আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
উদ্বেগের আপাত অবসান, ঢাকা ছেড়েছেন বিএনপি নেতা-কর্মীরা
উদ্বেগ, উত্তেজনা আর ভোগান্তি শেষে শান্তিপূর্ণভাবেই শেষ হয়েছে ঢাকায় বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশ। নানারকম শঙ্কা থাকলেও শেষ পর্যন্ত কোথাও কোন সহিংসতা বা গোলযোগের কথা শোনা যায়নি।
সারাদিন ঢাকা শহরে একপ্রকার গুমোট পরিবেশ থাকলেও সন্ধ্যার পর আবার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে এসেছে। সমাবেশ শেষে বিএনপি নেতাকর্মীরাও শান্তিপূর্ণভাবেই বাড়ি ফিরে গেছেন।
বিএনপির ঘোষণা অনুযায়ী, তারা যে ১০ দফা ঘোষণা করেছেন, সেটি বাস্তবায়নে ২৪শে ডিসেম্বর থেকে সারা দেশে মহানগর ও জেলা সদরে গণমিছিল কর্মসূচী পালন করা হবে। এর আগে ১৩ই ডিসেম্বর বিক্ষোভ মিছিল করা হবে।
সমাবেশ ঘিরে উদ্বেগ ও উত্তেজনা
ঢাকায় ১০ই ডিসেম্বরের এই সমাবেশ ঘিরে গত একমাস ধরেই উত্তেজনাপূর্ণ কথা বিনিময় চলছিল। বিএনপির কোন কোন নেতা সরকার পতনের আন্দোলন জোরালো করে তোলার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। আবার সরকারের তরফ থেকে বিএনপির এরকম যেকোনো পদক্ষেপ ঠেকিয়ে দেয়ার প্রস্তুতির কথাও বলা হয়েছিল।
টানটান উত্তেজনার মধ্যে সমাবেশস্থলের অনুমতি পাওয়ার পর শুক্রবার রাত থেকেই সেখানে হাজার হাজার নেতাকর্মী অবস্থান নিয়েছিলেন। আবার বিএনপির সমাবেশ ঘিরে ঢাকার পাড়া-মহল্লায় সতর্ক পাহারা বসানোর ঘোষণা দিয়েছিল আওয়ামী লীগ।
ফলে সবমিলিয়ে একপ্রকার উত্তেজনা ও শঙ্কার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। সারাদিন ঢাকা শহরের পরিস্থিতি ছিল অনেকটা হরতালের পরিস্থিতির মতো। বাস, সিএনজি বা অন্য গণপরিবহন চলেনি, পথে যাত্রীদের চলাফেরাও ছিল খুব কম।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, '' আজকে দুইদিন ধরে সকাল থেকে না খেয়ে (নেতাকর্মীরা) ঢাকা শহরে উপস্থিত হয়েছে। এরা সবাই জীবন দিয়ে দেশকে রক্ষা করতে ঢাকায় এসেছে। জীবন দিয়ে হলেও বাংলাদেশকে তারা মুক্ত করবে।"
‘’আজকে ঢাকা শহরে হরতাল পালিত হচ্ছে। কে ডেকেছে হরতাল? সরকার। সরকার হরতাল ডেকেছে। গাড়ি ঘোড়া নাই, বন্ধ, আওয়ামী সন্ত্রাসীরা পিকেটিং করছে। ঢাকা শহরে প্রবেশপথে পিকেটিং করছে হাতে মাল (অস্ত্র) নিয়ে। এরা পিকেটিংয়ের চেয়ে আরও বেশি কিছু করেছে।‘’
শনিবার ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান ও মিছিল করেছে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সহিংসতা বা গোলযোগের কোন কিছুই ঘটেনি। শান্তিপূর্ণভাবেই সমাবেশ শেষ হয়েছে।
যেসব ঘোষণা এলো বিএনপির সমাবেশ থেকে
সমাবেশে যেসব দাবি জানানো হয়েছে, সেখানেও নতুন করে কিছু আসেনি। এসব দাবি বহুদিন ধরেই বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
শুধুমাত্র নতুন ঘোষণা হিসাবে জাতীয় সংসদ থেকে সাত জন সদস্যের পদত্যাগের ঘোষণা এসেছে।
যে ১০দফা চার্টার্ড অব ডিমান্ড ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছিল দলটি, সেখানে কী থাকতে পারে, এ নিয়েও কৌতূহল ছিল রাজনৈতিক মহলে।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২২শে নভেম্বর বলেছিলেন, ‘’এখনো আমরা আসল ঘোষণা তো দেই নাই। আসল ঘোষণা আসবে ১০ তারিখে। সেদিন থেকে শুরু হবে এক দফার আন্দোলন।‘’
বিএনপি নেতা আমানউল্লাহ আমান ৮ অক্টোবর মন্তব্য করেছিলেন, ১০ই ডিসেম্বর সরকারের পতন হবে। সেদিনের পর থেকে দেশ চলবে খালেদা জিয়ার নির্দেশে।
কিন্তু সমাবেশে এরকম কিছুই ঘটেনি।
সমাবেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, ‘’নয়টি বিভাগীয় সমাবেশে জনগণ রায় দিয়েছে, তারা এই সরকারকে আর ক্ষমতায় দেখতে চায় না। এই সরকারের অনতিবিলম্বে বিদায় চায় দেশের জনগণ। তাই আজকে গায়ের জোরের সরকারকে যত দ্রুত সম্ভব পদত্যাগ করে দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ নিতে হবে।‘’
সমাবেশে তিনি ১০ দফা ঘোষণা করেন। যার মধ্যে রয়েছে:
- বর্তমান সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করে ক্ষমতাসীন সরকারের পদত্যাগ
- ১৯৯৬ সালের সংবিধান সংশোধনের আলোকে নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকার বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন
- বর্তমান নির্বাচন কমিশন বাতিল করে গ্রহণযোগ্য স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কমিশন গঠন এবং লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড গঠনে আরপিও সংশোধন করা। সেই সঙ্গে ইভিএম পদ্ধতি বাতিল, পেপার ভোট নিশ্চিত করা ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহার বাতিল
- খালেদা জিয়াসহ সব বিরোধী দলীয় নেতাকর্মী, সাংবাদিক ও আলেমদের সাজা বাতিল।সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও রাজনৈতিক কারাবন্দীদের অবিলম্বে মুক্তি এবং দেশে সভা সমাবেশ ও মত প্রকাশে কোন বাধা সৃষ্টি না করা। সব দলকে স্বাধীনভাবে গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচী পালনে প্রশাসন ও সরকারি দলের বাধা সৃষ্টি না করা। স্বৈরাচারী কায়দায় বিরোধী কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করতে নতুন কোন মামলা না করা ও বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার না করা।
- ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও বিশেষ ক্ষমতা আইনসহ সব কালাকানুন বাতিল করা
- বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গ্যাস ও পানিসহ জনসেবা খাতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাতিল করা
- নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনা ও বাজার সিন্ডিকেট মুক্ত করা
- গত ১৫ বছর ধরে বিদেশে পাচার করা অর্থ, ব্যাংক, আর্থিক খাত ও শেয়ারবাজার সহ সব ক্ষেত্রে সংঘটিত দুর্নীতি চিহ্নিত করতে কমিশন গঠন ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
- গত ১৫ বছরে গুমের শিকার সব নাগরিককে উদ্ধার ও বিচারবর্হিভূত হত্যা ও রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের দ্রুত বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করা। সেই সঙ্গে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর, উপাসনালয় ও সম্পত্তি দখলের জন্য বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করা।
- আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন ও বিচারবিভাগের ওপর সরকারি হস্তক্ষেপ দূর করে স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
যদিও এসব দাবি এর আগেও বিভিন্ন সময় বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হচ্ছে।
তবে সমাবেশে খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, ‘’আগামী দিনে এই ১০ দফা আদায়ের লক্ষ্যে প্রতিটি আন্দোলন কর্মসূচী আমরা যুগপৎভাবে পালন করবো। এই সরকারকে বিদায় দেওযার জন্য ধৈর্য সহকারে আপনারা আন্দোলন কর্মসূচী এগিয়ে নিয়ে যাবেন।‘’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘’নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন ব্যতীত বাংলাদেশে কোন নির্বাচন হতে দেয়া হবে না। পরিষ্কার।‘’
বাড়ি ফিরছেন নেতা-কর্মীরা
বিএনপি ঘোষণা দিয়েছিল, ১০ই ডিসেম্বরের সমাবেশে ১০ লাখ মানুষের সমাবেশ হবে। এই বিপুল সমাবেশ কোথায় হবে, সেই স্থান নিয়ে পুলিশের সঙ্গেও প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে টানাপড়েন চলেছে।
নয়াপল্টনে বিএনপির কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ ঠেকাতে পুলিশের অভিযানে একজন নিহত আর বহু আহতের ঘটনাও ঘটেছে। সেখান থেকে শতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার করে করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে শীর্ষ দুই নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, মীর্জা আব্বাসের মতো কেন্দ্রীয় নেতাকে।
বিএনপির সমাবেশকে ঘিরে গত কয়েকদিন ধরেই ঢাকা শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশের চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি করতে দেখা গেছে।
যানবাহন বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় সমাবেশে আসা অনেক নেতাকর্মী কয়েকদিন আগেই ঢাকায় এসে বিভিন্ন স্থানে থেকেছেন। শুক্রবার গোলাপবাগ মাঠের অনুমতি পাওয়ার পর বিকাল থেকেই সেখানে নেতাকর্মীরা অবস্থান নিতে শুরু করেছিলেন।
শনিবার সমাবেশ শুরু হওয়ার পর গোলাপবাগ মাঠ ছাড়াও আশেপাশের সড়কেও বিএনপি নেতাকর্মীদের অবস্থান নিতে দেখা গেছে।
তবে শনিবার সমাবেশ শেষে কোনরকম বিশৃঙ্খলা ছাড়াই তারা শান্তিপূর্ণভাবে বাড়ির পথ ধরেছেন। দিনের বেলায় ঢাকায় দুইটি অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুরের কথা শোনা গেলেও সমাবেশের পর ঢাকার কোথাও সহিংসতার কথা শোনা যায়নি।
সমাবেশ অংশ নিয়েছিলেন নোয়াখালীর একজন বিএনপি কর্মী ইব্রাহিম হোসেন। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ‘’চারদিন আগে বাসা থেকে ঢাকায় এসেছিলাম। ঢাকার সমাবেশে একটা দেখিয়ে দেয়ার ব্যাপার ছিল। কিন্তু পুলিশের হয়রানি আর আওয়ামী লীগের বাধায় আমাদের অনেক নেতাকর্মী সমাবেশে আসতে পারেননি। এখন আমরা বাড়ি ফিরে যাচ্ছি। যার যার এলাকায় আমরা কর্মসূচী বাস্তবায়ন করবো।‘’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ‘’বিএনপির একটি সমাবেশকে ঘিরে যেভাবে রিঅ্যাক্ট করেছে আওয়ামী লীগ, তাতে মনে হয়েছে, তারা বেশ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। কিন্তু সবমিলিয়ে যে কোন সহিংসতা বা বিশৃঙ্খলা ঘটেনি, এটা স্বস্তির একটা ব্যাপার। ‘’
রবিবার বিএনপির নয়াপল্টনের কার্যালয় খুলে দেয়া হতে পারে বলে জানিয়েছেন পুলিশের কর্মকর্তারা।