ঢাকা লিট ফেস্ট বাংলাদেশে ইংরেজি সাহিত্যের প্রসারে কেমন ভূমিকা রেখেছে

ছবির উৎস, Dhaka Lit Fest
- Author, সানজানা চৌধুরী
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং ঢাকাকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার থেকে পর্দা উঠেছে শিল্প-সাহিত্যের অন্যতম আসর ‘ঢাকা লিট ফেস্ট’ এর দশম সংস্করণের, যা চলবে ৮ই জানুয়ারি পর্যন্ত।
এই ফেস্টের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১১ সালে। তবে করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে টানা তিন বছর স্থগিত ছিল।
উৎসবে মূলত দেশি বিদেশি সাহিত্যিক, চিন্তাবিদ, লেখকদের বৈচিত্র্যময় সম্মেলন ঘটে যেখানে বই পড়া, বিভিন্ন দেশের সাথে সাহিত্যের সংযোগ, যোগাযোগ হয়।
সেই সাথে বিভিন্ন দেশের গল্প, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, ইতিহাস, সমাজ, রাজনীতি, কবিতা, অনুবাদ, বিজ্ঞান, ধর্ম ও দর্শন- এর সবই উৎসবে আলোচনার বিষয়বস্তু।
তবে বাংলাদেশে এখনও ইংরেজি সাহিত্যের পাঠক সংখ্যা খুব সীমিত থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই কোণঠাসা হয়ে আছে গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যের এই অঙ্গনটি।
কাটতি কম থাকায় প্রকাশকরাও ইংরেজি সাহিত্য প্রকাশ বা প্রচারের ব্যাপারে তেমন আগ্রহী নন।
আর এ কারণে বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে বাংলা সাহিত্য অনেকটাই অধরা বলে অভিযোগ করেছেন লেখকরা।
বাংলাদেশের ইংরেজি সাহিত্যে আগ্রহ
গত এক যুগ ধরে লিট ফেস্টের এই আয়োজনের কারণে বাংলাদেশে ইংরেজি ভাষার সাহিত্য চর্চা ব্যাপক সম্প্রসারিত হয়েছে বলে মনে করেন লিট ফেস্টের আয়োজক ও ইংরেজি সাহিত্য সংশ্লিষ্টরা।
ইংরেজি সাহিত্যিক সাজিয়া ওমর বিবিসি বাংলাকে জানান, লিট ফেস্টের কারণে বাংলাদেশের সাহিত্য বৈশ্বিক পরিচিতি পাচ্ছে। বিভিন্ন দেশের লেখক, প্রকাশক, রিভিউয়াররা বাংলাদেশে এসে জানতে পারছেন যে বাংলাদেশে এরকম লেখালেখি হচ্ছে।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের লেখকদের নিয়ে বিশ্বের প্ল্যাটফর্মগুলোয় আগে কোন আলোচনা হতো না। কিন্তু উৎসবের কারণে আমরা বৈশ্বিক পরিচিতি পেতে শুরু করেছি। পাঠক পেতে লেখক লাগে, আবার লেখক পেতে পাঠক লাগে। এ ধরণের উৎসব হওয়াতে এই কমিউনিটি ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে।”
মিসেস ওমর লেখালেখির পাশাপাশি প্রতিবছর রাইটিং ওয়ার্কশপও করিয়ে থাকেন। লিট ফেস্টের পর থেকে প্রতিনিয়ত তার ওয়ার্কশপে নব্য লেখকদের সংখ্যা বাড়ছে বলে তিনি জানান।
“প্রতি বছর ১০-১২ জন ওয়ার্কশপ করতে আসে। তারা লিখতে চায়, জানতেে চায় যে কিভাবে লেখাগুলো আরও পাঠক-বান্ধব, মার্কেট ফ্রেন্ডলি করা যাবে, লেখাগুলো প্রকাশ করা যাবে, এভাবে গত এক দশকে প্রতিনিয়ত লেখক ও পাঠকের সংখ্যা বাড়তে দেখছি।”

ছবির উৎস, Dhaka Lit Fest
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
লিট ফেস্টের নয়টি আসরের কারণে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের সাহিত্য নিয়ে বেশ আগ্রহ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন এর অন্যতম পরিচালক কাজী আনিস আহমেদ।
তিনি জানান এই ফেস্টের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের লেখক, প্রকাশকদের সাথে পারস্পরিক যোগাযোগ স্থাপনের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।
এখন বাইরের দেশের অনেক লেখক বাংলাদেশের সাহিত্য নিয়ে জানতে বেশ আগ্রহী।
এই আগ্রহের প্রতিফলন দেখা গিয়েছে গ্রান্টা, ওয়াটারফিরার মতো বিদেশি লিট ম্যগাজিনগুলোয়।
সেখানে ঢাকা লিট ফেস্টকে ঘিরে বাংলাদেশের সাহিত্য নিয়ে বিশেষ আয়োজন করা হয়েছে।
বাংলাদেশকে নিয়ে ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো প্রেস থেকে ‘ঢাকা টুরিস্ট’ বের হয়েছে। বিশ্বখ্যাত সিগাল প্রকাশনা থেকে বই বেরিয়েছে।
মি. আহমেদ বলেন, “বৈশ্বিক সাহিত্যের নেটওয়ার্কে বাংলাদেশের যোগাযোগ স্থাপন হয়েছে এই লিট ফেস্টের মধ্যে দিয়েই। এখন আমাদের লেখকরা যুক্ত হয়েছেন। তাদের পরিচিতির দুয়ার কিছুটা হলেও খুলতে শুরু করেছে। লিট ফেস্টকে ঘিরে লেখক ও পাঠকদের আগ্রহ যে প্রতিনিয়ত বাড়ছে সেটা স্পষ্ট।”
তিনি আরও বলেন, “যখন আমরা বিদেশিদের সাথে যোগাযোগ করি তখন তারা বাংলাদেশের সাহিত্য সংস্কৃতি নিয়ে জানতে চান, পড়তে চান, চিনতে চান। আমরা তাদেরকে প্রতিথযশা সাহিত্যের অনুবাদের বইগুলো ধরিয়ে দেই। তারা আমাদের ফিডব্যাক দেয়।”
অনুবাদে দুর্বলতা
লিট ফেস্টের মাধ্যমে বাংলাদেশের সাহিত্যকে বৈশ্বিক অঙ্গনে পরিচিত করাতে গিয়ে আয়োজকরা একটি বিষয় উপলব্ধি করেন।
সেটি হল, বাংলাদেশে বাংলা সাহিত্যগুলোর মান সম্মত ইংরেজি অনুবাদের ঘাটতি রয়েছে। যার কারণে এই সাহিত্য যথাযথভাবে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরাও তাদের জন্য চ্যালেঞ্জের হয়ে পড়েছে।
এ নিয়ে ঢাকা লিট ফেস্টের পরিচালক কাজী আনিস আহমেদ বলেন, “বিদেশি সাহিত্যিকরা আমাদের সাহিত্য জানতে চান। কিন্তু আমাদের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে, বেশিরভাগ লেখারই ভালো ইংরেজি অনুবাদ হয়নি। হলেও খুব কম।”
ইংরেজি সাহিত্য লেখার মান এবং ইংরেজি অনুবাদে ভারত ও পাকিস্তান অনেক এগিয়ে থাকলেও বাংলাদেশের এখনও অনেক কাজ করার প্রয়োজন আছে বলে মনে করছে প্রকাশনা সংস্থাগুলো
বাংলাদেশে ইংরেজি অনুবাদের যে কাজ হয় তার বেশিরভাগ বৈশ্বিক পাঠকদের জন্য যথেষ্ট "ইডিওমেটিক" বা সুপাঠ্য নয় বলে মনে করেন মি. আহমেদ।
এক কথায় বিদেশী পাঠকরা যে ধরনের প্রাঞ্জল ইংরেজিতে অভ্যস্ত সেটার অভাব রয়েছে।
তবে নতুন করে অনুবাদের দিকে নজর দেয়ায় এখন দৃশ্যপট অনেকটাই বদলেছে বলে জানান মি. আহমেদ।
যেমন, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসের উদ্যোগে 'লাইব্রেরি অব বাংলাদেশ' শীর্ষক উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
তারা মূলত বাংলাদেশের সেরা ১০ জন লেখকের বই বিদেশি অনুবাদকদের সহযোগিতায় এমনভাবে অনুবাদ করেছে যা বিদেশি পাঠকদের জন্য আরও সুখপাঠ্য ও সহজপাঠ্য।
সেখান থেকে সৈয়দ শামসুল হক, হাসান আজিজুল হক থেকে শুরু করে বহু লেখকের বইয়ের মানসম্মত ইংরেজি অনুবাদ করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে আগের অনূদিত বইয়ের নতুন করে অনুবাদ হয়েছে।

ছবির উৎস, Dhaka Lit Fest
মি. আহমেদ জানান, বিদেশি সাহিত্যিকরা বাংলাদেশের সাহিত্যের খোঁজ নেন, পড়েন এবং প্রশ্ন করেন। সে কারণেই বিশ্বের বড় বড় প্রকাশকরা আমাদের এই অনুষ্ঠানে আসতে শুরু করেছেন।
তার মতে, এ ধরনের অনুবাদ যতো বাড়বে বাংলাদেশের লেখা বিশ্বে তুলে ধরা ততোই সহজ হবে।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের তুলনায় আয়তনে ছোট দেশের লেখকরাও বিশ্বসাহিত্যে অনেক বড় জায়গা পেয়ে গেছেন, শুধুমাত্র এই অনুবাদের জায়গাটি সমৃদ্ধ করার কারণে। আমাদেরও বিশ্ব সাহিত্যে জায়গা করার সুযোগ আছে।”
তবে সাহিত্যের ধরনের ওপরেও বাংলাদেশের এই বিস্তৃতির বিষয়টি নির্ভর করে বলে মনে করেন আয়োজকরা।
মি আহমেদ জানান, সাহিত্যের মূলত দুটি রূপ আছে। একটি মান অপরটি ধরন।
বাংলাদেশে অনেক উঁচু মানের লেখকদের গুরুত্বপূর্ণ লেখা রয়েছে। কিন্তু সেই লেখাগুলো বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে কতোটা বোধগম্য বা আকর্ষণীয় হবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এ নিয়ে মি. আহমেদ বলেন, “আমাদের সাহিত্যের ধারাটা বেশ অন্তর্মুখী। সেই কারণে এটা অনুবাদ করে সীমানা পেরিয়ে অন্য সংস্কৃতির পাঠকদের কাছে পৌঁছানো কঠিন হয়। সাহিত্যের মান আছে কিন্তু ধরনটা অন্তর্মুখী হওয়ার কারণে সেটার বিস্তৃতি হয়নি।”
নতুন লেখকদের অনুপ্রেরণা
আয়োজকদের মতে, বাংলাদেশে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে যারা কাজ করছেন বা যাদের আগ্রহ আছে তারা লিট ফেস্ট থেকে সহজেই অনুপ্রাণিত হতে পারছেন।
এর ফলে নতুন লেখকদের মধ্যেও আরও ভালো মানের লেখার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।
এছাড়া তরুণ লেখক ও পাঠকদের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বের করে আনতেও এই লিট ফেস্টের বড় ভূমিকা আছে বলে মনে করা হচ্ছে।
মি. আহমেদ বলেন, “আমরা এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছি যেখানে নবীন লেখকেরা তাদের অনুপ্রেরণা খুঁজে পাবেন, তাদের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে আসতে পারে।
তিনি জানান, বৈশ্বিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সাহিত্যের কাটতি বাড়ানো এই লিট ফেস্টের মূল উদ্দেশ্য নয় বরং বাংলাদেশের লেখক পাঠকরা কতোটা যুক্ত হতে পারছে, নতুন লেখক তৈরি করতে পারছে, পাঠকদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করতে পারছে সেটাই মুখ্য।
“এখন নতুন লেখকরা লেখালেখির উদ্যোগ নিয়েছে, ইংরেজি সাহিত্যে পাঠকদের আগ্রহ বেড়েছে যা লিট ফেস্টের আগে এতোটা প্রসারিত ছিল না,” তিনি বলেন।
লিট ফেস্টে বড় ও নামি লেখকদের পাশাপাশি নতুন লেখক যারা বিভিন্ন এক্সপেরিমেন্টমূলক কাজ করছেন এবং শিল্পী যাদের কাজ আরও বেশি সামনে আসার যোগ্য বলে মনে করা হয় তাদেরকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়।
সেইসাথে সুপরিচিত সম্পাদক এবং প্রকাশকদের নিয়ে আসা হচ্ছে। ফলে বড় ধরনের নেটওয়ার্কিংয়ের সুযোগ হতে পারে এই লিট ফেস্ট।

ছবির উৎস, Dhaka Lit Fest
নতুন প্রকাশনা
এবারের উৎসবে বিশ্বখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা নিউ ডিরেকশনস, আর্কিপেলাগো, ব্লুমসবেরির সাথে বাংলাদেশের ইংরেজি ভাষার সাহিত্যিকদের সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।
এতে ফেস্ট শেষ হলেও লেখকরা তাদের সাথে যুক্ত হতে পারেন, তাদের সাথে দেখা করার সুযোগ পাবেন।
তাই এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে লেখকদের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন আয়োজকরা।
মি. আহমেদ বলেন, “লিট ফেস্টে যে লেখক ও প্রকাশকরা আসেন, আমাদের লেখকদের উচিত হবে নিজ উদ্যোগে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা ও সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করা। এ ধরনের যোগাযোগ বজায় থাকলে বাংলাদেশের লেখকদের লেখাগুলো নির্বাচিত ও আলোচিত হবে।”
তার মতে, ঢাকা লিট ফেস্ট সত্যিকার অর্থে আন্তর্জাতিক মাত্রা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। সেখানে সবার দেখা হবে, আড্ডা হবে।
"এটার ফলাফলটা কোন পরিমাপক দিয়ে বোঝানো সম্ভব না। বিষয়টা উপলব্ধির।”
তবে বাংলাদেশে ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অন্তরায় এই বইগুলো ছাপানোর জন্য যথেষ্ট প্রকাশনা সংস্থা না থাকা। এমনটাই অভিযোগ লেখকদের।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বই প্রকাশনার জন্য তাদের নির্ভর করতে হয় বিদেশি প্রকাশনার সংস্থার ওপর।
কিন্তু বিদেশি প্রকাশকরা তাদের নিজেদের লেখকদের বেশি প্রাধান্য দেয়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশে যদি ইংরেজি সাহিত্য প্রকাশের জন্য প্রকাশনা সংস্থা বাড়ানো হয় তাহলে, লেখকরা আরও সুযোগ পাবেন বলে মনে করা হচ্ছে।
লেখিকা সাজিয়া ওমর বলেন, “আমাদের হাতে গোনা যে কয়টি প্রকাশক আছে তারা আমাদের বই ছাপাতে চায় না, যেহেতু কাটতি কম। এই অবস্থায় আমরা বই ছাপাতে ভারতে না হলে যুক্তরাজ্যে যাই। ওই দেশের প্রকাশকরা আবার তাদের স্বার্থ বিরোধী কোন লেখা থাকলে ছাপাবে না।”
এক্ষেত্রে বিদেশি প্রকাশকদের ক্ষমতার বলয় থেকে বের হওয়া বেশ জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
“ওদের নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরোতে আমাদের নিজেদের প্রকাশক লাগবে। বাংলাদেশে এখনও প্রকাশনা নিয়ে অনেক রাজনীতি হয়। সেটা নতুন লেখকদের জন্য ডিল করা কঠিন। নতুন প্রকাশনা এলে অন্যের ওপরে নির্ভর করতে হবে না। নতুন লেখকেরা তাদের নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম পাবে, সাপোর্ট পাবে,” তিনি বলেন।

ছবির উৎস, Dhaka Lit Fest
শিশুদের বই পড়ার আগ্রহ বেড়েছে
এই লিট ফেস্টের কারণে শিশুদের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ অনেকটা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন লেখিকা সাজিয়া ওমর।
তিনি নিজেও দুই সন্তানের মা। লিট ফেস্ট হলে তার সন্তানরা বেশ আগ্রহী হয়ে ওঠে ফেস্টে গিয়ে বিভিন্ন স্টলে ঘুরে ঘুরে বই কেনার ব্যাপারে।
“বাচ্চারা ডিভাইস থেকে বের হয়ে বই পড়তে চাইছে, বই নিয়ে আলাপ করছে। ফেস্টিভালে অনেক বাচ্চারা আসে। এটা খুবই ইতিবাচক একটা দিক।” তিনি বলেন।
বাংলাদেশে শিশুদের জন্য মানসম্মত ইলাস্ট্রেশনযুক্ত বই বের করে ইতোমধ্যে আলোচনায় এসেছে গুবা বুক প্রকাশনা।
তারা মূলত শিশুদের জন্য বয়স উপযোগী বই ছাপিয়ে থাকে। যার মূল আকর্ষণের বিষয়টি হল সুন্দর ছবি এবং বইগুলো ইংরেজি ও বাংলা দুই ভাষাতেই পাওয়া যায়।
মিসেস ওমর বলেন, “আমাদের বাচ্চারা যে বইগুলো পড়ে, সেখানে সব চরিত্র হয় শ্বেতাঙ্গ না হলে কৃষ্ণাঙ্গ। সেখানে আমাদের বাচ্চারা তাদের নিজেদের খুঁজে পায় না। কিন্তু নতুন এই প্রকাশনীর বইয়ের চেহারাগুলো আমাদের মতো। সেটা পড়ে তার খুব মজা পায়।”
তার মতে, শুধু লিট ফেস্টের মাধ্যমে নয় বাংলাদেশের ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি শিশুদেরকে আগ্রহী করে তুলতে হবে স্কুল লেভেল থেকে। এখানে বাবা মায়ের ভূমিকা রয়েছে। যদি এই প্রচেষ্টা না তাকে তাহলে শিশুদের জীবনধারা থেকে বই পড়ার চর্চাই চলে যাবে।
এছাড়া বাংলাদেশে বইয়ের দোকানের সংখ্যা অনেক কমে গিয়েছে।
একটা ইংরেজি বই কিনতে চাইলে ঢাকার একটা দুইটা দোকানই ভরসা।
যেখানে বিশ্বের বড় শহরগুলোয় অলিগলিতে বইয়ের দোকান, সেখানে এতো জনসংখ্যার ঢাকায় মাত্র হাতে গোনা কয়েকটা বইয়ের দোকান বেশ দুঃখজনক বলে তিনি জানান।

ছবির উৎস, Dhaka Lit Fest
বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং
একটি দেশের শিল্প, সংস্কৃতি ও জীবনধারার ধারণা পাওয়া যায় ওই দেশের সাহিত্য পড়ে।
তেমনি বাংলাদেশকে বহির্বিশ্বে তুলে ধরার সবচেয়ে বড় অনুষঙ্গ দেশটির সাহিত্য।
আয়োজকরা জানান, বিদেশি সাহিত্যিকরা বাংলা সাহিত্য নিয়ে জানতে চান। আমরাও চেষ্টা করছি আমাদের মানসম্মত সাহিত্যগুলো তাদের সামনে তুলে ধরতে।
তারা বলছেন, বিশ্ব অঙ্গনে বাংলাদেশের সাহিত্যের ব্র্যান্ডিং করার একটি বড় প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে এই লিট ফেস্ট।
এর মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যের ইতিবাচক প্রচার প্রসার হচ্ছে, সেই সাথে নতুন লেখক ও পাঠকদের মধ্যে ইংরেজি সাহিত্যের ব্যাপারে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে বলে মনে করা হয়।
“বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে খুব নেতিবাচকভাবে তুলে ধরা হয়। আমরা দেখি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক জায়গায় কারা কোন অবস্থানে আছেন। তাদের সঙ্গে আমরা সারাবছর যুক্ত থাকি, তাদেরকে বলি যে, দেখো, বাংলাদেশে কিন্তু এইরকম কাজ হচ্ছে। আমরা যেমন বিশ্ব সাহিত্য থেকে অনেক কিছু নিয়েছি। আমরা ফেরাতেও চাই।”
পৃষ্ঠপোষকতা
বাংলাদেশ বিশ্বসাহিত্যে নিজেদের জায়গা করে নেয়ার একটি প্রক্রিয়ায় মধ্যে আছে। এক্ষেত্রে শুধু লিট ফেস্ট যথেষ্ট নয় বলে আয়োজকরা মনে করেন।
বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির আন্তর্জাতিক পরিচিতি পেতে সরকারি, বেসরকারি ব্যক্তিগত এই তিন উপায়ে আরও অনেক উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন রয়েছে।
প্রথমত বাংলাদেশের সাহিত্যের ক্ষেত্রে মানসম্মত অনুবাদের সংখ্যা বাড়ানো এবং যে ভাষায় অনুদিত হচ্ছে সেই ভাষায় মার্কেটিং করা।
যদি এ ধরণের সুপাঠ্য অনুবাদ নিয়মিত করা যায় তাহলে বিদেশের বড় বড় যে বইমেলা বা বই উৎসব রয়েছে যেমন ফ্রাঙ্কফুর্ট বুক ফেয়ার এবং লন্ডন বুক ফেয়ার রয়েছে সেখানে সরকারি উদ্যোগে বড় আকারে স্টল নেয়া যেতে পারে। যাতে করে সকল দেশের নাগরিকরা সেখানে বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে জানতে পারে। চিনতে শুরু করে।
মি. আহমেদ বলেন “বাংলাদেশের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় বা বাংলা একাডেমি এই লিট ফেস্টের সাথে যুক্ত হয়ে অনেকটা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ আকারে এই কাজগুলো করতে পারে। আমাদের চাইতে ছোট ছোট দেশ এই উদ্যোগ নিয়ে তাদের অবস্থান তৈরি করে ফেলেছে।”
সেইসাথে লেখক যারা আছেন তাদেরকেও ব্যক্তিগত নাহলে সরকারি/বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এসব মেলা, উৎসব, কনফারেন্স, সেমিনারে যেতে হবে। বিদেশি নেটওয়ার্কের সাথে সম্মুখ পরিচিতি গড়ে তুলতে হবে।

ছবির উৎস, Dhaka Lit Fest
কী থাকছে দশম সংস্করণে
বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে আয়োজিত এবারের আসরে ১৭৫টির বেশি সেশনে পাঁচটি মহাদেশের ৫০০ জনেরও বেশি বক্তা, শিল্পী ও চিন্তাবিদরা অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছে বলে জানা যায়।
তাদের মধ্যে নোবেলজয়ী লেখক ওরহান পামুক, আব্দুলরাযাক গুরনাহ সেইসাথে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পুরস্কার বিজয়ী বক্তারাও যোগ দেবেন।
যাদের মধ্যে পুলিৎজার, ইন্টারন্যাশনাল বুকার, নিউস্ট্যাড ইন্টারন্যাশনাল, পেন বা পিন্টার, প্রিক্স মেডিসিস, অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড, উইন্ডহাম ক্যাম্পবেল পুরস্কার, অ্যালার্ট মেডেল, ওয়াটারস্টোন চিল্ড্রেনস বুক প্রাইজ, আঁগা খান অ্যাওয়ার্ড ও অন্য পুরস্কার বিজয়ীরাও থাকছেন।
চার দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে থাকছেন লিট ফেস্টের তিন পরিচালক সাদাফ সায, আহসান আকবার ও ড. কাজী আনিস আহমেদ।
আয়োজকরা বলছেন, শুধু ইংরেজি সাহিত্য নয় বরং দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকাসহ বিশ্বব্যাপী প্রসিদ্ধ সাহিত্যের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করাও এই ফেস্টের উদ্দেশ্য।
চার দিনের এই আয়োজনের আলোচনায় থাকবে বিষয় বৈচিত্র্য, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, শিল্প প্রদর্শনী, সংগীত এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
একটি ফেস্টের আয়োজন শেষ হওয়ার পরপরই পরের ফেস্টের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন আয়োজকরা। বছর জুড়ে তাদের এই কার্যক্রমগুলো চলে। যেমন ২০২৪ সালের ঢাকা লিট ফেস্টের কাজ এরি মধ্যে শুরু হয়ে গেছে।











