে, তখন কিন্তু বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতার জায়গাটা দুর্বল হয়ে যাবে", বলেন তিনি।

অধ্যাপক রীয়াজ আরও জানান, সংবিধান সংস্কারের বাইরে থাকা আইন/অধ্যাদেশ, বিধি ও নির্বাহী আদেশের মধ্যে যেসব প্রস্তাব অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে করা সম্ভব, সেগুলো করা হয়েছে। সংসদ অধিবেশন শুরু হলে ৩০ দিনের মধ্যে সেগুলো আইনে পরিণত করতে হবে।

বিএনপি-জামায়াতের অবস্থান

গণভোটে হ্যাঁ ভোটের পক্ষে জোর প্রচারণা চালাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। হ্যাঁ ভোটে জয়ের বিষয়ে বেশ আশাবাদীও তারা।

দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি রচনার জন্য গণভোট হবে এবং তা সনদের ভিত্তি শক্তিশালী করবে।

"সংবিধান হলো মৌলিক সংস্কার। এই মৌলিক সংস্কারের জায়গাটাই সবার দাবি ছিল। সেটা হয়ে গেলে, বেশিরভাগ সংস্কার হয়ে যাবে। আর এটা যদি না হয়, অন্যান্য খুচরা জিনিসগুলো সংস্কার করে খুব বেশি গুণগত পরিবর্তন রাষ্ট্রে আসবে না", বলছিলেন তিনি।

হ্যাঁ ভোট জয়ী হলে, পরবর্তী সংসদে একটি 'কন্সটিটিউশনাল পরিষদ' গঠন হবে, যা কাউন্সিল হিসেবে কাজ করবে। এসময়ই প্রস্তাবগুলো অনুমোদন হয়ে চূড়ান্ত রূপ নেবে বলে জানান তিনি।

অন্যদিকে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়টিকে নৈতিক দৃষ্টিতে দেখছে বিএনপি। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, আইনের ভিত্তিতে এই গণভোট হচ্ছে।

ফলে হ্যাঁ জয়ী হলে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নৈতিক বাধ্যবাধকতার বিষয়টি চলে আসবে এবং প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়ায় দলটি তা করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

গণভোট যে সব বিষয়ে

২০২৪ সালের ১৩ই নভেম্বর জাতির উদ্দেশে ভাষণে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস জানিয়েছিলেন, চারটি বিষয়ের ওপর করা একটি প্রশ্নেই 'হ্যাঁ' বা 'না' ভোট দেবেন ভোটাররা।

গণভোটের ব্যালটে যে চারটি বিষয়ের ওপর প্রশ্নটি করা হবে সেগুলোও পড়ে শোনান তিনি।

বিষয়গুলো হলো –

১. নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।

২. আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ জন সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে।

৩. সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকার-সহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যমত হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে।

৪. জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।

গণভোটে চারটি বিষয়ের ওপর প্রশ্ন করা হবে, "আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?"