গ্রিনল্যান্ড নিয়ে শুল্ক আরোপের হুমকি থেকে সরে এলেন ট্রাম্প

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল ২১শে জানুয়ারি সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে ভাষণ দেন

ছবির উৎস, Chip Somodevilla/Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
    • Author, বার্নড ডেবুসম্যান জুনিয়র
    • Role, হোয়াইট হাউস সংবাদদাতা

নেটোর সঙ্গে আলোচনার পর গ্রিনল্যান্ড নিয়ে সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র খতিয়ে দেখছে বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একইসাথে যেসব ইউরোপীয় দেশ দ্বীপটি অধিগ্রহণের বিষয়ে বিরোধিতা করেছিল তাদের ওপর শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা থেকে সরে আসার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লিখেছেন, নেটো প্রধানের সঙ্গে "খুবই ফলপ্রসূ বৈঠক" হয়েছে, যার ফলে গ্রিনল্যান্ড ও আর্কটিক অঞ্চল নিয়ে একটি সম্ভাব্য চুক্তির 'কাঠামো' তৈরি হয়েছে।

তবে তিনি এ বিষয়ে খুব বেশি বিস্তারিত জানাননি।

নেটোও বৈঠকটিকে 'খুবই ফলপ্রসূ' বর্ণনা করেছে এবং জানিয়েছে, ট্রাম্প যে কাঠামোর কথা উল্লেখ করেছেন, সে সংক্রান্ত আলোচনা মূলত আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দিকেই নজর দেবে।

এর আগে, দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে বক্তব্য দিতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, তিনি সামরিক শক্তি ব্যবহার করবেন না। তবে ওই অঞ্চলের মালিকানা পেতে আলোচনা করতে চান।

বুধবার ট্রুথ সোশালে ট্রাম্প বলেন, "গ্রিনল্যান্ডসহ পুরো আর্কটিক অঞ্চলকে ঘিরে ভবিষ্যৎ চুক্তির একটি কাঠামো আমরা তৈরি করেছি"।

"এই সমাধানটি যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে তা যুক্তরাষ্ট্র এবং নেটোর সব দেশের জন্যই খুব ভালো হবে"।

প্রস্তাবটিতে ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানা অন্তর্ভুক্ত আছে কি না সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কিছু জানাননি। তবে একটি মার্কিন কেবল নেটওয়ার্ককে তিনি জানান, এই পরিকল্পনায় খনিজ সম্পদের অধিকারের বিষয়টি থাকতে পারে।

গ্রিনল্যান্ডে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বিক্ষোভ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, গ্রিনল্যান্ডে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেন হাজারো মানুষ
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প বলেন, আলোচনা এগোনোর সাথে সাথে "আরও তথ্য প্রকাশ করা হবে"।

আলোচনা চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ সরাসরি তার কাছে প্রতিবেদন দেবেন বলেও জানান তিনি।

ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন এক বিবৃতিতে বলেন, "দিনটি যেভাবে শুরু হয়েছিল, তার চেয়ে ভালোভাবেই শেষ হচ্ছে"।

তিনি আরও বলেন, "এখন আসুন, বসে দেখি কীভাবে আমরা ডেনমার্ক রাজ্যের সীমানাকে সম্মান জানিয়ে আর্কটিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা উদ্বেগগুলো সমাধান করতে পারি"।

পরবর্তী কয়েক ঘণ্টায় আরও কিছু বিস্তারিত তথ্য সামনে আসা শুরু করে।

সিএনবিসিকে ট্রাম্প বলেন, সম্ভাব্য এই চুক্তি 'চিরস্থায়ী' হতে পারে এবং এতে খনিজ সম্পদের অধিকার ও পরিকল্পিত 'গোল্ডেন ডোম' ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

ট্রাম্পের কল্পনা করা এই ভবিষ্যৎ ব্যবস্থায় স্থল, সমুদ্র ও মহাকাশজুড়ে বিস্তৃত ইন্টারসেপ্টর ও শনাক্তকারী ব্যবস্থা থাকবে, যার লক্ষ্য হবে যুক্তরাষ্ট্রকে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে সুরক্ষা দেওয়া।

গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত অবস্থানের পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসন এর বিশাল এবং এখনো অনেকটাই অনাবিষ্কৃত বিরল খনিজ সম্পদের মজুদের কথাও তুলে ধরেছে। এসব খনিজের অনেকগুলোই মোবাইল ফোন ও বৈদ্যুতিক গাড়িসহ বিভিন্ন প্রযুক্তির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সুইজারল্যান্ডের দাভোসে সিএনএনকে ট্রাম্প বলেন, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে চুক্তির কাঠামোটি "অনেকটাই এগিয়ে গেছে" এবং এতে "আমাদের যা যা প্রয়োজন ছিল সবই পাওয়া যাবে" - বিশেষত "প্রকৃত জাতীয় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা"।

নেটোর মহাসচিব মার্ক রুটে জানান, ট্রাম্পের সঙ্গে তার বৈঠকে গ্রিনল্যান্ডের ওপর ডেনমার্কের সার্বভৌমত্বের মূল বিষয়টি নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।

তিনি ফক্স নিউজকে বলেন, "আজ রাতে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আমার কথোপকথনে এই বিষয়টি আর আসেনি"।

এর আগে ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড ইজারা নেওয়ার ধারণা নাকচ করে দিয়ে বলেছিলেন, "মালিকানা রক্ষা করা হয়, ইজারা নয়"।

২০২৬ সালের ২১শে জানুয়ারি সুইজারল্যান্ডের ডাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনের ফাঁকে একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে নেটো মহাসচিব মার্ক রুটে কথা বলার সময় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুনছেন।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনের ফাঁকে আলাপ করছেন নেটো মহাসচিব মার্ক রুটে ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

নেটোর মুখপাত্র অ্যালিসন হার্ট এক বিবৃতিতে বলেন, বৈঠকের সময় ট্রাম্প ও রুটে "যুক্তরাষ্ট্রসহ সব মিত্র দেশের জন্য আর্কটিক অঞ্চলে নিরাপত্তা গুরুত্বের তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করেছেন"।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, "ডেনমার্ক, গ্রিনল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা এগিয়ে যাবে, যার লক্ষ্য থাকবে অর্থনৈতিক বা সামরিক কোনোভাবেই যেন রাশিয়া ও চীন গ্রিনল্যান্ডে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে।"

নিউ ইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য এই পরিকল্পনার আওতায় গ্রিনল্যান্ড ভূখণ্ডের ছোট অংশের মালিকানা যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়া হতে পারে, যেখানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা যাবে।

বুধবার নেটোর বৈঠকে উপস্থিত কর্মকর্তারা পত্রিকাটিকে জানান, প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থাটি সাইপ্রাসে যুক্তরাজ্যের ঘাঁটির মতো হতে পারে, যেগুলো ব্রিটিশ ওভারসিজ টেরিটরির অংশ।

ডেনমার্কের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডে ইচ্ছামতো সেনা মোতায়েন করতে পারে। বর্তমানে দ্বীপটির উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত পিটুফিক ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের একশরও বেশি সামরিক সদস্য স্থায়ীভাবে অবস্থান করছেন।

ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড কিনে নেওয়ার বিষয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাজ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো "যেকোনো ও সব ধরনের পণ্যের" ওপর পয়লা ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তিনি বলেছিলেন, পহেলা জুন থেকে সেই হার বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হবে।

একই শুল্ক আরোপের কথা ছিল ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও ফিনল্যান্ড থেকে আসা পণ্যের ক্ষেত্রেও—যাদের সবাই ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রতিরক্ষা জোট নেটোর সদস্য।

তবে রুটের সঙ্গে আলোচনার পর বুধবার ট্রাম্প সেই হুমকি প্রত্যাহার করেন। ট্রুথ সোশালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, নতুন শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা বাতিল করা হচ্ছে।

তিনি লেখেন, "এই বোঝাপড়ার ভিত্তিতে, পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়ার কথা থাকা শুল্ক আমি আরোপ করবো না"।

বুধবার দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের জন্য তিনি "তাৎক্ষণিক আলোচনা" চান, তবে এটাও জোর দিয়ে বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র শক্তি প্রয়োগ করে ওই ভূখণ্ড দখল করবে না।

মঙ্গলবার বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার সময় সানগ্লাস পরেছিলেন ম্যাক্রোঁ

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, নতুন মার্কিন শুল্কের বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপের বিকল্প বিবেচনার আহ্বান জানানো ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতাদের মধ্যে ম্যাক্রোঁও ছিলেন

তিনি বলেন, "আমি যদি অতিরিক্ত শক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত না নিই, তাহলে হয়তো কিছুই পাব না। আমাদের থামানো যাবে না, কিন্তু আমরা তা করব না। আমার শক্তি ব্যবহারের প্রয়োজন নেই, আমি শক্তি ব্যবহার করতে চাই না, আমি শক্তি ব্যবহার করব না"।

তিনি বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানান যে তাদের উচিত ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রকে নিতে দেওয়া। ট্রাম্পের ভাষায়, "আপনারা হ্যাঁ বলতে পারেন, তাহলে আমরা খুবই কৃতজ্ঞ থাকব। অথবা না বলতে পারেন, আর আমরা তা মনে রাখব"।

দাভোসে এক দিন আগে দেওয়া নিজের বক্তব্যে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ট্রাম্পের আগের আমদানি শুল্কের হুমকির সমালোচনা করেন।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে "নতুন শুল্কের অন্তহীন সংগ্রহ মৌলিকভাবেই অগ্রহণযোগ্য"।

নতুন মার্কিন শুল্কের বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপের বিকল্প বিবেচনার আহ্বান জানানো ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতাদের মধ্যে ম্যাক্রোঁও ছিলেন।

নিজের বক্তব্যে ম্যাক্রোঁকে লক্ষ্য করে ট্রাম্প বলেন, ফ্রান্স কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে "ঠকিয়ে আসছে"।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিকেও কটাক্ষ করেন। কার্নি দাভোসে এক দিন আগে দেওয়া বক্তৃতায় অস্ট্রেলিয়া, আর্জেন্টিনা ও নিজের দেশের মতো 'মধ্যম শক্তির' দেশগুলোকে একত্র হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

এর জবাবে ট্রাম্প কার্নিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অকৃতজ্ঞ বলে অভিযোগ করেন।

তিনি বলেন, "যুক্তরাষ্ট্রের কারণেই কানাডা টিকে আছে। পরেরবার যখন আপনি এমন বক্তব্য দেবেন, এটা মনে রাখবেন মার্ক"।