যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষের যত ইতিহাসের সাথে আলু জড়িয়ে, বাংলায় কীভাবে এলো?

আলু

ছবির উৎস, Getty Images

    • Author, সানজানা চৌধুরী
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা

সবার সাথে মিশতে পারে বা নানা ধরনের কাজ করতে পারে এমন মানুষকে অনেকে রসিকতা করে ‘আলু’ বলে ডাকে।

কারণ আলু এমনই এক সবজি যেটি মাংস, মাছসহ নানা ধরনের তরকারিতে ব্যবহার করা হয়। ভর্তা, ভাজি, চিপসসহ নানাভাবে খাওয়া যায়। বিরিয়ানিতেও অনেকের চোখ থাকে ওই আলুর দিকেই।

তাই বাংলাদেশে সবজির র‍্যাংকিং করা হলে সেখানে আলুর অবস্থান শীর্ষে থাকবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

অন্যান্য সবজি থেকে দামে সস্তা হওয়ায় নিম্নবিত্তদের পাতের শেষ ভরসার অন্যতম এই আলুই।

অথচ জেনে অবাক হবেন ছোট বড় সবার প্রিয় এই আলু চারশ বছর আগেও বাংলাদেশ বা এর আশেপাশে কেউ চোখে দেখেনি। এর নামও জানতো না অনেকে।

ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম কবে আলু এসেছে তা নিয়ে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া গিয়েছে।

পর্তুগিজ নাবিকরা ভারতবর্ষে প্রথম আলু নিয়ে আসে বলে ধারণা করা হয়।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পর্তুগিজ নাবিকরা ভারতবর্ষে প্রথম আলু নিয়ে আসে বলে ধারণা করা হয়।

ভারতবর্ষে আলু কীভাবে এলো?

বিশ্ব জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার মতে, সপ্তদশ শতকের প্রথম দিকে পর্তুগিজ নাবিকরা ভারতবর্ষে প্রথম আলু নিয়ে আসে বলে ধারণা করা হয়।

পর্তুগিজরা দীর্ঘ সমুদ্র যাত্রায় আলু বোঝাই করে নিয়ে আসতো। কারণ আলু সহজে পচে না। সেদ্ধ করেই খাওয়া যায়। পেট ভরা থাকে অনেকক্ষণ।

এই ইউরোপীয় বণিকদের মাধ্যমে আলুর বিষয়ে ভারতের মানুষ প্রথম জানতে পারে।

কথিত আছে কেরালা রাজ্যের কোঝিকোড় শহরের কালিকট বন্দরের শ্রমিকদের অন্যতম খাবার হয়ে দাঁড়িয়েছিল আলু।

কিন্তু আলুকে ভারতবর্ষের সর্বত্র ছড়াতে কাজ করেছিল ইংরেজরা।

সপ্তদশ শতকের শেষ দিকে অর্থাৎ ব্রিটিশ আমলে ভারতবর্ষ তথা বাংলার প্রথম গভর্নর জেনারেল ছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংস।

তিনি ১৭৭২ থেকে ১৭৮৫ সাল পর্যন্ত টানা ১৩ বছর দায়িত্বে থাকাকালে নিজ উদ্যোগে আলুর চাষ করেছিলেন।

তিনি মূলত চেয়েছিলেন ভারতে কম দামে আলু চাষ করে ইউরোপে বিক্রি করতে।

তার হাত ধরে ভারতের পশ্চিম উপকূলের শহর মুম্বাই বা তৎকালীন বোম্বেসহ অনেক প্রদেশে আলুর চাষ বিস্তার লাভ করে। যা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

১৮৪৭ সালে ইংল্যান্ড থেকে প্রকাশিত ‘দ্য গার্ডেনিং মান্থলি’ ম্যাগাজিনের একটি সংখ্যায় ভারতে আলু চাষ সম্পর্কে প্রথম তথ্য পাওয়া যায়।

পরে অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে উত্তর ভারত ও বাংলায় ব্রিটিশরা আলুর প্রচলন করেন।

আওধের নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আওধের নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ।

বাংলায় আলু

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

ভারতে প্রথম আলুর চাষ শুরু হয় উত্তরখণ্ড রাজ্যের পাহাড়ি এলাকা নৈনিতালে। সেখান থেকে আলু চাষের প্রবর্তন হয় মেঘালয় রাজ্যের চেরাপুঞ্জিতে।

কাছাকাছি সময়ে কলকাতার পার্শ্ববর্তী কিছু এলাকায় ব্রিটিশরা আলু চাষ করলে বাঙালি খাবারে আলু প্রবেশ করে।

খাদ্য ইতিহাসবিদ চিত্রিতা ব্যানার্জির নিবন্ধ থেকে জানা যায়, আলুকে বাংলায় আরও বেশি প্রসিদ্ধ করেছিলেন আওধের নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ।

১৮৫৬ সালে নবাবের রাজ্য লখনউ ব্রিটিশরা দখল করে নিলে তিনি কলকাতায় নির্বাসিত জীবন কাটান।

সেসময় নবাবের বাবুর্চিরা কলকাতায় মুঘল লখনউ বিরিয়ানি প্রবর্তন করে এবং তাতে আলু মেশায়। সেই থেকেই বাংলার বিরিয়ানিতে আলু প্রবেশ করেছে বলে মনে করা হয়।

তবে ইতিহাসবিদদের আরেকটি অংশ মনে করে ভারতবর্ষে আলু জনপ্রিয়তা পায় মূলত সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে অর্থাৎ ষোড়শ শতকের দিকে।

১৬১২ সালে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর ভারতের পশ্চিম উপকূলের সুরাট বন্দরে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বাণিজ্যকুঠি স্থাপনের অনুমতি দিলে ভারতবর্ষে ইংরেজদের যাতায়াত শুরু হয়। তারাই ভারতবর্ষে আলু নিয়ে আসে।

এতে মুঘল রাজ পরিবারে আলু নিয়মিত খাবার হয়ে ওঠে। এরপর বাংলার সম্রাটদের মধ্যেও আলু ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

আলু ভর্তা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আলু ভর্তা

বাংলায় আলু কেন জনপ্রিয়

বাংলাদেশে এখন আলু এতোটাই জনপ্রিয় যে কোনো না কোনো পদে আলু থাকতেই হয়।

আলু বাংলার মানুষের কাছে এতো দ্রুত জনপ্রিয় হওয়ার কারণ হিসেবে কৃষিবিদ খালিদ জামিল জানান, “আলু অল্প জমিতে বেশি ফলন হয় এতে কৃষকরা লাভবান হন। আবার দামে কম হওয়ায় ভোক্তারাও কিনতে পারেন। এছাড়া আলু খেতে সুস্বাদু এবং পুষ্টিগুণও ভাতের চাইতে বেশি। তাই আলু সারা দেশের মানুষ গ্রহণ করেছে।”

বাংলাদেশে গেল নব্বই দশকে আলু খাওয়া নিয়ে একটি পোস্টার ছাপানো হয়েছিল। তাতে স্লোগান ছিল ‘বেশি করে আলু খাও, ভাতের ওপর চাপ কমাও।’

আলুর ফলন বাড়াতে আশির দশক থেকে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটের (বারি) বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন দেশের আলুর জাতগুলোকে উন্নত করে দেশের আবহাওয়া উপযোগী করা শুরু করেন।

বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন অংশে বারি ১ থেকে ৯১সহ আরও বিভিন্ন জাতের আবাদ হয় যার বেশিরভাগের উৎপত্তিস্থল দেশ নেদারল্যান্ডস।

এরমধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত জাত হলো ডায়মন্ড (ডিম্বাকার), কার্ডিনাল (লালচে আলু), গ্রেনুলা (গোল আলু)।

বর্তমানে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি এলাকা ছাড়া দেশের সব স্থানেই আলুর চাষ হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি আলু ফলে মুন্সিগঞ্জ, বগুড়া ও রংপুর জেলায়। কৃষি গবেষকদের মতে আলু প্রথম চাষ হতে পারে মুন্সিগঞ্জে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সর্বশেষ পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, আলু উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম।

আবার ইন্টারন্যাশনাল পটেটো কাউন্সিলের তথ্যমতে, আলু উৎপাদনে এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের স্থান তৃতীয়।

কিন্তু এই আলু ইংলিশ, পর্তুগিজ বা ইউরোপীয় কোনো ফসল নয়। তাহলে আলুর উৎপত্তি কোথা থেকে হয়েছে?

আজ থেকে আট হাজার বছর পূর্বে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরুতে প্রথম আলু পাওয়া যায়।

ছবির উৎস, Ernesto Benavides/Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আজ থেকে আট হাজার বছর পূর্বে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরুতে প্রথম আলু পাওয়া যায়।

আলু আবিষ্কার হয়েছে কীভাবে

ক্যামব্রিজ ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি অব ফুডের তথ্যমতে, আজ থেকে আট হাজার বছর পূর্বে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরুতে প্রথম আলু পাওয়া যায়।

পেরুর ইন্টারন্যাশনাল পোটেটো সেন্টারের সিনিয়র কিউরেটর রেনে গোমেজের মতে, লিমা থেকে প্রায় ১০০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে টিটিকাকা হ্রদের কাছে প্রথমে আলু চাষ শুরু হয়েছিল।

প্রাক-কলম্বিয়ান কৃষক বা আজকের দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরুর দক্ষিণাঞ্চল এবং বলিভিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আদিবাসীরা আন্দিজ পর্বতমালায় পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে আলু চাষ করতো বলে জানা যায়।

এভাবে আলু শীঘ্রই পেরু আর বলিভিয়ার ইনকাসহ পাহাড়ে বসবাসকারী অন্যান্য আদিবাসী সম্প্রদায়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ খাবার হয়ে ওঠে।

তারা এই আলু সেদ্ধ করে, ভর্তা করে, স্টু বা মাড় বানিয়ে খেতো। সেইসাথে ভাঙ্গা হাড় জোড়া লাগাতে, বাতরোগ প্রতিরোধে আর বদহজম সারাতে তারা আলু ব্যবহার করতো।

পরবর্তীতে পেরু ও বলিভিয়াতে প্রত্নতাত্ত্বিকরা কিছু মাটির পাত্র পান। যেগুলোয় আলুর ছবি আঁকা ছিল। তারা একে কামাটা বা বাটাটা বলতো।

কথিত আছে, পেরুর ইনকা সভ্যতায় চাষের জমিকে আলু বলা হতো। সেখান থেকেই বাংলায় আলু কথাটা এসেছে।

আলু প্রথমবারের মতো পেরু থেকে ইউরোপের দেশ স্পেনে পৌঁছায়।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আলু প্রথমবারের মতো পেরু থেকে ইউরোপের দেশ স্পেনে পৌঁছায়।

আলু কীভাবে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে

আলু ইউরোপীয়দের নজরে আসে পঞ্চদশ শতকে। ১৫৩২ সালে স্পেনের নাবিকেরা দক্ষিণ আমেরিকায় আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করে। স্প্যানিশ আক্রমণে ইনকা সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যায়।

কথিত আছে, স্প্যানিশরা পেরুতে এসেছিল মূলত স্বর্ণের খোঁজে। স্বর্ণ তারা পায়নি। তবে আন্দিজ পর্বত এলাকায় স্থানীয়দের আলুর আবাদ তাদের নজরে আসে।

ফিরতি যাত্রায় জাহাজ বোঝাই করে নাবিকদের জন্য আলু নিয়ে যায় স্প্যানিশ বণিকরা। সেসময় সমুদ্র যাত্রায় নাবিকদের মধ্যে স্কার্ভি রোগ দেখা দিতো।

পরে দেখা যায় স্প্যানিশ জাহাজের যে সমস্ত নাবিক আলু খেয়েছে, তাদের স্কার্ভি রোগ হয়নি, কারণ আলুতে ভিটামিন সি আছে।

নাবিকেরা সব আলু খেয়ে শেষ করতে পারেনি। তাই কিছু আলু তারা স্পেন পর্যন্ত নিয়ে আসে।

১৫৬৫ সালের দিকে আলু প্রথমবারের মতো পেরু থেকে ইউরোপের দেশ স্পেনে পৌঁছায়। ইউরোপে আসার পরেই কামাটা বা বাটাটা নাম বদলে হয় পটেটো।

এই স্প্যানিশদের হাত ধরেই আলুসহ টমেটো, অ্যাভোকাডো এবং ভুট্টার মতো ফসল বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।

ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আমেরিকার বাইরে এই আলুর প্রচলনকে ঐতিহাসিকরা দ্য গ্রেট কলম্বিয়ান এক্সচেঞ্জ বলে অভিহিত করে।

আন্দিজ থেকে আনা প্রাথমিক শেকড়ের মতো জাতগুলো স্পেন এবং মূল ভূখণ্ড ইউরোপে জন্মানো সহজ ছিল না।

জেনেটিক বিজ্ঞানী হার্নান এ. বারবানো বলেছেন যে আন্দিজে, আলু গাছগুলি দিনে ১২ ঘণ্টা সূর্যালোক পেয়েছিল। কিন্তু ইউরোপের আবহাওয়া ছিল উল্টো। তাই ইউরোপে প্রথম দশক আলু চাষ ব্যর্থতার মধ্যে দিয়ে যায়।

অতপর ষোড়শ শতকে স্প্যানিশদের হাত ধরেই এর আবাদ ছড়িয়ে পড়ে ইতালি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড ও জার্মানি এক কথায় পুরো ইউরোপে।

একই সময়ে চীন ও উত্তর আমেরিকায় আলু ছড়িয়ে পড়ে। চীনের তৎকালীন মিং সাম্রাজ্যের রাজারা আলুকে সাদরে গ্রহণ করেছিলেন। আজ এই চীন হয়ে উঠেছে বিশ্বের সর্বাধিক আলু উৎপাদনকারী দেশ।

কানাডায় আলু চাষ হয় ১৬২৩ সাল থেকে

ছবির উৎস, International Potato Center

ছবির ক্যাপশান, কানাডায় আলু চাষ হয় ১৬২৩ সাল থেকে

আলুকে ঘৃণা করে আলুতেই রক্ষা

প্রথম দিককার আলুর গড়ন দেখতে অনেকটা শেকড়ের মতো ছিল। সেইসাথে এটি মাটির নিচের ফসল এবং কালো চামড়ার আদিবাসীদের খাবার হওয়ায় শুরুতে ইউরোপীয়রা আলুকে বেশ তাচ্ছিল্য করেছিল।

ফ্রান্সে এমন কথাও রটেছিল যে আলু খেলে বুঝি কুষ্ঠ হয়। ফ্রান্সের পার্লামেন্ট ১৭৪৮ সালে আলু চাষ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। যা ১৭৭২ সাল পর্যন্ত বহাল ছিল। তারা আলু শুধুমাত্র শুকরকে খাওয়াত। রুশরা এই আলুকে শয়তানের আপেলও বলতো।

পরে এই ধারণা বদলে দেন অ্যান্টোওয়াইন-অগাস্টিন নামে ফরাসি সেনাবাহিনীর এক মেডিকেল অফিসার।

১৭৫৬ থেকে ১৭৬৩ সালে ইউরোপে সাত বছরের যুদ্ধের সময় প্রুশিয়ান বাহিনী তাকে আটক করে জেলে বন্দি করে। বন্দি থাকার সময় তাকে আলু খেতে দেয়া হয়।

ফরাসিদের থেকে শস্য আমদানি বন্ধ হয়ে গেলে প্রুশিয়ানরা আলু চাষ শুরু করেছিল। সেখানকার শাসক ফ্রেডরিক দ্য গ্রেট তার প্রজাদের দুর্ভিক্ষ থেকে রক্ষা করার জন্য আলু চাষের নির্দেশ দিয়েছিলেন।

সেই আলু খাওয়ার পর ফরাসি বন্দি সেনা অগাস্টিন দেখেন এর কোনো পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নেই।

তিনি মুক্তি পাওয়ার পর ফ্রান্সে আলু খাওয়ার প্রচার করেন এবং দুর্ভিক্ষের সময় শস্যের বিকল্প হিসেবে আলু খাওয়ার পরামর্শ দেন।

পরবর্তীতে ফ্রান্সে ১৭৭১ সালে ঘোষণা করা হয়- আলু ক্ষতিকারক নয়, বরং উপকারী।

বাংলাদেশে আলুর ফলন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশে আলুর ফলন

১৭৭৫ সালে রাজা ষোড়শ লুই এর শাসনামলে হঠাৎ রুটির দাম বেড়ে যায়। সে সময় প্রচার করা হয়, ‘রুটির কথা ভুলে যাও, বেশি করে আলু খাও।’

তিনি কর্তাব্যক্তিদের জন্য একটি ভোজের আয়োজন করেছিলেন, যার সব পদ ছিল আলুর তৈরি।

রাজা কোটের বোতামে গুঁজেছিলেন আলুর ফুল আর সেটিকে কানের দুল করেছিলেন তার রানি।

এর আগে ১৭৭০ সালের দিকে ইউরোপে প্রচণ্ড ঠান্ডা পড়ার কারণে প্রচুর ফসল নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু ভালো থাকে আলু। তখনও মানুষ আলুর গুরুত্ব বুঝতে শেখে।

আলুর গুরুত্ব বুঝে স্পেনের রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ আলু চাষ করতে পোপের থেকে সম্মতি নেন। কেননা তখনও অভিজাতদের মধ্যে আলুর প্রতি আগ্রহ দেখা যায়নি। তারা এটি খেতে দিতো পশুদের।

খাদ্য ইতিহাসবিদদের মতে, যখন আলুর পুষ্টিগুণ নিয়ে প্রচারণা চালানো হয় তখন থেকে সেটি অভিজাতদের পাতে উঠতে শুরু করে।

সে সময় কার্লুস ক্লুসিয়া নামে এক চিকিৎসক আলুর পুষ্টিগুণ নিয়ে গবেষণা ও লেখালেখি করতেন।

তিনি তার এক লেখায় বলেছিলেন যে আলু বেশ স্বাস্থ্যকর খাবার। তারপর থেকে আলুর প্রতি অভিজাত ইউরোপীয়দের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে শুরু করে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্যানুসারে, অষ্টাদশ শতকের গোড়ার দিকে নেপোলিয়নিক যুদ্ধ শুরু হওয়া পর্যন্ত আলু ইউরোপের প্রধান খাদ্য হয়ে উঠেছিল।

আলুতে মড়ক লাগার কারণে টানা কয়েক বছর দুর্ভিক্ষের কবলে আয়ারল্যান্ডের লাখ লাখ মানুষ।

ছবির উৎস, Hulton Archive/Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আলুতে মড়ক লাগার কারণে টানা কয়েক বছর দুর্ভিক্ষের কবলে আয়ারল্যান্ডের লাখ লাখ মানুষ।

আলু আর আইরিশ দুর্ভিক্ষ

ইউরোপে আইরিশরা ছিল ব্যতিক্রম। তারা অল্প সময়েই আলুর গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিল।

ইউরোপিয়ান কমিউনিকেশন সায়েন্সের তথ্যমতে, ব্রিটিশ অভিযাত্রী ও লেখক স্যার ওয়ালটার র‍্যালেই ১৫৮৯ সালে আয়ারল্যান্ডে তার নিজস্ব আঙিনায় আলু চাষাবাদ শুরু করেন।

পরে অন্য আইরিশরাও তাদের বাড়ির সবজি বাগানে আলু চাষ করতে থাকে।

আয়ারল্যান্ডের ঠান্ডা কিন্তু তুষারমুক্ত পরিবেশ ছিল আলু চাষের জন্য অনুকূল। তাছাড়া কম জমিতে বেশি ফলন হয়। একারণে আইরিশ কৃষকরা আলুর আবাদ শুরু করে।

এর স্বাদ অল্প সময়ে এতোটাই জনপ্রিয়তা পায় যে শস্যের পর আলুই আইরিশদের বিকল্প প্রধান খাবার হয়ে ওঠে।

অল্প জমিতে, অল্প খরচে বেশি বেশি উৎপাদন হওয়ায় সপ্তদশ শতকের শেষে বা অষ্টাদশ শতকের শুরুতে এটি আয়ারল্যান্ডের খাদ্য-ফসলে পরিণত হয়।

আজও মিষ্টি আলু থেকে আলাদা করতে সবজির আলুকে আইরিশ আলু বলা হয়।

এদিকে আয়ারল্যান্ডে আলু প্রবেশের পরপরই ১৫৯০ থেকে ১৮৪৫ সালের মধ্যে তাদের জনসংখ্যা ১০ লাখ থেকে বেড়ে ৮০ লাখে দাঁড়ায়।

কিন্তু বিপত্তি ঘটে ১৮শ শতকের মাঝামাঝি এসে। আলুতে লেট ব্লাইট নামে এক ধরণের ছত্রাকজনিত রোগ ছড়িয়ে পড়ে।

যার কারণে ক্ষেতে ক্ষেতে আলু নষ্ট হতে থাকে। আলুর ফলন প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।

আলুতে মড়ক লাগার কারণে টানা কয়েক বছর দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে আয়ারল্যান্ডের লাখ লাখ মানুষ।

১৮৪৫ থেকে ১৮৫২ পর্যন্ত টানা সাত বছর আইরিশরা এই দুর্ভিক্ষের সাথে লড়াই করে। এরমধ্যে সবচেয়ে খারাপ বছর ছিল ১৮৪৭ সাল, এই বছরটাকে 'কালো ৪৭' বলা হয়।

ইন্টারন্যাশনাল পটেটো সেন্টার আন্দিজ থেকে আলুটির বিশ্বব্যাপী গতিবিধি দেখানোর জন্য একটি মানচিত্র তৈরি করেছে

ছবির উৎস, International Potato Center

ছবির ক্যাপশান, ইন্টারন্যাশনাল পটেটো সেন্টার আন্দিজ থেকে আলুর বিশ্বব্যাপী গতিবিধি দেখানোর জন্য একটি মানচিত্র তৈরি করেছে

ওই বছর আইরিশ সরকার নিজেদের মরণাপন্ন মানুষকে না খাইয়ে আয়ারল্যান্ড থেকে মটর, শিম, মাছ, মধু ব্রিটেনসহ অন্যান্য জায়গায় রপ্তানি অব্যাহত রাখে।

ফসলের ব্যর্থতা এবং লন্ডন সরকারের অবহেলার কারণে দুর্ভিক্ষের সময় আয়ারল্যান্ডের দশ লাখ মানুষ মারা যায়।

এমন অবস্থায় ১৮৪৫ থেকে ১৮৫৫-এর মধ্যে প্রায় ১০ লাখ মানুষ আমেরিকায় এবং ২০ লাখ মানুষ অন্য জায়গায় চলে যায়। খাবারের সন্ধানে যারা দেশ ছেড়েছিলেন, তাদের অনেকে পথেই মারা যান।

কয়েক দশকের মধ্যে আয়ারল্যান্ডের জনসংখ্যা অর্ধেকে নেমে আসে।

তৎকালীন ব্রিটিশ রানি ভিক্টোরিয়ার আমলে শস্য আইন বাতিল এবং শস্য কেনাবেচায় উচ্চতর কর ধার্য হওয়ায় আয়ারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশ এমনকি ভারতবর্ষ ব্যাপক ভোগান্তির মুখে পড়েছিল।

দুর্ভিক্ষকালে একদিকে আলুর মড়ক অন্যদিকে বাজার ধস ও অব্যবস্থাপনায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল।

আজও আইরিশ দুর্ভিক্ষকে ব্রিটিশ সরকারের আরোপিত গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

পরে ১৯৯৭ সালে ব্রিটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার যুক্তরাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আইরিশদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

আলুর অন্তত পাঁচ হাজার প্রজাতি রয়েছে।

ছবির উৎস, Diego Arguedas Ortiz

ছবির ক্যাপশান, আলুর অন্তত পাঁচ হাজার প্রজাতি রয়েছে।

শিল্প বিপ্লব, যুদ্ধ ও কর ফাঁকি

ইতিহাসবিদ উইলিয়াম ম্যাকনিল তার ‘হাও দ্য পটেটো’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের সময় প্রচুর কারখানা গড়ে ওঠে যা পরিচালনার জন্য প্রয়োজন ছিল শ্রমজীবী মানুষের।

এই বিশাল সংখ্যক শ্রমিকদের অল্প খরচে খাওয়ার জন্য আলুর প্রয়োজনীয়তা বেড়ে যায়।

সেসময় ইউরোপের কারখানা শ্রমিক এবং জেলেরা আলু বেশ পছন্দ করেছিল কারণ এটি সহজে নষ্ট হতো না। সহজে সেদ্ধ করে খাওয়া যেতো। পেট অনেকক্ষণ ভর্তি থাকতো।

আলুর জনপ্রিয়তার আরেকটি কারণ ছিল যুদ্ধ। ইউরোপের যুদ্ধ চলাকালীন সৈনিকদের কাছে আলু জনপ্রিয় খাবার হয়ে ওঠে।

আলুর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এটি মাটির নিচে জন্মায়। শত্রুরা ফসল ধ্বংস করতে পারে না। এতে মানুষ আলু খেয়ে চলতে পারে।

ইতিহাসের ঘটনা প্রবাহে বিংশ শতকেও ইউরোপে বিশেষ করে জার্মানিতে আলু ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

বলা হয় দুটি বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির নাৎসি বাহিনীকে সচল রেখেছিল এই আলু।

ওই যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী যখন খাদ্য সংকট দেখা দেয় তখন খাবার হিসাবে আলুর কদর বিশেষ করে মিষ্টি আলুর কদর বেড়ে যায়। মিষ্টি আলু পুড়িয়ে বা সেদ্ধ করে খাওয়া যায়, কাঁচাও খাওয়া যায়।

উত্তর কোরিয়ার কৃষি অনেকটাই নির্ভরশীল ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে সার আমদানি এবং বৈদ্যুতিক পানির পাম্পের উপর।

কিন্তু সোভিয়েত পতনের পর উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতিতেও ধস নামে। ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৮ দেশটিতে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। যাতে মারা যায় আড়াই লাখ থেকে সাড়ে তিন লাখ মানুষ।

এমন অবস্থায় দেশটির তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান কিম জং ইল দেশকে দূর্ভিক্ষ থেকে বাঁচাতে আলু চাষ শুরু করে।

উত্তর কোরিয়ার অনেক চিত্র শিল্পে আলু এবং আলু ফুলের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। আলু নিয়ে তাদের গণ সংগীতও আছে।

আলুর ফলন

ছবির উৎস, Getty Images

এক কথায় শিল্প উৎপাদন ও সামরিক শক্তির জন্য প্রয়োজন ছিল শক্তিসবল মানুষ। আর তাদের জন্য আলু ছিল স্বাস্থ্যকর খাবার। সেক্ষেত্রে রাষ্ট্র এদিকে মনোযোগী হয়ে ওঠে।

ওয়ারউইক ইউনিভার্সিটির ইতিহাস বিভাগের প্রধান রেবেকা আর্ল বলেন, যারা আলু খায় তাদের দিকে তাকান। তারা অন্যদের চেয়ে শক্তিশালী।

খাদ্য ইতিহাসবিদ রেবেকা আর্লে, তার ফিডিং দ্য পিপল: দ্য পলিটিক্স অফ দ্য পটেটো বইয়ে উল্লেখ করেন, ইউরোপের কর কর্মকর্তারা ক্ষেত ও ফসলের আকার দেখে কর নির্ধারণ করতেন এবং ফসল প্রস্তুত হলে আদায়ের জন্য আসতেন।

কিন্তু আলু মাটির নিচে জন্মানোয় সেটা দেখা যেতো না এতে সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা কমে যায়।

যুদ্ধের সময় কৃষকরা আলু সংরক্ষণ করতে পারতো। কেননা সৈন্যরা শস্যের গুদামে হামলা চালায়, কেউ ক্ষেত খনন করে না। এ সুবিধা দেখে এবং খাদ্য নিরাপত্তার কথা ভেবেই প্রুশিয়ার রাজা ফ্রেডরিক আলু চাষের নির্দেশনা দিয়েছিলেন।

অ্যাডাম স্মিথ দ্য ওয়েলথ অফ নেশনস-এ লিখেছেন, “আলু ক্ষেতে উত্থিত খাদ্য, গম ক্ষেতে উত্থিত খাদ্যের চেয়ে অনেক ভালো।”

এটাও দাবি করা হয় যে আলুর বিস্তার ইউরোপ ও এশিয়ায় জনসংখ্যার বিস্ফোরণ ঘটায়। বিশেষ করে সপ্তদশ থেকে ঊনবিংশ শতকের মধ্যে বিশ্বের জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং নগরায়নের প্রায় এক-চতুর্থাংশ ছিল আলুর কারণে।