ভারতে শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্তার অভিযোগে সুরাহা না পেয়ে গায়ে আগুন দেওয়া ছাত্রীর মৃত্যু

ভারতের ওড়িশা রাজ্যে ২০ বছর বয়সী যে কলেজ ছাত্রী তারই অধ্যাপকের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ করেও কোনো সুরাহা পেতে ব্যর্থ হয়ে গায়ে আগুন দিয়েছিলেন, সোমবার মাঝরাতে তার মৃত্যু হয়েছে।

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মোহন চরণ মাঝি নিজেই মঙ্গলবার দিবাগত রাতে এক্স হ্যান্ডেলে এই খবর জানিয়েছেন।

রাজধানী ভুবনেশ্বরে অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সেস, যেটি 'এইমস' হাসপাতাল বলেই বেশি পরিচিত, সেখানে ওই ছাত্রীর চিকিৎসা চলছিল। সেখানকার কর্তৃপক্ষ মেডিকেল বুলেটিনে জানিয়েছে যে সোমবার রাত ১১.৪৬ মিনিটে মৃত্যু হয় ওই ছাত্রীর।

ময়নাতদন্তের পরে তার দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে বালেশ্বর জেলার ভোগোরাই গ্রামে তার দেহ সৎকার করা হয়েছে।

বালেশ্বরের একটি স্বয়ংশাসিত কলেজের বিএড বিভাগের ছাত্রী গত শনিবার অধ্যক্ষের ঘরের সামনেই গায়ে আগুন দেন। তারই এক অধ্যাপকের বিরুদ্ধে বার বার যৌন হেনস্থার অভিযোগ জানিয়েছিলেন তিনি।

কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি রুখতে আইন অনুযায়ী যে অভ্যন্তরীণ কমিটি গড়া বাধ্যতামূলক ভারতে, সই কমিটি অভিযুক্ত অধ্যাপককে ক্লিন চিট দেয়। তারপরেই গায়ে আগুন দেন ওই ছাত্রী। তাকে বাঁচাতে গিয়ে কলেজেরই এক ছাত্রও অগ্নিদগ্ধ হয়েছিলেন।

শিক্ষক-শিক্ষণ বিভাগের প্রধানের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার পাশাপাশি পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়ার হুমকির অভিযোগও তুলেছিলেন ওই ছাত্রী।

তার বাবা অভিযোগ করেছেন যে গত প্রায় ছয় মাস ধরে ওই অধ্যাপক তার মেয়েকে হেনস্থা করছিলেন।

তিনি গায়ে আগুন দেওয়ার পরেই অভিযুক্ত অধ্যাপককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাকে আড়াল করার অভিযোগে প্রথমে কলেজের অধ্যক্ষকে সাসপেন্ড করা হয়, আর সোমবার তাকেও গ্রেফতার করে পুলিশ।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন

অধ্যাপকের বিরুদ্ধে একাধিকবার অভিযোগ ছাত্রীর

বালেশ্বরের স্বয়ংশাসিত ফকির মোহন কলেজে বি-এডের বিভাগীয় প্রধানের বিরুদ্ধেই ছাত্রীটি যৌন হেনস্থার অভিযোগ তুলেছিলেন। কলেজ প্রশাসনের কাছে যেমন অভিযোগ করেছিলেন তিনি, তেমনই সরকারি কর্মকর্তাদের ট্যাগ করে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেও যৌন হেনস্থার অভিযোগ জানিয়েছিলেন ছাত্রীটি।

ওই ছাত্রীর বাবা বিবিসি হিন্দির সহযোগী সাংবাদিক সুব্রত কুমার পতিকে বলেন, "আমরা ন্যায়বিচার চাইছি। শুধু ওই দুজনকে গ্রেফতার করে লাভ হবে না। আসলে মিথ্যা রিপোর্ট দিয়ে আমার সন্তানকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ কমিটির সদস্যরাও অপরাধী। এদের বিরুদ্ধে কঠোরতম পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি।"

তার এক সহপাঠী বিবিসিকে জানিয়েছেন যে ওই অধ্যাপকের ব্যবহার নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন।

তার কথায়, "অধ্যাপকের হেনস্থা করা নিয়ে কলেজের অধ্যক্ষের কাছে অভিযোগ জমা দিয়েছিল ও। ঘটনার তদন্তে একটা কমিটি তৈরি হয়েছিল।"

"তবে ওই তদন্ত কমিটি তাদের রিপোর্টে অধ্যাপকের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার উল্লেখই করেনি, উপরন্তু ঘটনাটিকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছিল," বিবিসিকে জানিয়েছেন ওই ছাত্রীর বড় ভাই।

তার কথায়, পুরো বিষয়টিই পরিবারকে জানিয়েছিলেন তার বোন।

"তাকে মানসিকভাবে হেনস্তা করা হচ্ছিল। কয়েকটি বিষয়ে তাকে ফেল করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আর উপস্থিতির হার কম থাকার অজুহাতে পরীক্ষায় বসতে দেওয়া হয়নি," জানাচ্ছিলেন মৃত ছাত্রীটির বড় ভাই।

গত শনিবার ওই ছাত্রীটি এবং তার কয়েকজন সহপাঠী কলেজের গেটে বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন।

তার সহপাঠীরা স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে প্রতিবাদ-বিক্ষোভের মধ্যে হঠাৎই ওই ছাত্রীটি দৌড়ে চলে যান কলেজ অধ্যক্ষের ঘরের দিকে এবং সেখানেই গায়ে আগুন দিয়ে দেন।

শরীরের ৯০ শতাংশেরও বেশি অগ্নিদগ্ধ হয়ে গিয়েছিল তার। প্রথমে বালেশ্বরের হাসপাতালে এবং তারপরে ভুবনেশ্বরের 'এইমস' হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ওই ছাত্রীকে।

গত কয়েকদিন লাইফ সাপোর্ট দিয়ে 'এইমস' হাসপাতালে চিকিৎসা করা হচ্ছিল। সোমবারই ওই হাসপাতালে সফরে গিয়ে ছাত্রীটির খোঁজ নিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু।

পুলিশের তদন্ত

ছাত্রীটি গায়ে আগুন দেওয়ার পরে পুলিশ তার তোলা অভিযোগগুলো নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে।

প্রথমে গ্রেফতার করা হয় অভিযুক্ত অধ্যাপককে, সাসপেন্ড হন কলেজের অধ্যক্ষও।

সোমবার অধ্যক্ষকেও গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

পুলিশ বলছে, সব দিক খতিয়ে দেখতে একটা উচ্চপর্যায়ের তদন্ত-দল গঠন করেছে তারা।

বালেশ্বরের পুলিশ সুপার রাজ প্রসাদ বিবিসি হিন্দিকে জানিয়েছেন, "এই ঘটনার প্রতিটি দিকই তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদেরও তদন্তে সামিল করা হয়েছে। ডেপুটি পুলিশ সুপার পদের এক অফিসারকে পুরো দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।"

"ওই ছাত্রীটি প্রথমে কলেজের অভ্যন্তরীণ কমিটির কাছে অভিযোগ দায়ের করেছিল। আমরা এটা খতিয়ে দেখছি যে সেই কমিটি কী তদন্ত করে অধ্যক্ষকে কী রিপোর্ট দিয়েছিল," মন্তব্য পুলিশ সুপারের।

রাজনৈতিক দোষারোপ

কলেজ ছাত্রীটির প্রথমে নিজের গায়ে আগুন লাগানো এবং শেষমেশ তার মৃত্যু নিয়ে ওড়িশায় রাজনৈতিক দোষারোপ চলছে।

মঙ্গলবার কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী এই ঘটনাকে 'সংগঠিত হত্যা' বলে বর্ণনা করেছেন।

এক্স হ্যান্ডেলে মি. গান্ধী লিখেছেন, "সুবিচার চেয়ে লড়াই করতে গিয়ে মৃত্যু হলো ওই মেয়েটির। এটা সরাসরি বিজেপির 'সিস্টেম' দ্বারা সংগঠিত হত্যা।"

"ওই সাহসী ছাত্রীটি যৌন হেনস্তার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিল। কিন্তু তাকে ন্যায়বিচার দেওয়ার বদলে হুমকি দেওয়া হয়েছিল, প্রতারণা করা হয়েছিল, বার বার অপমানিত হতে হয়েছে তাকে। যাদের দায়িত্ব ছিল তাকে রক্ষার করার, তারাই তাকে বার বার আঘাত করেছে," লিখেছেন রাহুল গান্ধী।

ওই ছাত্রীটি নিজের গায়ে আগুন দেওয়ার পর থেকেই ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক দোষারোপ শুরু হয়েছিল।

মঙ্গলবার রাহুল গান্ধীর মন্তব্যের পরে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, "একটা গুরুতর ও সংবেদনশীল ঘটনাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার করে রাহুল গান্ধী সস্তা মানসিকতার প্রদর্শন করছেন।"

ওড়িশার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়ক এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছিলেন, "কয়েক মাস ধরে সে আতঙ্কে কাটিয়েছে, পয়লা জুলাই বাধ্য হয়ে সাহায্যের আবেদন জানিয়ে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেছিল উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ট্যাগ করে, তার সমস্যা জানিয়েছিল। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।"

ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহন চরণ মাঝি এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন, "মৃতের পরিবারকে আমি আশ্বাস দিচ্ছি যে এই ঘটনায় জড়িত সব দোষীদের আইন অনুযায়ী কঠোরতম সাজা দেওয়া হবে। এর জন্য আমি নিজে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছি।"