আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
খেলাপি ঋণ রেকর্ড ছাড়িয়েছে,পলাতক অনেকে, আদায় হবে কীভাবে?
- Author, তাফসীর বাবু
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
গাজীপুরের টঙ্গিতে অ্যাননটেক্স গ্রুপের একটি পোশাক কারখানা। সাত বছর ধরে কারখানাটি বন্ধ। চাকরি হারিয়েছেন কয়েকহাজার শ্রমিক।
কারখানাটির কাছে গিয়ে দেখা গেলো, মূল ফটক থেকে খুলে ফেলা হয়েছে কারখানার নাম এবং মালিকপক্ষের কোম্পানির লোগো। ভেতরে বেশ কয়েকটি বহুতল ভবন অলস পড়ে আছে।
মূল ফটকের ভেতরে কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মী আড্ডা দিচ্ছিলেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেলো, তাদের একজন মালিকপক্ষ থেকে নিয়োজিত। অন্যজন জনতা ব্যাংকের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা তদারকির দায়িত্বে আছেন।
মূলত: কারখানাটির মালিক অ্যাননটেক্স গ্রুপের কাছে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব জনতা ব্যাংকের পাওনা সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকারও বেশি। যার পুরোটাই খেলাপি হয়ে গেছে। মালিকপক্ষ ঋণ শোধ করছেন না, কিস্তিও দিচ্ছেন না। ফলে বন্ধকি এই সম্পত্তি এখন ব্যাংকের অধীনে।
সেখানে কথা হয় জনতা ব্যাংকের নিরাপত্তা তত্ত্বাবধায়ক শফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, "এটার তো লোন আছে। সেজন্যই ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আমাদেরকে এখানে রাখছে।
"এখানে আমাদের মূল কাজটা হলো যেন এখান থেকে কোনো মালামাল বের না হতে পারে। অথবা মালিকপক্ষ কোনো কিছু নিয়ে যেতে না পারে। অর্থাৎ যেখানে, যা আছে, সেভাবেই থাকবে।"
বাংলাদেশে খেলাপি ঋণে অ্যাননটেক্স গ্রুপ একমাত্র উদাহারণ নয়। বেক্সিমকো, এস আলমসহ বড় বড় কোম্পানি নামে-বেনামে বড় অংকের ঋণ খেলাপি হয়েছে দেশটিতে।
বিশেষ করে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে গত এক বছরে খেলাপি ঋণ রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে।
এছাড়া নানা কৌশলে খেলাপি না দেখানো ঋণগুলোও এখন প্রকাশ্যে আসায় সেটা ক্রমাগত: বাড়ছে। যেটা মোট ঋণের ত্রিশ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে, ঋণ খেলাপিদের অনেকেই যখন পলাতক, তখন এই বিপুল খেলাপি ঋণ আদায় করা কতটা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশে খেলাপি ঋণ কত?
বাংলাদেশে ২০০৯ সালে দেশটিতে খেলাপি ঋণ ছিলো বাইশ হাজার কোটি টাকা।
২০২৪ সালের জুনে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় দুই লাখ এগার হাজার কোটি টাকা।
আর ২০২৫ সালের জুন নাগাদ খেলাপি ঋণ গিয়ে ঠেকেছে পাঁচ লাখ ত্রিশ হাজার কোটি টাকায়।
অর্থাৎ একবছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে রেকর্ড পরিমাণে তিন লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যাচ্ছে, গত কয়েকমাসে খেলাপি ঋণের পরিমাণ পাঁচ লাখ ত্রিশ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ছয় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
সে হিসেবে দেশটির মোট ঋণের তেত্রিশ শতাংশরও বেশি খেলাপি হয়ে গেছে।
সংখ্যাটা বিশাল তাতে কোনও সন্দেহ নেই। এই বিপুল খেলাপি ঋণে মোটাদাগে বড় কিছু সমস্যাও দেখা যাচ্ছে অর্থনীতিতে।
এক. এই বিশাল পরিমাণ টাকা আদায় হবে কি-না সেটা অনিশ্চিত।
দুই. যেসব ব্যাংক এসব ঋণ দিয়েছে সেই ব্যাংকগুলো ধুঁকছে। গ্রাহকদের টাকা ঋণ হিসেবে দিয়ে দেওয়ায় ব্যাংকের কাছে টাকা নেই। ফলে আমানতকারীরা তাদের টাকা পাচ্ছে না।
তিন. সামগ্রিকভাবে এটা অর্থনীতিতে একটা ক্ষতিকর 'চেইন রিঅ্যাকশন' তৈরি করেছে। ব্যাংকগুলো এখন বেরসরকারি খাতে ঋণ দিতে পারছে না। ফলে নতুন উদ্যোক্তা বা ব্যবসা সৃষ্টি কমে গেছে। কর্মসংস্থান কমে গিয়ে এর প্রভাব জনজীবনেও পড়ছে।
"এখানে একটা দুষ্টচক্র সৃষ্টি হয়েছে। বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, মানুষের জীবনমান সবখানেই এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে।"
বলেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ -সিপিডির ডিস্টিংগুইশড ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।
খেলাপি ঋণ লাফিয়ে বাড়লো কেন?
গত একবছরে রাজনীতি এবং অর্থনীতিতে অনেক কিছুই ঘটেছে, যার ফলে দেশটির খেলাপি ঋণ হঠাৎ বেড়েছে।
অর্থনীতিবিদরা অবশ্য বলছেন, খেলাপি ঋণের চিত্র কমবেশি এরকমই ছিলো। কিন্তু সেটাকে এতোদিন সামনে আনা হয়নি অর্থাৎ প্রকৃত চিত্র 'লুকিয়ে রাখা হয়েছিলো'।
তবে এর বাইরেও খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির আরও কারণ আছে।
এক. শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগ সমর্থিত ব্যবসায়ীদের অনেকেই দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। যাদের অনেকেরই বড় অংকের ঋণ আছে। যেমন বেক্সিমকো, এস আলম গ্রুপ, নাসা গ্রুপ ইত্যাদি। তাদের এখন ব্যবসা প্রায় নেই। ঋণের কিস্তিও দিচ্ছে না।
দুই. আন্তর্জাতিক মূদ্রা তহবিলের পক্ষ থেকে খেলাপি ঋণ নিয়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণে চাপ দেওয়া হচ্ছিলো বাংলাদেশ ব্যাংককে। সেটা অনুসরণ করতে গিয়ে খেলাপি ঋণ বেড়ে যায়।
তিন. বেশ কিছু ঋণ আদালতের আদেশে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা যাচ্ছিলো না। পরে সেগুলোকেও খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা শুরু হয়।
চার. কিছু ব্যাংকে 'ফরেনসিক অডিট' করা হয়। এতে করে সেখানেও নতুন খেলাপি ঋণের তথ্য বেরিয়ে আসে।
সবমিলিয়েই একবছরে এই বৃদ্ধি ঘটেছে বলে জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান।
ঋণ আদায়ের অভিজ্ঞতা: 'কোনো যন্ত্রই কাজ করছে না'
বাংলাদেশে খেলাপি ঋণ চিহ্নিত হচ্ছে। কিন্তু চিহ্নিত করাটাই সমাধান নয়। এর আদায় এবং কীভাবে খেলাপির পরিমাণ কমিয়ে আনা হবে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।
এক্ষেত্রে খেলাপি ব্যক্তির ঋণ নেওয়ার সময় যে জামানত আছে, সেটা বিক্রি করে টাকা আদায়ের প্রক্রিয়ায় গিয়েছে ব্যাংকগুলো। একইসঙ্গে ঐ ব্যক্তির শেয়ার জব্দ করে টাকা আদায় হচ্ছে।
কিন্তু এটা করতে গিয়ে নানা জটিলতাও তৈরি হয়েছে। যেমন-
এক. খেলাপি ঋণের বিপরীতে যে জামানত রাখা আছে, সেটার মূল্যমাণ ঋণের তুলনায় কম। অর্থাৎ দশ টাকার জামানত নিয়ে একহাজার টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রে এসব জামানত বিক্রি করেও লাভ হচ্ছে না।
দুই. বড় বড় ঋণগুলো দেওয়া হয়েছে বেনামে। এস আলম গ্রুপসহ অনেকেই নেপথ্যে থেকে বেনামে এসব ঋণ বের করে নিয়েছেন।
তিন. ঋণগ্রহীতারা বিদেশে পলাতক। টাকাও বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। ফলে টাকা আদায় হচ্ছে না।
উদাহারণ হিসেবে বলা যায়, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের কথা।
ব্যাংকটির তথ্যে দেখা যায়, সেখানে এখন মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫৯ হাজার কোটি টাকা। যেটা ব্যাংকটির মোট ঋণের ৯৫ শতাংশ।
সেখানে গত একবছরে খেলাপি ঋণ আদায় হয়েছে তিন হাজার কোটি টাকা। এছাড়া জামানত জব্দ করে বিক্রি কিংবা ঋণ পুন:তফসিল করে ভবিষ্যতে আদায়ের সুযোগ আছে সবমিলিয়ে বিশ হাজার কোটি টাকা।
কিন্তু এরপরও ৩৯ হাজার কোটি টাকা অনাদায়ী থাকবে, যেটা আসলে আদায়ের সুযোগ নেই বললেই চলে। কারণ এসব টাকা বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। অন্যদিকে ঋণগ্রহীতারাও পলাতক।
ব্যাংকটিতে গতবছর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান ইসলামী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান। ঋণ আদায়ের অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে তিনি জানাচ্ছেন, তার ভাষায়, ঋণ আদায়ে কোনো যন্ত্রই কাজ করছে না।
তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, "এই ব্যাংকের মোট ডিপোজিট ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এখন ৩৯ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ (ঋণ দেয়া হয়েছে) হয়েছে এমনভাবে যেখানে প্রকৃত সুবিধাভোগীকে পাওয়া যাচ্ছে না।
"মনে করেন কাজের বুয়াকে একশত কোটি টাকা দিয়ে দিলেন বা চটপটিওয়ালার নামে দুইশত কোটি টাকা দিয়ে দিলেন। এখানে এই লুটপাটটা ঘটে গেছে।"
মি. মান্নান যে ঋণের কথা বলছেন, সেগুলো নিয়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলোয় বহু রিপোর্ট হয়েছে। এসব ঋণের পেছনে প্রধানত: দায়ী করা হচ্ছে চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপকে।
এসব ঋণ আদায়ে সরকারের পদক্ষেপ দরকার বলে জানাচ্ছেন ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান।
"এই ব্যাংকে এতোবড় একটা মিসম্যাচ হয়ে গেছে। এখন আমাদের ব্যাপারটা হচ্ছে, আমরা পেশাদার ব্যাংকার হিসেবে বিনিয়োগ করতে শিখেছি, আমরা ডিপোজিট আনতে শিখেছি।
"এখন আপনি যদি আমার গ্রাহক হন, তাহলে স্বাভাবিক আদায় প্রক্রিয়ায় আমরা জানি যে, আপনার কাছে কোনো যন্ত্র ব্যবহার করে টাকাটা আদায় করা যাবে। কিন্তু এখানে কোনো যন্ত্রই কাজ করছে না। এরা যেহেতু বিদেশে আছে, এখানে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সরকারের সাহায্য লাগবে। তারা সেটা শুরুও করেছেন" বলে মন্তব্য করেন মি. মান্নান।
কী করছে বাংলাদেশ ব্যাংক?
বাংলাদেশ ব্যাংক কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছে যেন ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণ কমাতে পারে।
এক. গত ষোল বছর মূলত: রাজনৈতিক কারণে যেসব ব্যবসা বন্ধ হয়ে ঋণগুলো খেলাপি হয়েছিলো, এখন তাদেরকে সহজ শর্তে পুন:তফসিলের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এতে করে ঋণগুলো আর খেলাপি থাকবে না। গ্রেস পিরিয়ডের পর কিস্তি শুরু হয়ে যাবে।
দুই. জামানত ও শেয়ার বিক্রি করে ঋণের কিছু অর্থ আদায় করছে ব্যাংকগুলো।
তিন. ব্যাংকে যেসব মন্দ ঋণ আছে সেগুলোকে ব্যাংকের মূল অ্যাকাউন্টস বা বই থেকে আলাদা করে ফেলার সুযোগ সহজ করে দেওয়া হয়েছে। এতে কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণ কমবে। তবে গ্রাহকের দায়মুক্তি হবে না।
চার. ব্যাংকের যারা ঋণ আদায়ে দক্ষতা দেখাবেন তাদের জন্য প্রণোদনা বাড়ানো।
পাঁচ. বিদেশ থেকে পাচারকৃত টাকা ফেরাতে 'স্টোলেন অ্যাসেট রিকোভারি' নামে টাস্কফোর্স গঠন করা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, তাদের টাস্কফোর্স বিদেশে কাজ শুরু করেছে।
"বিশ্বের যেসব দেশে অর্থ পাচার হয়েছে বলে কথিত আছে, সেসব দেশে আমরা যাচ্ছি। এবং আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
"আমরা তো দেখেছি কিছুদিন আগে ইংল্যান্ডে সাবেক একজন মন্ত্রীর স্থাবর সম্পত্তি সেদেশের সরকার ক্রোক করেছে। স্থাবর সম্পত্তি হয়তো ফেরানো যাবে না কিন্তু সেটা যদি টাকায় কনভার্ট করে আমরা ফেরত আনতে পারি, তাহলে অবশ্যই এটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে" বলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র।
এছাড়া খেলাপি ঋণে রুগ্ন হয়ে পড়া পাঁচটি ইসলামি ঘরানার ব্যাংককে একত্রিত করে একটি ব্যাংক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, ব্যাংকগুলোকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি করা।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ -সিপিডির ডিস্টিংগুইশড ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, ব্যাংকে টাকা রাখে গ্রাহকরা। সেই টাকা থেকেই ঋণ দেওয়া হয়। এখন সেই ঋণ বিশাল অংকে খেলাপি হয়ে গেলে ব্যাংকের কাছে আর টাকা থাকে না। ফলে ব্যাংক গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে পারে না।
"ব্যাংকগুলোকে এখন জোর দিতে হবে সবল করার উপর। ব্যাংকগুলোকে যদি আমরা শক্তিশালী অবস্থায় আনতে পারি, তাহলে গ্রাহকদের যে টাকাটা এখন যেসব ব্যাংক দিতে পারছে না, সেটা কিছুটা ফেরত দেওয়া যাবে।
"কিন্তু একটা বড় ড্যামেজ যেটা, সেটা তো রয়েই গেছে। দেশের বাইরে যেটা নিয়ে গেছে, সেই ড্যামেজটাকে আমরা খুব বেশি রিকোভার করতে পারবো না। কিন্তু ব্যাংকগুলোর স্বাস্থ্য ভালো করতে পারলে গ্রাহকদের যে চাহিদা আছে সেটা পূরণ করা যাবে" বলছিলেন মোস্তাফিজুর রহমান।