তারেক রহমানের জন্য 'ট্রাভেল পাসের' প্রসঙ্গ আসছে কেন?

তারেক রহমান রাজনৈতিক আশ্রয়ে ব্রিটেনে আছেন

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, তারেক রহমান রাজনৈতিক আশ্রয়ে ব্রিটেনে আছেন
    • Author, রাকিব হাসনাত
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরার 'অনিশ্চয়তা' ও তার জন্য ট্রাভেল পাসের আলোচনার মধ্যেই আজ বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে যে, তিনি এখনো বাংলাদেশের ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করেননি, তবে কমিশন অনুমতি দিলে তার ভোটার হওয়ার সুযোগ আছে।

ওদিকে মি. রহমান দেশে ফিরে আসতে চাইলে একদিনেই তাকে ট্রাভেল পাস দেওয়া সম্ভব হবে বলে রবিবার পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন যে মন্তব্য করেছেন সেটিও নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

কারণ ট্রাভেল পাসের বিষয়ে উপদেষ্টার মন্তব্য এই ইঙ্গিতই দিচ্ছে যে, মি. রহমান এখনো বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাননি কিংবা নেননি। কারণ সাধারণত পাসপোর্ট না থাকলেই নাগরিকদের দেশে ফেরার জন্য এ ধরনের ট্রাভেল পাস প্রয়োজন হয়।

কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পনের মাস পরে এসে তারেক রহমানের দেশে ফেরার জন্য পাসপোর্টের বদলে ট্রাভেল পাসের প্রসঙ্গ আসছে কেন- সেটিও অনেকের মধ্যে কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে।

এ বিষয়ে বিবিসি বাংলার প্রশ্নের জবাবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, "পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তার সদিচ্ছা প্রকাশ করতে গিয়ে এভাবে বলে থাকতে পারেন। তবে আমরা মনে করি ট্রাভেল পাস বা পাসপোর্ট- কোনো কিছু নিয়েই সমস্যা হবে না। কারণ এক্ষেত্রে সরকারেরও সদিচ্ছা আছে"।

মি. রহমান বাংলাদেশের পাসপোর্ট পেয়েছেন কি-না কিংবা চেয়েছেন কি-না অথবা পাসপোর্ট পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো জটিলতা আছে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে মি. আহমদ শুধু বলেছেন, "এ বিষয়ে আমার জানা নেই"।

প্রসঙ্গত, শনিবার তারেক রহমান তার দেশে ফেরার বিষয়ে 'সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়' বলে ফেসবুক স্ট্যাটাস দেয়ার পর তার দেশে ফেরা নিয়ে অনিশ্চয়তার আলোচনা শুরু হয়।

তখন থেকেই এই প্রশ্ন উঠে যে- কেন দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না এবং এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে। এর পরপরই রোববার পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন তারেক রহমানের জন্য ট্রাভেল পাসের বিষয়টি সামনে নিয়ে এলেন।

২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর আটক হয়ে কারাগারে গিয়েছিলেন তারেক রহমান

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর আটক হয়ে কারাগারে গিয়েছিলেন তারেক রহমান

ট্রাভেল পাস কী, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা কী বলেছেন

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

তারেক রহমানের পাসপোর্ট নিয়ে ২০১৮ সালে তখনকার আওয়ামী লীগ সরকারের তোলা এক বিতর্কের জের ধরে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ওই বছরের এপ্রিলে বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, ২০১২ সালে তারেক রহমান ব্রিটেনে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন এবং এক বছরের মধ্যেই সেটি গৃহীত হয়েছে।

এর আগে ২০০৮ সালে তারেক রহমান দেশ ছেড়ে লন্ডনে যাওয়ার পর বিএনপির তরফ থেকে বরাবরই বলা হচ্ছিল যে তিনি চিকিৎসার জন্য বিদেশে অবস্থান করছেন।

কিন্তু এখন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের ১৫ মাস পর আবার পাসপোর্ট ইস্যু আলোচনায় ফিরে এসেছে পররাষ্ট্র উপদেষ্টার ট্রাভেল পাস সংক্রান্ত বক্তব্যকে কেন্দ্র করে।

রোববার ঢাকায় কূটনৈতিক সাংবাদিকদের এক অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন এক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, তারেক রহমান দেশে আসতে চাইলে কোনো বিধিনিষেধ নেই, এক দিনেই তাকে ট্রাভেল পাস দেওয়া সম্ভব।

তিনি বলেন, ট্রাভেল পাসের নিয়ম হলো যখন পাসপোর্ট থাকে না বা মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে বলে তখন কেউ যদি আসতে চায় (দেশে ফিরতে চায়), তাহলে ওয়ান টাইম পাস দেয়া হয় একবার দেশে আসার জন্য।

"এটাতে এক দিন লাগে। কাজেই এটা উনি (তারেক রহমান) যদি আজকে বলেন যে উনি আসবেন, আগামীকাল হয়তো আমরা এটা দিলে পরশু দিন প্লেনে উঠতে পারবেন। কোনো অসুবিধা নাই। এটা আমরা দিতে পারব," বলেছেন মি. হোসেন।

এই অনুষ্ঠানে উপদেষ্টা বলেন, তারেক রহমান দেশে ফিরতে পারবেন না- এমন কোনো বিধিনিষেধ সরকারের পক্ষ থেকে নেই।

তারেক রহমান আগামী নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্ব দেবেন বলে দল থেকে বলা হচ্ছিলো

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, তারেক রহমান আগামী নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্ব দেবেন বলে দল থেকে বলা হচ্ছিলো

ট্রাভেল পাস কারা পায় এমন প্রশ্নের জবাবে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলছেন, বাংলাদেশের কোনো নাগরিকের যদি পাসপোর্ট না থাকে কিংবা পাসপোর্ট হারিয়ে ফেললে অথবা কারও জন্য যদি পাসপোর্ট ইস্যুর জন্য পর্যাপ্ত সময় না থাকে তাহলে সংশ্লিষ্ট দেশে থাকা বাংলাদেশ হাইকমিশন বা দূতাবাস তাকে শুধুমাত্র দেশে আসার জন্য ট্রাভেল পাস দিয়ে থাকে।

"এটি ওয়ান ওয়ে অর্থাৎ শুধু বাংলাদেশে আসার জন্য। দেশে আসা পর্যন্তই এই ট্রাভেল পাস ভ্যালিড থাকে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

অর্থাৎ পররাষ্ট্র উপদেষ্টার মন্তব্য অনুযায়ী তারেক রহমানের যদি ট্রাভেল পাস দরকার হয় তার মানে হলো এ মুহূর্তে তার বাংলাদেশি পাসপোর্ট নেই।

যদিও বিএনপির দিক থেকে এ বিষয়ে কেউ কোনো মন্তব্য করতে কেউ রাজি হননি। এমনকি মি. রহমান আদৌ পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছেন কি-না তাও তিনি বা দলটির পক্ষ থেকে কেউ খোলাসা করেননি।

আবার শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর প্রায় পনের মাস হয়ে গেলেও কেন তিনি পাসপোর্ট নেননি বা পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেননি তাও তিনি বা তার দলের পক্ষ থেকে কখনো ব্যাখ্যাও করা হয়নি।

এমন প্রেক্ষাপটে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলও আজ সোমবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, তারেক রহমানের দেশে ফিরতে কোনো আইনগত বাধা নেই।

"বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের বাংলাদেশে আসার ব্যাপারে কোনো রকম আইনগত বাধা আছে বলে আমার জানা নেই। আর যদি কোনো বাধা থেকেও থাকে...অবশ্যই সর্বোচ্চ সহযোগিতা করব। ওনার নিরাপত্তার ব্যাপারেও আমরা সর্বোচ্চ সহযোগিতা করব," বলেছিলেন তিনি।

মায়ের স্বাস্থ্য ও দেশে ফেরা প্রসঙ্গে তারেক রহমানের স্ট্যাটাস

ছবির উৎস, Tarique Rahman/facebook

ছবির ক্যাপশান, মায়ের স্বাস্থ্য ও দেশে ফেরা প্রসঙ্গে তারেক রহমানের স্ট্যাটাস

ভোটার হবেন কীভাবে

সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা। সেই নির্বাচনের জন্য বিএনপি দলীয় প্রার্থীদের যে তালিকা ঘোষণা করেছে তাতে তারেক রহমানেরও নাম আছে।

কিন্তু সোমবার নির্বাচন কমিশনের সচিব আখতার আহমেদ বলেছেন মি. রহমান এখনো ভোটার হননি। যদিও বাংলাদেশে ভোট দেওয়ার জন্য যেমন ভোটার হওয়ার বাধ্যবাধকতা আছে। আবার ভোটার তালিকায় নাম না থাকলে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া যায় না।

"বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এখনো ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হননি। তবে ইসি সিদ্ধান্ত দিলে তিনি আগামী নির্বাচনে ভোটার ও প্রার্থী হওয়ার সুযোগ পাবেন। আইনগতভাবে ইসির এই এখতিয়ার আছে," প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেছেন মি. আহমেদ।

কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সম্প্রতি বিএনপির দিক থেকেও নির্বাচন কমিশনের কাছে একটি অনুরোধ করা হয়েছিলো যে তারেক রহমান যেন দেশে ফেরার পর ভোটার হওয়ার সুযোগ পান।

তবে মি. রহমান স্ত্রী জুবাইদা রহমান চলতি বছরের মে মাসে লন্ডন থেকে দেশে আসার পর ভোটার তালিকায় তার নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যাদি সংগ্রহ করেছিলেন বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা।

কর্মকর্তারা বলছেন, এখন প্রবাসী ভোটারদের নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির আবেদন গ্রহণের যে প্রক্রিয়া চলছে তাতেও কাউকে আবেদন করতে হলে তাকে অন্য ডকুমেন্টসের পাশাপাশি 'মেয়াদ সম্বলিত কিংবা মেয়াদোত্তীর্ণ কিংবা বিদেশি পাসপোর্টের কপি, বাংলাদেশে নাগরিক সনদের কপি কিংবা দ্বৈত নাগরিকত্ব সনদের কপি' জমা দিতে হবে।

২০০৮ সাল থেকে লন্ডনে রয়েছেন তারেক রহমান

ছবির উৎস, BNP

ছবির ক্যাপশান, ২০০৮ সাল থেকে লন্ডনে রয়েছেন তারেক রহমান

তারেক রহমানের বাংলাদেশি বা অন্য দেশের পাসপোর্ট আছে কি-না সেটি এখনো প্রকাশ করা হয়নি। এমনকি তার দ্বৈত নাগরিকত্ব আছে কি-না তাও পরিষ্কার না।

তবে আওয়ামী লীগ আমলে তখনকার সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিলো যে তারেক রহমান বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন। যদিও বিএনপি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলো।

সবকিছু বিবেচনায় বলা যায় যে, বাংলাদেশি পাসপোর্ট মেয়াদোত্তীর্ণ হলে বা না থাকলে মি. রহমানকে ট্রাভেল পাস নিয়েই দেশে ফিরতে হবে। তবে দেশে ফিরে তিনি জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি ও পাসপোর্টের জন্য আবেদন করতে পারবেন বলে কর্মকর্তারা ধারণা দিয়েছেন।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতা নেওয়া সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে দুর্নীতির অভিযোগে আটক হয়ে আঠারো মাস কারাগারে থাকার পর ২০০৮ সালের তেসরা সেপ্টেম্বর মুক্তি পেয়েছিলেন তারেক রহমান।

পরে ২০০৮ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর লন্ডনের উদ্দেশে পরিবারের সদস্যদেরকে সাথে নিয়ে ঢাকা ছেড়েছিলেন তিনি।

মি. রহমান চলতি বছর অক্টোবরের শুরুতে বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে "দ্রুতই দেশে ফিরে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার" কথা জানিয়েছিলেন। তার দলের নেতারা বলেছিলেন যে, তিনি নভেম্বরেই দেশে ফিরবেন।

কিন্তু নভেম্বর শেষ হওয়ার মাত্র এক দিন আগে মি. রহমান নিজেই ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে জানিয়েছেন যে, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার একক নিয়ন্ত্রণ তার নেই।