'মেয়েদের হাসপাতালে নিরাপত্তা নেই, কলেজেও নিরাপত্তা নেই'

    • Author, রূপসা সেনগুপ্ত
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা

"কোথায় নিরাপত্তা? কোন নিরাপত্তার কথা বলছেন?" কলকাতায় নারীরা কতটা নিরাপদ–– জানতে চাওয়ায় পাল্টা এই প্রশ্নই করেছিলেন আইনের ছাত্রী মধুবন চক্রবর্তী।

তারপর এক নিঃশ্বাসে বলছিলেন, "আমি কসবা আইন কলেজের ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রী যেখানে মেয়েদের নিয়মিতভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। কিন্তু অভিযুক্ত একটা বিশেষ রাজনৈতিক দলের আশ্রয়ে ছিল বলে এতদিন ধরা পড়েনি।"

এক বছর আগে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে তরুণী পড়ুয়া- চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের প্রতিবাদে বহু মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন। নৈহাটির বাসিন্দা মধুবন চক্রবর্তী তাদেরই একজন।

শহরের নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তথ্য প্রযুক্তিকর্মী মধুরিমা দত্ত।

তিনি বলেছেন, "বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত বাবা-মা উৎকণ্ঠায় থাকে। অফিস থেকে গাড়ি করে ড্রপের ব্যবস্থা থাকলেও নিশ্চিন্ত হতে পারে না, জেগে বসে থাকে।"

তবে কলকাতাকে অন্যান্য শহরের তুলনায় নিরাপদ বলে মনে করেন কলেজ পড়ুয়া তৃণা দাশ। তার মতে, "দিল্লির মতো শহরের চাইতে কলকাতা অনেক নিরাপদ। এখানে মেয়েরা অন্তত কিছুটা হলেও নিশ্চিন্তে বেরোতে পারে। দিল্লিতে সেটা ভাবাই যায় না।"

পরিসংখ্যান বলছে, ভারতের অন্যান্য শহরের তুলনায় কলকাতা সবচেয়ে নিরাপদ। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর রিপোর্টে টানা তিন বছর সবচেয়ে নিরাপদ শহরের শিরোপা পেয়েছিল কলকাতা।

কিন্তু এই কলকাতা ও শহরতলিতে মেয়েদের হেনস্তা এবং যৌন নির্যাতনের মতো ঘটনা প্রতিবারই প্রশ্ন তুলেছে, কলকাতা মেয়েদের জন্য কতটা নিরাপদ আর রাজ্যের চিত্রই বা কী?

নারী নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করেই ঠিক এক বছর আগে উত্তাল হয়েছিল রাজ্য। সে বছর নয়ই আগস্ট আরজি কর হাসপাতালে তরুণী পড়ুয়া-চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর প্রশ্নের মুখে পড়ে রাজ্যের নারী নিরাপত্তা।

নিহত চিকিৎসকের জন্য ন্যায়বিচার এবং মেয়েদের নিরাপত্তার দাবি জানিয়ে পথে নেমেছিলেন অসংখ্য মানুষ।

সেই সময় সরকারের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছিল, এই নারীদের নিরাপত্তার জন্য সব রকম ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রাস্তায় পুলিশি টহল বাড়ানো হবে, নারী পুলিশ থাকবেন। কর্মক্ষেত্রে যাতে নারীরা রাতেও নিরাপদ হন তা নিশ্চিত করা হবে।

আরজি কর হাসপাতালের ঘটনার এক বছর হতে চলেছে। নিরাপত্তার নিরিখে ছবিটা বদলেছে কি?

'নিরাপদতম শহর'

ন্যাশানাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর (এনসিআরবি) ২০২২ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতের যেসব শহরে ২০ লাখের বেশি মানুষের বাস, তার মধ্যে কলকাতাতেই সবচেয়ে কম সংখ্যক অপরাধ রেকর্ড করা হয়েছিল।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীকে প্রায়শই জনসভাগুলোয় এই বিষয়ে বলতে শোনা যায়।

এক লক্ষ জনসংখ্যা প্রতি ৮৬.৫টা অপরাধের মামলা রেকর্ড করা হয়েছিল কলকাতায়। প্রতি লাখে অপরাধের নিরিখে কলকাতার পর ছিল মহারাষ্ট্রের পুনে (২৮০.৭) এবং তেলেঙ্গানার হায়দরাবাদ (২৯৯.২)।

এনসিআরবি-র রিপোর্ট অনুযায়ী, অপরাধের সংখ্যা কমেছে কলকাতায়। ওই রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২১ সালে কলকাতায় প্রতি লাখে ১০৩.৫টি অপরাধের মামলা রেকর্ড করা হয়েছিল।

২০১৬ সালে ওই সংখ্যা ছিল ১৫৯.৬টি।

কলকাতা যে নারীদের জন্য সত্যিই নিরাপদ–– তা মনে করেন জয়েন্ট কমিশনার অফ পুলিশ (ক্রাইম) রূপেশ কুমার। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "মেয়েদের সুরক্ষার বিষয়টাকে আমরা গুরুত্বের সঙ্গে বিচার করি এবং তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।"

অন্যদিকে,পরিসংখ্যানের সঙ্গে বাস্তবের মিল থাকে না বলেই মনে করেন পুলিশের সাবেক কর্মকর্তা অনিল কুমার জানা।

তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "এনসিআরবি-র রিপোর্ট কিন্তু বাস্তব চিত্রকে প্রতিফলন করে না। বাস্তবে অপরাধের সংখ্যা ওর থেকে অনেক বেশি। আমার মনে হয় না গত কয়েক বছরে কলকাতা বা এই রাজ্যে অপরাধের সংখ্যা কমেছে।"

বিশেষজ্ঞদের মতে, বহু ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরা সামনে এসে পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেন না।

অধ্যাপক এবং সমাজকর্মী শাশ্বতী ঘোষ বলেছেন, "মুখ্যমন্ত্রী বা শাসক দলের নেতারা এই শহর সবচেয়ে নিরাপদ বলে যতই দাবি করুন না কেন, বাস্তবে ছবিটা অন্য। গত এক বছরের রাজ্যে একের পর এক নারী নির্যাতনের ঘটনাই তার প্রমাণ।"

নারী সুরক্ষায় সাম্প্রতিক পদক্ষেপ

আরজি করের ঘটনার পর সরকারের তরফে নারী সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে একাধিক পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করা হয়েছিল। রাতের শিফটে সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে স্পষ্ট নীতি তৈরির নির্দেশ দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী।

আর জি করের ঘটনার এক বছর হওয়ার ঠিক আগে সেই নীতিমালার খসড়া সরকারের সব দফতরে পাঠানো হয়েছে। দফতরভিত্তিক মতামত পৌঁছানোর পর চূড়ান্ত করে সেটা মুখ্যমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। অনুমোদন মিললে তারপর বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে।

ওই নীতিমালায় সরকারি প্রতিষ্ঠানে রাতে কর্মরত নারীদের সুরক্ষার জন্য নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন করা, সিসিটিভি লাগানো, কর্মস্থলে পর্যাপ্ত আলো ও শৌচাগারের ব্যবস্থা ও পরিবহনের সুবিধার কথা বলা হয়েছে।

এছাড়া ইন্টারনাল কমপ্লেন কমিটি বাধ্যতামূলক করা এবং যৌন হেনস্থার ক্ষেত্রে 'জিরো টলারেন্সের' ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে কলকাতা হাইকোর্টে রাতের শিফটে কর্মরত নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে একটা জনস্বার্থ মামলা দায়ের করা হয়েছিল। বেসরকারি তথ্য প্রযুক্তি সেক্টরের, নারী সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারি হস্তক্ষেপ চেয়ে এই মামলা দায়ের করা হয়।

সরকারের পক্ষ থেকে আদালতে জানানো হয়েছিল, নারী সুরক্ষার জন্য 'রাত্রীসাথী' নামে বিশেষ প্রকল্প চালু হয়েছে। পাশাপাশি, শহর এবং শহরতলির বিভিন্ন এলাকায় রাতে পুলিশ টহল দিচ্ছে।

সেই সময় প্রধান বিচারপতি টিএস শিবজ্ঞানম এবং বিচারপতি বিভাস পট্টনায়েকের ডিভিশন বেঞ্চ জানায়, সরকারি এবং বেসরকারি দফতরে কর্মরত নারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এর বাইরে আরও পদক্ষেপের প্রয়োজন।

আদালতের পক্ষ থেকে প্রিন্সিপাল সেক্রেটারিকে একটা দল গঠন করে নারী নিরাপত্তার জন্য কী প্রয়োজন এবং কোথায় ঘাটতি রয়েছে তা খতিয়ে দেখে একটা খসড়া প্রস্তাব দিতে বলা হয়।

গত এক বছরে বদল হয়েছে?

জয়েন্ট কমিশনার অফ পুলিশ (ক্রাইম) রূপেশ কুমার বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, গত এক বছরে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেছেন, "রাতে রাস্তায় পুলিশ টহল দেয়, সেখানে বিশেষভাবে নারী পুলিশকর্মীদের রাখা হয়েছে।"

"সিসিটিভির রয়েছে যার মাধ্যমে নজরদারি করা হয়। সরকারি হাসপাতালে পুলিশ আউটপোস্ট রয়েছে, সেখানে মোতায়েন পুলিশ কর্মীরা দ্রুত পদক্ষেপ নেন।"

তার মতামতের সঙ্গে সহমত নন অনেকেই।

সদ্য ডাক্তারি পাশ করা এক তরুণী বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "রাজ্যের একাধিক হাসপাতালে পরিষ্কার বাথরুম নেই। ওয়ার্ডে রাউন্ডে থাকলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাথরুমে না গিয়ে থাকি। অথচ সরকার বলেছিল সমস্ত ব্যবস্থা করা হবে।"

"রাতে ডিউটি থাকলে বাথরুমের বাইরে কোনো নার্স দিদিকে দাঁড়াতে অনুরোধ করি। মেয়েরা থাকলে তবেই চেঞ্জিং রুম ব্যবহার করি।"

কলকাতার এক সরকারি হাসপাতালের নার্সও একই কথা জানিয়েছেন। তার কথায়, "পরিস্থিতি বদলায়নি সেটা রাজ্যের যে কোনো সরকারি হাসপাতালে গেলেই বোঝা যায়। ক্যাম্পাসে জায়গায় জায়গায় আলো নেই, বাথরুমের অবস্থার কথা বাদ দিলাম।"

বেসরকারি অফিসের দীপান্বিতা দাশ বলেন, "প্রতিশ্রুতির সবই মৌখিক। এক বছরে কোনো পরিবর্তন হয়নি।"

"ওড়িশায় এক কলেজ ছাত্রী তার সঙ্গে হওয়া হেনস্থার কথা বারবার জানিয়েও বিচার পায়নি, শেষ পর্যন্ত সে আত্মহত্যা করেছে। কলকাতার কসবা কলেজে একের পর এক যৌন হেনস্থা হয়েছে সেখানেও ছাত্রীরা বিচার পায়নি। সম্প্রতি ওই ছাত্রী প্রকাশ্যে এসে অভিযোগ দায়ের করার পর এতদিনে সবাই নড়েচড়ে বসেছে। এর আগে কী হচ্ছিল? কোথায় তফাত অন্য রাজ্যের সঙ্গে?"

গত বছরের আরজি করের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন মধুবন চক্রবর্তী।

তার কথায়, "ঠিক এক বছর আগে হাসপাতালে তিলোত্তমাকে ধর্ষণ করে হত্যার প্রতিবাদে আমরা সবাই পথে নেমেছিলাম। আর এক বছর পর কসবা কলেজের ক্যাম্পাসে ছাত্রীদের নির্যাতনের ঘটনা সামনে আসছে। মেয়েদের হাসপাতালে নিরাপত্তা নেই, কলেজেও নিরাপত্তা নেই- তাহলে নিরাপত্তা কোথায়?"

বিশেষজ্ঞদের মতামত

আরজি করের ঘটনার পর প্রশাসনের 'টনক নড়েনি' বলেই মনে করেন শিক্ষক এবং ফেমিনিস্ট অ্যাক্টিভিস্ট শতাব্দী দাশ।

তার কথায়, "কলকাতা আগের চেয়ে সুরক্ষিত হয়েছে এটা কিছুতেই বলা যায় না। আরজি করের ঘটনার পর আন্দোলনের সময় আমাদের কিছু নির্দিষ্ট দাবি ছিল। রাস্তা-ঘাটে আলোর ব্যবস্থা, রাস্তায় শৌচাগারের ব্যবস্থা ,২৪ ঘণ্টা সরকারি গণপরিবহন, সমস্ত কলেজ এবং কর্মক্ষেত্রে ইন্টারনাল কমপ্লেন কমিটি রাখাসহ প্রোহিবিশন অফ সেস্কুয়াল হ্যারাসমেন্ট অ্যাক্ট নিশ্চিত করাসহ একাধিক বিষয়ের কথা সেখানে বলা হয়েছিল। কিন্তু গত এক বছরে তার কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে?"

"সরকার পাল্টা বলছে, অপরাজিতা বিল আনা হবে, ধর্ষণ হলে তার কঠিন শাস্তি হবে। কিন্তু সেভাবে তো সুরক্ষা আসে না।"

পরিস্থিতির বদল হয়নি বলেই তার মত। তার কথায়, "এখনো রাতে কোথাও গেলে আমি বা আমার বন্ধু-বান্ধব সবাই বাড়িতে লোকেশন জানিয়ে রাখি, যেমনটা আগেও করেছি। গত এক বছরে আমরা প্রশাসনের টনক নড়াতে পারিনি।"

তাহলে কি কোনো পরিবর্তনই হয়নি, এর উত্তরে শতাব্দী দাশ বলেছেন, "গত এক বছর ধরে ক্রমাগত প্রতিবাদের জেরে মানুষ সচেতন হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে মেয়েরা ভোকাল হচ্ছে–– সেটা রাস্তাঘাটে হোক, কর্মক্ষেত্রে হোক বা বাড়িতে।"

নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন শাশ্বতী ঘোষ। তিনি বলেছেন, "অনেকদিন আগে ব্যারাকপুরের একটা কলেজের ছাত্রীদের নিয়ে ওয়ার্কশপ করেছিলাম। তারা বলেছিল- দিদি হাইরোড ধরে সাইকেল চালিয়ে আসাটা আমাদের কাছে সবচেয়ে ভয়ের। কথাটা আমাকে খুব স্ট্রাইক করেছিল।"

"মেয়েরা সহজলভ্য এবং অন্যায় করলেও কিছু হয় না এই চিন্তাটা বদলায়নি। দোষীরা জানে তারা কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের আশ্রয়ে ঢুকে যাবে।"

কেন নারী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না? এই প্রশ্নে সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা অনিল কুমার জানা বলেছেন, "এইভাবে অপরাধের হার কমানো সম্ভব নয়। কিন্তু কোনো অপরাধ হলেই তাকে লঘু করার চেষ্টা করা বা মিথ্যে প্রমাণের এই চেষ্টাটা ভয়ানক।"

"দীর্ঘদিন ধরেই পুলিশে প্রয়োজনের তুলনায় কর্মী কম। গত কয়েক বছরে সেটা পূরণের চেষ্টা করা হয়েছে সিভিক ভলেন্টিয়ার নিয়োগের মাধ্যমে। তাদের সেই শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ বা দায়িত্ববোধ কিছুই নেই। এইভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা যায় না।"

অধ্যাপিকা শাশ্বতী ঘোষ বলেছেন, "মেয়েদের সুরক্ষার বিষয়টা বরাবরই রাজনৈতিক চাপানউতোরের মধ্যে চলে যায়। আসলে দলগুলো রাজনীতি করতে ব্যস্ত, সাধারণ মানুষ বা মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে এদের মাথা ব্যাথা নেই।"