'ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিক নিজে প্লট না নিলেও মা, ভাই,বোনকে পাইয়ে দিতে প্রভাব খাটিয়েছেন'

ছবির উৎস, PA Media
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগ্নি ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক বাংলাদেশে আয়কর রিটার্ন জমা দিয়েছিলেন এবং সেই নথিতে ঢাকার স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা দেওয়া হয়েছে, দুদকের আইনজীবী খান মোহাম্মদ মইনুল হাসান সাংবাদিকদের কাছে এই দাবি করেছেন।
তিনি আরও জানান, "পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে নিজের মা, ভাই, বোনকে প্লট পাইয়ে দিতে নিজের খালা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রভাবিত করেছেন টিউলিপ সিদ্দিক।"
আজ বুধবার সকাল দশটা ৫০ মিনিটে শেখ হাসিনার বোন রেহানা সিদ্দিকসহ তার তিন ছেলেমেয়ের বিরুদ্ধে ৩০ কাঠার প্লট দুর্নীতি সংক্রান্ত পৃথক তিন মামলার বাদী দুর্নীতি দমন কমিশনের তিনজন কর্মকর্তা আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন।
ঢাকার বিশেষ জজ আদালত - ৪ এর বিচারক রবিউল আলম তাদের জবানবন্দি গ্রহণ করেছেন।
দুদকের আইনজীবী মি. হাসান পরে সাংবাদিকদের বলেন, "টিউলিপ সিদ্দিক ব্রিটিশ পার্লামেন্টের মেম্বার হিসেবে বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী হয়ে তার খালা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর প্রভাব ও চাপ প্রয়োগ করে তার মা শেখ রেহানা, ভাই রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ও বোন আজমিনা সিদ্দিক বরাবরে পূর্বাচল নতুন শহরের ডিপ্লোমেটিক জোনে প্লট প্রাপ্তির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।"
তবে টিউলিপ সিদ্দিক ওই প্রকল্পে নিজের জন্য প্লট নেননি বলে জানান মি. হাসান।
এ সংক্রান্ত "নেসেসারি এভিডেন্স সাক্ষ্য প্রমাণে আদালতে যথাসময়ে দাখিল করা হবে" উল্লেখ করে মি. হাসান জানান, তদন্তের সময় দুদক টিউলিপ সিদ্দিকের যেসব নথি পেয়েছে সেগুলোতে বাংলাদেশের ঠিকানা পাওয়া গেছে। ওই ঠিকানায় তাকে সমন পাঠানো হয়েছে।
এদিকে, টিউলিপ সিদ্দিক এই মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছেন।
এর আগে দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকাকে তিনি বলেছিলেন, মুহাম্মদ ইউনূস ও শেখ হাসিনার মধ্যে বিরোধে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত। কোনো সমন পাননি বলেও জানিয়েছেন তিনি।
দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর গত জানুয়ারিতে যুক্তরাজ্যের হ্যাম্পস্টেড ও হাইগেটের এই এমপি ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার অর্থনীতি বিষয়ক মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
এদিকে, টিউলিপ সিদ্দিকের অভিযোগ সম্পর্কে এক প্রশ্নের উত্তরে দুদকের আইনজীবী মি. হাসান বলেছেন, "টিউলিপ সিদ্দিক বাংলাদেশে আয়কর রিটার্ন দাখিল করেছেন। তার বাংলাদেশের ঠিকানা আছে। সেই ঠিকানায়ই তার সমন পাঠানো হয়েছে। এমনকি ভোটার লিস্টেও তার নাম আছে।"
তবে আসামি পলাতক থাকায় এসব মামলায় সাক্ষীদের জেরা করার কোনো সুযোগ ছিল না।

এই আইনজীবী জানান, মিজ সিদ্দিক পলাতক থাকায় তার আইনজীবীদের দেখা করার কোনো সুযোগ নেই।
টিউলিপ সিদ্দিকের করা মন্তব্যের কথা উল্লেখ করলে দুদকের এই আইনজীবী মি. হাসান বলেন, "উনি সম্পূর্ণরূপে মিথ্যা বলেছে। ওনার বিরুদ্ধে যেই অভিযোগ এজাহারে আনা হয়েছে তার বিষয়বস্তু আমরা যথাসময়ে আদালতে দাখিল করবো।"
টিউলিপের বিরুদ্ধে অভিযোগ কী? কী সাজা হতে পারে?
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
"ক্ষমতা ও প্রভাবের অপব্যবহার করে" বাংলাদেশের রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্লট বরাদ্দ নেওয়া অভিযোগ উঠেছে শেখ হাসিনা ও তার ভাগ্নি টিউলিপ সিদ্দিকসহ তাদের পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে।
পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে মোট ৬০ কাঠা প্লট বরাদ্দে দুর্নীতির অভিযোগে শেখ হাসিনার ছেলেমেয়ে ও রেহানা সিদ্দিকের ছেলেমেয়েদের বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন।
তিনটি মামলায় টিউলিপ সিদ্দিক এবং শেখ হাসিনাকে আসামি করা হয়েছে।
এর মধ্যে ১০ কাঠা প্লট দুর্নীতির অভিযোগের এক মামলায় রেহানা সিদ্দিক, টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক, শেখ হাসিনাসহ মোট ১৭ জন আসামি।
আরেক মামলায় রেহানা সিদ্দিকের মেয়ে আজমিনা সিদ্দিক, টিউলিপ সিদ্দিক এবং শেখ হাসিনাসহ ১৮ জন আসামি।
প্লট দুর্নীতির তৃতীয় মামলায় মিজ রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিকসহ মোট আসামি ১৮ জন।
এই তিন মামলায় মোট আসামি ২২ জন। এদের মধ্যে রাজউক, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও রয়েছেন।
রেহানা সিদ্দিকের বিরুদ্ধে করা মামলায় বুধবার সাক্ষ্য দিয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের উপ - পরিচালক ও মামলার বাদী মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন।
তিনি সাক্ষ্য দিতে গিয়ে বলেছেন, "রেহানা সিদ্দিকের নিজের বা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মালিকানায় ঢাকা শহরে রাজউকের এখতিয়ারাধীন এলাকায় বাড়ি বা ফ্ল্যাট বা আবাসন সুবিধা রয়েছে। এরপরও হলফনামায় তথ্য গোপন করে পূর্বাচল নতুন শহর আবাসন প্রকল্পে প্লট বরাদ্দ সংক্রান্ত আইন, বিধি ও নীতিমালা ও আইনানুগ পদ্ধতি লঙ্ঘন করে তার মেয়ে আসামি টিউলিপ সিদ্দিকের বিশেষ ক্ষমতাবলে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব ও সহযোগিতায় আসামি শেখ হাসিনাকে প্রভাবিত করে তার ওপর অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার করে অপরাধজনক বিশ্বাসভঙ্গ করেছেন।"
একইসাথে প্রকল্পে বরাদ্দ বিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত গণকর্মচারীদের প্রভাবিত করার অভিযোগও করা হয়েছে।
"আইনমতে বরাদ্দ পাওয়ার যোগ্য না হওয়া সত্ত্বেও পরস্পর যোগসাজসে নিজেরা লাভবান হয়ে ও অন্যকে লাভবান করার উদ্দেশ্যে" পূর্বাচল আবাসন প্রকল্পের 'অতি মূল্যবান' কূটনৈতিক এলাকার ২৯ নম্বর সেক্টরের ১৩ নম্বর প্লট রেহানা সিদ্দিকের নামে বরাদ্দ নিয়ে এবং প্লটের বাস্তব দখলসহ রেজিস্ট্রি নিয়ে আসামিরা "অপরাধজনক বিশ্বাসভঙ্গ" করেছেন বলেও জানান মামলার বাদী।
এটা দণ্ডবিধি ও দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনে দণ্ডযোগ্য অপরাধ বলেও উল্লেখ করেছেন মামলার সাক্ষী।
দুদকের আইনজীবী খান মোহাম্মদ মইনুল হাসান জানান, অপরাধজনক বিশ্বাসভঙ্গসহ যে অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে, এসব অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
এদিকে বুধবার মি. সালাহউদ্দিন ছাড়া দুদকের আরও দুইজন কর্মকর্তা ও দুই মামলার বাদী সাক্ষ্য দিয়েছেন।
সাক্ষীরা আদালতে জানিয়েছেন, অভিযোগ অনুসন্ধানের সময় বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা করে তারা জেনেছেন আসামি টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক বর্তমানে যুক্তরাজ্যের হ্যাম্পস্টেড ও হাইগেট অঞ্চলের হয়ে বৃটিশ পার্লামেন্টের সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এর আগে তিনি হ্যাম্পস্টেড ও কিলবার্ন অঞ্চলের হয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি যখন জানতে পারেন তার খালা সাবেক প্রধানমন্ত্রী আসামি শেখ হাসিনা তার ক্ষমতা ব্যবহার করে তার নিজ নামে, ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও মেয়ে সায়মা ওয়াজেদের নামে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প এলাকায় প্রত্যেকে দশ কাঠা প্লট বরাদ্দ নিচ্ছেন, তখন তিনি যুক্তরাজ্যের ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তার মা রেহানা সিদ্দিক, বোন আজমিনা সিদ্দিক ও ভাই রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিকের নামে একই প্রকল্পে প্লট বরাদ্দ নিতে তার বিশেষ ক্ষমতা ব্যবহার করে খালা শেখ হাসিনার ওপর চাপ প্রয়োগ ও প্রভাব বিস্তার করেন বলে সাক্ষ্য দিয়েছেন মামলার বাদীরা।

ছবির উৎস, AP
রাজউকের পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের জন্য ২০০৮ সালের বিভিন্ন সময় দরখাস্ত আহ্বান করা হয়। প্লট বরাদ্দের প্রসপেক্টাস প্রকাশিত হয় একই বছর।
মি. সালাহউদ্দিন তার সাক্ষ্যে বলেন, ওই প্রসপেক্টাস পর্যালোচনা করে দেখা গেছে প্লট পেতে আগ্রহী বাংলাদেশি নাগরিকদের রাজউকের নির্ধারিত আবেদন ফরমে ২০০৮ সালের ১৮ ডিসেম্বরের মধ্যে আবেদন করতে বলা হয়।
পরে প্লট বরাদ্দের সংশোধিত বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয় বলে জানান মি. উদ্দিন।
একইসাথে রাজউকের নির্ধারিত ফরম ছাড়া আবেদন করা যাবে না এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন করতে হবে।
কিন্তু আসামিরা নির্ধারিত ফরম ও সময়সীমার মধ্যে কোনো আবেদন করেননি বলে মামলার বাদীরা তাদের সাক্ষ্যে জানিয়েছেন।
এদিকে, রেহানা সিদ্দিক, টিউলিপ সিদ্দিকসহ প্রত্যেকের বাংলাদেশে স্থায়ী ঠিকানা রয়েছে বলে মামলার বাদীরা জানিয়েছেন।
রাজউকের বিধি অনুযায়ী, ঢাকা বা আশেপাশে নারায়ণগঞ্জেও যদি নিজেদের নামে, নির্ভরশীল বা পোষ্য কারও নামে কোনো প্লট, ফ্ল্যাট থাকে তবে তারা প্লট পাবে না।
প্লটের জন্য আবেদনকারীদের প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের স্বাক্ষরিত একটি হলফনামা দাখিল করতে হয়। কিন্তু আসামিদের কেউই ঢাকায় তাদের প্লট বা ফ্ল্যাট থাকলেও তা জানাননি।
মামলার একজন বাদী দুদকের সহকারী পরিচালক আফনান জান্নাত কেয়া সাক্ষ্যে বলেন, "রাজউকের বিধান লঙ্ঘন করে আসামি আজমিনা সিদ্দিককে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে প্লট বরাদ্দের জন্য টিউলিপ রেজওয়ানা সিদ্দিকের চাপে আসামি শেখ হাসিনার নির্দেশে তার কার্যালয়ের মাধ্যমে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ অন্যান্য কর্মকর্তাকে প্রভাবিত করেন।"
এক্ষেত্রে দ্য ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট রুলস, ১৯৬৯ এর বিধান লঙ্ঘন করা হয়েছে। বিশেষ অনুগ্রহ ও অবৈধ পারিতোষিক হিসেবে প্লটটি বরাদ্দ দেওয়া ও গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানান মিজ কেয়া।
দুদকের আইনজীবী জহিরুল ইসলাম বলেন, "ব্রিটিশ সিটিজেন আজমিনা সিদ্দিক আবেদন না করেও প্লটের মালিক হয়েছেন। রাজউকের বিধিতে বলা আছে বাংলাদেশি নাগরিকরা এখানে প্লট পাবেন। কিন্তু ব্রিটিশ সিটিজেন হয়েও পেয়েছেন। কারণ সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালার ক্ষমতা ব্যবহার ও বোন টিউলিপ সিদ্দিককে ব্যবহার করে আবেদন না করা সত্ত্বেও ১০ কাঠা প্লট পেয়েছেন।"
শেখ হাসিনা ও টিউলিপ সিদ্দিক উভয়েই ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন বলে জানান তিনি।
এই তিন মামলার বাদীদের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ২৮শে ডিসেম্বর পরবর্তী শুনানির দিন ঠিক করেছে আদালত।
এর আগে গত সোমবার প্লট দুর্নীতি মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ জয় এবং ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন একই সাক্ষীরা।








