আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
ইয়েমেনে ভারতীয় নার্সের মৃত্যুদণ্ড ঠেকানোর সব আশাই কি শেষ?
- Author, গীতা পান্ডে ও ইমরান কুরেশি
- Role, বিবিসি নিউজ, দিল্লি ও ব্যাঙ্গালোর
যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ পাওয়া একজন ভারতীয় নার্স, নিমিশা প্রিয়ার ফাঁসির আদেশ আগামী ১৬ জুলাই (বুধবার) কার্যকর হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
নিমিশা প্রিয়ার জীবন বাঁচানোর জন্য যারা গত বেশ কয়েক বছর ধরে লড়ছেন, সেই ক্যাম্পেইনাররা বিবিসির কাছে এ খবর নিশ্চিত করেছেন।
স্থানীয় একজন ইয়েমেনি ব্যক্তিকে হত্যা করার অভিযোগে সে দেশের আদালত নিমিশা প্রিয়াকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে।
তালাল আব্দো মাহদি নামে নিহত ওই ব্যক্তি নিমিশা প্রিয়ার ব্যবসাায়িক অংশীদার ছিলেন। ২০১৭ সালে তার টুকরো টুকরো করা দেহ একটি জলের ট্যাঙ্ক থেকে উদ্ধার করা হয়।
এখন নিমিশাকে বাঁচানোর একমাত্র রাস্তা হলো যদি ওই নিহত ব্যক্তির পরিবার 'দিয়াহ' বা 'ব্লাড মানি'-র বিনিময়ে ওই নার্সের প্রাণভিক্ষা দিতে রাজি হয়!
নিমিশা প্রিয়া-র আত্মীয়স্বজন ও সমর্থকরা ইতোমধ্যেই মাহদির পরিবারকে 'ব্লাড মানি' দিতে ১ মিলিয়ন বা ১০ লক্ষ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করেছেন।
'সেইভ নিমিশা প্রিয়া কাউন্সিল' নামে যে সংগঠনটি ওই নার্সের প্রাণ বাঁচানোর জন্য লড়ছে তার একজন সদস্য বিবিসিকে বলেছেন, "নিহতের পরিবারের কাছ থেকে আমরা এখনও প্রাণভিক্ষা পাওয়ার – কিংবা তারা অন্য কোনও নতুন দাবি জানায় কি না – তার অপেক্ষায় আছি।"
ওই কাউন্সিলের সদস্য ও কেরালার সমাজকর্মী বাবু জন বলেন, ইয়েমেনের বিচার বিভাগের যিনি মহাপরিচালক (ডিরেক্টর জেনারেল), তিনিই জেল কর্তৃপক্ষকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তারিখটি জানিয়েছেন।
"আমরা এখনও নিমিশাকে বাঁচানোর আশা ছাড়িনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবটাই নির্ভর করছে নিহতের পরিবার তার প্রাণভিক্ষা দিতে রাজি হয় কি না, তার ওপর", বিবিসিকে জানান মি জন।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা অবশ্য বিবিসিকে বলেছেন, মৃত্যুদন্ড কার্যকরের তারিখ ঘোষণা হয়ে গেছে বলে যেটা বলা হচ্ছে সেটার সত্যতা নিরূপণের জন্য তারা এখনও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত নার্সের জীবন বাঁচানোর জন্য এর আগে ভারত সরকারও কূটনৈতিক পর্যায়ে বহু চেষ্টা চালিয়েছে – কিন্তু ইয়েমেনে যেহেতু ভারতের কোনও দূতাবাস বা কূটনৈতিক উপস্থিতি নেই তাই সে চেষ্টাও ব্যাহত হয়েছে।
দক্ষিণ ভারতের রাজ্য কেরালা থেকে নিমিশা প্রিয়া ২০০৮ সালে রাজধানী সানা-র একটি সরকারি হাসপাতালে নার্সের চাকরি নিয়ে ইয়েমেনে পাড়ি দিয়েছিলেন।
কিন্তু ২০১৭তে তালাল আব্দো মাহদি-র লাশ উদ্ধার হওয়ার পর তাকে গ্রেপ্তার হতে হয়।
এখন ৩৪ বছর বয়সী নিমিশা প্রিয়া ইয়েমেনের রাজধানী সানা-র সেন্ট্রাল জেলে বন্দি রয়েছেন।
তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, সিডেটিভ বা ঘুমের ওষুধের 'ওভারডোজ' দিয়ে তিনি তালাল আব্দো মাহদিকে হত্যা করেছেন এবং পরে তার দেহটিকে টুকরো টুকরো করে জলের ট্যাঙ্কে ফেলে দিয়েছেন।
নিমিশা প্রিয়া অবশ্য এই অভিযোগগুলোর সবই অস্বীকার করেছেন।
আদালতে তার আইনজীবী দাবি করেন, মাহদি প্রিয়ার ওপর শারীরিক নির্যাতন চালাতেন, তার সব টাকাপয়সা ছিনিয়ে নিয়েছিলেন, পাসপোর্ট পর্যন্ত আটকে রেখেছিলেন – এমনকি বন্দুক দিয়েও প্রিয়াকে ভয় দেখাতেন!
শুনানিতে তিনি আরও বলেন, নিমিশা প্রিয়ার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল মাহদিকে অচেতন করে তার কাছ থেকে নিজের পাসপোর্ট উদ্ধার করা – কিন্তু ভুলবশত সিডেটিভের ডোজ বেশি হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু ২০২০ সালে ইয়েমেনের একটি স্থানীয় আদালত ভারতীয় ওই নার্সকে দোষী সাব্যস্ত করে তাকে মৃত্যুদন্ডের সাজা দেয়।
নিমিশা প্রিয়ার পরিবার এই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে সে দেশের সুপ্রিম কোর্টের শরণাপন্ন হয়, কিন্তু ২০২৩ সালে শীর্ষ আদালতও তাদের সেই আপিল খারিজ করে দেয়।
ইয়েমেনের রাজধানী সানা-র নিয়ন্ত্রণ এখন হুথি বিদ্রোহীদের কব্জায়, হুথিদের সুপ্রিম পলিটিক্যাল কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট মাহদি আল-মাশাত চলতি বছরের জানুয়ারির গোড়ার দিকে এই মৃত্যুদণ্ডের আদেশে তার অনুমোদন দেন।
তবে ইয়েমেনের বিচারবিভাগ যেহেতু শরিয়া বা ইসলামি আইন অনুসরণ করে চলে, তাই নিমিশা প্রিয়ার জীবন বাঁচানোর জন্য এরপরও একটি শেষ আশার আলো ছিল – আর সেটা হল যদি নিহতের পরিবার 'ব্লাড মানি' নিয়ে অভিযুক্তকে ক্ষমা করে দেয়।
নিমিশার দরিদ্র মা কেরালায় গৃহপরিচারিকার কাজ করে সংসার চালাতেন, মেয়ের জীবন বাঁচানোর চেষ্টায় তিনি গত বেশ কয়েক বছর ধরে ইয়েমেনেই মাটি কামড়ে পড়ে আছেন।
নিহত তালাল আব্দো মাহদির পরিবারের সঙ্গে কথাবার্তা বলা ও আলাপ-আলোচনার জন্য ইয়েমেনের একজন সমাজকর্মী স্যামুয়েল জেরোমকে তিনি দায়িত্ব দিয়েছেন।
নিমিশা প্রিয়ার প্রাণ বাঁচানোর জন্য 'সেইভ নিমিশা প্রিয়া ইন্টারন্যাশনাল অ্যাকশন কাউন্সিল' নামে একটি লবি গ্রুপও গড়ে তোলা হয়েছে, ভারতে ও ভারতের বাইরে থেকে নানা দেশ থেকে তারা ক্রাউডফান্ডিং-এর মাধ্যমে অর্থও সংগ্রহ করছেন।
স্যামুয়েল জেরোম জানিয়েছেন, তাদের পক্ষ থেকে মাহদির পরিবারকে ১০ লক্ষ ডলারের সমপরিমাণ ব্লাড মানি ইতোমধ্যেই অফার করা হয়েছে। কিন্তু তারা সেই প্রস্তাবে রাজি হয়ে নিমিশার জীবন ভিক্ষা দিতে রাজি কি না, সেটা এখনও স্পষ্ট নয়।
এরই মাঝে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা হওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে সেই শেষ পথটাও বোধহয় বন্ধ হয়ে আসছে। নিমিশার প্রাণ বাঁচানোর জন্য তার পরিবার ও সমর্থকদের হাতে আর সপ্তাহখানেকও সময় নেই!