কারাবন্দি ইমরান খানের সঙ্গে অবশেষে পরিবারের সাক্ষাৎ

ইমরান খানের বোনেরা বলছেন, গত চৌঠা নভেম্বর তাদের সঙ্গে ইমরান খানের শেষবারের মতো দেখা হয়েছিল।
ছবির ক্যাপশান, ইমরান খানের বোনেরা বলছেন, গত চৌঠা নভেম্বর তাদের সঙ্গে ইমরান খানের শেষবারের মতো দেখা হয়েছিল।
    • Author, উমর দারাজ নাঙ্গিয়ানা ও ফুরকান ইলাহী
    • Role, বিবিসি উর্দু

প্রায় এক মাস পর, নিজের পরিবারের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পেলেন কারাগারে থাকা পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান।

আদিয়ালা কারাগারে তার ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করার পর উজমা খান জানিয়েছেন, ইমরান খানের "স্বাস্থ্য ভালো আছে, আল্লাহকে ধন্যবাদ, কিন্তু তিনি খুব রেগে ছিলেন এবং বলছিলেন যে তাকে মানসিক নির্যাতন করা হচ্ছে।"

উজমা খানের মতে, ইমরান খানের সাথে তার সাক্ষাৎ ২০ মিনিট স্থায়ী হয়েছিল। তার ভাই তাকে আরও বলেছিলেন যে তাকে 'সারা দিন ঘরে আটকে রাখা হয়, কেবল অল্প সময়ের জন্য ঘর থেকে বের হতে দেওয়া হয়েছিল।'

উল্লেখ্য, মঙ্গলবার ইসলামাবাদ হাইকোর্ট এবং আদিয়ালা কারাগারের বাইরে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ বা পিটিআই এর বিক্ষোভের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বোন উজমা খানকে তার ভাইয়ের সাথে দেখা করার অনুমতি দেওয়া হয়।

সকালে, ইমরান খানের তিন বোন আলিমা খানম, নওরীন নিয়াজি এবং উজমা খান যখন আদিয়ালা কারাগারের বাইরে সাক্ষাতের জন্য পৌঁছান, তখন সেখানে মোতায়েন পুলিশ অফিসাররা তাদেরকে বাধা দেন।

তবে কিছুক্ষণ পরে, কারা কর্তৃপক্ষ একজন অফিসারকে ইমরান খানের বোনদের কাছে পাঠায় এবং বার্তা দেওয়া হয় যে সাক্ষাতের জন্য উজমা খানের নামে অনুমতি রয়েছে।

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পরিবার আগে দাবি করেছিল যে প্রায় এক মাস ধরে তাদেরকে ইমরান খানের সাথে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। তাদের মতে, 'সরকারি কর্মকর্তারা চান না ইমরান খানের বার্তা কারাগারের বাইরে আসুক।'

বিবিসির সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে ইমরান খানের বোন নওরীন খান অভিযোগ করেন যে, "তারা (সরকারি কর্মকর্তারা) একমাত্র যে বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত তা হলো ইমরান খানের কথা বাইরে আসছে, যে কারণে তারা বৈঠক পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে।"

ইমরান খানের বোনেরা জানিয়েছেন, আগে আদালতের আদেশ অনুসারে প্রতি মঙ্গলবার তাদের ভাইয়ের সাথে দেখা করার অনুমতি ছিল, কিন্তু ইমরান খানের সাথে তাদের শেষ দেখা হয়েছিল গত চৌঠা নভেম্বর।

উল্লেখ্য, মঙ্গলবার ইসলামাবাদ হাইকোর্ট এবং আদিয়ালা কারাগারের বাইরে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের ডাক দেন পিটিআই-এর সকল সংসদ সদস্য। যে কর্মসূচি ঘিরে ইসলামাবাদ এবং রাওয়ালপিন্ডিতে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়।

কর্মসূচিতে ইমরান খানের ছবি নিয়ে তার সমর্থকেরা

ছবির উৎস, Anadolu via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ইমরান খানের প্রাক্তন স্ত্রী জেমিমা সোশ্যাল মিডিয়ায় এই বিষয়টি উত্থাপন করেছেন।
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

ইমরান খানের আরেক বোন আলিমা খান বিবিসির সাথে কথা বলতে গিয়ে জানান, গত চৌঠা নভেম্বর কারা কর্তৃপক্ষ নওরীন খানকে ইমরান খানের সাথে দেখা করার ব্যবস্থা করে এবং "তারপর, তারা তাকে কারও সাথে দেখা করতে দেয়নি।"

ইমরান খানের প্রাক্তন স্ত্রী জেমিমা খানও সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ দাবি করেন, ইমরান খান তার ছেলেদের সঙ্গে, "ফোনেও কথা বলতে পারছেন না।" এমনকি তার ছেলেরা "চিঠিও পাঠাতে পারে না," বলে দাবি করেন তিনি।

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বোন নওরিন খান আরও অভিযোগ করেন, "পাকিস্তানি সরকার ইমরান খানকে নয়ই মে যে ঘটনা ঘটেছিল তার দায় স্বীকার করতে বাধ্য করতে চায়।"

"তারা চায় ইমরান খান যেন ওই ঘটনার জন্য, ভাঙচুর চালানোর জন্য এবং নিজের লোকদের গুলি করার জন্য তাদের কাছে ক্ষমা চায়। হয়তো তারা এটাই চায়।"

নওরিন খানের মতে, "ইমরান খান কর্তৃপক্ষকে একটাই উত্তর দিয়েছিলেন যে, তোমাদের সিসিটিভি ফুটেজ দেখা উচিত, সেনানিবাসের ভেতরে চেকপোস্ট আছে, সেনাবাহিনীর নজরে না পড়ে বা ক্যামেরায় বন্দি না হয়ে কেউ এখানে প্রবেশ করতে পারবে না।"

উল্লেখ্য, গত বছর নয়ই মে-র ঘটনার আগে, সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মেজর জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরীকে এক সংবাদ সম্মেলনে পিটিআই-এর সাথে সম্ভাব্য আলোচনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল।

তখন তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, "কেউই এমন একটি বিশৃঙ্খল গোষ্ঠীর সাথে কথা বলবে না যারা তাদের নিজস্ব সেনাবাহিনীকে আক্রমণ করেছে। এই ধরনের বিশৃঙ্খল গোষ্ঠীর জন্য একমাত্র উপায় হল দেশের কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং ঘৃণার রাজনীতি ত্যাগ করে গঠনমূলক রাজনীতি শুরু করা।"

ইমরান খানের বোন আলিমা খান
ছবির ক্যাপশান, ইমরান খানের বোন আলিমা খান

সরকার কী বলছে?

ইমরান খানকে তার পরিবারের সাথে দেখা করতে না দেওয়ার বিষয়টি কেবল একটি অভিযোগই নয়, সরকারি বিভিন্ন পদক্ষেপ বা বার্তা এই অঘোষিত নিষেধাজ্ঞার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেই মনে হচ্ছে।

পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম সামা টিভির একটি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফের রাজনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা রানা সানাউল্লাহ বলেন, "এমন কোনও আইন নেই যা একজন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিকে কারাগারে থাকাকালীন সরকার বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার অনুমতি দেয়।"

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে তার পরিবারের সাথে দেখা করতে না দেওয়ার বিরুদ্ধে কেবল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ বা পিটিআই প্রতিবাদ করছে তা নয় বরং মানবাধিকার সংস্থাগুলোও এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

সোমবার, পাকিস্তানের মানবাধিকার কমিশন এক বিবৃতিতে বলেছে, "ইমরান খানকে তার নিকটাত্মীয়, সহযোগী বা আইনি দলের সাথে দেখা করতে না দেওয়ার বিষয়টি সরকারের স্পষ্ট করা উচিত। কারণ, পরিবার সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ একটি মৌলিক সুরক্ষা।"

অবশ্য গত বেশ কয়েকদিন ধরে, ইমরান খানের অসুস্থতা এবং কারাগারে মৃত্যু নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় যে গুজব ছড়িয়েছে, তা অস্বীকার করেছেন সরকারি কর্মকর্তারা।

ইমরান খানের বোন নওরীন খান
ছবির ক্যাপশান, ইমরান খানের বোন নওরীন খান

কেমন আছেন ইমরান খান?

ইমরান খানকে নিয়ে ছড়ানো গুজব সম্পর্কে তার বোন নওরীন খান বলেন, "আমি জানি না এই খবর কীভাবে ছড়িয়ে পড়ল।"

তিনি অভিযোগ করেন যে, "ইমরান খানকে জেলে নির্যাতন করা হচ্ছে, তাকে আইসোলেশনে রাখা হচ্ছে এবং এই সবই কারাগারের নিয়ম লঙ্ঘন।"

ইমরান খানের আরেক বোন আলিমা খানও বলতে পারছেন না যে এই গুজব কোথা থেকে ছড়িয়ে পড়েছিল।

আলিমা খান বিবিসি উর্দুকে বলেন, "এই গুজবগুলো কোথা থেকে এলো, জেলের ভেতর থেকে কীভাবে এলো? গুজব ছড়ানো ব্যক্তিরা অবশ্যই জেলের কর্মী অথবা প্রতিষ্ঠান।"

তিনি দাবি করেন যে "কেউ কেউ আমাদেরকে বলেছে যে তারা মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য পরীক্ষা করছে। আমাদের কোন ধারণা নেই।"

তবে, চৌঠা নভেম্বর ইমরান খানের সাথে দেখা করা তার বোন নওরীন খান বলেছিলেন যে তার ভাই "সুস্থ আছেন, নিজের খাবার খাচ্ছেন, ব্যায়াম করছেন এবং নিজেকে সুস্থ হিসেবেই সবার সামনে উপস্থাপন করছেন।"

"সেখানে (কারাগারে) খাবার ইমরান খানের নির্দেশ অনুসারেই রান্না করা হয় এবং এটি তার টাকা দিয়েই করা হয়।"

ইসলামাবাদ হাইকোর্ট এবং আদিয়ালা কারাগারের বাইরে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের ডাক দিয়েছিলেন পিটিআই-এর সকল আইনপ্রণেতারা।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ইসলামাবাদ হাইকোর্ট এবং আদিয়ালা কারাগারের বাইরে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের ডাক দিয়েছিলেন পিটিআই-এর আইনপ্রণেতারা।

কেন পরিবারের সাথে দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না?

পরিবারের সাথে ইমরান খানকে দেখা করতে না দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট কোনো বিবৃতি দেয়নি কারা কর্তৃপক্ষ।

তবে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফের রাজনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা রানা সানাউল্লাহ অভিযোগ করেছেন যে, ইমরান খান কারাগারে বসেই অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা ছড়ানোর চেষ্টা করছেন।

সামা টিভির একটি অনুষ্ঠানে তিনি স্বীকার করেছেন যে, "আইন একজন বন্দিকে তার পরিবার এবং আইনজীবীদের সাথে দেখা করার অনুমতি দেয়। কিন্তু এমন কোনও আইন নেই যা একজন দণ্ডিত বন্দিকে কারাগারে বসেই সরকার বা জাতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার অনুমতি দেয়।"

"এমন কোনও আইন নেই যা একজন বন্দিকে সরকারের বিরুদ্ধে নৈরাজ্য, রাষ্ট্রদ্রোহ, বিশৃঙ্খলা, আন্দোলন বা অগ্নিসংযোগ করার এবং দর্শনার্থীদের মাধ্যমে এই সমস্ত কিছু চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়," বলেন তিনি।

তবে ইমরান খানের সঙ্গে বাইরের কারো সাক্ষাতের ওপর কে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে এ বিষয়ে জানেন না বলেই দাবি করেছেন রানা সানাউল্লাহ। তিনি বলেন, "এই নিষেধাজ্ঞা অবশ্যই জেল কর্তৃপক্ষ আরোপ করেছে।"

পাঞ্জাব সরকার এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, "আমি এটা সম্পর্কে অবগত নই।"

ইমরান খানের বোন নওরীন খান অবশ্য বলছেন, কারাগারে দেখা করতে গেলে, তিনি এবং ইমরান শুধুমাত্র "কী ঘটছে, কী হবে" এসব বিষয় নিয়ে 'সাধারণ আলোচনা' করেন।

তিনি দাবি করেন, ইমরান খানের "টিভি বন্ধ, সংবাদপত্র বন্ধ। কারাগারের নিয়ম অনুসারে, আপনি কোনও বন্দিকে চার দিনের বেশি নির্জন কারাগারে রাখতে পারবেন না।"

তিনি আরও বলেন, দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কোনও অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা চাইছেন না, বরং "তিনি কেবল বই এবং তার সন্তানদের সাথে কথা বলার জন্য অনুরোধ করছেন।"

প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফের রাজনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা রানা সানাউল্লাহ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফের রাজনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা রানা সানাউল্লাহ

দেশটির আইনে কী বলা আছে?

বন্দি অধিকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন- কারা আইন অনুসারে, বন্দিদেরকে তাদের পরিবার এবং আইনজীবীদের সাথে দেখা করার অনুমতি দিতে হবে।

সোসাইটি ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড প্রিজনার্স এইড এর প্রধান নির্বাহী মুহাম্মদ মুদাসসার জাভেদ বিবিসি উর্দুকে বলেন, "কারাগারের ম্যানুয়াল অনুসারে, রাজনৈতিক বন্দি কিংবা সাধারণ বন্দি, তাদেরকে প্রতি সপ্তাহে সাক্ষাতের সুযোগ দেয়া উচিৎ।"

"পরিবারের সদস্যদের বন্দির সাথে দেখা করার অধিকার আছে এবং বন্দি তার আইনজীবী কিংবা আইনি পরামর্শকের সাথে দেখা করতে পারেন।"

মুহাম্মদ মুদাসসির জাভেদ বলেন, "কারও অধিকার নেই বন্দিদের সাথে দেখা বন্ধ করার।"

তিনি বলেন, "নিরাপত্তার কারণে জেল কর্তৃপক্ষ এই ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারেন। তবে প্রতিদিন বন্দিদের সাথে দেখা করার ব্যবস্থা করা এবং তাদের সুযোগ-সুবিধা প্রদান করাও তার দায়িত্ব।"

ইমরান খানের বোনেরা বলছেন যে, তাদের ভাইকে পরিবারের সাথে দেখা করতে না দিয়ে 'হয়রানি' করা হচ্ছে।

নওরীন খান সতর্ক করে বলেন, "যদি তারা ইমরান খানের সাথে কিছু করে, তাহলে মনে রাখবেন যে তারা পাকিস্তানে বা বিশ্বের অন্য কোনও প্রান্তে থাকতে পারবেন না।"