ইসলামিক স্টেট কেন এত বর্বর ও নৃশংস?

আইএস

ছবির উৎস, AP

ছবির ক্যাপশান, আইএস জঙ্গিরা একদল ইথিওপিয়ান বন্দিকে হত্যা করছে - ফাইল ছবি

শিল্প, সংস্কৃতি আর ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে নজিরবিহীন হামলার দায়িত্ব স্বীকার করেছে ইসলামিক স্টেট জঙ্গি গোষ্ঠী।

ইসলামিক স্টেট নামটি বিদ্বেষের সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শিরশ্ছেদ, ক্রুশবিদ্ধ করা, পাথর ছুড়ে মারা, পাইকারীহারে হত্যা, জীবন্ত কবর দেয়া আর ধর্মীয় ও জাতিগত নিধন – কী করছে না এই গোষ্ঠী।

সুন্নি এই চরমপন্থি গোষ্ঠীটি হঠাৎ করে ইরাক ও আশেপাশে আত্মপ্রকাশ করার পর শিউরে ওঠার মত হিংস্রতা আর রক্তপাতের মাধ্যমে পুরো বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

কিন্তু হিংস্রতার কারণ সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করেছেন লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স ও পলিটিক্স-এর অধ্যাপক ফাওয়াজ এ. গারগেজ, যিনি ‘জার্নি অব দ্যা জিহাদিস্ট: ইনসাইড মুসলিম মিলিট্যান্সি’ শিরোনামে একটি বই লিখেছেন।

যে মাত্রায় আইএস বর্বরতা চালাচ্ছে তা হয়তো সভ্য সমাজের বেশীরভাগ মানুষের কাছে অর্থহীন মনে হতে পারে, কিন্তু আইএস-এর জন্যে এটি যৌক্তিক একটি পছন্দ।

এটি তাদের একটি সচেতন সিদ্ধান্ত শত্রুকে ভয় দেখানো এবং এর মাধ্যমে নতুনদেরকে প্রভাবিত করে দল ভারী করা।

আইএস

ছবির উৎস, AP

ছবির ক্যাপশান, আইএস জঙ্গিদের কনভয়ের এই ছবি রিলিজ করে জঙ্গিদের একটি ওয়েবসাইট -ফাইল ছবি

আইএস কোন সীমা বা নিষেধ না মেনে সর্বাত্মক যুদ্ধে বিশ্বাসী। এমনকি অন্য সুন্নি প্রতিপক্ষের সাথে বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে এরা কোন সমঝোতায়ও বিশ্বাসী নয়।

পূর্বসূরি আল-কায়েদার মতো অপরাধকে যুক্তিগ্রাহ্য করার জন্যে আইএস ধর্মের বানীও আওড়ায় না।

আইএস-এর সহিংসতার শিকড় রয়েছে এর আগের দুটো সহিংসতার মধ্যে, যদিও সেগুলোর মাত্রা এত ব্যাপক ছিল না।

প্রথম ঢেউটির নেতৃত্বে ছিলেন সাঈদ কুতব-এর শিষ্যরা। মিশরীয় এই কট্টরপন্থীকে আধুনিক জিহাদীতন্ত্রের মূল তাত্ত্বিক মনে করা হয়।

এরা পশ্চিমা-পন্থী ধর্মনিরপেক্ষ আরব সরকারগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল, যাদেরকে তারা বলতো ‘কাছের শত্রু’।

এদের শুরু ১৯৮০ সালে মিশরীয় প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদতের হত্যাকাণ্ড দিয়ে, আর একটা বড় অংশ আফগানিস্তানে নতুন শত্রু খুঁজে পায়, যেটি ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন।

সোভিয়েতের বিরুদ্ধে আফগান জিহাদ জন্ম দেয় দ্বিতীয় ঢেউয়ের।

বিন লাদেন

ছবির উৎস, Getty

ছবির ক্যাপশান, ১৯৯৮ সালে তোলা ওসামা বিন লাদেনের ছবি। নিউ ইয়র্কে সন্ত্রাসী হামলার জন্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাকেই দায়ী মনে করে - ফাইল ছবি

এদের ছিল সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য বস্তু – ‘দুরের শত্রু’, যাদের মধ্যে ছিল মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, আর কিছুটা হলেও ইউরোপের দেশগুলো। আর এর নেতৃত্বে ছিলেন ধনী এক সৌদি নাগরিক, ওসামা বিন লাদেন।

বিন লাদেন এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরে হামলার ঘটনা ঘটিয়েছিলেন, যাকে তিনি বলেছেন ‘আত্মরক্ষামূলক জিহাদ’ বা মুসলিম সমাজে কথিত মার্কিন প্রভাবের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ।

আইএস নেতা আবু বকর বাগদাদীর কাছে অবশ্য এসব যুক্তির কোন মূল্য নেই। তিনি ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা ধর্মের দোহাই আর তত্ত্বের ব্যাপারে মাথা না ঘামিয়ে সহিংসতার ওপর জোর দেন। নিজেদেরকে গড়ে তোলেন কিলিং মেশিন হিসেবে, যাকে শক্তি যোগায় রক্ত আর অস্ত্র।

বিন লাদেনের মূলমন্ত্র ছিল এ রকম – ‘মানুষ একটি শক্তিশালী ঘোড়া ও একটি দুর্বল ঘোড়া দেখলে তাঁরা সবলটিকে পছন্দ করে’। আর আল-বাগদাদীর মূলমন্ত্র হলো – ‘সন্ত্রাসের মাধ্যমে বিজয় অর্জন’।

আর এর মাধ্যমে তিনি বন্ধু ও শত্রুদের যে বার্তা দিচ্ছেন, তা হলো – আইএস নামের ঘোড়াটি জয় করতে এসেছে। সরে দাড়াও, না হলে পিষ্ট হবে। অথবা আমাদের বহরে যোগ দিয়ে ইতিহাস তৈরি করো।

সাক্ষ্য-প্রমাণ যা পাওয়া যাচ্ছে, তাতে দেখায় যায় আল-নুসরা ফ্রন্টের মতো গোষ্ঠী যারা এক সময় আইএস-এর বিরোধী ছিল, তারাও আল-বাগদাদীর ডাকে সাড়া দিয়েছে।

বাগদাদী

ছবির উৎস, afp getty

ছবির ক্যাপশান, আবু বকর আল-বাগদাদী - ফাইল ছবি

ইসলামের শত্রুর বিরুদ্ধে আইএস-এর যে কৌশল, তাতে সাড়া দিয়েছে সারা বিশ্বের অনেক তরুণ, যারা এই গোষ্ঠীকে মুক্তির পথ বলে মনে করে।

ইরাক ও সিরিয়ায় আইএস বিশাল এলাকা দখল করে খেলাফত প্রতিষ্ঠা করেছে। সাফল্যের চেয়ে বড় আর কিছু নেই, ফলে অনেকেই তাদের সঙ্গে যোগ দিচ্ছে।

খেলাফতের উত্থানের কথায় পশ্চিমা অনেক মানুষ সেখানে গেছে। প্রথম দিকে লন্ডন, বার্লিন আর প্যারিসের অনেক তরুণ স্বধর্মীদের রক্ষায় জিহাদের ভূমিতে গেছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আইএস-এর হাতে পড়ে অংশ নিয়েছে নিরীহ মানুষের শিরশ্ছেদের মতো ঘটনায়।

আইএস-এর লাগামছাড়া কট্টরপন্থার শেকড় রয়েছে ইরাকে আল-কায়েদার ভেতরে, যার নেতৃত্বে ছিলেন আবু মুসাব আল-যারকাওয়ি।

আইএস

ছবির উৎস, AP

ছবির ক্যাপশান, আইএস যোদ্ধা - ফাইল ছবি

আল-কায়েদা শিয়া বিরোধী না হলেও আইএস শিয়া বিরোধী হিসেবে বেড়ে উঠেছে। আল-যারকাওয়ি এবং আল-বাগদাদী দু’জনেই শিয়াদেরকে বিধর্মী হিসেবে মনে করেন। শিয়াদের হত্যা না করতে আল-কায়েদা নেতা আইমান আল-যাওয়াহিরির একের পর এক ডাক উপেক্ষা করেছেন আল-বাগদাদী।

ইরাকে শিয়া-সুন্নি বিভেদ আর সিরিয়ায় জাতিগত দাঙ্গার সুযোগ নিয়ে আল-বাগদাদী সুন্নিদের মধ্যে একটি শক্তিশালী সমর্থক গোষ্ঠী গড়ে তুলেছেন।

এতদিন আইএস মূলত শিয়াদের নিয়ে ব্যস্ত ছিল, ‘দুরের শত্রু’র দিকে নজর ছিল কম। এখন যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ তাদের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়েছে, তাই গোষ্ঠীটি তাদের সব শক্তি প্রতিশোধের জন্যে ব্যবহার করতে পারে।

কয়েকমাস আগে আল-বাগদাদী বলেছিলেন যে আমেরিকায় গিয়ে হামলা চালানোর মতো সক্ষমতা তাঁর সংগঠনের নেই। তবে তিনি চান আমেরিকানরা মাঠে নামবে এবং তিনি তাদের খুন করবেন।