স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র দিয়েছেন বিএনপির এমপিরা, ৫ জনের আসন শূন্য ঘোষণা

    • Author, সায়েদুল ইসলাম
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেছেন বিএনপির সাতজন সদস্য। তাদের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পার্লামেন্ট কর্তৃপক্ষ।

রবিবার সকালের দিকে বিএনপির পাঁচজন সংসদ সদস্য জাতীয় সংসদ ভবনে গিয়ে স্পিকার শিরিন শারমিন চৌধুরীর কাছে পদত্যাগ পত্র দিয়েছেন।

এরপর স্পিকার শিরিন শারমিন চৌধুরী বলেছেন, বিএনপির সাতজন সদস্যের পদত্যাগপত্র পেয়েছি। তাদের মধ্যে পাঁচজন নিজেরাই এসেছিলেন।

তিনি বলেন, যে পাঁচজন পদত্যাগপত্র নিয়ে এসেছেন, তাদের আসন শূন্য হয়ে গেছে। বাকি দুটি আবেদনের ব্যাপারে যাচাই-বাছাই করে দেখা হবে যে, তারাই পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন কিনা, তা সংসদ সচিবালয় খোঁজ নেবে।

তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট আসনগুলো শূন্য ঘোষণা করে সংসদ সচিবালয় প্রজ্ঞাপন জারি করবে।

নিয়ম অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের কোন আসন শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে উপ-নির্বাচন করার কথা রয়েছে।

যে সংসদ সদস্যরা পদত্যাগ করেছেন

শনিবার ঢাকার গোলাপবাগে বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছিলেন দলটির এমপিরা।

রবিবার সকালে সংসদ ভবনের সামনে বিএনপির সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, ‘’আপনারা জানেন, বিএনপির সাতজন সংসদ সদস্য সংসদে গিয়েছিলাম দলের সিদ্ধান্তে। গতকাল ১০ ডিসেম্বরের জনসভা থেকে যে ১০টা গাইডলাইন আমাদের দেয়া হয়েছে, সেখানে প্রথম যে নির্দেশনা ছিল আছে সংসদ ভেঙ্গে দেয়া এবং সংসদ থেকে পদত্যাগ করা এবং নির্দলীয় সরকারের হাতে ক্ষমতা দেয়া। সংসদ ভেঙ্গে দেয়ার যে দাবি আমাদের দলের, তার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে আমরা সাতজন সংসদ সদস্য সংসদ থেকে পদত্যাগ করলাম।‘’

বিএনপির আরেকজন সংসদ সদস্য জিএম সিরাজ বলেছেন, ‘’আপনারা জানেন যে, পার্লামেন্টে গত চারবছর ধরে বিরোধী দল বলতে শুধু আমরা এই সাতজনই ছিলাম। আর যে বিরোধী দল নামকাওয়াস্তে আছে, তারা তো পোষা বিরোধী দল।‘’

সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির ছয়জন প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছিলেন। সংরক্ষিত নারী আসনে তারা একটি আসন পান।

আজ যে সংসদ সদস্যদের আসন শূন্য হয়েছে, তারা হলেন:

  • চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের এমপি আমিনুল ইসলাম
  • ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের এমপি জাহিদুর রহমান
  • বগুড়া-৪ আসনের এমপি মোশারফ হোসেন
  • বগুড়া-৬ আসনের এমপি গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ,
  • সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি রুমিন ফারহানা।

তবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের এমপি হারুনুর রশীদ দেশের বাইরে থাকায় এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের এমপি আবদুস সাত্তার ভূঞা অসুস্থ থাকায় তাদের পক্ষে পদত্যাগপত্র নিয়ে এসেছিলেন বাকি এমপিরা। সেই দুটি আবেদনপত্র যাচাই-বাছাই করার কথা জানিয়েছেন স্পিকার।

পদত্যাগ নিয়ে কী বলা হয়েছে আইনে?

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান ৬৭ এর ২ ধারায় বলা হয়েছে, কোন সংসদ-সদস্য কারের কাছে তার স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে নিজ এমপি পদ ত্যাগ করতে পারবেন।

তবে স্পিকার কিংবা স্পিকারের পদ শূন্য থাকলে বা অন্য কোন কারণে স্পিকার নিজের দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হইলে ডেপুটি স্পিকার ওই পদত্যাগপত্র পাবেন।

 যখন থেকে তারা ওই পদত্যাগপত্র পাবেন, তখন থেকে ওই সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হবে।

সংবিধানের ১২৩ ধারায় বলা হয়েছে, সংসদ ভেঙ্গে যাওয়া ব্যতীত কোন কারণে যদি সংসদের কোন সদস্যপদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে ওই আসনে উপ-নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ‘’কোন সংসদ সদস্য স্পিকারের কাছে নিজের স্বাক্ষর করা পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে সেটা সঙ্গে সঙ্গেই কার্যকর হয়ে যায়। সেখানে স্পিকারের গ্রহণ করা বা অগ্রহণ করার কিছু থাকে না। পদত্যাগপত্র জমা দেয়ার দিন থেকেই সেই আসন সেদিন থেকেই শূন্য বলে বিবেচিত হবে’’।

তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অতীতে দেখা গেছে, পদত্যাগপত্র জমা দেয়া হলেও তা তাৎক্ষণিকভাবে অনেক সময় গ্রহণ করা হয়নি।

যেমন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজ মন্ত্রণালয় এবং সংসদ সদস্যপদ থেকে ২০১২ সালের এপ্রিলে পদত্যাগ করেন।

কিন্তু ব্যক্তিগত সহকারীর মাধ্যমে পাঠানো সেই পত্র গ্রহণ করা হয়নি। তখন জাতীয় সংসদের স্পিকার আব্দুল হামিদ (বর্তমানে রাষ্ট্রপতি) বলেছিলেন, তানজিম আহমদ সোহেল তাজ সশরীরে এসে পদত্যাগপত্র জমা দিলে তা গ্রহণ করা হবে।

তার আগে জমা দেয়া ২০০৯ সালে তিনি স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী পদ থেকে তার পদত্যাগপত্রও গ্রহণ করা হয়নি।

পরবর্তীতে অবশ্য সাতই জুলাই সশরীরে স্পিকারের কাছে তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেয়ার পর সেটি গ্রহণ করা হয়।

আরেকটি বড় উদাহরণ হলো ১৯৯৪ সালে ২৮শে ডিসেম্বর তৎকালীন বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন আওয়ামী লীগের ১৪৭ জন সদস্য।

কিন্তু সেই সময় স্পিকার শেখ রাজ্জাক আলী পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করে বরং তাদের সংসদে তাদের অনুপস্থিতি হিসাবে বিবেচনা করার সিদ্ধান্ত নেন। এভাবে সাত মাস সংসদ চলে।

সংবিধান অনুযায়ী, ৯০ কার্যদিবস অনুপস্থিতি থাকলে আসন শূন্য হয়ে যায়। সেই হিসাবে পরের বছর ৩১শে জুলাই আওয়ামী লীগ এমপিদের আসনগুলো শূন্য ঘোষণা করে উপ-নির্বাচনের ঘোষণা দেয়া হয়।

বিএনপির পদত্যাগে কী প্রভাব পড়তে পারে?

জাতীয় সংসদের কর্মকাণ্ডে বিএনপির সাত সদস্যের পদত্যাগে আইনগত বা সাংবিধানিক দিক থেকে কোন সমস্যা তৈরি করবে না বলে মনে করেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক।

তিনি বলছেন, ‘’তাদের সদস্য সংখ্যা তো ছোট, মাত্র সাতজন সংসদ সদস্যের পদত্যাগে সাংবিধানিক বা আইনগত কোন ইস্যু তৈরি হবে না। যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য অর্থাৎ ১৭৬ জন সংসদ সদস্য যদি পদত্যাগ করতেন, তাহলে পার্লামেন্ট বিলুপ্ত হয়ে যেতো। এখন এই সাতজনের ক্ষেত্রে নিয়ম অনুযায়ী বাই-ইলেকশন (উপ-নির্বাচন) হওয়ার কথা।‘’

সাবেক নির্বাচন কমিশনার বিগ্রেডিয়ার জেনারেল সাখাওয়াত হোসেন (অব) বলছেন, সংসদ থেকে পদত্যাগে সংসদে কোন সমস্যা হবে না, তবে এতে তাদের রাজনৈতিকভাবে প্রভাব পড়তে পারে।‘’

‘’বিএনপি বড় রাজনৈতিক দল হলেও সংসদে বিরোধী দলতো জাতীয় পার্টি। ফলে এই সাতজন সংসদ সদস্য চলে গেলে সংসদীয় কার্যাবলীতে কোন প্রভাব পড়বে না। সেখানে কোন সমস্যা হবে বলে আমি করি না। এরপর বাই-ইলেকশন হবে। সেখানে তো সরকারি-বিরোধী সবাই অংশ নিতে পারবে।‘’

তবে তিনি মনে করেন, ‘’আমার ব্যক্তিগত মত হচ্ছে, পার্লামেন্ট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেয়ে বরং তারা পার্লামেন্টে থাকলে যতটুকুই সুযোগ পেতেন, দলের পক্ষে কথা বলতে পারতেন। তারা তো নির্বাচনে অংশ নিয়েই সংসদ সদস্য হয়েছেন,তিন-চার বছর সংসদ সদস্য ছিলেন। এখন এসে তাদের এই পদত্যাগ, রাজনৈতিক বিষয় হয়তো তারা ভালো বুঝবেন, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি না, এতে সরকারের আচরণে কোন পরিবর্তন হবে।‘’

তবে সাবেক অধ্যাপক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী মনে করেন, এর মাধ্যমে বিএনপি তাদের অতীতের ভুল সংশোধন করে নিল।

‘’বিএনপি সাতজনকে যখন সংসদে পাঠিয়েছিল, একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হিসাবে আমি মনে করি, যখন তারা এই সংসদকে অবৈধ ডাকছে, তখন সেখানে পাঠানো তখনি সেটা বিপরীতমুখী হয়েছে। তখন যে কাজটা করার দরকার ছিল, এখন তারা সেটা করেছে।‘’ তিনি বলছেন।

‘’যখন তারা দাবি করবে যে, পার্লামেন্টে কোন অপজিশন নাই এবং সেটা অবৈধ পার্লামেন্ট, পদত্যাগের মাধ্যমে সেটাকেই তারা প্রতিষ্ঠিত করলো। এখন তারা আরও জোরালোভাবে সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করতে পারবে।‘’

কিন্তু পার্লামেন্টে দলের বক্তব্য তুলে ধরার যে সুযোগ বিএনপি এতোদিন পেয়েছে, সেটা কি তাহলে হারাতে হলো কিনা, জানতে চাইলে অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলছেন, ‘’পার্লামেন্টে কি হচ্ছে, কি বক্তৃতা দিচ্ছে, এটা নিয়ে এখন তো আর বাংলাদেশে আর কেউ মাথা ঘামাচ্ছে না। যেভাবে দেশের সিচুয়েশন একটা সংঘর্ষের দিকে চলে যাচ্ছে, সেখানে পার্লামেন্টের বক্তব্য নিয়ে তো মানুষ আর মাথা ঘামাবে না।‘’

তবে সংসদ থেকে বেরিয়ে গেলেও তা বিএনপির রাজনীতিতে কোন সমস্যা তৈরি করবে না বলে মনে করে অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী। কারণ তিনি বলছেন, ‘’পাঁচই জানুয়ারির নির্বাচনের পর দীর্ঘদিন পার্লামেন্টে ছিল না বিএনপি। তাতে কি এই দলের কোন সমস্যা হয়েছে? বরং সংসদ থেকে বেরিয়ে গিয়ে বিএনপি এখন তাদের দাবি দাওয়ার পক্ষে জোরালো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবে।‘’