লাক্ষাদ্বীপে ভারতের দ্বিতীয় সামরিক নৌঘাঁটি কি মালদ্বীপকে মাথায় রেখেই?

ছবির উৎস, INDIAN NAVY/X
- Author, রূপসা সেনগুপ্ত
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা
ভারত মহাসাগরে নজরদারি আরও শক্তিশালী করতে লাক্ষাদ্বীপে নতুন নৌঘাঁটি তৈরি করতে চলেছে ভারতীয় নৌবাহিনী। লাক্ষাদ্বীপের মিনিকয় দ্বীপে 'আইএনএস জটায়ু' নামে এই সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের বিশদ পরিকল্পনা অচিরেই ঘোষণা করতে চলেছে ভারত সরকার।
আগামী ৬ মার্চ (বুধবার) আনুষ্ঠানিকভাবে আইএনএস জটায়ুর বিষয়ে ঘোষণা করবে ভারত সরকার। কিন্তু এই প্রকল্প ঘোষণা হওয়ার পরই এর সূত্র ধরে আরও একবার উঠে এসেছে ভারত ও মালদ্বীপের কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রসঙ্গ।
ভারতীয় নৌবাহিনীর তরফে জানানো হয়েছে, এই ঘাঁটিটি পশ্চিম আরব সাগরে জলদস্যুদের প্রতিহত করতে সাহায্য করবে। একই সঙ্গে মাদক বিরোধী অভিযানের দিকে ভারতীয় নৌবাহিনীর অভিযানের পরিসর আরও বাড়িয়ে তুলবে।
যদিও ভারত মহাসাগরে নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে ব্যবহৃত জলপথে অবাধ চলাচলের ক্ষেত্রে এই নতুন নৌঘাঁটির গুরুত্ব অনস্বীকার্য, মালদ্বীপের নিকটবর্তী ‘কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ’ ওই উপকূলে শক্তিবৃদ্ধি করতেই ওই নৌঘাঁটি তৈরি করতে চলেছে ভারতীয় নৌবাহিনী - এমনটাও ধারণা করা হচ্ছে।
ভারতের সঙ্গে মালদ্বীপের সম্পর্কের অবনতি এবং সেখান থেকে ভারতীয় সেনা সদস্যদের ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরুর ঠিক আগেই ভারতীয় নৌবাহিনীর তরফে এই পদক্ষেপ নেওয়া ইঙ্গিতবহ, একথা জানানো হয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি-র একটি প্রতিবেদনে।
সেখানে বলা হয়েছে, ভারত ও মালদ্বীপের সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে গত বছর চীনপন্থী প্রেসিডেন্ট মোহামেদ মুইজ ক্ষমতায় আসার পর থেকে। ভারতীয় বাহিনীকে বহিষ্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনে জিতেছিলেন তিনি।
অন্য দিকে, চীনের সঙ্গে মালদ্বীপের ‘নৈকট্য’ও ভারত মহাসাগরে নজরদারি আরও শক্তিশালী করে তোলার পিছনে অন্যতম কারণ বলেও মনে করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিককালে ভারত-মালদ্বীপ সম্পর্কের সঙ্গে এই ভারতীয় নৌবাহিনীর এই পদক্ষেপের কোনও যোগাযোগ রয়েছে কী?
সাবেক উইং কমান্ডর এবং প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ প্রফুল্ল বক্সি বলেন, “আইএনএস জটায়ু একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে নজরদারি করবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ৮০ শতাংশ মালাক্কা প্রণালীর সঙ্গে সম্পর্কিত এই জলপথে ব্যবহার করে হয়।"
"চীন তাদের জ্বালানি এবং বাণিজ্যের জন্য এই পথ ব্যবহার করে থাকে। কৌশলগত ভাবে এই অঞ্চলের গুরুত্ব অপরিসীম, বিশেষত চীনের আগ্রাসনের কথা ভাবলে। তাই এই নতুন নৌঘাঁটি কিন্তু খুব জরুরি।”
অন্যদিকে, বিদেশ নীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং লেখক রাজীব ডোগরা বলেন, “ভারত মহাসাগরের প্যাসেজে আন্তর্জাতিক নৌচলাচল এবং নিরাপত্তার দিক থেকে ভারত অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে।“
“আইন মেনে আন্তর্জাতিক নৌচলাচল যাতে অবাধ ও সুরক্ষিতভাবে হতে পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখাটা একটা বড় বিষয়। এই ভাবনা থেকেই ভারতের লাক্ষাদ্বীপে একটি নতুন নৌঘাঁটি গড়ে তোলার কথা ভাবা হচ্ছে। এর সঙ্গে ভারত-মালদ্বীপের সম্পর্কএর কোনও যোগাযোগ নেই বলে আমি মনে করি”, বিবিসি বাংলাকে বলেন মি ডোগরা।

ছবির উৎস, INDIAN NAVY/X
লাক্ষাদ্বীপে দ্বিতীয় নৌঘাঁটি
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
ভারতীয় নৌবাহিনীর আইএনএস জটায়ু লাক্ষাদ্বীপের দ্বিতীয় নৌ ঘাঁটি। এছাড়া লাক্ষাদ্বীপের কাভারত্তিতে আইএনএস দ্বীপরক্ষক রয়েছে। মালদ্বীপের সঙ্গে এই নতুন ঘাঁটির দূরত্ব লাক্ষাদ্বীপের অপর ঘাঁটি দ্বীপরক্ষকের থেকে দূরত্বের তুলনায় আরও কম হবে।
মিনিকয় লাক্ষাদ্বীপ দ্বীপপুঞ্জের সবচেয়ে দক্ষিণের দ্বীপ, যা মালাক্কা প্রণালী এবং এডেন ও হরমুজ উপসাগরের মধ্যে প্রাথমিক সামুদ্রিক বাণিজ্য রুটগুলির সঙ্গে সম্পর্কিত।
আইএনএস জটায়ু ওই অঞ্চলে প্রাথমিক ভাবে যোগাযোগ করবে, নৌবাহিনীর সক্ষমতা বাড়াবে এবং মূল ভূখণ্ডের সাথে সংযোগ বাড়াবে।
এ বিষয়ে মি ডোগরা বলেছেন, “আন্তর্জাতিক স্তরে জলপথে নৌ চলাচলের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার দিক থেকে ভারতের ভূমিকা কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর সঙ্গে মালদ্বীপের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের কোনও সম্পর্ক নেই।"
"লাক্ষাদ্বীপে আরও একটি নতুন নৌঘাঁটি তৈরির প্রয়োজন ছিল। এটা একটা স্বতন্ত্র পদক্ষেপ। ঘোষণার সময় হয়ত এখন, কিন্তু এই বিষয়ে অনেক আগে থেকেই চিন্তাভাবনা করা হয়েছিল।”
আন্তর্জাতিক অবস্থানের কথা ভেবে এই অংশে আরও আগেই এই দ্বিতীয় ঘাঁটি গড়ে তোলা উচিত ছিল, এমনটা জানিয়েছেন সাবেক উইং কমান্ডার প্রফুল্ল বক্সি।
তিনি বলেন, “এই অংশটা এশিয়া প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিক এরিয়ার মধ্যে পড়ে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এর ভৌগোলিক অবস্থান এবং চীনের আগ্রাসনের কথা ভাবলে এই দ্বিতীয় ঘাঁটি কিন্তু আগেই তৈরি করা উচিত ছিল।"

ছবির উৎস, Getty Images
মালদ্বীপের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাম্প্রতিক লাক্ষাদ্বীপ সফরের ছবিতে মালদ্বীপের মন্ত্রী মরিয়াম শিউনা এবং অন্যান্য নেতাদের আপত্তিজনক মন্তব্যকে ঘিরে কূটনৈতিক উত্তেজনা ও সংঘাত তুঙ্গে ওঠে গত জানুয়ারি মাসে।
গত বছর ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপতি মুইজ ভারতীয় সেনাকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে বলার বিষয়টিকে ঘিরে তরজা কিন্তু আগে থেকেই চলছিল। এরপর মুইজ সরকারের মন্ত্রীদের মন্তব্যকে ঘিরে শুরু হয় বিতর্ক।
প্রধানমন্ত্রী মোদীর লাক্ষাদ্বীপ সফরের সময় তিনি পর্যটনকেন্দ্র হিসাবে লাক্ষাদ্বীপকে তুলে ধরার বিষয়ে জোর দিয়েছিলেন। সেই ছবিকে ঘিরে মালদ্বীপের মন্ত্রীদের বিতর্কিত মন্তব্যের পর ‘বয়কট মালদ্বীপ’ ভারতের সমাজমাধ্যমে ট্রেন্ড করতে থাকে।
অনেক পর্যটক মালদ্বীপ সফর বাতিল করেন। ভারতীয় ভ্রমণ সংস্থা গুলিও একই সিদ্ধান্ত নেয়। ট্রেন্ড করতে থাকে ‘লাক্ষাদ্বীপ’।
অন্য দিকে, মালদ্বীপের একটি ঘাঁটি থেকে চলতি মাসেই ভারতের সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার করার কথা। এবং পরে মে মাসের মধ্যে বাকি দুই ঘাঁটি থেকে সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে, এমনটাই মালের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এই আবহে ভারতে একটি নতুন নৌঘাঁটি, তাও সেটি লাক্ষাদ্বীপে তৈরি করার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে বলেও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
যদিও এ বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করেন বিদেশনীতি এবং সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ মনোজ যোশী।
তার কথায়, “মালদ্বীপে আমাদের তো সে অর্থে কোনও সামরিক ঘাঁটি নেই। আমরা মালদ্বীপের সরকারকে সাহায্য করতে যেটুকু দরকার, সেটুকু সাহায্য করছিলাম। তাই সেখান থেকে ভারতীয় বাহিনী সরিয়ে নেওয়ার সঙ্গে লাক্ষাদ্বীপে একটি নতুন নৌঘাঁটি তৈরির কোনও যোগাযোগ আছে বলে আমি মনে করি না।“
অবস্থানগত ভাবে ওই জলপথের গুরুত্বের কথাও বলেছেন তিনি।
“আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক রুটের পরিপ্রেক্ষিতে লাক্ষাদ্বীপে দ্বিতীয় নৌঘাঁটি একটা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু এটা ছাড়াও কর্ণাটক, কোচি, মুম্বইয়েও নৌঘাঁটি রয়েছে। সেদিন থেকে এটা কোনও নতুন ঘটনা নয়।”
বিদেশনীতি বিশেষজ্ঞ রাজীব ডোগরা এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক জলপথে নিরাপত্তার কথা তুলে ধরেছেন। সাম্প্রতিককালে ১৯ জন পাকিস্তানি নাবিককে সোমালিয়ার জলদস্যুদের কবল থেকে ভারতীয় নৌবাহিনী যেভাবে উদ্ধার করেছিল, সে ঘটনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
মি ডোগরার কথায়, “আন্তর্জাতিক স্তরে জলপথে নৌ চলাচলের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার দিক থেকে ভারতের ভূমিকা কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক যে আইন রয়েছেব তা সমস্ত দেশ মেনে চলছে কি না সে বিষয়ে নজরদারির দিক থেকেও এই পদক্ষেপ উল্লেখযোগ্য।”
তবে, চীন যে ওই অংশে কড়া নজর রেখেছে সে বিষয়ে উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
“চীনের আগ্রাসন এবং ভারত মহাসাগরে তাদের নজর কিন্তু একটা বড় কারণ ওই অঞ্চলে নজরদারি বাড়ানোর। চীন ইতিমধ্যে কৃত্রিমভাবে দ্বীপ বানাচ্ছে একই সঙ্গে মালদ্বীপের সঙ্গে তাদের নৈকট্যও বেড়েছে” বলছিলেন মি বক্সি।

ছবির উৎস, Getty Images
End of বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর
চীনের সঙ্গে নৈকট্য
ভারত এবং মালদ্বীপের সম্পর্কের অবনতি 'দুঃখজনক' বলে মনে করেন সাবেক উইং কমান্ডার প্রফুল্ল বক্সি। মালদ্বীপে ১৯৮৯ সালে অভ্যুত্থানের উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ভারত কিন্তু বরাবরই মালদ্বীপের পাশে থেকেছে। ১৮৮৯-এর অভিযানের আমি সাক্ষী। দুই দেশের মধ্যে যে সম্পর্কের অবনতি তা দুঃখজনক। চীনের সঙ্গে তাদের নৈকট্য বেড়েছে সেটাও ঠিক।”
এই নৈকট্যের বিষয়টা যে আগে থেকেই শুরু হয়েছে সে বিষয়টা ভারত জানত, এমনটাই মনে করেন অধ্যাপক উপমন্যু বসু। মানব রচনা ইন্সটিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড স্টাডিজ-এর রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক তিনি।
অধ্যাপক বসু বলছিলেন, “চীনের সঙ্গে মালদ্বীপের নৈকট্যের বিষয়টা ভারত জানত। এবং প্রেসিডেন্ট মুইজ ক্ষমতায় আসার পর তা একটু একটু করে স্পষ্ট হয়েছে। তিনি প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর প্রথমে তুরস্ক এবং তারপরেই চীন সফরে গিয়েছেন।”
প্রসঙ্গত, এর আগে মালদ্বীপের প্রেসিডেন্টরা কিন্তু বরাবর সবার আগে ভারত সরফেই এসেছেন রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর। এক্ষেত্রে তা হয়নি।
ভোটের প্রচারের সময়েই ভারতীয় সেনা মালদ্বীপ থেকে প্রত্যাহার করার কথা শোনা গিয়েছিল। একই সঙ্গে তিনি চীনপন্থি বলেও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
“চীনের সঙ্গে তাদের ভাল সম্পর্ক যে খুব লাভদায়ক হবে মালদ্বীপের জন্য তেমনটা নয়, কারণ দুই দেশের মধ্যে ভৌগোলিক দূরত্ব। একই সঙ্গে চীন যে দেশগুলোকে সাহায্য করছে, তাদের উপর চাপ প্রয়োগের বিষয়টাও কিন্তু রয়েছে।"
"যেমনটা শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে, ফিলিপিন্সের জন্যেও চীন দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে”, বলছিলেন মি ডোগরা।
উপমন্যু বসু আবার বলছিলেন, “চীনের গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিসিয়েটিভ এবং গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ-এর প্রেক্ষিতে মালদ্বীপের একটা নির্দিষ্ট ভূমিকা আছে। আর চীনের নিজেদের অর্থনীতির অবস্থা ভাল না হলেও বিশ্ব দরবারে নিজেদের তুলে ধরা আর ভারত বিরোধী নীতি কিন্তু বরাবরই আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।"
"অন্যদিকে, ভারত যে সাহায্য করতে চায় মালদ্বীপকে সে কথাও একাধিকবার স্পষ্ট করেছে ভারত সরকার।”
তবে চীনের সঙ্গে মালদ্বীপের সম্পর্ক ভবিষ্যতে কোন দিকে গড়ায় সেদিকে অবশ্যই নজর থাকবে প্রতিবেশী দেশ ভারতের।
“চীনের সঙ্গে মালদ্বীপের কী সম্পর্ক দাঁড়ায় সেটা দেখার। তবে মালদ্বীপের নাগরিকেরা যে তাদের প্রেসিডেন্টের মতো ভাবেন তেমনটা নয়।"
"সেই কারণে সে দেশে প্রেসিডেন্টের বিরোধীরাও ভাবিত যে ভারতের সঙ্গে মালদ্বীপের সম্পর্কের আরও অবনতি হয় কিনা। এই পুরো বিষয়টি কিন্তু বেশ গুরুত্বপূর্ণ”, বিবিসিকে বলছিলেন রাজীব ডোগরা।








