'চিকিৎসায় রেসপন্স' করছেন খালেদা জিয়া, বিএনপির কর্মসূচি স্থগিত

ঢাকার হাসপাতালে সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা একই রকম আছে, তবে তিনি 'চিকিৎসায় রেসপন্স' করছেন বলে চিকিৎসকের বরাত দিয়ে দলের পক্ষ থেকে বিবিসি বাংলাকে জানানো হয়েছে।

তবে দলীয় প্রধানের অসুস্থতার কারণে বিজয় দিবস উপলক্ষে পহেলা ডিসেম্বর থেকে পনেরই ডিসেম্বর পর্যন্ত 'মশাল রোড শো'সহ বিজয় দিবসের সব কর্মসূচি স্থগিত করে মিসেস জিয়ার সুস্থতার জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছে তার দল বিএনপি।

আগামী পহেলা ডিসেম্বর চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মশাল রোড শোর মাধ্যমে বিএনপির বিজয়ের মাস উদ্‌যাপন কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা ছিল।

১৬ই ডিসেম্বর বিজয় দিবসে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে মহাসমাবেশ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে রোড শো শেষ হওয়ার কথা ছিল।

দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, মিসেস জিয়ার শারীরিক অবস্থা অপরিবর্তিত রয়েছে এবং নতুন করে অবনতি হয়নি বলে তারা জানতে পেরেছেন।

"উনার শারীরিক অবস্থা অবনতিশীল হয়নি। তাই বলে খুব একটা উন্নতি হয়েছে এরকমও খবর পাইনি। তার মানে উনার শারীরিক অবস্থা অপরিবর্তিত রয়েছে," বলেছেন মি. রিজভী।

অন্যদিকে চিকিৎসকদের একটি সূত্র বলছে, ডাকলে মাঝে মধ্যে সাড়া দিতে শুরু করেছেন হাসপাতালে চিকিৎসকদের 'নিবিড় পর্যবেক্ষণে' থাকা খালেদা জিয়া । এ পরিস্থিতিকে চিকিৎসকরা গত তিন দিনের চেয়ে আশাব্যঞ্জক বলে মনে করছেন।

সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী নতুন করে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হলে গত রোববার জরুরি ভাবে হাসপাতালে নেয়ার পর থেকেই চিকিৎসাধীন আছেন ।

তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এ জেড এম জাহিদ হোসেন জানিয়েছিলেন, ফুসফুস ও হৃদযন্ত্রের গুরুতর সংক্রমণ নিয়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন তিনি।

এরপর বুধবার থেকে তার অবস্থার অবনতি ঘটে এবং বৃহস্পতিবার রাতে চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে জানানো হয় যে, মিসেস জিয়ার অবস্থা 'সংকটময়', যা শুক্রবার দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেন।

পরে শনিবার তার দল বিএনপি ও তার ছেলে তারেক রহমানের বিবৃতিতে তার অবস্থাকে 'গুরুতর ও সংকটাপন্ন' হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

এ জেড এম জাহিদ হোসেন শনিবার রাতে সাংবাদিকদের বলেছেন, বৃহস্পতিবার থেকেই বিএনপি চেয়ারপার্সনকে 'ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট বা সিসিইউ'তে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

"গত তিনদিন ওনার অবস্থা একই আছে। ডাক্তারি ভাষায় যদি বলি, চিকিৎসকরা যে চিকিৎসা দিচ্ছেন, সেটা তিনি গ্রহণ করতে পারছেন," বলেছেন মি. হোসেন।

এর আগে শনিবার বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন জানিয়েছিলেন যে, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার সামান্য উন্নতি হলেই পরিবারের সদস্যরা তাকে লন্ডনে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে।

তবে তাকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেয়ার বিষয়ে মেডিকেল বোর্ড এখনো কোনো পরামর্শ দেয়নি বলে সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন রুহুল কবির রিজভী।

তিনি অবশ্য বলেছেন, লন্ডনে মিসেস জিয়া যেই হাসপাতালে আগে চিকিৎসা নিয়েছিলেন সেখানকার চিকিৎসকদের সাথে তারেক রহমান যোগাযোগ রাখছেন। একই সাথে তিনি ঢাকার চিকিৎসকদের সাথেও কথা বলছেন।

বহু বছর ধরেই তিনি লিভার সিরোসিস, আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, কিডনি, ফুসফুস এবং চোখের সমস্যাসহ নানা জটিলতায় ভুগছেন।

ঢাকায় নিজের বাসায় থাকা অবস্থাতেই ২০২১ সালের মে মাসে করোনায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নেন তিনি। তখনো শ্বাসকষ্টে ভোগার কারণে তাকে করোনারি কেয়ার ইউনিটে থেকে চিকিৎসা নিতে হয়েছিল।

এরপর ২০২৪ সালের জুনে তার হৃদপিণ্ডে পেসমেকার বসানো হয়। তখনো তিনি মূলত হার্ট, কিডনি ও লিভারসহ বিভিন্ন ধরনের রোগে ভুগছিলেন, যা তার শারীরিক অবস্থাকে জটিল করে তুলেছিলো।

এর আগে থেকেই তার হার্টে তিনটি ব্লক ছিল। আগে একটা রিংও পরানো হয়েছিল। এছাড়া ২০২৪ সালের জুনে পোর্টো সিস্টেমেটিক অ্যানেসটোমেসির মাধ্যমে খালেদা জিয়ার লিভারের চিকিৎসাও দেয়া হয়েছে বিদেশ থেকে ডাক্তার এনে।

আওয়ামী লীগ আমলে ২০১৮ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিলো আদালত, তারপর থেকে প্রথমে কারাগারে বিশেষ ব্যবস্থায় ও পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। দুর্নীতির আরেকটি মামলাতেও তাকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

পরে হাসপাতালে থাকা অবস্থাতেই নির্বাহী আদেশে বিশেষ শর্তে মুক্তির পর তিনি গুলশানের বাসায় উঠেন।

২০২৪ সালে অগাস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ৬ই অগাস্ট রাষ্ট্রপতির নির্বাহী আদেশে তাকে সব দণ্ড থেকে পুরোপুরি মুক্তি দেওয়া হয়। এরপর চলতি বছরের জানুয়ারিতেই তিনি চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান।

পরে ফিরে আসার পরেও ঢাকায় আরও কয়েকবার হাসপাতালে যেতে হয়েছে মিসেস জিয়াকে।

সবশেষ একুশে নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে রওনা দিয়ে গাড়িতে ওঠেই অস্বস্তি বোধ করছিলেন তিনি। অনুষ্ঠান থেকে ফিরে তিনি আরও অসুস্থ হয়ে যান ও তার শ্বাসকষ্ট তীব্র হয়ে ওঠে।

এ অবস্থায় গত ২৩শে নভেম্বর তাকে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে নেয়ার পর জানা যায় যে তিনি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন।

ওদিকে অসুস্থ খালেদা জিয়াকে সেনাকুঞ্জের অনুষ্ঠানে কেন নেয়া হয়েছিলো- তা নিয়েও দলের একাংশের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তার চিকিৎসকরাও দলের শীর্ষ নেতাদের কাছে এ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বলে জানা যাচ্ছে।

সেনাকুঞ্জের ওই অনুষ্ঠানে মিসেস জিয়াকে অনেকর সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে দেখা গেছে। সাধারণত সশস্ত্র বাহিনীর এই অনুষ্ঠানে বিপুল সংখ্যক অতিথি যোগ দিয়ে থাকেন।

অনুষ্ঠানে তার কাছেই ছিলেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।