ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা যেভাবে 'প্রশমিত' হয়েছিল অতীতে

ভারত অনেকবারই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আন্তঃসীমান্ত ও বিমান হামলা চালিয়েছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ভারত অনেকবারই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আন্তঃসীমান্ত ও বিমান হামলা চালিয়েছে
    • Author, সৌতিক বিশ্বাস
    • Role, ভারত সংবাদদাতা

ভারতশাসিত কাশ্মীরের পহেলগামে অস্ত্রধারীদের হামলায় ২৬ জনের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তা নিরাপত্তা বাহিনী ও কূটনীতিকদের কাছে নতুন নয়, বরং বেশ পরিচিত।

এর আগে, ২০১৬ সালে কাশ্মীরের উরিতে সামরিক ঘাঁটিতে সন্ত্রাসী হামলায় ১৯ ভারতীয় সেনার মৃত্যুর পর পাকিস্তানের 'সশস্ত্র বাহিনীর ঘাঁটি' লক্ষ্য করে 'সার্জিক্যাল স্ট্রাইক' করেছিল ভারত।

পুলওয়ামায় বোমা হামলায় ভারতীয় আধাসামরিক বাহিনীর ৪০ জনের মৃত্যুর পর ২০১৯ সালে বালাকোটের অভ্যন্তরে বিমান হামলা চালানো হয়। ১৯৭১ সালের পর সেটাই পাকিস্তানের অভ্যন্তরে প্রথম এই ধরনের হামলা। এরপর দুই দেশের মধ্যে 'প্রতিশোধমূলক অভিযান' এবং আকাশপথে লড়াই শুরু হয়ে যায়।

এই দুই ঘটনায় সেনাবাহিনীকে লক্ষ্য করা হয়েছিল। কিন্তু ২০০৮ সালে মুম্বাইয়ের হোটেল, রেলস্টেশন ও ইহুদি কেন্দ্রে যে ভয়াবহ হামলা চালানো হয়, সেখানে নিশানায় ছিলেন বেসামরিক নাগরিক। মুম্বাইয়ের ওই হামলায় প্রাণ হারিয়েছিলেন ১৬৬ জন ব্যক্তি।

ভারত প্রতিবারই পাকিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে এই জাতীয় হামলার জন্য দায়ী করেছে এবং ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে এসব গোষ্ঠীকে সমর্থনের অভিযোগও তুলেছে। আর উত্তরে পাকিস্তান বরাবরই তা অস্বীকার করে আসছে।

এই জাতীয় ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে বার বার উত্তেজনাও তৈরি হয়েছে। কিন্তু ২০১৬ সালের পর থেকে, বিশেষত ২০১৯ সালের পর দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির এই সীমা 'নাটকীয়ভাবে' বদলে গেছে।

ভারতের দিক থেকে 'নতুন নিয়ম' হয়ে দাঁড়িয়েছে আন্তঃসীমান্ত ও বিমান হামলা এবং তার প্রত্ত্যুতর মিলেছে পাকিস্তানের পক্ষ থেকেও। দুই তরফের পদক্ষেপই কিন্তু বিদ্যমান 'অস্থিতিশীল' পরিস্থিতিকে আরও ঘনীভূত করেছে।

পুলওয়ামা হামলাকে কেন্দ্র করে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছিল

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পুলওয়ামা হামলাকে কেন্দ্র করে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছিল

বিশেষজ্ঞদের মতে আরও একবার ভারতের সামনে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে তার সামনে খোলা আছে দু'টো পথ–– সাম্প্রতিক হামলার জবাবে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখানো অথবা সংযম। এই দুয়ের মধ্যে 'ভারসাম্য রক্ষার' কাজ সহজ নয়।

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে বারবার তৈরি হওয়া আবহ যারা ভালোভাবে বোঝেন তাদের তালিকায় রয়েছেন পুলওয়ামা হামলার সময় পাকিস্তানে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাই কমিশনার অজয় বিসারিয়া।

তার স্মৃতিকথা 'অ্যাঙ্গার ম্যানেজমেন্ট: দ্য ট্রাবলড রিলেশনশিপ বিটুইন ইন্ডিয়া অ্যান্ড পাকিস্তান' বইয়ে দুই দেশের মধ্যে এই জবাব, পাল্টা জবাবে এবং তার পরিণতির কথা তুলে ধরেছেন।

সাম্প্রতিক হামলার দশদিন পর তিনি আমাকে বলেছিলেন, "পুলওয়ামা বোমা হামলা আর পলেহগামের হত্যার পর যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে একটা বিস্ময়কর সাদৃশ্য আছে।"

তবে এই মিল থাকা সত্ত্বেও, পহেলগামের হামলার ঘটনার বিষয়ে একটা উল্লেখযোগ্য দিক তুলে ধরেছেন তিনি।

তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, পুলওয়ামা এবং উরিতে সেনাবাহিনীর ওপর হামলা করা হয়েছিল, কিন্তু পহেলগামে নিশানা করা হয়েছে বেসামরিক নাগরিকদের।

মি. বিসারিয়া ব্যাখ্যা করেছেন, সাম্প্রতিকতম হামলায় ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলার স্মৃতি উসকে দিয়ে ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকদের ওপর আঘাত হানা হয়েছে।

তিনি বলেছেন, "এই হামলা পুলওয়ামার উপাদান বহন করে, তবে এক্ষেত্রে মুম্বাইয়ের হামলার অনেক বেশি উপাদান রয়েছে।"

"আমরা আবারও একটা সংঘাতময় পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছি এবং বিষয়টা অনেকটা একইভাবে উন্মোচিত হচ্ছে।"

পহেলগামে মূলত পর্যটকদের নিশানা করেছিল হামলাকারীরা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পহেলগামে মূলত পর্যটকদের নিশানা করেছিল হামলাকারীরা

পহেলগাম হামলার পর দিল্লি দ্রুত পাল্টা পদক্ষেপ নিয়েছে যে তালিকায় রয়েছে প্রধান সীমান্ত ক্রসিং বন্ধ করে দেওয়া, গুরুত্বপূর্ণ জল বণ্টন চুক্তি স্থগিত করা, কূটনীতিকদের বহিষ্কার করা এবং পাকিস্তানি নাগরিকদের বেশিরভাগ ভিসা বন্ধ করে দেওয়া।

এরইমধ্যে দুই দেশের মাঝে নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর গুলি বিনিময়ের ঘটনাও প্রকাশ্যে এসেছে।

পাশাপাশি, বাণিজ্যিক ও সামরিকসহ সব পাকিস্তানি বিমানকে ভারতীয় আকাশসীমায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ভারতের বিরুদ্ধে ইসলামাবাদের অনুরূপ পদক্ষেপের প্রতিফলন দিল্লির এই সিদ্ধান্ত।

পাকিস্তান পাল্টা ভিসা স্থগিত করেছে এবং ভারতের সঙ্গে ১৯৭২ সালে ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত শান্তি চুক্তি স্থগিত করেছে।

(ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশই কাশ্মীরকে পুরোপুরি নিজেদের বলে দাবি করলেও তা তারা আংশিকভাবেই শাসন করে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকে এই কাশ্মীর দুই দেশের কাছে একটা বিবাদের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে।)

মি. বিসারিয়া তার স্মৃতিকথায় ২০১৯ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি মাসে পুলওয়ামা হামলার পর ভারতের প্রতিক্রিয়ার কথা উল্লেখ করেছেন।

ওই হামলার পরের দিন সকালে তাকে দিল্লিতে তলব করা হয়। ততক্ষণে পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ করার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছিল ভারত। পাকিস্তানকে ১৯৯৬ সালে দেওয়া সর্বাধিক সুবিধাপ্রাপ্ত দেশের মর্যাদাও প্রত্যাহারও করে নেওয়া হয়।

পহেলগামের হামলায় বেসামরিক নাগরিকদের নিশানা করার ঘটনা মুম্বাই হামলার স্মৃতিকে উস্কে দিয়েছে

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান, পহেলগামের হামলায় বেসামরিক নাগরিকদের নিশানা করার ঘটনা মুম্বাই হামলার স্মৃতিকে উসকে দিয়েছে

এরপর দেশের নিরাপত্তা বিষয়ক সর্বোচ্চ কমিটি - ক্যাবিনেট কমিটি অন সিকিওরিটি (সিসিএস)-এর বৈঠকে পাকিস্তানি পণ্যের ওপর ২০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে এবং কার্যকরভাবে সমস্ত আমদানি বন্ধ করে দেয়। ওয়াঘার স্থল সীমান্তে বাণিজ্যও স্থগিত করা হয়।

মি. বিসারিয়া উল্লেখ করেছেন পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে রাশ টানতে বৃহত্তর পদক্ষেপও প্রস্তাব করা হয়েছিল, যার বেশিরভাগই পরে বাস্তবায়িত হয়।

এই তালিকায় ছিল - আন্তঃসীমান্ত ট্রেন সমঝোতা এক্সপ্রেস-এর পরিষেবা স্থগিত এবং দিল্লি ও লাহোরের মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী বাস পরিষেবা স্থগিত করা। উভয় পক্ষের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে আলোচনা এবং ঐতিহাসিক কর্তারপুর করিডোর নিয়ে আলোচনা স্থগিত করা, ভিসা প্রদান স্থগিত করা, আন্তঃসীমান্ত বন্ধ করা, পাকিস্তানে ভারতীয়দের ভ্রমণ নিষিদ্ধ করা এবং দু'দেশের মধ্যে বিমান চলাচল স্থগিত করা।

"আমি ভেবেছিলাম বিশ্বাস তৈরি করা কতটা কঠিন আর ভাঙা কত সহজ," মি. বিসারিয়া লিখেছেন।

"একটা হলুদ নোটপ্যাডের লেখায় কীভাবে (দুই দেশের মধ্যে) সম্পর্কের টানাপোড়েনের আবহে আস্থা তৈরির জন্য বছরের পর বছর ধরে পরিকল্পিত, আলোচনা এবং প্রয়োগ করা সমস্ত পদক্ষেপগুলো থেকে কয়েক মিনিটের মধ্যে অব্যহতি পাওয়া যায়।"

একটা পৃথক কূটনৈতিক ঘটনার কারণে ২০২০ সালের জুন মাসে ইসলামাবাদে ভারতীয় হাই কমিশনের নিয়োগপ্রাপ্তদের সংখ্যা ১১০ থেকে কমিয়ে ৫৫ করা হয়েছিল। (পহেলগাম হামলার পর এখন সেই সংখ্যা ৩০-এ দাঁড়িয়েছে।) ভারত সেই সময় কূটনৈতিক তৎপরতাও শুরু করে।

উরি হামলার পরও দুই দেশের মধ্যে তীব্র উত্তেজনার আবহে সীমান্তে সামরিক তৎপরতা দেখা গিয়েছিল

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, উরি হামলার পরও দুই দেশের মধ্যে তীব্র উত্তেজনার আবহে সীমান্তে সামরিক তৎপরতা দেখা গিয়েছিল

পুলওয়ামা হামলার একদিন পরে, তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব বিজয় গোখলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, রাশিয়া এবং ফ্রান্সসহ ২৫টা দেশের রাষ্ট্রদূতদের ওই ঘটনায় পাকিস্তান-ভিত্তিক জইশ-ই-মোহাম্মদ (জেইএম) গোষ্ঠীর ভূমিকা সম্পর্কে জানান।

সেই সময় তিনি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে 'সন্ত্রাসবাদকে রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে ব্যবহার করার' অভিযোগ করেছিলেন।

প্রসঙ্গত, সেই সময় ভারত, রাষ্ট্রপুঞ্জ, যুক্তরাজ্য ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে 'সন্ত্রাসী গোষ্ঠী' হিসেবে চিহ্নিত জইশ-ই- মোহাম্মদ ওই হামলার দায় স্বীকার করেছিল।

ভারতের কূটনৈতিক তৎপরতা কিন্তু অব্যাহত ছিল এবং ২৫শে ফেব্রুয়ারি জইশ-ই - মোহাম্মদের প্রধান মাসুদ আজহারকে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা কমিটির পক্ষ থেকে 'সন্ত্রাসী' হিসেবে ঘোষণা করা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের 'স্বায়ত্তশাসিত সন্ত্রাসী তালিকায়' অন্তর্ভুক্ত করার জন্য চাপ দিয়েছিল।

মি. বিসারিয়া লিখেছেন, সিন্ধু জল বণ্টন চুক্তি বাতিলের জন্য সেই সময়েও চাপ ছিল। কিন্তু ভারত অন্য পন্থা নেয়।

সম্ভাব্য স্থগিতের জন্য ৪৮টা দ্বিপাক্ষিক চুক্তি পর্যালোচনা করা হয়েছিল। দিল্লিতে সেই সময় একটা সর্বদলীয় বৈঠক ডাকা হয় এবং সেখানে সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল।

কিন্তু তখন দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগের সমস্ত চ্যানেলগুলো খোলা ছিল। এই তালিকায় ছিল দুই দেশের সামরিক অপারেশনের মহাপরিচালকের (ডিজিএমও) মধ্যে হটলাইন, মিলিটারি-টু-মিলিটারি কন্ট্যাক্ট এবং একইসঙ্গে দুই দেশের উভয় হাই কমিশনও। এবারের মতোই ২০১৯ সালেও পাকিস্তান ওই হামলাকে 'ফলস ফ্ল্যাগ অপারেশন' বলে দাবি করেছিল।

সাম্প্রতিক হামলার পর কাশ্মীরে যেভাবে ধরপাকড় চলেছে তেমনই ২০১৯ সালেও হয়েছিল। সেই সময় 'ক্র্যাকডাউনে' ৮০ জনেরও বেশি 'ওভারগ্রাউন্ড ওয়ার্কার'কে গ্রেফতার করা হয় ভারতশাসিত কাশ্মীর থেকে।

ধৃতদের বিরুদ্ধে পাকিস্তান-ভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠীকে লজিস্টিক দিক থেকে সাহায্য, আশ্রয় দেওয়া এবং গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করার মতো অভিযোগ তোলা হয়েছিল।

ভারতের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং জম্মু ও কাশ্মীর সফর করেন। পুলওয়ামা হামলা এবং ওই ঘটনায় সন্দেহভাজনদের বিষয়ে সব তথ্য একত্র করা হয়।

অজয় বিসারিয়া তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন

ছবির উৎস, Ajay Bisaria

ছবির ক্যাপশান, অজয় বিসারিয়া তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন

ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সঙ্গে বৈঠকের সময় মি. বিসারিয়া তাকে বলেন, "এ জাতীয় সন্ত্রাসী হামলার মোকাবিলার ক্ষেত্রে ভারতের কাছে কূটনৈতিক বিকল্প সীমিত।"

তিনি তার বইয়ে উল্লেখ করেছেন, "উনি আমাকে একটা ধারণা দিয়েছিলেন যে সীমান্তে কিছু কড়া পদক্ষেপ সত্ত্বর নেওয়া হবে এবং তারপর কূটনৈতিক পথ প্রসারিত হবে বলে আশা করা যায়।"

এরপর ২৬শে ফেব্রুয়ারি বালাকোটে জইশ-ই-মোহাম্মদের প্রশিক্ষণ শিবির লক্ষ্য করে প্রথম বিমান হামলা চালায় ভারত। ১৯৭১ সালের পর এই প্রথম আন্তর্জাতিক সীমান্ত পেরিয়ে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল ভারতের পক্ষ থেকে।

এর ছয় ঘণ্টা পর ভারতের পররাষ্ট্র সচিব ঘোষণা করেন, বালাকোট হামলায় 'বিপুল সংখ্যক' সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য ও কমান্ডারের মৃত্যু হয়েছে। পাকিস্তান অবশ্য এই দাবি অস্বীকার করেছে।

এরপর দিল্লিতে আরও উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হয়।

পরের দিন অর্থাৎ, ২৭শে ফেব্রুয়ারি সকালে এই সংকট নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায় যখন পাকিস্তান 'প্রতিশোধমূলক' বিমান হামলা শুরু করে।

ভারতীয় ফাইটার জেটকে গুলি করে ভূপাতিত করা হয় এবং এর ফলে তার পাইলট, উইং কমান্ডার অভিনন্দন বর্তমান পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে অবতরণ করেন।

পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে তার বন্দি হওয়ার সেই ঘটনা জাতীয়স্তরে উদ্বেগের সৃষ্টি করে এবং পারমাণবিক শক্তিধর দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেয়।

অজয় বিসারিয়া তার লেখায় উল্লেখ করেছেন, সেই পরিস্থিতিতে ভারত একাধিক কূটনৈতিক চ্যানেল ব্যবহার করেছিল। মার্কিন ও যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূতদের সাহায্যে ইসলামাবাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়।

ভারতের তরফে বার্তা দেওয়া হয়, "পাকিস্তান যদি পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করে তোলে বা পাইলটের ক্ষতি করার চেষ্টা করে তবে ভারতের দিক থেকেও উত্তেজনা বাড়বে।"

পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ২৮শে ফেব্রুয়ারি অভিনন্দন বর্তমানকে মুক্ত করার ঘোষণা করেন। যুদ্ধবন্দি প্রোটোকলের অধীনে পহেলা মার্চ তাকে হস্তান্তর করা হয়।

দুই দেশের মধ্যে চলমান সেই উত্তেজনাকে প্রশমনের লক্ষ্যে পাকিস্তান তাদের দিক থেকে এই পদক্ষেপকে 'গুডউইল জেশ্চার' বা শুভেচ্ছার নিদর্শন হিসেবে উপস্থাপন করেছে।

এর পরই পাঁচই মার্চের মধ্যে ভারতে রাজনৈতিক ময়দানের উত্তাপও কমতে থাকে। সিসিএস বৈঠকে ভারতের হাইকমিশনারকে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

উইং কমান্ডার অভিনন্দন বর্তমানের পাকিস্তানের হাতে আটক হওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান, উইং কমান্ডার অভিনন্দন বর্তমানের পাকিস্তানের হাতে আটক হওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল

সাবেক হাই কমিশনারের কথায়, "পুলওয়ামা হামলার ২২ দিন পর ১০ই মার্চ আমি ইসলামাবাদে পৌঁছাই। কার্গিলের পর থেকে সবচেয়ে গুরুতর সামরিক পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ চলেছিল এক মাসেরও কম সময় ধরে।"

"ওল্ড ফ্যাশনড ডিপ্লোম্যাসিকে আরও একবার সুযোগ দিতে চেয়েছিল ভারত। এর মাধ্যমে ভারত যেমন কৌশলগত ও সামরিক লক্ষ্য অর্জন করে, পাকিস্তানও তার দেশের মানুষের কাছে নিজেদের বিজয় দাবি করে।"

ওই সময়কালকে মি. বিসারিয়া কূটনীতিকদের কাছে একটা "পরীক্ষা এবং আকর্ষণীয় সময়" হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

তবে অতীতের পরিস্থিতি এবং সাম্প্রতিক আবহের মধ্যে একটা বড় পার্থক্য রয়েছে। এবার নিশানা করা হয়েছে বেসামরিক নাগরিকদের।

মি. বিসারিয়ার কথায়, "পরিহাসের বিষয় হলো এমন একটা সময় হামলা চালানো হয়েছে, যখন কাশ্মীরের পরিস্থিতির নাটকীয় উন্নতি হয়েছিল।"

সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে তিনি উত্তেজনা বৃদ্ধিকে অনিবার্য বলেই মনে করছেন। তবে তিনি উল্লেখ করেছেন, "উত্তেজনা বৃদ্ধির যেমন প্রবৃত্তি রয়েছে তেমনই তা প্রশমনের প্রবৃত্তিও রয়েছে।"

তিনি বলেন, এ ধরনের সংঘর্ষের সময় যখন সিসিএস বৈঠক হয়, তখন তার সিদ্ধান্তে সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাবের বিষয়টাও বিবেচনা করা হয়। ভারতের জন্য বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি না করে পাকিস্তানের ক্ষতি হয় এমন ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

তার কথায়, "(এইবার) বডি ল্যাঙ্গুয়েজ এবং অপটিক্স একই রকম।"

তবে তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে যা দেখছেন তা হলো সিন্ধু জল চুক্তি বাতিল করার যে হুমকি ভারত দিয়েছে।

তার কথায়, "ভারত যদি এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেয় তাহলে তা পাকিস্তানের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও গুরুতর পরিণতি বয়ে আনবে।"

"মনে রাখবেন, আমরা এখনো একটা সংকটের মধ্যে রয়েছি। আমরা এখনো কোনো গতিশীল (সামরিক) পদক্ষেপ দেখিনি।"