ওসমান হাদির সার্বিক পরিস্থিতি 'অত্যন্ত আশঙ্কাজনক'

গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে থাকা শরিফ ওসমান হাদির সার্বিক পরিস্থিতি 'অত্যন্ত আশঙ্কাজনক' বলে জানিয়েছে তার চিকিৎসার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ড।

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদির চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ডের পক্ষ থেকে শনিবার বিকেলে তার স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সর্বশেষ অবস্থা জানানো হয়।

ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালের আইসিইউ অ্যান্ড এইচডিইউ বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ও কো-অর্ডিনেটর ডা. মো. জাফর ইকবালের পাঠানো বার্তায় বলা হয়, মি. হাদির চিকিৎসায় বিভিন্ন বিভাগের ১৩ জন চিকিৎসকের সমন্বয়ে মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে।

মেডিকেল বোর্ডের পক্ষে এই বার্তায় বলা হয়, শুক্রবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওসমান হাদির অপারেশনের পরে এভারকেয়ার হাসপাতালের ক্রিটিকাল কেয়ার ইউনিটে তাকে স্থানান্তর করা হয় অপারেশন পরবর্তী চিকিৎসার জন্য।

চিকিৎসকরা দেখতে পেয়েছেন, তার ব্রেন 'মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে'। মি. হাদির ফুসফুসে ইনজুরি আছে এবং তার ভেন্টিলেটর সাপোর্ট চালিয়ে যেতে হবে।

তার কিডনির কার্যক্ষমতা ফেরত এসেছে। শরীরে রক্ত জমাট বাধা ও রক্তক্ষরণ হওয়ার মধ্যে যে অসামঞ্জস্যতা দেখা দিয়েছিলো সেটা অনেকটাই ঠিক হয়ে আসছে।

তবে তার ব্লাড প্রেশার ও হার্ট বিট উঠানামা করছে।

বর্তমানে তার সার্বিক পরিস্থিতি 'অত্যন্ত আশঙ্কাজনক' বলেও মেডিকেল বোর্ড জানিয়েছে।

প্রসঙ্গত, শুক্রবার দুপুরে ঢাকায় গুলিবিদ্ধ হন ওসমান হাদি, যিনি জাতীয় সংসদের ঢাকা-৮ আসনে সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছিলেন। এ দিন রাত থেকে তিনি বেসরকারি এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি আছেন।

এদিকে, হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় অপরাধীদের গ্রেফতারে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছে তার সংগঠন। পুলিশ বলছে, দোষীদের গ্রেফতারে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে তারা।

গত বছরের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেশ আলোচিত চরিত্র হয়ে উঠেন শরীফ ওসমান হাদি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পড়াশোনা শেষ করার পর বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছিলেন তিনি।

এর আগে যা বলেছিলেন চিকিৎসকরা

শুক্রবার দুপুরে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরপরই ওসমান হাদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং সন্ধ্যার দিকে সেখানে তার অপারেশন হয়।

অপারেশন শেষে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের প্রধান ডা. জাহিদ রায়হান বিবিসি বাংলাকে বলেন, "তার কন্ডিশন খুবই খারাপ। ক্রিটিক্যাল বলতে যা বোঝায় তাই। এখন ওনাকে কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে ওনাকে আমরা বাঁচিয়ে রেখেছি। তবে আশার কথা হলো, সাইন অব লাইফ বা জীবনের চিহ্ন ওনার মধ্যে আছে ।"

অপারেশন চলাকালে ওসমান হাদির দুইবার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছে এবং প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে বলেও জানান ওই চিকিৎসক।

এমন অবস্থায় পরিবারের ইচ্ছায় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে তাকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়।

রাত আটটার দিকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে।

শুক্রবার রাত এগারোটার কিছু আগে হাসপাতালের সামনে ব্রিফিং করেন তার রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ও চিকিৎসকদের একটি দল।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. আব্দুল আহাদ এসময় বলেন, "তার অবস্থা খুবই ক্রিটিকাল ছিল। অপারেশন শেষ করার পর তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। মূলত তার পরিবারের ইচ্ছায় এভারকেয়ার হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে"।

শুক্রবার রাতে সেখানে ভর্তির পর থেকে আর অপারেশনের প্রয়োজন হয়নি এবং নতুন করে আর অপারেশনের প্রয়োজন নাও হতে পারে বলে তিনি জানান।

সেখানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, ''বাম কানের ওপর দিয়ে ঢুকে ডান দিক দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া বুলেট মস্তিষ্কের ব্রেন স্টেম ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানে 'ম্যাসিভ ব্রেন ইনজুরি' বলা হয়। আগামী ৭২ ঘণ্টা অত্যন্ত ঝূঁকিপূর্ণ। এখন নতুন কোনো ইন্টারভেনশন করা হচ্ছে না''।

২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম, পুলিশ বলছে সর্বশক্তি নিয়োগ করা হয়েছে

এই ঘটনায় দ্রুতই অপরাধীদের আটকে আল্টিমেটাম দেয় ইনকিলাব মঞ্চ। একই সাথে প্রয়োজন উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়ারও দাবি জানানো হয়েছে ওসমান হাদির সংগঠন ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে।

রাত ১১ টার দিকে এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে ইনকিলাব মঞ্চের সামনে ব্রিফিং করা হয়।

এসময় ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বলেন, "ডাক্তাররা বলেছেন তারা ওসমান হাদির ব্যাপারে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে"।

এসময় প্রয়োজনে চার্টার্ড বিমানে করে দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়ারও দাবি জানানো হয় ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে।

এসময় মি. জাবের বলেন, "আমরা চিকিৎসকদের সাথে কথা বলেছি তারা বলেছে ওসমান হাদির অবস্থা আগের থেকে উন্নত, তবে তিনি শঙ্কামুক্ত নন"।

গত রাত থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শরীফ ওসমান হাদির ওপর গুলির ঘটনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে বিক্ষোভসহ নানা কর্মসূচি পালন করা হয়।

ওসমান হাদির নিজ সংগঠন ইনকিলাব মঞ্চ এই ঘটনায় এখনো পর্যন্ত কোনো পক্ষকে সন্দেহ করছে না বা, আবার কাউকে সন্দেহের বাইরেও রাখছে না।

মি. জাবের বলেন, "আমরা কাউকেই সন্দেহের চোখে দেখছি না, কাউকে বাইরেও দেখছি না। এমনো হতে পারে অনেকে ভোটের রাজনীতিতে ওসমান হাদিকে প্রতিপক্ষ মনে করছে তারা হামলা চালাতে পারে"।

"আমরা সরকার ও পুলিশকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি। আমরা চাই না, অপরাধী অন্য কোনো ভাবে মারা যাক। তাকে আইনের হেফাজতে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে," বলেন মি. জাবের।

তবে পুলিশ বলছে, তারা সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। এ নিয়ে ছায়া তদন্ত চলছে। পুলিশের সব বিভাগ এক সাথে কাজ করছে।

আইজিপি বাহারুল আলম বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ''আমরা ২৪ ঘণ্টা বা ৪৮ ঘণ্টা না, আমরা আমাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করেই তাকে গ্রেফতারে কাজ করি। অচিরেই অপরাধীদের আটক করতে পারবো আশা করি''।