আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
নির্বাচনে সংখ্যালঘু ভোট, 'কোন দিকে যাব আমরা'?
- Author, আবুল কালাম আজাদ
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
"আমরা যদি বিএনপিরে ভোট দিই তালি আমাগে জামাত আইসে ধরে বসবে, আর যদি জামাতরে ভোট দিই তালি বিএনপি আইসে ধরে বসবে। কোন দিকে যাবো আমরা কন?" ভোটে বিষয়ে জানতে চাইলে বিবিসি বাংলার কাছে এ মন্তব্য করেন যশোরের অভয়নগরের নির্মল বিশ্বাস।
একই গ্রামের শিউলি বিশ্বাস বলেন, "আমরা হলাম হিন্দু মানুষ, সামনে যদি ব্যালট পেপারে সিল মাইরে দিই তাও কিন্তু আমাদের বিশ্বাস করবে না, এইটাই কিন্তু বাস্তব। আমরা হয়ে গেছি বলের মতো, যেদিকে যাই সেদিকে লাথি খাই। পথে ঘাটে যেহানেই যাই শুনি হিন্দু মানেই নৌকার।"
ভোটকে সামনে রেখে প্রতিক্রিয়া দেয়া দুইজন যশোরের অভয়নগরের ডহরমসিয়াহাটি গ্রামের ভুক্তভোগী বাসিন্দা নির্মল ও শিউলি বিশ্বাসের। গত বছর মে মাসে তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়। স্থানীয় এক বিএনপি নেতার হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে হিন্দু অধ্যুষিত মতুয়া সম্প্রদায়ের ওই গ্রামের ১৮টি বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল।
শিউলি বিশ্বাস বলছিলেন, এবার নির্বাচনে নিরাপত্তার বিষয়টি তাদের অগ্রাধিকার। "আমরা অবশ্যই ভোট দিতে যাব। কিন্তু আমাদের কথা হচ্ছে আমাদের যে নিরাপত্তা দেবে আমরা তারেই ভোট দেব।"
২০২৪ সালে বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রথম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ফেব্রুয়ারি মাসে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরে বসত বাড়িতে আগুন, ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে ভালুকায় পিটিয়ে আগুন দিয়ে দিপু চন্দ্র হত্যা এবং পর পর কয়েকজন হিন্দু ব্যবসায়ী খুন হওয়ার ঘটনা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে উৎকন্ঠা সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতা রঞ্জন কর্মকার বিবিসি বাংলাকে বলেন, ভোটের আগে ক্যাম্পেইন, ভোট প্রদান এবং ভোটের পরের নিরাপত্তার শঙ্কা মিলিয়ে সংখ্যালঘুরা নির্বাচনে অংশগ্রহণের একটা বিরূপ পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
তার ভাষায় নির্বাচনে সংখ্যালঘুদের অংশগ্রহণের জায়গা কমে যাচ্ছে। সহিংসতা চলমান। রাষ্ট্রের সেটাকে স্বীকার না করা এবং বিচারহীনতা উদ্বেগ তৈরি করেছে। এছাড়া রাজনৈতিক এবং সামাজিক সাংষ্কৃতিক দলগুলো এই সহিংসতার বিরুদ্ধে ঠিকমতো দাঁড়াতে পারছে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
"মেরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছেন এটা কোন রাজনীতি। এটা কিন্তু আমাদের দেশের রাজনীতির কালচার না। একজন মাইনরিটি এফেক্ট হওয়া মানে কিন্তু একজন মাইনরিটি না একজন পরিবার না গোটা এলাকা, গোটা দেশ। একটা মেয়েকে যখন রেইপ করবে, তখন গোটা দেশের মেয়েদের উপর প্রভাব পড়বে। আজকে কিন্তু মাইনরিটি গ্রুপ বিশেষ করে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী তারা কিন্তু অস্তিত্বের সংকটে, ভীত অবস্থানে একটা অস্থির অবস্থায় জীবন যাপন করছে।"
রঞ্জন কর্মকার বলছেন, সংখ্যালঘুরা নির্বাচনের প্রত্যেকটা প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে ইচ্ছুক। তবে এটা নির্ভর করছে রাষ্ট্র বা সরকার সেই সুযোগটা করে দিচ্ছে কিনা। রাজনৈতিক দলগুলো সেই ব্যাপারে যথাযথ দায়িত্ব পালন করছে কিনা তার উপর।
"আপনি বলছেন, নির্বাচনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করো কিন্তু আমাকে সুরক্ষাটা কোথায় দিলেন, নিরাপত্তা কোথায় দিলেন। আমার মতামত প্রকাশের সুযোগটা কোথায় দিলেন। আমার রাজনৈতিক বিশ্বাস প্রকাশের জায়গাটা কোথায় দিলেন, দিচ্ছেন নাতো। তাহলে এইরকম একটা অবস্থায় মাইনরিটিরা কীভাবে অংশগ্রহণ করবে"- প্রশ্ন রাখেন রঞ্জন কর্মকার।
আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা কেন?
পাঁচই অগাস্ট পরবর্তী বাংলাদেশে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যলঘুদের ওপর হামলা- নির্যাতনের আড়াই হাজারের বেশি ঘটনা ঘটেছে বলে পরিসংখ্যান দিয়ে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতারা বলছেন, ভোটের আগে সংখ্যালঘুরা আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠায় আছে।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরে ধারাবাহিক কয়েকটি ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সংখ্যালঘুদের মধ্যে। সম্প্রতি চট্টগ্রামের রাউজানে বেশকটি হিন্দু বৌদ্ধ বসতবাড়িতে বাইরে থেকে দরজা আটকে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। মিঠুন শীল নামের একজন জানান, ভোটের আগে এ ধরনের ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। ওই ঘটনার পর থেকে সংখ্যালঘুরা পালাক্রমে রাতে বাড়িঘর পাহারা দিচ্ছে।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের অন্যতম সভাপতি নির্মল রোজারিও বিবিসি বাংলাকে বলেন, "শঙ্কা যে আমাদের মধ্যে নাই সেটা বলতে পারবো না। আপনি ভালুকার ঘটনা চিন্তা করেন। যে একজন মানুষকে কোন প্রমাণ ছাড়া পিটানো হইছে এবং পরে তাকে আগুন দিয়ে পুড়ায় দেয়া হইছে।
"সেইম থিং সাউথ বেঙ্গলে ঘটেছে। এই ধরনের ঘটনাগুলোতো আমাদের শঙ্কিত করে। ভোটের আগে আমার গুরুত্ব হলো জীবন রক্ষা। আমার জীবন যদি রক্ষা না হয়, আমার পরিবার যদি রক্ষা না হয় তাহলে ভোটের বিবেচনা পরে করবে" বলেন মি. রোজারিও।
বাংলাদেশে নির্বাচনে হিন্দু ভোট সবসময়ই একটা ফ্যাক্টর। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের মূল্যায়নে দেশের আশিটির মত সংসদীয় আসনে জয় পরাজয় নির্ধারণে প্রভাব ফেলে সংখ্যালঘুদের ভোট।
নির্মল রোজারিও বলেন, ভোট মানুষ দিতে যাবে তখনই যখন সে দেখবে ভোট দেয়ার কারণে সে কোনো থ্রেটের সম্মুখীন হবে না। কোনো হুমকির সম্মুখীন হবে না।
"কোনো রাজনৈতিক দলের যেন কোনো স্টিগমা লেগে না যায় যে এত সালে নির্বাচনে এই এই করছিল। ২০০১ সালের নির্বাচনের কথা আমরা এখনো বলি যে ওই সময় আমাদের উপর অনেক নির্যাতন নিষ্পেষণ হইছিল। সুতরাং এখন আবার ২০২৬ সালের নির্বাচনে যেন কোনো রেফারেন্স তৈরি না হয়। দশ বছর বা বিশ বছর পরে মানুষ রেফারেন্স তুলবে ছাব্বিশ সালের নির্বাচনে এই ধরনের ঘটনাগুলো ঘটেছিল। "
নির্মল রোজারিও বলেন, আমরা চাই একটা ফ্রি- ফেয়ার নির্বাচন।
"আমরা চাবো, সিচুয়েশনটা এমন হবে যে, আমরা কনফিডেন্ট হতে পারি যে নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করলে কোনো ধরনের অসুবিধা হবে না। সেখানে সকল নাগরিকের নিরাপত্তা থাকবে। বিশেষ করে আমাদের ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাটা নিশ্চিত হবে এবং একটা উৎসবমুখর পরিবেশ যদি হয় তাহলে ভোটকেন্দ্রে যাবে। আর যদি ওরকম না হয় তাহলে যার যার সিদ্ধান্ত সে সে নেবে।"
বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে প্রত্যাশার বিষয়টি উল্লেখ করে ঐক্য পরিষদের প্রেসিডিয়াম সদস্য রঞ্জন কর্মকার বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো ঘোষণা দিক যে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংখ্যালঘুদের উপর কোনো নির্যাতন সহিংসতা ঘটবে না। তাহলেই তো আমরা আশ্বস্ত হবো।
"আমরাতো শুধু সরকারের কাছে নিরাপত্তা চাচ্ছি না, সুরক্ষা চাচ্ছি না। আমরা প্রত্যেকটা রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে ঘোষণা চাচ্ছি যে, আপনারা ঘোষণা দেন কেন্দ্রীয়ভাবে যে মাইনোরিটিরা যেখানেই ভোট দিক তার ইচ্ছা অনুযায়ী, যে ক্যাম্পেইনেই যাক তার সুরক্ষা নিরাপত্তা দেয়ার জন্য আমরা সবাই একত্রিত। কই কেউতো দিলেন না এখন পর্যন্ত" বলেন রঞ্জন কর্মকার।
'সংখ্যালঘুদের বাড়িতে হামলার বেশিরভাগ রাজনৈতিক কারণে'
সংখ্যালঘুদের বাড়ি ঘরে হামলার বেশিরভাগ ঘটনা রাজনৈতিক কারণে ঘটেছে বলেও দাবি করে বিএনপি।
দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বিবিসিকে বলেন, "বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিটা অনেক উচ্চমানের। যেটা ভারতেও নাই। কিন্তু বাংলাদেশে কখনো সাম্প্রদায়িক কারণে কোনো ঘটনা ঘটে না।
"নির্বাচনের আগেই হোক পরেই হোক সরকারের একটা পরিবর্তন আসলে যা কিছু ঘটে রাজনৈতিক কারণে ঘটে। এই বিবেচনায় নিতে হবে।"
গয়েশ্বর রায় এ-ও বলেন, একটা এলাকায় যে ধর্মের লোকই হোক, তার ভোট প্রাপ্তির ক্ষেত্রে দলের চেয়ে বেশি দায়িত্ব হলো প্রার্থীর। প্রার্থীর উপর তারা কতটুকু আস্থা রাখতে পারবেন। প্রার্থী তাদেরকে কতটুকু আস্থায় আনতে পারবেন তার উপর এই ভোটগুলো নির্ভর করে।
বাংলাদেশের সংখ্যালঘু ভোটারদের একটা বড় অংশ আওয়ামী লীগের সমর্থন করে এমন বিশ্লেষণ রয়েছে। এবার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ না থাকায় সংখ্যালঘুদের ভোট টানতে বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃত্বে দুই জোটই তৎপর হয়েছে।
জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহম্মদ তাহের বিবিসি বাংলাকে বলেন, "এটা পারসেপশন যে হিন্দু মানেই আওয়ামী লীগ। এবং পারসেপশনটা এরকম যে জামাত মানেই এন্টি হিন্দু। এগুলো একসময় ছিল।
"আমি মনে করি এগুলো সব কেটে গেছে এখন। এখন আর তারা আওয়ামী লীগকে ওইভাবে দেখে না। দুই নম্বর হচ্ছে আওয়ামী লীগের অ্যাবসেন্সে তারা নতুন করে ভাবার সুযোগ পেয়েছে। সেই ভাবনাতে তারা দেখছে জামাত তাদের ফ্রেন্ড দ্যান এনি আদার অর্গানাইজেশন। তো আমরা আশা করছি হিন্দুদের বিশাল অংশ এবার জামাতকে সমর্থন করবে" বলেন মি. তাহের।
ভোটের মাঠে বড় দুই দলের পক্ষ থেকেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার আশ্বাস দেয়া হচ্ছে।
সংখ্যালঘু ভোটারদের মধ্যে পরাজিত প্রার্থীর লোকজন ভোট না দেয়ার অভিযোগ তুলে হামলা হতে পরে, এমন আশঙ্কার বিষয়ে আশ্বস্ত করে জামায়াতের নায়েবে আমির বলেন, এরকম কোনো সম্ভাবনা নাই।
"প্রথম কথা হচ্ছে বিএনপি যদি প্রপার নির্বাচনে জিতে আপনার হিন্দু হোক মুসলমান হোক আমাদের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের আপত্তি, বাধা বিপত্তি বা আক্রমণের কোনো সম্ভাবনা নাই। আমরা এটাকে সহজভাবে নেব।
আর জামায়াত যদি জেতে বিএনপি যদি হামলা করতে চায় আমরা তাদের প্রটেকশন দেব। আমরা তাদের পাশে এসে দাঁড়াব। আমরা আশাকরি এরকম পরিস্থিতিতে বিএনপি এরকম করার সাহস করবে না, সুযোগও পাবে না" বলেন মি. তাহের।
সংখ্যালঘুদের উদ্বেগ নিয়ে বিএনপি নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ভবিষ্যতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে কঠোর হবে বিএনপি।
"ঠিক আছে নির্বাচনে জয়লাভ করার জন্য কৌশল থাকবে। ভোটের পরে যদি কেউ মনে করে তারা যে বিএনপিকে ভোট দিছে বিএনপি ক্ষমতায় আসছে, তাদের উপর আক্রমণ করবে। তাহলে কঠিন এবং কঠোরভাবে দমন করা হবে। কঠিন এবং কঠোরভাবে দমন করবো। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হতে আমরা দেব না। বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে আমরা ছোট করতে দেব না।"