ইসরায়েলে তথ্য পাচারের অভিযোগ, কাতার জেল থেকে মুক্তি পেলেন ভারতের সাবেক নৌ সেনারা

গত বছর ভারতীয় নৌবাহিনীর আটজন সাবেক কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। এর বিরুদ্ধে দোহাকে অনুরোধ জানিয়েছিল ভারত।

ছবির উৎস, ANI

ছবির ক্যাপশান, গত বছর ভারতীয় নৌবাহিনীর আটজন সাবেক কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। সেই সাজা বিবেচনা করার জন্য কাতারের কাছে আবেদন করেছিল ভারত।

কাতারে কারাবন্দি ভারতীয় আটজন সাবেক নৌ কর্মকর্তাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, এদের মধ্যে সাতজন ইতিমধ্যে ভারতে ফিরে এসেছেন।

ইসরায়েলকে সংবেদনশীল তথ্য পাচারের অভিযোগে গত বছর নৌবাহিনীর ওই আটজন সাবেক কর্মকর্তাকে কাতারে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। সেই সাজা বিবেচনা করার জন্য কাতারের কাছে আবেদন করেছিল ভারত।

পরে অবশ্য, এই ভারতীয় নাগরিকদের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে দেওয়া হয় এবং জানুয়ারি মাসে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে তাদের কারাদণ্ড ঘোষণা করে কাতার।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, "দাহরা গ্লোবাল কোম্পানিতে কর্মরত আট ভারতীয় নাগরিক, যারা কাতারে বন্দি ছিলেন তাদের মুক্তিকে ভারত সরকার স্বাগত জানাচ্ছে।”

অন্যদিকে, দীর্ঘ অপেক্ষার পর দেশে ফিরে আপ্লুত ভারতীয় নাগরিকরা। সে কথা জানিয়ে এক কর্মকর্তা বলেন, “দেশে সুরক্ষিতভাবে ফিরতে পেরে আমরা সত্যিই খুবই খুশি।”

দিল্লি বিমান বন্দরে এসে পৌঁছানোর পর, ভারতের প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন নৌ বাহিনীর প্রাক্তন কর্মীরা।

তাদের মধ্যে একজন সংবাদ সংস্থা এএনআইকে বলেছেন, “আমরা ভারতে ফিরে আসার জন্য প্রায় ১৮ মাস অপেক্ষা করেছি। আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। তার ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ এবং কাতারের সাথে তার সমীকরণ ছাড়া এটি সম্ভব হত না।”

এই আট ভারতীয় নাগরিককে আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছিল।

এই ভারতীয়দের গ্রেফতার করা হয়েছিল ২০২২ সালের আগস্ট মাসে।

রমজান বা ঈদের আগে কাতার ওই আটক নৌসেনাদের মুক্তি দিতে পারে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল বলে ‘দ্য হিন্দু’তে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল। শেষপর্যন্ত, এই ঘোষণাটি করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) সফরে যাওয়ার ঠিক একদিন আগে।

প্রসঙ্গত, ‘দ্য হিন্দু’র ওই রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে প্রায় ৭৫০ ভারতীয় এখনও কাতারের জেলে বন্দি আছেন।

আরও পড়তে পারেন:
দীর্ঘ অপেক্ষার পর দেশে ফিরে আপ্লুত ওই ভারতীয় নাগরিকরা।

ছবির উৎস, ANI

ছবির ক্যাপশান, দীর্ঘ অপেক্ষার পর দেশে ফিরে আপ্লুত ওই ভারতীয় নাগরিকরা।

কেন আটক করা হয়েছিল নৌবাহিনীর প্রাক্তন কর্মীদের?

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

কাতার সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এই ভারতীয়দের গ্রেফতারের কোনো কারণ জানায়নি।

কিন্তু স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রেফতার হওয়া ভারতীয় নাগরিকদের বিরুদ্ধে দোহায় কাজ করছে এমন একটি সাবমেরিন প্রকল্পের বিষয়ে সংবেদনশীল তথ্য ইসরায়েলকে পাচার করার অভিযোগ রয়েছে।

‘দাহরা গ্লোবাল টেকনোলজিস অ্যান্ড কনসাল্টিং সার্ভিসে’ কাজ করতেন তারা।

এই কোম্পানিটি কাতার নৌবাহিনীর জন্য সাবমেরিন প্রকল্পে কাজ করছিল। উদ্দেশ্য ছিল ইতালির প্রযুক্তি উপর ব্যবহার করে রাডার থেকে বাঁচতে পারে এমন অত্যাধুনিক সাবমেরিন তৈরি করা।

গত বছর, কাতার সরকার কোম্পানিটি বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিল। একই সঙ্গে ওই সংস্থার আনুমানিক ৭০ জন কর্মীকে গত বছরের মে মাসের শেষের দিকে দেশ ছাড়ার নির্দেশও দেওয়া হয়। এদের মধ্যে বেশিরভাগই ভারতীয় নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ছিলেন।

যে ভারতীয়দের গ্রেফতার করা হয়েছিল তাদের মধ্যে ছিলেন কমান্ডার (অব.) পূর্ণেন্দু তিওয়ারি, ক্যাপ্টেন (অব.) নবতেজ সিং গিল, কমান্ডার (অব.) বীরেন্দ্র কুমার ভার্মা, ক্যাপ্টেন (অব.) সৌরভ বশিষ্ঠ, কমান্ডার (অব.) সুগনাকর পাকালা, কমান্ডার (অব.) অমিত নাগপাল, কমান্ডার (অব.) সঞ্জীব গুপ্ত, এবং নাবিক রাগেশ।

বিদেশ মন্ত্রক এই ভারতীয়দের মৃত্যুদণ্ড কমানোর বিষয়েও একটি বিবৃতি জারি করেছিল।

ওই বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছিল, "এই বিষয়ে বিস্তারিত আদেশের জন্য অপেক্ষা করছি। আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপগুলি কী হবে তা বিবেচনা করার জন্য আমরা লিগাল টিম এবং পরিবারবর্গের সঙ্গে যোগাযোগ করছি।''

''কাতারে আমাদের রাষ্ট্রদূত এবং অন্যান্য কর্মকর্তারা আপিল আদালতে রয়েছেন। মামলাটির শুরু থেকেই আমরা তাদের পাশে ছিলাম এবং সবরকম কনস্যুলার ও আইনি সহায়তার করার জন্য ভবিষ্যতেও তাদের সঙ্গে থাকব। আমরা কাতার কর্তৃপক্ষের কাছেও বিষয়টি উত্থাপন করেছি।"

সে সময় বিদেশ মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছিল, "এই মামলার প্রক্রিয়া গোপনীয় এবং সংবেদনশীল প্রকৃতির কারণে, এই সময়ে আর কোনও মন্তব্য করা উপযুক্ত হবে না।"

কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামদ আল থানির সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামদ আল থানির সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
আরও পড়তে পারেন

নরেন্দ্র মোদী ও কাতারের আমিরের বৈঠক

গত ডিসেম্বরে দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত সিওপি-২৮ সম্মেলন চলাকালীন কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামদ আল থানির সঙ্গে নরেন্দ্র মোদীর দেখা হয়।

সেই সময়, প্রধানমন্ত্রী মোদী কাতারে বসবাসরত ভারতীয় সম্প্রদায়ের বিষয়ে খোঁজ খবর নেন এবং দ্বিপাক্ষিক বিষয় নিয়ে আলোচনাও করেন। ওই বৈঠককে বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়েছিল কারণ সে সময় এই আটজন সাবেক নৌ সেনারা কাতারের কারাগারে বন্দি ছিলেন।

এই বৈঠকের কথা উল্লেখ করে বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালও বলেছেন যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে।

নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মৃত্যুদণ্ডের খবরে ভারত জানিয়েছিল, ঘটনাটি তাদের ‘স্তব্ধ’ করেছে এবং তারা সমস্তরকম আইনি বিকল্প খতিয়ে দেখছে।

এরই মাঝে, বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এই আট ভারতীয় নাগরিকের পরিবারের সঙ্গে দেখাও করেন।

সাবেক নৌসেনাদের মুক্তির জন্য কেন্দ্রের মোদী সরকারের উপর ক্রমাগত চাপ বাড়ছিল। কংগ্রেস, এআইএমআইএম এবং অন্যান্য বিরোধী দলগুলি তাদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানাচ্ছিল।

প্রসঙ্গত, এই মুক্তির ঘোষণা এমন সময়ে ঘটেছে যার ঠিক আগে, গত সপ্তাহে ভারত ও কাতারের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে।

আনুমানিক ৭৮০০ কোটি ডলারের এই চুক্তিটি পরবর্তী ২০ বছরের জন্য স্বাক্ষরিত হয়েছে। ভারত আগামী ২০৪৮ সাল পর্যন্ত কাতার থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কিনবে।

ভারতের বৃহত্তম এলএনজি আমদানিকারক কোম্পানি পেট্রোনেট এলএনজি লিমিটেড (পিএলএল) কাতারের সরকারি কোম্পানি কাতার এনার্জির সঙ্গে এই চুক্তি করেছে। সম্প্রতি স্বাক্ষরিত চুক্তির আওতায় কাতার প্রতি বছর ভারতে ৭৫ লক্ষ টন গ্যাস রপ্তানি করবে।

এই গ্যাস বিদ্যুৎ, সার তৈরি এবং কম্প্রেসড ন্যাচারাল গ্যাসে (সিএনজি) রূপান্তরিত করতে ব্যবহার করা হয়।