ভারতে ডাইনি অপবাদ নিয়ে তিন বছর ধরে ঘরছাড়া এক আদিবাসী পরিবার

ছবির উৎস, SUJIT MONDAL
- Author, অমিতাভ ভট্টশালী
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা
পশ্চিমবঙ্গের একটি গ্রামের ১২ জন আদিবাসীকে ডাইনি বলে ঘরছাড়া করা হয়েছে। করোনা মহামারীর আগের ওই ঘটনার পরে গত প্রায় তিন বছর তারা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে থাকছেন। সেখানেও ডাইনি বলে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিচ্ছে আত্মীয়রাই। ঘরছাড়া ওই পরিবারের বয়স্ক থেকে শুরু করে শিশু-কিশোর আর নারীরাও আছেন।
বীরভূম জেলায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত শান্তিনিকেতনের কাছেই মণিকুণ্ডডাঙ্গার এক আদিবাসী পরিবারের অভিযোগ তারা স্থানীয় প্রশাসনকে বারবার জানিয়েও ঘরে ফিরতে পারেন নি প্রায় তিন বছর ধরে।
প্রশাসন বলছে বিষয়টি তাদের নজরে এলেও জোর করে পরিবারটিকে তারা গ্রামে ফেরত পাঠাতে চায় না, তাতে ওই পরিবারটিকে আরও বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া হবে। তারা স্থানীয় গ্রামবাসীদের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে।

ছবির উৎস, SUJIT MONDAL
‘ছাগল মারা গেছে বলে আমাকে ডাইনি সাজিয়ে দিল’
মণিকুণ্ডডাঙ্গার বাসিন্দা বছর পঞ্চাশেকের যশোমতী হাঁসদাকে তার গ্রামের প্রতিবেশীরাই ডাইনী সাজিয়ে ঘর ছাড়া করিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মঙ্গলবার মিসেস হাঁসদা বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, “গ্রামে একটা ছাগল মরেছিল। সর্দার রটিয়ে দিল যে আমিই নাকি খেয়েছি ছাগলটা। আমাকে ডাইনি সাজিয়ে দিল। আমার বাড়িতেও বিপদ ছিল তখন। কেউ বুঝল না আমার বিপদ, ডাইনি সাজিয়ে দিল।“
স্বামী, তিন ছেলে, পুত্রবধূ আর দুই শিশু-কিশোর নাতি নাতনী নিয়ে তাদের গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে যারা, তারাও আদিবাসী সমাজেরই মানুষ।
মিসেস হাঁসদার ছেলে উদয় হাঁসদার কথায়, “মা পুজোটুজো করত, তাই ঠাকুরতলায় পান, পাতা এসব পড়েছিল। মা-ই নাকি ওইসব পাতা, পান ছড়িয়ে রেখেছিল, আর তার জন্যই নাকি গ্রামে হাঁস, মুরগি, ছাড়ল সব মরে যাচ্ছে। তারা সন্দেহ করছে যে ওই কাজটা নাকি মা করেছে।
“পাঁচটা গ্রামের লোক মিলে খুঁজে বার করে মাকে ডাইনি বলে চিহ্নিত করল। ঠাকুরতলা থেকে নাকি তারা সবাই শুনে এসেছে যে মা ডাইনি। পান পাতাতে সিঁদুর দিয়ে নাকি আমার মা গ্রামের চৌমাথায় ফেলে এসেছে,” বলছিলেন উদয় হাঁসদা।

ছবির উৎস, SUJIT MONDAL
আত্মীয়রাও তাড়িয়ে দিয়েছে
গ্রামছাড়া হওয়ার পরে হাঁসদা পরিবার আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতেই থাকছিলেন ঘুরে ঘুরে।
কিন্তু সেখানেও ডাইনি বদনাম দেওয়া হয়েছে, আর গ্রামবাসীর ভয়ে আত্মীয়রাও তাড়িয়ে দিয়েছে পরিবারটিকে।
মি. হাঁসদার স্ত্রী মেলানি হাসঁদার কথায়, “যেখানে, যার বাড়িতে গেছি, সেখানেও রটিয়ে দিয়েছে যে আমাদের ডাইনি অপবাদ দেওয়া হয়েছে। এমনকি আমার নিজের ভাইও বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। তাকেও বলেছে যে তোমার দিদির দুটো মেয়েকে বাড়িতে রেখেছ, ওরাও তো ডাইনি! গ্রামের লোকের চাপে আমার ভাই বাড়ি থেকে বার করে দিল। তারপরে আমার বোনের বাড়িতে থাকি।
“এভাবেই ঘুরে ঘুরে তিন বছর কেটে গেল। বাচ্চাগুলো স্কুলে পড়ত, তারাও স্কুল যেতে পারে না, পড়াশোনা করতে পারে না ঠিকমত,” বলছিলেন মেলানি হাঁসদা।
পরিবারটি বলছে তারা আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে ধারদেনা করে কোনমতে খেয়ে পরে আছে।

ছবির উৎস, SUJIT MONDAL
জমি থেকে উৎখাতের চেষ্টা?
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
বীরভূমে আদিবাসীদের মধ্যে প্রায় আড়াই দশক ধরে কাজ করেন অ্যাক্টিভিস্ট কুনাল দেব।
তিনি বলছেন, “মনিকুণ্ডডাঙ্গার ঘটনাতে দুটো বিষয় জড়িত আছে। প্রথমত যাকে ডাইনি অপবাদ দেওয়া হয়েছে, সেই যশোমতী হাঁসদা গ্রামের ঠাকুরতলায় পুজো করতেন। আবার স্থানীয় এক প্রভাবশালীর দুই আত্মীয়ও পুজোর কাজ শুরু করেছিলেন। মিসেস হাঁসদার কারণে তাদের পসার জমাতে সমস্যা হচ্ছিল বলে একটা পরিকল্পিত ক্যাম্পেইন চালানে হয়। আবার এই পরিবারটি এক মালিকের বড়সড় মাপের জমিতে ভাগচাষী হিসাবে কাজ করতেন। ভাগচাষীদের সরিয়ে দিতে পারলে জমিটা কম খরচে বিক্রি করে দেওয়া যাবে।
“জমি আর ঠাকুরতলার পুজো এই দুটো কারণেই স্থানীয় প্রভাবশালীরা হাঁসদা পরিবারকে গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দেয়। তবে এটা বীরভূমে বেশ আশ্চর্যজনক ব্যাপার। ওখানকার জমি মূলত এক ফসলী। তাই জমির জন্য ডাইনি অপবাদ দিয়ে গ্রাম ছাড়া কার উদাহরণ খুব বেশি দেখা যায় না। আবার গ্রাম থেকে শুধু না, এমনকি আত্মীয়স্বজনদের এলাকাতেও গিয়ে অপপ্রচার চালিয়ে এলাকা ছাড়া করা হবে, এরকম সাধারণত দেখা যায় না। আসলে বোলপুর শহর লাগোয়া অঞ্চলে জমি হাঙ্গরদের দৌরাত্ম এতটাই বেড়ে গেছে তথাকথিত উন্নয়নমূলক প্রকল্প, হোটেল, রিসর্ট ইত্যাদির ফলে, তাই যে কোনও জমিই এখন বহুমূল্য হয়ে উঠেছে,” বলছিলেন কুনাল দেব।
তবে ইতিহাস বলছে জমি থেকে হঠাতেই সবথেকে বেশি ডাইনি অপবাদ দেওয়ার চল রয়েছে, ‘সায়েন্টিফিক অ্যামেরিকান’-এর প্রকাশিত একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদন উল্লেখ করে বলছিলেন মি. দেব।
থাকার জায়গা আর ক্ষতিপূরণের দাবী
হাঁসদা পরিবার জানাচ্ছে গ্রাম থেকে ডাইনি অপবাদ দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়ার পরেই তারা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং পুলিশের কাছে গিয়েছিল, কিন্তু কোনও সহায়তা পায় নি।
প্রশাসন আর রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে সাড়া না পেয়ে তারা যোগাযোগ করে তপশীলি জাতি, উপজাতি, অন্যান্য পিছিয়ে থাকা শ্রেণী এবং সংখ্যালঘুদের ‘জয়েন্ট ফোরাম’ নামে একটি সংগঠনের সঙ্গে।
তারাই সোমবার বোলপুরের মহকুমা শাসকের কাছে হাঁসদা পরিবারকে নিয়ে ধর্না দিতে এসেছিল।
সংগঠনটির সভাপতি বৈদ্যনাথ দাসের কথায়, “গত প্রায় ছয়মাস ধরে আমরা এই পরিবারটিকে গ্রামে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছি। এখন আমরা চাইছি এরা যেভাবে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে ঘুরে ঘুরে থাকছে, সেখান থেকেও বিতাড়িত হচ্ছে, তার বদলে প্রশাসন এদের অস্থায়ীভাবে একটা থাকার জায়গার ব্যবস্থা করুক। গত তিন বছরে এদের কোনও আয় নেই, তাই আত্মীয় পরিজনের কাছ থেকে ধার কর্জ করে চলছে। প্রশাসন সেই ধারদেনাটার অর্থটা একটা ক্ষতিপূরণ দিয়ে মিটিয়ে দিক।
“আমাদের কথা মতো প্রশাসন একটা ব্যবস্থা করেছিল রূপপুরের দিকে একটা গ্রামে। কিন্তু সেটাও আদিবাসী গ্রাম। তাই আমরা রাজী হই নি। কারণ সেখানেও যদি তাদের ওপরে স্থানীয়রা চড়াও হয়! বোলপুরে তো কত সরকারী ভবন আছে, সেখানে কোথাও এদের থাকার ব্যবস্থা করা যায় না? প্রশ্ন মি. সাহার।

ছবির উৎস, BAIDYANATH SAHA
প্রশাসন কী বলছে?
সোমবার রাত থেকে অবশ্য হাঁসদা পরিবারের ১২ জন সদস্যকে একটা কমিউনিটি হলে রাখার ব্যবস্থা করেছে প্রশাসন।
বীরভূমের জেলাশাসক বিধান চন্দ্র রায় বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, “ওই পরিবারটিকে ডাইনি অপবাদ দিয়ে যে তিন বছর বাড়ি ছাড়া করা হয়েছে, ঘটনাটা আমি জানি। আমরা হয়তো প্রশাসনিক জোর খাটিয়ে গ্রামে তাদের ফিরিয়ে দিতে পারতাম। কিন্তু গ্রামে এদের ব্যাপারে একটা ক্ষোভ আছে, কতদিন আমরা আর পুলিশ পাহারায় রাখব ওদের। তাই যদি জোর করে ফেরত দিয়ে আসি, তাহলে এই পরিবারটিকেই আমরা আরও বিপদের মুখে ফেলব। । তাই আমরা সেটা চাইছি না।
“গ্রামের সব পক্ষকে আমরা বোঝানোর চেষ্টা করছি যাতে তারা নিজেরাই ফিরিয়ে নেয় এই পরিবারটিকে। একই সঙ্গে ওই এলাকায় আমরা সচেতনতামূলক প্রচারও চালাচ্ছি ডাইনি প্রথার বিরুদ্ধে। সেটাও আমাদের পরিকল্পনারই অংশ। সবরকমভাবে চেষ্টা করছি যাতে দ্রুত পরিবারটিকে গ্রামে ফিরিয়ে দেওয়া যায়,” বলছিলেন বীরভূমের জেলাশাসক বিধান চন্দ্র রায়।








