যৌনাঙ্গ আক্রান্তকারী পরজীবী দেশে দেশে ছড়াতে পারে, বিজ্ঞানীদের সতর্কতা

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, কেট বোউই
- Role, গ্লোবাল হেলথ, বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস
এটি এমন এক পরজীবী যা ত্বকের ভেতর দিয়ে শরীরে ঢোকে এবং রক্তে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকে।
নীরবেই এটি ডিম পাড়ে, আর এসব ডিম জমা হয় মানবদেহের লিভার, ফুসফুস ও যৌনাঙ্গে।
অনেক সময় বছরের পর বছর ধরে মানুষের শরীরে এই পরজীবীর উপস্থিতি থাকলেও তা ধরা না-ও পড়তে পারে।
এই পরজীবীর সংক্রমণ স্নেইল ফিভার নামে পরিচিত। স্নেইল বা শামুক এই পরজীবী বহন করার কারণেই এই নামকরণ।
এই রোগের বিষয়ে মানুষের জানাশোনা অনেক কম। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো এই পরজীবী সংক্রমিত রোগ ক্রমেই বদলাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে শক্তিশালী হচ্ছে।
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, মনোযোগ উপেক্ষিত এই পরজীবীর সংক্রমণ এমনভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে, যার ফলে ভবিষ্যতে এটি নিয়ন্ত্রণ করা বেশ কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
প্রতি বছর এই রোগের জন্য চিকিৎসা নেন বিশ্বের প্রায় ২৫ কোটি মানুষ। যাদের বেশিরভাগই আফ্রিকা মহাদেশে বসবাস করেন। কারণ, যেসব শামুক এই পরজীবী বহন করে, সেগুলো মূলত আফ্রিকাতেই পাওয়া যায়।
তবে বিশ্বজুড়ে ৭৮টি দেশে এই রোগের সংক্রমণের ঘটনা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে চীন, ভেনেজুয়েলা ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশও রয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, বিষয়টি এখন একটি বৈশ্বিক উদ্বেগে পরিণত হয়েছে।
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, পরজীবীটির গঠন ও বৈশিষ্ট্যে এমন সব পরিবর্তন এসেছে, যার ফলে এটি নতুন নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এই সতর্কবার্তাটি এসেছে এমন এক সময়ে, যখন ৩০শে জানুয়ারি ওয়ার্ল্ড নেগলেক্টেড ট্রপিক্যাল ডিজিজ ডে পালন করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
এই দিবসের লক্ষ্য হলো ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, পরজীবী ও ছত্রাকজনিত এমন রোগগুলোর দিকে দৃষ্টি দেওয়া, যেগুলো মূলত দরিদ্র অঞ্চলে বসবাসকারী ১০০ কোটিরও বেশি মানুষকে আক্রান্ত করে।

ছবির উৎস, Getty Images
স্নেইল ফিভার কী?
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আগেই জানিয়েছি এই পরজীবী বহন করে বিশেষ ধরনের শামুক। এই শামুক যে পানিতে থাকে সেখানে এই পরজীবীর লার্ভা বা শিশু পরজীবী পানিতে ছড়িয়ে পড়ে।
এখন কোনো মানুষ বা প্রাণী যদি কোনোভাবে সেই পানির সংস্পর্শে আসে বা গোসল করতে নামে তখন তার স্নেইল ফিভার হতে পারে।
এই লার্ভাগুলোয় চামড়া গলিয়ে ফেলার মতো এনজাইম ছাড়ে এবং ত্বকের ভেতর দিয়ে শরীরে ঢুকে পড়ে।
এরপর এগুলো ধীরে ধীরে মানুষের শরীরের ভেতরে বড় হয়ে পূর্ণবয়স্ক কৃমিতে পরিণত হয় এবং রক্তনালিতে বসবাস শুরু করে। স্ত্রী কৃমিগুলো ডিম পাড়ে।
এই ডিমগুলোর কিছু কিছু মল বা প্রস্রাবের সঙ্গে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। তবে অনেক ডিম শরীরের ভেতরের টিস্যুতে আটকে যায়।
ডিমগুলো আটকে গেলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সেগুলো ধ্বংস করতে গিয়ে আশপাশের সুস্থ টিস্যুকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর ফলে বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতি হতে পারে।
কিছু ডিম তলপেট ও যৌনাঙ্গের আশপাশে আটকে যায়। এই অবস্থাকে বলা হয় ইউরোজেনিটাল স্কিস্টোসোমিয়াসিস।
এই রোগে পেটব্যথা থেকে শুরু করে ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে এবং মারাত্মক ক্ষেত্রে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
স্নেইল ফিভার সাধারণত অ্যান্টি-প্যারাসাইটিক ওষুধে সেরে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের, যেমন ছোট শিশু, কৃষিশ্রমিক ও জেলেদের গত কয়েক বছর ধরে পরামর্শ দিয়ে আসছেন যেন তারা প্রতি বছর এই ওষুধ খান।
তবে মালাউই লিভারপুল ওয়েলকাম ক্লিনিক্যাল রিসার্চ প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক অধ্যাপক জানেলিসা মুসায়াসহ অন্যান্য বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই পরজীবীর নতুন কিছু ধরন পাওয়া গেছে যেগুলো বর্তমানে প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতিতে ধরা নাও পড়তে পারে।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন

ছবির উৎস, Getty Images
সংকট আরো গভীর
প্রশ্ন হলো, একই জায়গায় বারবার এই রোগ ছড়াচ্ছে কেন?
গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের শরীরে থাকা পরজীবী আর প্রাণীর শরীরে থাকা পরজীবী একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়ে নতুন 'হাইব্রিড' (মিশ্র) ধরন তৈরি করছে।
এই হাইব্রিড পরজীবীগুলো মানুষ ও প্রাণী দুজনকেই আক্রান্ত করতে পারে। ফলে রোগের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
বিজ্ঞানীরা আগে থেকেই জানতেন যে মানুষ ও প্রাণীর শরীরের পরজীবীগুলো একে অপরের সঙ্গে প্রজনন করছে।
কিন্তু তারা নিশ্চিত ছিলেন না, এই হাইব্রিড ডিমগুলো শরীরের বাইরে টিকে থাকতে ও বেঁচে থাকতে পারছে কি না।
এটা প্রমাণ করতে গবেষকরা মালাউইর কিছু নির্দিষ্ট এলাকার মানুষ ও প্রাণীর কাছ থেকে নমুনা নেন। তারা দেখেন, এসব পরজীবীর সাত শতাংশই ছিল পরিবর্তিত হাইব্রিড, যা তাদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি।
এর মানে হলো, এই নতুন পরজীবীগুলো সফলভাবে বংশবিস্তার করছে এবং ভবিষ্যতে আরও ছড়িয়ে পড়বে।
"প্রকৃতিতে যদি এভাবে সংক্রমণ চলতেই থাকে, তাহলে সংখ্যাটা অনেক বড় হয়ে যাবে," বিবিসিকে বলেন অধ্যাপক মুসায়া।
তিনি সতর্ক করে বলেন, যেহেতু গবেষণা শুধু কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় করা হয়েছে, তাই এটা হয়তো "হিমশৈলের চূড়া মাত্র", আসল সমস্যা আরও বড় হতে পারে। বিশেষ করে, অনেক সময় পরীক্ষায় এই সংক্রমণ ধরাই পড়ছে না।
ভবিষ্যতে এই হাইব্রিড পরজীবীগুলো পুরনো পরজীবীদেরও হারিয়ে দিতে পারে বলে সতর্ক করছেন তিনি।
এটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে, কারণ চিকিৎসকেরা এখনো নিশ্চিত নন, এই হাইব্রিড পরজীবী বহন করা রোগীদের কীভাবে চিকিৎসা করতে হবে।
অধ্যাপক মুসায়া বলেন, "নীতিনির্ধারকদের প্রতি আমাদের একটা বার্তা–– জেগে উঠুন। বড় সমস্যা হওয়ার আগেই কি আমরা দ্রুত কিছু করতে পারি না?"

ছবির উৎস, Getty Images
পরীক্ষায় যৌনাঙ্গে হওয়া সংক্রমণ ধরা পড়ছে না
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এই হাইব্রিড পরজীবীগুলো মানুষের যৌনাঙ্গেও সংক্রমণ ঘটাচ্ছে।কিন্তু এক্ষেত্রে হাইব্রিড স্নেইল ফিভার শনাক্ত করা কঠিন, কারণ এদের ডিম মাইক্রোস্কোপে সাধারণ পরজীবীর ডিমের মতো দেখায় না।
এ ছাড়া অনেক সময় স্বাস্থ্যকর্মীরা এর উপসর্গগুলোকে যৌনবাহিত রোগ ভেবে ভুল করতে পারেন।
চিকিৎসা না হলে ইউরোজেনিটাল স্কিস্টোসোমিয়াসিস থেকে যৌনাঙ্গে ক্ষত, বন্ধ্যত্ব এবং এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
নারীদের ক্ষেত্রে এই রোগের শারীরিক, সামাজিক ও সন্তান ধারণ–সংক্রান্ত প্রভাব আরও বেশি গুরুতর বলে মনে করা হয়।
অধ্যাপক মুসায়া বলেন, "ভাবুন তো, যদি কোনো নারী সন্তান ধারণ করতে না পারেন… আমাদের সংস্কৃতিতে সন্তান হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সন্তান না হলে মানুষ ওই নারীকে নানা নামে ডাকতে শুরু করে। এটা সত্যিই খুব খারাপ এবং খুবই কষ্টের একটি রোগ"।

ছবির উৎস, Getty Images
চাপের মুখে অগ্রগতি
বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এই হাইব্রিড পরজীবীগুলো নতুন নতুন অঞ্চলে স্নেইল ফিভার ছড়িয়ে দিতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তন, ভ্রমণ এবং মানুষের অভিবাসনের কারণে স্নেইল ফিভার ছড়াতে পারে। আর হাইব্রিড পরজীবী থাকলে এই রোগ নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হয়ে যায়।
ইতোমধ্যে দক্ষিণ ইউরোপের কিছু এলাকায় এমন হাইব্রিড সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্কিস্টোসোমিয়াসিস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির প্রধান ডা. আমাদু গারবা জিরমে বলেন, "এটা একটি বৈশ্বিক উদ্বেগ"।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আশঙ্কা করছে, এর ফলে রোগ নির্মূলের লক্ষ্য ব্যাহত হতে পারে।
তিনি বলেন, "কিছু দেশে মানুষের মধ্যে এই রোগের সংক্রমণ নেই, কিন্তু প্রাণীদের শরীরে পরজীবীটি রয়ে গেছে। ভবিষ্যতে সেটাই মানুষের জন্য ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে"।
এই নতুন হুমকি মোকাবিলায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের কৌশল বদলাচ্ছে।
চলতি বছর সংস্থাটি প্রাণীদের মধ্যে রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য নতুন নির্দেশনা প্রকাশ করবে। এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশকে হাইব্রিড পরজীবী নিয়ে আন্তর্জাতিক সতর্কবার্তাও পাঠানো হয়েছে।
বড় পরিসরে অ্যান্টি-প্যারাসাইটিক ওষুধ বিতরণ কর্মসূচির কারণে ২০০৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে স্নেইল ফিভারের সংক্রমণ ৬০ শতাংশ কমেছে।
তবে এই অগ্রগতি ধরে রাখতে দরকার নিয়মিত অর্থায়ন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে উপেক্ষিত ট্রপিক্যাল রোগ খাতে সহায়তা ৪১ শতাংশ কমে গেছে, যা বড় হুমকি।
তবু অধ্যাপক মুসায়া আশাবাদী।
তিনি বলেন, "আমরা রোগটি নির্মূল করতে পারি। তবে এটা একা কারও কাজ নয়। আমরা সক্রিয়ভাবে কাজ করছি। আমরা বলছি, সমস্যাটা আছে, এখনই এটাকে সামলাতে হবে"।








