ইরানে শাসক পাল্টানোর চেষ্টা হতে পারে ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় বাজি

    • Author, ড্যানিয়েল বুশ
    • Role, ওয়াশিংটন সংবাদদাতা
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

ইরানে হামলা চালিয়ে এবং দেশটির শাসন কাঠামোর সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত বড় একটি বাজি ধরেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, আগের প্রেসিডেন্টরা যেখানে ব্যর্থ হয়েছেন, সেখানে মার্কিন সামরিক শক্তি ব্যবহার করে তিনি মধ্যপ্রাচ্যকে নতুনভাবে রূপ দিতে পারবেন।

যুক্তরাষ্ট্র শুধু আকাশশক্তি ব্যবহার করে যদি ইরানের পরমাণু কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করতে পারে এবং তেহরানে শাসন পরিবর্তন ঘটাতে পারে, তাহলে ট্রাম্প এটিকে যুগান্তকারী এক জয় হিসেবে দাবি করবেন। যদিও ইরানে ইসলামিক রিপাবলিক-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে ওয়াশিংটনের সুস্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা চোখে পড়ছে না।

কিন্তু ইরানে অভিযান, পেন্টাগন যার নাম দিয়েছে 'অপারেশন এপিক ফিউরি', এটা যদি ব্যর্থ হয় বা এমন এক বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেয় যা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সম্পৃক্ততা টেনে আনে, তাহলে ট্রাম্পের উত্তরাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার সম্ভাবনাও কমে যেতে পারে।

শনিবার ভোরে ইরানে সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দিতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট দেখিয়ে দেন, এই পদক্ষেপে কত কিছু ঝুঁকিতে রয়েছে।

"আমেরিকান বীরদের আমরা হারাতে পারি," বলেন ট্রাম্প। তার যুক্তি—১৯৭৯ সালে ক্ষমতা দখলের পর থেকে যে শাসনব্যবস্থা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অস্থিরতা ছড়িয়েছে, তাকে চাপের মুখে ফেলতে এই মূল্য চোকানো প্রয়োজনীয়।

"৪৭ বছর ধরে ইরানের শাসকরা 'আমেরিকার সর্বনাশ' বলে স্লোগান দিয়ে এসেছে," বলেন ট্রাম্প। পরে তিনি যোগ করেন, "আমরা আর এটি সহ্য করব না"।

তবে বিশ্বের নজর যখন সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পর ইরানি শাসনব্যবস্থা কী করে সেদিকে, তখনো স্পষ্ট নয় যে, ট্রাম্প দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযান এড়াতে পারবেন কি না।

আরেকটি প্রশ্ন হলো, তিনি কি আমেরিকান জনগণকে, বিশেষ করে তার 'মাগা' বা মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইনের তত্ত্বের সমর্থকদের, যারা সাধারণত বিদেশে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের বিরোধী—মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি সামরিক অনুপ্রবেশকে সমর্থন করাতে পারবেন?

এটি ট্রাম্পের জন্য এক সন্ধিক্ষণ, কারণ দেড় বছরেরও কিছু বেশি আগে তিনি দপ্তরে ফিরে এসেছিলেন আফগানিস্তান ও ইরাকের মতো তথাকথিত "চিরস্থায়ী যুদ্ধ" শেষ করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে। অথচ তার প্রশাসন ইরান, ভেনেজুয়েলা ও সিরিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশে সামরিক অভিযান চালিয়েছে।

হোয়াইট হাউজ আগেই সতর্ক করেছিল, যদি ইরানি শাসনব্যবস্থা তাদের পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচি ত্যাগ, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বন্ধ এবং হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন প্রত্যাহারের চুক্তিতে রাজি না হয়, তবে আক্রমণ চালানো হবে। এর পরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বোমা হামলা শুরু করে।

ওই অঞ্চলে বিপুল সামরিক শক্তি জড়ো করার পর, ট্রাম্প শুক্রবার রাতে ফ্লোরিডার তার মার-অ্যা-লাগো এস্টেটে শীর্ষ উপদেষ্টাদের সঙ্গে বসে তাৎক্ষণিক আপডেট নিয়ে হামলার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করেন।

ওয়াশিংটনে, ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ড এবং প্রশাসনের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে জড়ো হন এবং বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত এক সূত্রের বরাতে জানা যায়, তারা কনফারেন্স লাইনে ট্রাম্পের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বোমা হামলার পরিস্থিতি রিয়েল-টাইমে অনুসরণ করেন।

খামেনির হত্যাকাণ্ড পরিস্থিতিকে বড় ধরনের সংঘাতে রূপ দিয়েছে, তবে বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা—এটি ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

"যা ঘটার তা ঘটে গেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য পুরো পথটাই যেতে হবে। সমস্যা হলো—মাটিতে সেনা না নামিয়ে আপনি সেটা করতে পারবেন না," বলেন নেভাল পোস্টগ্র্যাজুয়েট স্কুলের অধ্যাপক মোহাম্মদ হাফেজ।

তিনি আরও বলেন, ইরানের যে পাল্টা হামলা যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্র দেশ বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতারসহ বিভিন্ন স্থান লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে, তা দেখায়– গত বছরের মার্কিন হামলার প্রতিক্রিয়ার তুলনায় এবার শাসনব্যবস্থা আরও আক্রমণাত্মকভাবে জবাব দিতে চায়।

"ইরানি শাসনব্যবস্থার কৌশল হবে এমন এক আঞ্চলিক সংঘাত তৈরি করা যা বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং মার্কিন অর্থনীতিকে প্রভাবিত করবে—এবং তা ট্রাম্পের জন্য মোটেই ভালো হবে না," বলেন ইসলামী রাজনৈতিক সহিংসতা ও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক রাজনীতির বিশ্লেষক হাফেজ।

"এটি এক গভীর অচলাবস্থার দিকে নিয়ে যেতে পারে"।

মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত গাজা পুনর্গঠন বা সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের মতো ট্রাম্পের অন্যান্য আঞ্চলিক অগ্রাধিকারের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

এটি যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও তার সমর্থকদের দূরে ঠেলে দিতে পারে—বিশেষ করে এমন এক সময়ে যখন জীবনযাত্রার ব্যয় এবং নানা অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে ভোটারদের ক্ষোভের কারণে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি সমর্থন হারাচ্ছেন।

ট্রাম্পের প্রথম দফার প্রশাসনের এক সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, যিনি এখনো তার দলের ঘনিষ্ঠ এবং অভ্যন্তরীণ নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবহিত, তিনি বলেন– সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে প্রশাসনের বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ইরানে বড় ধরনের সামরিক অভিযান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

সেসব বিভাজন নেপথ্যে দেখা গেলেও প্রকাশ্যে ট্রাম্প ইরানে হামলার হুমকি দিয়েছেন এবং ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক সমাবেশের নির্দেশ দিয়েছেন।

শনিবার অভিযানের সিদ্ধান্ত নিয়ে সপ্তাহব্যাপী জল্পনার অবসান ঘটিয়ে ট্রাম্প তার মিশন সম্পর্কে আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেন। তবে তিনি এমন কিছু পরস্পরবিরোধী বার্তাও দেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ-লক্ষ্য নিয়ে নতুন প্রশ্ন তোলে।

"আমি চাইলে দীর্ঘমেয়াদে গিয়ে পুরো বিষয়টা আয়ত্বে নিতে পারি, আবার চাইলে দুই-তিন দিনের মধ্যেই শেষ করতে পারি—আর ভবিষ্যৎ হামলার হুমকিও বজায় রাখতে পারি," মার্কিন সংবাদ মাধ্যম অ্যাক্সিওসকে বলেন ট্রাম্প।

তিনি পরে সামাজিক মাধ্যমে বলেন, "ভারী ও নির্ভুল বোমাবর্ষণ… সারা সপ্তাহজুড়ে বা যতদিন প্রয়োজন, নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকবে"।

এই মন্তব্যগুলো সমালোচকদের সেই বক্তব্যকেই জোরালো করে যে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির ধরন ঢিলেঢালা এবং সামরিক আক্রমণ শুরু করার আগে আইনপ্রণেতা ও জনমতকে সঙ্গে নেওয়ার ভিত্তি প্রস্তুত করার বিষয়ে তার আগ্রহ কম।

আবার প্রেসিডেন্টের মিত্র ও সমর্থকদের মতে, এই একই প্রচলিত রীতির বাইরে থাকা পদ্ধতিই তাকে কিছু সাফল্য এনে দিয়েছে—এর মধ্যে রয়েছে গাজায় একটি যুদ্ধবিরতি এবং নেটোর জন্য ইউরোপের আর্থিক অঙ্গীকার বৃদ্ধির বিষয়টি।

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করা কেন আমেরিকানদের স্বার্থে—এই বিষয়ে বিস্তারিত যুক্তি আগেভাগে জনসাধারণের সামনে উপস্থাপনে ট্রাম্প খুব কমই উদ্যোগ নিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট চাইলে গত সপ্তাহের স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে তার যুক্তিগুলো তুলে ধরতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা করেননি।

আগে কংগ্রেসের অনুমোদন না নিয়েই প্রেসিডেন্ট সামরিক অভিযান শুরু করেন। তবে শনিবার রিপাবলিকানদের বেশিরভাগই এই পদক্ষেপের পক্ষে সমর্থন জানায়।

"ইরান তাদের দুষ্ট কর্মকাণ্ডের কঠোর পরিণতির মুখোমুখি হচ্ছে," এক বিবৃতিতে বলেছেন হাউস স্পিকার মাইক জনসন, "ইরানি শাসনের দীর্ঘস্থায়ী পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও উন্নয়ন, সন্ত্রাসবাদ এবং আমেরিকানদের, এমনকি তাদের নিজস্ব জনগণকেও হত্যার প্রতিক্রিয়ায় শান্তিপূর্ণ ও কূটনৈতিক সমাধান খুঁজতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও প্রশাসন সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে"।

কিন্তু কংগ্রেসের সঙ্গে সমন্বয়ের অভাব যুক্তরাষ্ট্রের হামলার বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের এবং ট্রাম্পের দলীয় কিছু সদস্যকেও ক্ষুব্ধ করেছে।

"ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে এমন এক যুদ্ধে টেনে নিচ্ছেন, যা আমেরিকান জনগণ চায় না," এক বিবৃতিতে বলেছেন সাবেক ভাইস-প্রেসিডেন্ট ও ২০২৪ সালের ডেমোক্র্যাটিক মনোনীত প্রার্থী কামালা হ্যারিস। তিনি আরও যোগ করেন, "ট্রাম্পের নিজেদের পছন্দের এই যুদ্ধে আমাদের সেনাদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলা হচ্ছে"।

সেনেটের সংখ্যালঘু নেতা চাক শুমার বলেছেন, প্রশাসন কংগ্রেস ও আমেরিকান জনগণকে "হুমকির ব্যাপ্তি ও তাৎক্ষণিকতা সম্পর্কে অত্যাবশ্যক তথ্য" দেয়নি।

"প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অসংলগ্নভাবে প্রতিক্রিয়া দেখানো এবং বিস্তৃত সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নেওয়া—এটা কোনো টেকসই কৌশল নয়," তিনি বলেন।

শনিবার ডেমোক্র্যাটদের তীব্র প্রতিক্রিয়া ইঙ্গিত দেয় যে, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন এই যুদ্ধের সময় ট্রাম্পকে দেশে এক রাজনৈতিক লড়াইও লড়তে হতে পারে, নভেম্বরের গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যখন প্রাইমারি ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে।

রোববার সন্ধ্যায় সামরিক অভিযান নিয়ে নিজেদের প্রতিক্রিয়া নির্ধারণে হাউজ ডেমোক্র্যাটরা একটি বৈঠক করছেন বলে অবহিত দুটি সূত্র জানিয়েছে।

হাউজ মাইনরিটি নেতা হাকিম জেফ্রিজ বলেছেন, ডেমোক্র্যাটরা আগামী সপ্তাহে ইরান বিষয়ে ট্রাম্পের যুদ্ধক্ষমতা সীমিত করার প্রস্তাবিত এক প্রস্তাবে ভোট আনার প্রচেষ্টা পুনরায় শুরু করবেন।

"ভেনেজুয়েলার মতো অন্য দেশের নেতাকে গ্রেফতার করা সহজ, কিন্তু পরের দিনগুলোতে আপনি কী করবেন?" হাউস ডেমোক্র্যাটদের এক সিনিয়র সহকারী বলেন, তিনি যোগ করেন- প্রশাসন "কোনো কৌশল বা লক্ষ্য স্পষ্ট করেনি"।

এদিকে ট্রাম্প শনিবার আরও আগেই এনবিসিকে ইরান প্রসঙ্গে বলেন, "কোনো এক পর্যায়ে তারা আমাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করবে, কাকে (নেতা হিসেবে) আমি পছন্দ করি। আমি একটু মাত্র ব্যঙ্গ করে বলছি"।

নভেম্বরের ওই মধ্যবর্তী নির্বাচনগুলো যেমন তার মেয়াদের বাকি সময়ে ট্রাম্প কী করতে পারবেন তা নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে, তেমনি অতীতের প্রেসিডেন্টদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে এ ধরনের ব্যতিক্রমী সামরিক অভিযান শুরু করার সিদ্ধান্ত তার উত্তরাধিকারের অবস্থান তৈরিতে আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।