পাবনায় লড়াই হবে বিএনপি-জামায়াতের, সংঘাতের আশঙ্কা ভোটারদের

- Author, মুকিমুল আহসান
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, পাবনা
আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আনুষ্ঠানিক প্রচার প্রচারণা শুরু হয়েছে, সেই সাথে ভোটে জয় পরাজয়ের হিসাব নিকাশ চলছে উত্তরের জেলা পাবনায়। জেলার পাঁচটি আসনের মধ্যে অনন্ত দুই থেকে তিনটি আসনে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে জামায়াতে ইসলামী।
অন্যদিকে, কোনো কোনো আসনে দলের বিদ্রোহী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকায় কিছু বিপাকে আছে বিএনপি। যদিও বিএনপি দাবি করেছে, একটি মাত্র আসন ছাড়া বাকি চারটি আসনে তারা জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।
জয়-পরাজয়ের হিসাব নিকাশের বাইরেও এবারের নির্বাচন ঘিরে সাধারণ ভোটারদের মাঝেও এক ধরনের শঙ্কা রয়েছে ভোটের পরিবেশ নিয়ে।
কেননা, এবার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই পাবনার ঈশ্বরদীতে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে।
তবে দল দুইটির নেতারা বলছেন, এবারের নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তারা আশা করছেন নির্বাচন হবে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে।
বিবিসি বাংলা পাবনার অন্তত তিনটি আসনের ভোটারদের সাথে কথা বলেছে। এসব ভোটারদের অনেকেই বলেছেন, এবারের নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে এই লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে আওয়ামী লীগের ভোট।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও পাবনা-৪ আসনের প্রার্থী হাবিবুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "আমরা আশা করছি এবারের আওয়ামী লীগের যে সব ভোটার জামায়াতকে পছন্দ করে না তারা মুক্তিযুদ্ধপন্থী দল হিসেবে বিএনপিকেই ভোট দিবে"।
পাবনার রুপপুর এলাকায় গড়ে উঠেছে দেশের প্রথম ও একমাত্র এখানে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। যেটি কেন্দ্র করে এ অঞ্চলের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক কিছু পরিবর্তন আসলেও বেড়েছে নানা সংকট।
আগামী সংসদ নির্বাচন ঘিরে পাবনার বিভিন্ন এলাকার ভোটারদের যেমন উচ্ছ্বাস আছে। সেই সাথে আছে নানা শঙ্কাও। তারা চান এমন কেউ নির্বাচিত হোক, যারা সাধারণ মানুষের এসব সমস্যার সমাধানকেই সবচেয়ে গুরুত্ব দেবে।

কর্মসংস্থানের সাথে বেড়েছে সংকটও
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
বিদ্যুৎ প্রকল্প লাগোয়া এই স্থানটির নাম বিবিসি বাজার। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় এই বাজারে আবুল কাশেম মোল্লা নামে একজনের দোকানে রেডিওতে বিবিসি বাংলার খবর শুনতেন অনেকেই।
সেখান রুপপুরের এই বাজার সংলগ্ন এলাকাটির পরিচিতি পায় বিবিসি বাজার হিসেবে। এই বিবিসি বাজার লাগোয়া পাকশী ইউনিয়নের গৃহিনী আজমেরি আক্তার।
মিজ আক্তারের বাড়ির সাথের জমির একটা অংশ একাংশ পড়েছে এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এলাকায়। তিনি বলছিলেন, এই বিদ্যুৎকেন্দ্র একদিকে তাদের এলাকার অর্থনীতির জন্য আশীর্বাদ হলেও শঙ্কারও কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কারণ হিসেবে তিনি জানান, এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি এখনো চালু হয়নি। পরীক্ষামূলকভাবে কিছু কাজ হচ্ছে। তবে, পরীক্ষামূলকভাবে কিছু কাজ যখন করা হচ্ছে তখন তীব্র শব্দে চরম অস্বস্তিতে পড়েন বাসিন্দারা।
এই এলাকার তিন হাজারেরও বেশি রাশিয়ান নাগরিক কাজ করেন বিদ্যুৎ প্রকল্পে। সেটি ঘিরে বহু দোকানপাট আবাসন ব্যবস্থা যেমন গড়ে উঠেছে, তেমনি বেড়েছে মাদকের পরিমাণও।
পাকশী ইউনিয়নের বাসিন্দা সারোয়ার হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলেন, "এখানে প্রতি গ্রামে গ্রামে মাদক ছড়িয়ে পড়েছে। মাদকের পরিমাণ এতটাই বেড়েছে যে এর প্রভাবে অন্যান্য নানা অপরাধও বহুগুণ বাড়ছে"।
এই এলাকায় নারীরা সবচেয়ে সংকটে রয়েছে বলে মনে করেন আজমেরি আক্তার। তিনি বলছিলেন, প্রতিনিয়ত নারী নির্যাতন বা ধর্ষণের ঘটনাও ঘটছে। নারীরা বাইরে বের হতে খুব একটা নিরাপদ বোধ করেন না।
আগামী নির্বাচনে যারা ভোটে জিতবেন তাদেরকে এই সমস্যাগুলোর সমাধানে জোর দিয়েছেন এলাকার বাসিন্দারা।

'ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবো তো?'
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই গত নভেম্বরে পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে।
এরপর থেকে ঈশ্বরদীসহ জেলার বেশ কয়েকটি জায়গায় জামায়াত ও বিএনপি জোটের প্রার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
এবার নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হচ্ছে ২২শে জানুয়ারি। পাবনা সদর, বেড়া, ঈশ্বরদীর বেশ কয়েকজন ভোটারের সাথে কথা বলেছে বিবিসি বাংলা।
তাদের অনেকের আশঙ্কা এবার নির্বাচনে পাবনার কয়েকটি আসনে ভোটের দিন সংঘাত বা সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন তারা।
এই যেমন পাবনা সদরের অন্ততপুর এলাকায় কথা হয় একজন চায়ের দোকানির সাথে। তিনি তার নামটি গোপন রাখার শর্তে বলছিলেন, পাবনা সদরের আসনটিতে জামায়াতে ইসলামীর জনপ্রিয়তা বিএনপির চাইতে কিছুটা বেশি। তবে বিএনপির যিনি প্রার্থী তার প্রভাব অনেক বেশি।
সেই উদাহরণ টেনে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, নির্বাচনের দিনও বিএনপি-জামায়াত এই দুই দলের মধ্যে মারামারি হতে পারে। এই নিয়ে ভোটারদের মধ্যেও এক ধরনের ভয় কাজ করছে।
ঈশ্বরদীতে কথা হয় দেলোয়ার হোসেন নামে একজন ষাটোর্ধ একজন ভোটারের সাথে। তিনিও প্রায় একই ধরনের অভিযোগ করছিলেন।
মি. হোসেন বলছিলেন, "আগে তো না হয় একতরফা নির্বাচন হইছে, মানুষ কেন্দ্রে যেতে পারেনি। এবার এই সুযোগ আসছিলো, কিন্তু অনেকে বলতেছে গ্যাঞ্জাম হতে পারে। এই জন্য আমি নিজেও মনে হয় ভোট দিতে যাবো না। ভোটের দিন বাসা থেকে বের নাও হতে পারি"
End of বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর

বিএনপি জামায়াতের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস
পাবনার পাঁচটি আসনের মধ্যে এবারের নির্বাচনে সবগুলো আসনেই প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। বড় এই দু'টি দলই এবার আলাদাভাবে জোটবদ্ধ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।
তবে, জোটবদ্ধ নির্বাচন হলে পাবনার পাঁচটি আসনেই বিএনপি জামায়াত এই দুটি দলই জোটের শরীকদের জন্য কোন আসন ছাড়েনি।
যে কারণে, জেলার সবগুলো আসনেই নৌকা ও ধানের শীষের মধ্যেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলেই মনে করছেন পাবনার সাধারণ ভোটাররা।
২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জামায়াত জোটবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। ওই নির্বাচনে দুইটি আসনে জয় পেয়েছিল জামায়াতের প্রার্থীরা।
জামায়াতের সাবেক আমির প্রয়াত মতিউর রহমান নিজামীর নিজ এলাকাও পাবনায়। যে কারণে এই জেলায় জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান অন্য জেলার চেয়ে তুলনামূলক শক্ত।
তবে, বিএনপি মনে করছে পাঁচটি আসনের মধ্যে অন্তত চারটি আসনেই জয় পেতে পারে তারা। শুধুমাত্র পাবনার সাথিয়া নিয়ে গঠিত পাবনা-১ আসন বাদে বাকি আসনগুলোতে জয় পাবে তারা।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও পাবনা-৪ আসনের প্রার্থী হাবিবুর রহমান হাবিব বিবিসি বাংলাকে বলেন, "শুধুমাত্র পাবনা-১ আসনে আমাদের প্রার্থী একটু দুর্বল। সেখানে জামায়াতের প্রার্থী যোগ্যতার দিক দিয়ে এগিয়ে। এর বাইরে সবগুলো আসনেই আমরা জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। সেখানে আমাদের শক্তিশালী প্রার্থী আছে"।
পাবনার নির্বাচনী এলাকার অনেক ভোটারদের সাথে বলে জানা গেছে, এবার পাবনায় নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াতে পারে আওয়ামী লীগের ভোটাররা।
এই প্রশ্নে বিএনপি নেতা মি. হাবিব মনে করছে পাবনায় এবার আওয়ামী লীগের ভোটাররা স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হিসেবে বিএনপিতেই ভোট দিবে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ভোটের আগে কয়েক দফায় জরিপও করেছিল। জামায়াতের দাবি, সে সব জরিপে দুয়েকটি আসন বাদে বাকিগুলোতে এগিয়েছিল।
জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির ও পাবনা সদর আসনের জামায়াতের প্রার্থী ইকবাল হোসাইন বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমরা শুরু থেকেই নির্বাচনে প্রার্থী দিয়েছি। তারা মাঠে কাজ করেছে প্রায় দেড় বছর ধরে। পাবনার পাঁচটি আসই এ ক্যাটাগরিভুক্ত। আমরা আশাবাদী ৫টি আসনেই আমরা বিজয়ী হবো"।
তবে- এই জয় পরাজয়ের হিসাব নিকাশের বাইরে এবারের নির্বাচনে সংঘাতের আশঙ্কাও করছেন ভোটারদের অনেকে। এর আগে গত নভেম্বরে, আগে নির্বাচনী প্রচারণা ঘিরে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে ঈশ্বরদীতে। যে কারণে, এবারের নির্বাচন ঘিরে ভোটারদেরও বাড়ছে নানা দুশ্চিন্তাও।








