লেখকের বয়ানে অবিভক্ত বাংলায় স্টিমার যাত্রার অভিজ্ঞতা

পুরনো আমলের স্টিমারগুলোর কোনো কোনটিকে এখনো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নদীপথে চলতে দেখা যায়। ছবিটি তুলেছেন শাহনাজ পারভীন।

ছবির উৎস, Shahnaz Parveen

ছবির ক্যাপশান, পুরনো আমলের স্টিমারগুলোর কোনো কোনটিকে এখনো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নদীপথে চলতে দেখা যায়। ছবিটি তুলেছেন শাহনাজ পারভীন।
    • Author, মীর সাব্বির
    • Role, বিবিসি বাংলা

অবিভক্ত বাংলায় কলকাতা থেকে ঢাকায় যাতায়াতের সাধারণ মাধ্যমটি ছিল বর্তমান বাংলাদেশের রাজবাড়ি জেলার গোয়ালন্দ থেকে স্টিমারে নারায়ণগঞ্জ যাত্রা।

কলকাতা থেকে ট্রেন তারপর গোয়ালন্দ থেকে সেই স্টিমার ভ্রমণ ছিল যাত্রীদের কাছে অনন্য একটি অভিজ্ঞতা।

পরবর্তীতে সিরাজগঞ্জ হয়ে ট্রেন এবং ফেরি সার্ভিস চালু হবার কারণে গোয়ালন্দের সেই স্টিমারের গুরুত্ব কমতে থাকে।

কিন্তু সেই স্টিমারে ভ্রমণ এখনো অনেককে স্মৃতিকাতর করে তোলে।

লেখক এবং বামপন্থী রাজনীতিবিদ বদরুদ্দীন উমর এমনই একজন।

তার শৈশব কেটেছে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে।

* <bold><link type="page"><caption> দেখুন: ইন্টার‍্যাকটিভ ম্যাপে বাংলাদেশের ঝুঁকিপূর্ণ নদী</caption><url href="http://www.bbc.com/bengali/news/2016/04/160406_amar_nodi_interactive_map" platform="highweb"/></link> </bold>

১৯৪৫ সালের ডিসেম্বর মাসে মোটে চৌদ্দ বছর বয়সে গোয়ালন্দ ঘাট থেকে প্রথমবারের মত স্টিমারে চড়েছিলেন মি. উমর।

তিনি বলছেন, “স্টিমারে যাত্রা ওই বয়সে খুব এক্সাইটিং ছিল। কারণ আমরা তো পশ্চিমবঙ্গের লোক, খুব একটা নৌকো বা স্টিমার-টিমারে চড়তাম না। প্রথম চড়লাম। সেটা খুব ভাল লেগেছিল।”

* <bold><link type="page"><caption> ক্লিক করুন: আমার নদী, বিবিসি বাংলার ফেসুবক পাতা</caption><url href="https://www.facebook.com/events/175701469475522/?active_tab=posts" platform="highweb"/></link> </bold>

“তখনকার দিনের নদীও বিশাল ছিল। এদিক ওদিক দেখা যেত না এরকম অবস্থা। অনেকটা সমুদ্র যাত্রার মতো মনে হত। স্টিমার যখন যেত, সেই স্টিমার এত ঢেউ তুলত বুঝলেন, নৌকোগুলো ভীষণ লাফাত। এটা দেখার মত ছিল”।

তখন ঢাকায় আসতে গেলে গোয়ালন্দ নারায়ণগঞ্জ লাইনের স্টিমার ছাড়া আর কিছু ছিল না। ট্রেনে আসা শুরু হল অনেক পরে, বলছিলেন মি. উমর।

বদরুদ্দিন উমর।
ছবির ক্যাপশান, বদরুদ্দিন উমর।

“শেয়ালদা থেকে চড়তাম, ট্রেন থেকে এসে আমরা গোয়ালন্দ ঘাটে নামতাম। ট্রেনের যে টিকেট কাটতাম, সেটা হত একদম নারায়ণগঞ্জ পর্যন্তই। টিকিট আর করতে হত না।”

“রাস্তায় যেতে যেতে দুটো বড় স্টেশন পড়ত। একটি ছিল তারপাশা। আরেকটি ছিল মুন্সীগঞ্জ। মুন্সীগঞ্জে যেটা দেখা যেত, বিরাট বিরাট সব ঝুড়িতে সাগর কলা। আমাদের ওখানে হচ্ছে মর্তমান কলা সবচেয়ে বড় কলা, এখানে যেটাকে সবরী কলা বলে”।

“এই মুন্সীগঞ্জের কলা আগে দেখিনি আমরা। আর বিরাট বিরাট ঝুড়ি নৌকোতে নিয়ে তারা সব ঘাটে আসত। কোনো সময় ইলিশ মাছ যারা বিক্রি করে তারাও ঘাটে আসত।”

আগেকার দিনে ট্রেনে যেমন ফার্স্ট ক্লাস, সেকেন্ড ক্লাস, থার্ড ক্লাস আর ইন্টার ক্লাস ছিল তেমনি স্টিমারেও ওই চারটে ক্লাস বা যাত্রী শ্রেণী ছিল।

“বিরাট বড় স্টিমার। যেরকম স্টিমার হয়তো এখন আছে বোধ হয় কিছুটা ঢাকা বরিশাল রুটে চলাচল করে। আগেকার দিনে চট্টগ্রামেও যেত। যাত্রীরা চাঁদপুরে নেমে (ট্রেনে চড়ে) চট্টগ্রামে চলে যেত”।

“খাওয়ার ব্যবস্থাও সেরকম ছিল। ফার্স্ট ক্লাস আর সেকেন্ড ক্লাসের যারা প্যাসেঞ্জার তাদের জন্য আলাদা কিচেন ছিল, সেখানে রান্না হত। আর একটা কিচেন ছিল বড়, যেখানে ইন্টার ক্লাস আর থার্ড ক্লাসের প্যাসেঞ্জাররা খেত”।

“দুটি জিনিস খুব ভাল রান্না করত ওরা, ইলিশ মাছ আর মুরগি। মুরগির ওই কারির খুব সুখ্যাতি ছিল। আর ইলিশ মাছও রানতো খুব ভাল করে।”

বদরুদ্দীন উমর বলছেন, এভাবে স্টিমারে করেই ঢাকা-কলকাতা যাওয়া আসা করেছেন তারা।

দেশ বিভাগের পর ১৯৫৭ বা ১৯৫৮ সালে প্রথম ট্রেনে চড়ে ঢাকা আসেন। পরেও স্টিমারে যাওয়া হয়েছে এক আধবার। কিন্তু পরবর্তীতে বেশীরভাগ সময়ই সিরাজগঞ্জ দিয়ে ট্রেনে চড়ে যাওয়া হত।

মি. উমরের ভাষায়, “স্টিমারের জার্নিটা খারাপ ছিল না, কিন্তু সময় বেশী নিত। নদীর উপর দিয়ে জার্নিটাই একটা আনন্দময় ব্যাপার ছিল”।